বিজ্ঞাপন

মাথিউরা চা-বাগান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০১৭ সাল থেকে মাথিউরা চা-বাগানে বিচ্ছিন্নভাবে কফিগাছ লাগানো শুরু হয়েছে। এই বাগানে যে কফিগাছ লাগানো হচ্ছে, এগুলো কফি অ্যারাবিকা জাতের। তবে টিলাজুড়ে একসঙ্গে যেভাবে চা-গাছ লাগানো হয়ে থাকে, কফিগাছ সে রকম লাগানো হয়নি। প্রাথমিকভাবে চা-বাগানের চারটি বাংলো এবং বাগানের সড়কের আশপাশে এই গাছগুলো লাগানো হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ একর জায়গার মধ্যে কোথাও সারিবদ্ধভাবে, কোথাও চা-গাছের ফাঁকে ফাঁকে এবং কোথাও বাংলোর কাছে প্রায় ১০ হাজার কফিগাছ লাগানো হয়েছে। এই গাছগুলো ৩–৪ ফুট থেকে ১০-১৫ ফুট উঁচু হয়ে গেছে। অনেকগুলোতেই ফল এসেছে। তবে ফল পরিপক্ব হয়নি। এখনো বাগানে লাগানো কফিগাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা হয়নি।

default-image

কফি ফল উত্তোলনের সময় অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি। তবে এ বছর কফি ফল উত্তোলন করা হবে। প্রক্রিয়াজাতও করা হবে দেশি পদ্ধতিতে। কফি বীজ ফাটিয়ে চূর্ণ করে সেই ভাঙা কফি রোদে তাপ অনুযায়ী ৪০ মিনিট থেকে ৭০ মিনিট পর্যন্ত শুকিয়ে তা সংরক্ষণ করা হবে। আপাতত এ রকম পদ্ধতিতেই উৎপাদিত কফি প্রক্রিয়াজাতের চিন্তাভাবনা করছে বাগান কর্তৃপক্ষ।

কফির সব ফল থেকে কফি পাওয়াও যাবে না। এর মধ্যে ছোট ও অপরিপক্ব বাছাই করেই প্রক্রিয়াজাত করা হবে। এতে একটি কফিগাছ থেকে ২০০–৩০০ গ্রাম কফি পাওয়া যেতে পারে। প্রক্রিয়াজাতের পর পরীক্ষা করে বোঝা যাবে এই কফিতে ক্যাফেইনের মাত্রা। এর মানের ওপর অনেকটা ভবিষ্যৎ চাষাবাদ নির্ভর করছে। যদিও চা চাষের জন্য মাটির পিএইচ ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ দরকার। কফিও এ রকম অম্লমাত্রার মাটিতেই চাষের উপযোগী। তবে চায়ের সঙ্গে চাষের ধরন, শ্রম ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে পার্থক্য কিছুটা আছে। কফিগাছ চা-গাছের মতো ছাঁটাই করতে হয় না। শুধু গাছের নিচের দিকের পাতা একটু ছেঁটে দিতে হয়। এ ছাড়া চা-গাছে সেচ লাগে, কফিগাছে সেচ দিতে হয় না। চা-গাছে ছায়াবৃক্ষের দরকার পড়ে, কফিগাছে তা লাগে না। চা-গাছের মতো কফিগাছে রোগবালাইয়ের আক্রমণ নেই।

কফিগাছ লাগানোর প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে মাথিউরা চা-বাগানের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক ইবাদুল হক জানালেন, চা-বাগানে নতুন করে রাবার চাষ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চা-চাষের পাশাপাশি আর নতুন কোন ফসল ফলানো যায়, সেই ভাবনা থেকেই রাবারের বিকল্প হিসেবে কফি চাষের কথা ভাবা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কফি চাষে চায়ের চেয়ে খরচ কম হবে। বছরে একবার ফসল হয়। চা-গাছের মতো ছাঁটাই, সেচ লাগে না। রোগবালাই কম। আমি মনে করি, এতে করে চা-বাগানের জমির সুষ্ঠু ব্যবহার হবে। চা-বাগানের জন্য কফি একটি সম্পূরক ফসলও হতে পারে। অবশ্য এখনো বাগানে বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষ শুরু করা হয়নি। পরীক্ষামূলক কফিগাছ লাগানো হয়েছে। যদি দেখা যায় কফির গুণগত মান ও উৎপাদন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হচ্ছে, তবেই বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষে যাওয়া হবে।’

