বারবার ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন? এই গবেষণা আপনাকে সাহায্য করবে

মানুষ নিয়মিত একই ধরনের ভুল করেছবি: পেক্সেলস

২০০২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান ইসরায়েলি-মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কানেম্যান। বাক্যটা পড়ে আপনার কপালে বিস্ময়সূচক চিন্তার ভাঁজ পড়তেই পারে। অর্থনীতিতে পুরস্কার পেলেন মনোবিজ্ঞানী? এ বিষয়ের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয় যে অর্থনীতিতে মনোবিজ্ঞানের গুরুত্ব কতটা গভীর আর কার্যকর।
ড্যানিয়েলের গবেষণার বিষয় ছিল, ‘ডিসিশন মেকিং আন্ডার আনসার্টেইনিটি’ বা অনিশ্চয়তার ভেতর মানুষ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। এই মনোবিজ্ঞানীর গবেষণা অর্থনীতির চিন্তাধারায় বিপ্লব ঘটায়। এ কারণেই তাঁকে অর্থনীতিতে নোবেল দেওয়া হয়।

গবেষণাটা কী

ড্যানিয়েল কানেম্যান ও তাঁর সহকর্মী আমোস টভার্সকি দুই দশকের বেশি সময় ধরে গবেষণা করে প্রমাণ করেন, মানুষ আদতে পুরোদস্তুর যুক্তিবাদী না। মানুষ সব সময় যুক্তিসংগতভাবে লাভ-ক্ষতি হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেয়—অর্থনীতির এই প্রচলিত ধারণা ভেঙে দেন এই দুজন। ড্যানিয়েল ও আমোস দেখান, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমরা প্রায়ই আবেগ, অভ্যাস, মানসিক পক্ষপাত, ভয় ও লাভ-ক্ষতির অনুভূতি, এমনকি কে কী মনে করবে, এসব দ্বারা প্রভাবিত হয়েও সিদ্ধান্ত নিই। এই গবেষণা থেকেই মূলত ‘বিহেভিয়রাল ইকোনোমিকস’ বা ‘আচরণগত অর্থনীতি’র ধারণা সুদৃঢ় হয়।

কী আছে এই বিখ্যাত গবেষণায়

১. টু-সিস্টেম মডেল
মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় মূলত দুটি মডেল অনুসরণ করে। এক. আবেগপ্রবণ হয়ে, অবচেতন মন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ও হুট করে। আর দুই. যুক্তি বিশ্লেষণ করে, ধীরে, সচেতনভাবে নিরপেক্ষ থেকে। এই গবেষণায় জানা যায়, শতকরা ৮৬ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে মানুষ প্রথম মডেল অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নেন। আর সে ক্ষেত্রে তাঁরা আবেগকে যুক্তির জায়গায় বসিয়ে যুক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মনে করেন।

নোবেল জয়ী ইসরায়েলি-মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কানেম্যান
ছবি: উইকিপিডিয়া

২. বারবার একই ভুল
এ গবেষণায় এই বিজ্ঞানী দেখিয়েছেন, মানুষ নিয়মিত একই ধরনের ভুল করে। অর্থাৎ একই প্যাটার্নে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। প্রিয় রং, প্রিয় সংখ্যা বা কোনো অনুভূতি নিরপেক্ষভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে বাধা। ড্যানিয়েলের গবেষণা ব্যাখ্যা করে, একই কথা বারবার বলা হলে তা আমাদের কাছে পরিচিত মনে হয়। আর সেটাকে আমরা সহজেই বিশ্বাস করি। ফলে একটা পরিচিত ভুল কথা আর অপরিচিত সঠিক কথা—এই দুইয়ের ভেতর আমরা সাধারণত প্রথম বিকল্পটাকেই গ্রহণ করি। কেননা আমাদের মস্তিষ্ক পরিচিত বিকল্পটিকে সত্য আর সঠিক হিসেবে ধরে নেয়। আর এভাবেই জ্ঞানগত পক্ষপাতের ফলে আমাদের মস্তিষ্ক ধোঁকা খায়। এ গবেষণা বলে, ধীর কিন্তু বেশি নির্ভুল উত্তর অপেক্ষা ‘যথেষ্ট ভালো’ উত্তরকে আমাদের মস্তিষ্ক দ্রুত গ্রহণ করে। আর ঠিক এ কারণেই আমরা অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্তেও আত্মবিশ্বাসী থাকি।

৩. ক্ষতির ভয়
এটি এ গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। মানুষ সমপরিমাণ লাভে যতটা খুশি হয়, সমপরিমাণ ক্ষতিতে তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট পায়। আর সেটি প্রায় লাভে খুশি হওয়ার চার গুণ পর্যন্ত হতে পারে। ধরুন, আপনি ৫০০ টাকা লটারিতে জিতলেন। বাড়ি ফেরার সময় সেই ৫০০ টাকা আপনার ব্যাগ থেকে হারিয়ে গেল। গণিত অনুসারে, আপনার অনুভূতি হওয়ার কথা ছিল নিরপেক্ষ। কিন্তু আপনার মন খারাপ। আর সেই মন খারাপ ভাবটা কতটা গভীর জানেন? ৫০০ টাকা লটারিতে জেতার পর যতটা খুশি হয়েছিলেন, তার দ্বিগুণ থেকে চার গুণ!
ঠিক এ কারণেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ লাভ হওয়ার চেয়ে ক্ষতি এড়ানোটাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়।

এ গবেষণা কীভাবে মানুষের কাজে লাগে

স্বাস্থ্য খাতে রোগী ও ডাক্তার কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তা বুঝে ভালো চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। মানুষ কেন ভুল বিনিয়োগ করে, ভয় পেয়ে সিদ্ধান্ত বদলায়—তা বোঝা যায়। সঞ্চয়, ঋণ, বিমা নীতিমালা উন্নত করা যায়। সরকারি নীতিতে মানুষকে জোর না করে, পরিবেশ বদলে ভালো সিদ্ধান্তে উৎসাহ দেওয়া যায় (যেমন ট্যাক্স দেওয়া, টিকা নেওয়া)।
ব্যক্তিজীবনে আমরা কেন ভুল সিদ্ধান্ত নিই, তা এ গবেষণার বিশ্লেষণের মাধ্যমে সহজে বোঝা যায়। এ গবেষণা ধীরে সিদ্ধান্ত নেওয়া, বিকল্প কমানো ও ক্লান্ত অবস্থায় বড় সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়।

সূত্র: অ্যামেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন

আরও পড়ুন