ক্ষণজন্মা এক খ্যাপাটে ফুটবলের ঈশ্বর, পর্ব–০১
আর্থিক সংগতি ছিল না, তাই স্কুলে না পাঠিয়ে ম্যারাডোনাকে ফুটবল কিনে দিয়েছিল পরিবার
আর্জেন্টিনার দে লা নুসে ক্লিনিক। ৩০ অক্টোবর ১৯৬০, রোববার।
ক্লিনিকে যত বাচ্চার জন্ম হয়েছে তার সবই মেয়ে। শুধু একটি বাচ্চা ছিল ছেলে। মাথাটা দেহের তুলনায় বেশ বড়। চিকিৎসক মাকে বলেন, ‘তোমার এই ছেলে বড় হয়ে খুব শক্তপোক্ত হবে, দেখো।’ মায়ের খুশি আর ধরেই না। আগের তিনটিই মেয়ে। ঈশ্বরের কাছে একটিই চাওয়া ছিল—এবার যেন ছেলে হয়। গরিবের সংসার। ভেবেছিলেন, একটা ছেলে হলে সংসারেও সুবিধা হবে।
আর্জেন্টিনায় রোববার মানেই ফুটবল। বলা হয়, সেখানকার লোক ফুটবল দিয়ে ভাত খায়। রোববার বিকেলেও পাশের স্টেডিয়ামে খেলা চলছে। চিকিৎসকের অপারেশন থিয়েটারেও একটি রেডিও। রেডিওতে চলছে ফুটবলের ধারাবিবরণী। ঠিক বাচ্চা হওয়ার মুহূর্তে একটা গোল হলো। দর্শক চিৎকার করে উঠল। ধারাভাষ্যকার চিৎকার করে উঠলেন। বেডে শুয়ে থাকা মা তোতোও চিৎকার করে উঠলেন, গোওওললল। হ্যাঁ, ছেলেটা জন্মের পর প্রথম যে শব্দ শুনেছিল, সেটা ছিল গোওওললল!
ছেলে হওয়ার খবরে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন বাবা ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ভাবলেন, কী নাম রাখা যায় ছেলের? ঐতিহ্য অনুযায়ী বাবার নাম শুরুতে বসবে। বংশের নাম বসবে শেষে। মূল নাম থাকবে মাঝখানে। অবশেষে গাট্টাগোট্টা ছেলেটার নাম রাখা হলো ডিয়েগো আরমান্দ ম্যারাডোনা। ‘আসল’ ডিয়েগো ম্যারাডোনা কি ভেবেছিলেন, এই পুঁচকে ছেলের নামের আড়ালে তাঁর নাম একদিন হারিয়ে যাবে? ডিয়েগো ম্যারাডোনা নামে এই পৃথিবী তাঁকে কখনোই চিনবে না। বরং বিশ্ব তাঁকে চিনবে ডিয়েগো ম্যারাডোনার বাবা হিসেবে?
ডন ডিয়েগো ম্যারাডোনা ছিল আসলে ম্যারাডোনার বাবার নাম। ডাক নাম ছিল চিতোরো। ম্যারাডোনার আসল নাম ছিল আরমান্দ। কিন্তু পুরো বিশ্বে ম্যারাডোনা তাঁর বাবার নামেই পরিচিত হয়েছিলেন।
(যেহেতু বাপ–ব্যাটার নাম এক, সেহেতু বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য ম্যারাডোনার বাবাকে আমরা চিতোরো নামে লিখব। চিতোরো ছিল ম্যারাডোনার বাবার ডাক নাম।)
ম্যারাডোনার মা জন্মগতভাবে ইতালীয় বংশোদ্ভূত। সম্ভবত এ জন্যই ইতালির প্রতি ম্যারাডোনার সব সময়ই একটা টান ছিল। ইতালি ছিল তাঁর ‘সেকেন্ড হোম’। নেপলস শহরের এক মেয়ে একবার বলেছিল, ‘আমরা পোপের চেয়ে ম্যারাডোনাকে বেশি ভালোবাসি।’
ম্যারাডোনারা যে এলাকায় থাকতেন, সেটা ছিল একেবারেই গরিব একটা এলাকা। মাদক, সন্ত্রাস, মারামারি সব সময় লেগেই থাকত। ছোট ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার বালাই ছিল না। কেউ মাদকের ব্যবসা করত, কেউ ছোটবেলাতেই জড়িয়ে যেত ছিনতাই বা চুরিতে। অনেকেই টুকটাক ব্যবসা করত। প্যাকেট কুড়িয়ে শহরে বিক্রি করত। এমন একটা পরিবেশে বড় হয়েছিলেন ম্যারাডোনা।
ফুটবলের সঙ্গে ম্যারাডোনার পরিচয় হয়েছিল তিন বছর বয়সে। বাবা এবং চাচা দুজনই ছিলেন ফুটবল অনুরাগী। ছোট চাচা তিন বছর বয়সে ম্যারাডোনাকে একটি ফুটবল কিনে দিয়েছিলেন। এবং তারপর ম্যারাডোনার শৈশব বলতে ছিল শুধুই ফুটবল আর ফুটবল।