default-image

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক কাজী লুৎফুল বারী বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে কফির চাষ হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে মৌলভীবাজারের মাটি ও আবহাওয়ার মিল আছে। আমাদের মাটি অ্যাসিডিক। এখানেও কফি চাষ হবে। মাথিউরায় বিচ্ছিন্নভাবে কফিগাছ লাগানো হয়েছে। কৃষিমন্ত্রীও মৌলভীবাজারে কফি চাষে আগ্রহ দেখিয়েছেন। আমরা অনেক কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা বলেছেন, তাঁদের টিলাভূমি আছে। সেখানে কফির চাষ করবেন। আমরা হয়তো বীজ এনে নিজেরাও চারা করতে পারি। নয়তো চারা সংগ্রহ করতে পারি। উপপরিচালক বলেন, ‘কফি চায়ের মতো শহর ও গ্রামে এখন পরিচিত। নতুন প্রজন্মের পছন্দ কফি। কফির চাহিদা বাড়ছে। এই এলাকাতে কফি চাষের সম্ভাবনা আছে।’

সম্ভাবনার নতুন ফসল

মীর মাহমুদুল হাসান, নীলফামারী
নীলফামারী জেলায় শুরু হয়েছে কফি চাষ। জেলার তিনজন কৃষক মোট ৫২ শতাংশ জমিতে ওই কফি চাষ শুরু করলেও আগামী এক মাসের মধ্যে জেলায় অন্তত এক শ বিঘায় কফি চাষ সম্প্রসারণ করবে কৃষি বিভাগ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, নীলফামারী জেলার মাটি ও আবহাওয়া কফি চাষের উপযোগী হওয়ায় সমতলে বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষ করা সম্ভব। তাই মুজিব বর্ষ উপলক্ষে আগামী এক মাসের মধ্যে সম্ভাবনাময় এই কফি চাষের পরিধি বাড়ানো হবে। এতে করে লাভবান হবেন এলাকার কৃষক, সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা।

default-image

কফিচাষিরা বলছেন, সাধারণত পতিত জমিতে কফি চাষ বাড়ানো গেলে অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে লাভ বেশি। এদিকে কৃষি বিভাগের অভিমত, পানিনিষ্কাশনযুক্ত যেকোন উঁচু জমিতে কফি চাষ করা সম্ভব। দেশে বর্তমানে রোবাস্টা ও অ্যারাবিকা—দুই জাতের কফি চাষ হচ্ছে। তবে এ জেলায় রোবাস্টা জাতের কফির ফলন বেশি। তাই বাণিজ্যিকভাবে ওই জাত আবাদের পরিকল্পনা কৃষি বিভাগের। এ ছাড়া কফির ফুল থেকে উন্নত মানের মধু আহরণ করা সম্ভব এবং এই জমিতে মিশ্র ফসল আবাদ করা সম্ভব।

কথা হয় নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলা সদরের মুন্সিপাড়া গ্রামের জেলায় প্রথম কফিচাষি আবদুল কুদ্দুসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে নার্সারি ব্যবসা করি। ২০০৭ সালের দিকে একটি পত্রিকায় দেখি কক্সবাজারে কফি চাষের খবর। এরপর চারা সংগ্রহের চেষ্টা চালাই। জেলা নার্সারি সমিতির সহসভাপতি হিসেবে ২০০৮ সালে বঙ্গভবনে আমার ডাক পড়ে। সেখানে গিয়ে একটি বই পাই। ওই বইতে ৬৪ জেলার নার্সারি মালিকদের মোবাইল নম্বর পাই। সেখান থেকে নম্বর সংগ্রহ করে কক্সবাজার থেকে ২০০৯ সালে ১৫০টি কফির চারা সংগ্রহ করি। তখন প্রতিটি চারার মূল্য ছিল ২০ টাকা। ওই চারার ৪ শতাংশ জমিতে লাগাই।

default-image

তিন বছরের মাথায় ফল আসতে শুরু করে। কিন্তু ওই ফল দিয়ে কী করব, এ নিয়ে চিন্তায় পড়ি। এরপর বাড়িতে কফি ফল গুঁড়া করি। কিন্তু কফির স্বাদ আসে না। অনেক ভেবেচিন্তে একদিন কড়াইতে ভেজে গুঁড়া করে দেখলাম, কফির স্বাদ ও গন্ধ—দুটোই এসেছে। এরপর স্বল্প পরিসরে এলাকায় বিক্রি করতে শুরু করি। এখন আমি কফির চারা বিক্রির দিকে বেশি নজর দিয়েছি। আমার বাগানের চারা দেশের ৬৪ জেলায় যাচ্ছে।’

আবদুল কুদ্দুসের বাগানে এখন এক থেকে ছয় ফুট দৈর্ঘ্যের চারা আছে, প্রতি ফুট চারার মূল্য এক শ টাকা হিসেবে বিক্রি করছেন বলে জানান তিনি। প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ টাকার চারা বিক্রির কথাও জানালেন আবদুল কুদ্দুস।

জেলার জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের সুনগর গ্রামের মোছাম্মদ খাদিজা আক্তার ২০১৯ সালে ৪০ শতাংশ জমিতে কফির বাগান করেছেন। ওই বাগানে এখন ফল আসতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘আমার চার একর জমির ওপর বাড়ি এবং বিভিন্ন ফলের বাগান করেছি। ওই বাগানের ৪০ শতাংশ জায়গায় ৫৮৬টি কফিগাছ আছে। এগুলোর মধ্যে ২৪৬টি গাছে ফল এসেছে। ফলনও ভালোই হয়েছে। কৃষি বিভাগের লোকজন প্রতিনিয়ত এসে পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে ওই ফল সংগ্রহ কীভাবে হবে, সেটি জানার চেষ্টা করছি।’

default-image

খাদিজা আক্তার বলেন, ‘আমার বড় ছেলে নর্দান ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় ইউটিউবে দেখে আমাকে কফি চাষে উদ্বুদ্ধ করেছে। এখন সে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং বিভাগে চাকরি করছে। এ কারণে কফি বাজারজাতকরণে অসুবিধা হবে না বলে সে জানিয়েছে।’ তিনি বলেন, কফি অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে দাম বেশি। ফলন দেখে বোঝা যায়, এটি অনেক লাভজনক হবে। তিনি বলেন, ‘আমি আগামী বছরে আরও পাঁচ শ চারা লাগাব। এর আগে তিনি প্রতিটি চারা ২০০ টাকা হিসেবে ৮০০ চারা সংগ্রহ করেছিলেন। যার মধ্যে ৫৮৬টি গাছ টিকে আছে। তাঁর মতে, কফি সাধারণত উঁচু জমিতে হয়, যেখানে ধান পাট চাষ করা যায় না।

কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নের কাছারীপাড়া গ্রামের সুলতান আলী ২০১৯ সালে ৮ শতাংশ জমিতে চাষ করেন কফি। তাঁর ৯০টি গাছের মধ্যে ৮০টিতে ফল এসেছে। তিনি জানান, একটি বেসরকারি সংস্থার দেওয়া কফিগাছের চারা এবং আর্থিক সহযোগিতায় তিনি কফি চাষ করেছেন। ফলন দেখে মনে হচ্ছে, লাভ হবে। কৃষি বিভাগ নিয়মিতভাবে তাঁদের পরামর্শ দিয়ে কফি চাষে উৎসাহিত করছেন বলেও জানান তিনি।

ব্যাপক আকারে এর চাষ শুরু না হওয়ায় প্রতি বিঘায় লাভ কেমন হবে, এ বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারছেন না কফিচাষিরা। তবে স্থানীয় বাজারে কফি বাজারজাত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, কফি সাধারণত পাহাড়ি ফসল। উঁচু এবং যেখানে পানি জমে না থাকে—এমন সমতল জমিতে কফি চাষ করা যাবে। নীলফামারীর মাটি বেলে-দোঁআশ হওয়ায় এই মাটি কফি চাষের উপযোগী। নীলফামারীতে তিনজন কৃষক ইতিমধ্যে ৫২ শতাংশ জমিতে অ্যারাবিয়ান জাতের কফি চাষ করেছেন। তাঁদের গাছে ফলও ভালো এসেছে।
ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, মুজিব বর্ষ উপলক্ষে এই জেলায় আগামী এক মাসের মধ্যে আমরা এক শ বিঘা জমিতে রোবাস্টা জাতের কফি চাষের পরিকল্পনা করেছি। এর ফলন বেশি পাওয়া যায়। আমরা কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করেছি। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ তাঁদের বিনা মূল্যে চারা সরবরাহ করবে।