ছোটবেলাতেই ম্যারাডোনার ফুটবল–জাদু প্রকাশিত হলো। ছোট্ট ডিয়েগোর সারা দিনই কাটত ফুটবল নিয়ে। বাবা কখনোই তাঁকে ফুটবল খেলতে বাধা দেননি। কারণ, ছেলেকে ভালো স্কুলে পড়াশোনা করানোর মতো সামর্থ্য তাঁদের ছিল না। তাই ফুটবলেই তাঁরা নিখরচায়, কোনো অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ছাড়াই ম্যারাডোনার ভবিষ্যৎ দেখতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু ফুটবলার হতে হলে দরকার ভালো খাবারের। সেটা খাওয়ানোর সামর্থ্য ম্যারাডোনার পরিবারের ছিল না। ছোটবেলাতেই তাই তিনি অপুষ্টির শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের প্রতি ম্যারাডোনার কোনো অভিযোগ ছিল না। বরং সারা জীবন তিনি পরিবারকে আগলে রেখেছেন।
আর্জেন্টিনায় একটি কথা প্রচলিত আছে। আর্জেন্টাইনরা তিনটি জিনিস কখনো ভোলে না। মা, মাতৃভূমি আর পরিবার। ম্যারাডোনাও ভোলেননি। বহু বছর পর, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে এক বক্তৃতায় বলেছেন তাঁর শৈশবের গল্প, ‘আমার মা–বাবা তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমাকে পড়িয়েছেন। আমি খুব গরিব একটি পরিবারে জন্মেছি। আমার মা–বাবার সামর্থ্য ছিল না আমাকে ভালো ইংরেজি স্কুলে পড়ানোর। আমাদের ঘরে তো তখন খাবারই ছিল না, আমি ভালো স্কুলে পড়তাম কীভাবে?’
এই অন্তহীন দারিদ্র্য ম্যারাডোনাকে ক্ষুধার্ত করেছিল। পরিবারের আর্থিক কষ্ট তিনি ভুলে থাকতেন ফুটবলের মধ্যে ডুবে গিয়ে। পাড়ার মানুষ তন্ময় হয়ে, অবাক চোখে তাঁর খেলা দেখতেন। এমনই একদিন, পাড়ার মাঠে ম্যারাডোনা ফুটবল খেলছেন। সেদিন শুধু পাড়ার মানুষই নন, আড়াল থেকে তাঁর খেলা দেখছিলেন আরও একজন। বুয়েনস এইরেসের এক ট্রাকচালক, নাম ত্রোত্তা। সারা দিন এখানে–সেখানে ট্রাক চালান। তবে ত্রোত্তার আরও একটা শখ আছে। সেটা হলো ফুটবল। ত্রোত্তার বন্ধু কর্নেখো একটি ফুটবল দলের কোচ। ভালো কোনো ফুটবলার পেলেই ত্রোত্তা তাকে নিয়ে যেতেন কর্নেখোর কাছে।
সেদিন রাস্তার ধারে ট্রাক থামিয়ে খেলা দেখছেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, আজ খেলা দেখে কাউকে ভালো লাগলে পরদিন সেই ছেলেকে ক্লাবে নিয়ে যাবেন। কিন্তু ম্যারাডোনার অবিশ্বাস্য ফুটবল দেখার পর এক রাত দেরি করার ঝুঁকি নেননি। তাঁর মনে হয়েছিল, এই ছেলেকে যদি তখনই ক্লাবে নেওয়া না হয়, তবে রাতের মধ্যেই হয়তো অন্য কেউ একে তুলে অন্য ক্লাবে নিয়ে যাবে।
কাজেই ত্রোত্তার সেদিন আর ভাড়া মারা হলো না। খেলার মাঠ থেকে সাত বছরের বাচ্চা ডিয়েগোকে ধরে নিয়ে ট্রাকে তুললেন। ট্রাক চলল আর্জেন্টিনাস বয়েজ ক্লাবের দিকে। এবড়োখেবড়ো পথ, মাঝেমধ্যেই হোঁচট খাচ্ছে ট্রাক, ঝাঁকি খেয়ে কেঁপে উঠছে। কিন্তু ত্রোত্তা ওসব বুঝতেই পারলেন না। কারণ, তিনি তখন উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছেন। তাঁর মন বলছিল, তিনি এই মুহূর্তে সাত বছরের একটা হিরের টুকরোকে আবিষ্কার করে ফেলেছেন!
ত্রোত্তার সেই উত্তেজনায় জল ঢেলে দিলেন তাঁর বন্ধু এবং আর্জেন্টিনাস বয়েজ ক্লাবের কোচ কর্নেখো। ছোট্ট ম্যারাডোনাকে দেখে শীতল কণ্ঠে বললেন, ‘না, এই ছেলেকে আমি আমার দলে খেলতে নেব না।’ (চলবে)
বি.দ্র: তিন পর্বে ম্যারাডোনার জীবনের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হবে ৯ ডিসেম্বর, পরবর্তী শুক্রবার সকাল ১০টায়।