default-image

ওবায়দুর রহমান মণ্ডল আরও বলেন, ‘এর বাজার আপাতত দেশে হবে। প্রতি বিঘায় ৩৫০-৪০০টি চারার প্রয়োজন হবে। প্রতি কেজি শুকনা কফিবীজ যদি ৮০০-১০০০ টাকায়ও বিক্রি হয়, তবে ১ বিঘা থেকে বছরে ৩৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা লাভ করা সম্ভব। এতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।’ আগামী তিন বছরের মধ্যে কফি রপ্তানিপণ্যের তালিকায় যুক্ত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
কফি প্রক্রিয়াজাতকরণে কোনো সমস্যা হবে না বলে মনে করেন ওবায়দুর রহমান মণ্ডল। তিনি বলেন, প্রত্যেকে বাড়িতেই প্রক্রিয়াজাত করতে পারবেন। এ জন্য শুধু একটি ব্লেন্ডার মেশিন লাগবে, যা খুবই সহজলভ্য। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে গত বছর যে ৬০ মেট্রিক টন কফি উৎপাদিত হয়েছে, সেটা ব্লেন্ডার মেশিনে প্রক্রিয়া করা হয়েছে।

সবুজ পাহাড়ে কফির আবাদ

পলাশ বড়ুয়া, দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি

কফি চাষে স্বপ্ন বুনছেন তিন যুবক। তাঁরা খাগড়াছড়ির দীঘিনালার দুর্গম সীমানাপাড়া এলাকায় জুমের পতিত আট একর পরিমাণ পাহাড়ে পরীক্ষামূলকভাবে অ্যারাবিকা জাতের কফি চাষ করেছেন। কফি বাগানে কর্মসংস্থান হয়েছে গ্রামের আটজন শ্রমিকের।

default-image

২০১৮ সালের মে মাসে লাগানো চার হাজার কফিগাছের মধ্যে পাঁচ শ গাছ মরে গেছে। বাকি সাড়ে তিন হাজারের মধ্যে এক শটি গাছে এ বছর ফলন এসেছে। কফিগাছের ছায়ার জন্য ফাঁকে ফাঁকে লাগানো হয়েছে ২৫০টি কড়ই ও ৫০টি অর্জুনগাছ। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার প্রাকৃতিক পরামর্শক কৃষিবিদ ক্যশৈপ্রু মারমার মতে, তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়গুলো কফি চাষের জন্য খুবই উপযোগী। পাহাড়গুলোতে অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা জাতের কফি চাষে সফলতা পাওয়া গেছে।
উপজেলা সদর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে দুর্গম সীমানাপাড়া এলাকার পতিত জুম পাহাড়ে গিয়ে দেখা যায়, কফিগাছের আগাছা পরিষ্কারে ব্যস্ত আটজন শ্রমিক। শ্রমিকদের কাজের তদারক করছিলেন গ্রামের প্রধান চয়ন ত্রিপুরা। তিনি বললেন, ‘আট একর পাহাড়ে একসময় জুম চাষ হতো। এক বছর জুম চাষ করলে পাহাড়টি দুই বছর পতিত থাকত। তাই পাহাড়ে স্থায়ী কিছু করার চিন্তা থেকে কফি বাগানটি গড়ে তোলা। আমার সঙ্গে কফি চাষে যোগ দিয়েছেন আমার চাচাতো ভাই শিপু ত্রিপুরা ও তাঁর বন্ধু চিংউয়েং চৌধুরী।’

চিংউয়েং চৌধুরী বলেন, ‘আমি মূলত ফ্যাশন ডিজাইনার। আমার ছোটবেলার বন্ধু শিপু ত্রিপুরা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা। বান্দরবানে কফি চাষের সফলতা দেখে দুই বন্ধু পতিত জুম পাহাড়ে কফি চাষ করার সিদ্ধান্ত নিই। গ্রামের প্রধান চয়ন ত্রিপুরাসহ এই পাহাড়েই কফি চাষ করার উপযুক্ত বলে মনে করি। এ ক্ষেত্রে আমার আত্মীয় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থায় কর্মরত ক্যশৈপ্রু মারমা পাহাড়টি পরিদর্শন করে কফি চাষের উপযুক্ত জানালে সেখানে ২০১৮ সালের মে মাসে বান্দরবানের রুমা উপজেলা থেকে অ্যারাবিকা জাতের চার হাজার বীজ নিয়ে এসে রোপণ করি। কফি চাষ বিষয়ে বিভিন্ন বই পড়ে জেনেছি, মূলত কফি চাষ পদ্ধতিটা চা চাষের মতোই। কফি গাছেও ছায়া দিতে হয়। তাই আমরা গাছের ফাঁকে ফাঁকে কড়ই আর অর্জুনগাছ লাগিয়েছি।’

শিপু ত্রিপুরা বলেন, ‘মূলত আমরা শখের বশে পরীক্ষামূলকভাবে এ বাগান গড়ে তুলেছি। যদি সফলতা আসে, তাহলে বাগানের পরিধি আরও বাড়াব। তবে সেচ সমস্যা রয়েছে। কারণ, এখানে পানির উৎস পাহাড় থেকে আট–নয় শ ফুট নিচে। সেখান থেকে সেচের ব্যবস্থা করে পানি আনা খুবই ব্যয়বহুল। এ ক্ষেত্রে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সেচের ব্যবস্থা করা গেলে উপকার হবে। ইতিমধ্যে আমাদের তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রতিদিন আটজন শ্রমিক কফিগাছ পরিচর্যায় কাজ করেন। তাঁদেরকেও নিয়মিত বেতন দিতে হচ্ছে।’

default-image

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রকৃতিবিষয়ক পরামর্শক ক্যশৈপ্রু মারমা বলেন, ‘তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়গুলো অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা জাতের কফি চাষের উপযোগী। আমরা ইতিমধ্যে বান্দরবানের রুমা, থানচি, রাঙামাটির সাজেক ও খাগড়াছড়ির আলুটিলায় এ জাতের কফি চাষ করে সফলতা পেয়েছি। সীমানাপাড়া এলাকায় চাষ করা কফি বাগানটিও আমি দেখেছি। ওই এলাকার মাটি খুবই উর্বর, কফি চাষের জন্য উপযোগী। তবে যত উঁচু পাহাড়ে কফি চাষ করা যায়, কফির ফলন ততই ভালো হয়। একেকটি কফিগাছ ৬০ থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ফলন দেয়। কফিগাছে তিন বছরের মধ্যেই ফলন আসে। প্রথম বছর প্রতিটি গাছে এক কেজি ফলন এলেও তা ধীরে ধীরে পাঁচ থেকে ছয় কেজি পর্যন্ত ফলন দেবে। সাগর থেকে তিন হাজার ফুট উচ্চতার পাহাড়ে কফি চাষ করা গেলে এর ফলন ও গুণগত মান অনেক ভালো হয়। পতিত পাহাড়গুলোতে কফি চাষ করলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

পাহাড়ে কফি চাষ ও রেনিং ম্রোর স্বপ্ন

চহ্লামং মারমা, থানচি
বান্দরবানের দুর্গম উপজেলা থানচিতে প্রথম কফি চাষ নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন রেনিং ম্রো। উপজেলা বলীপাড়া ইউনিয়নে দিন্তে ম্রো পাড়ার প্রধান তিনি। সদরে থেকে ৭ কিমি দূরে নিজের ফলের বাগানে গত বছর রোপণ করেন সাড়ে ৩ হাজার কফির চারা। প্রতিটি চার কিনেছিলেন ১৫ টাকা। আরও এক বছর পরে লাখ টাকা লাভের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

default-image

রেনিং ম্রো বলেন, ‘উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রথম পাঁচ একর জায়গায় শুরু করেছি। এখন বাগানগুলোর আগাছা পরিষ্কার করে রাখছি। এরই মধ্যে অবশ্য মারা গেছে ৩০০-৫০০টি চারা।’
চারা রোপণ করার উপযুক্ত সময় সম্পর্কে রেনিং ম্রো বললেন, ‘আগস্ট মাসে সম্পূর্ণ চারা রোপণ করেছি এবং কৃষি অফিস থেকে তথ্য অনুসারেই করেছি। গত বছর আমাকে তিন বস্তা সারও দেওয়া হয়। করোনা মহামারিতে এ বছর কোনো তথ্য ও সহায়তা এখনো মেলেনি।’
রেনিং ম্রো আরও জানান, এ পর্যন্ত দেড় লাখ টাকার বেশি খরচ করেছেন। কিন্তু স্বপ্ন দেখছেন লাভের। তবে কফিবীজ ভালো হলে আশা করছেন, প্রতি কেজি ১০০-১৫০ টাকা দরে বিক্রি হবে।

রসনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন