বিজ্ঞাপন

কফির কাপে উপচে ওঠা ফেনার মতো তরুণ মগজে উথলে উঠছে দ্রোহের পবিত্র আগুন। লম্বা জানালার বাইরে অতিকায় সাপের মতো শুয়ে রয়েছে কলেজ স্ট্রিট। ইতস্তত ছড়িয়ে আছে চটিজুতা, ঝোলা ব্যাগ। ব্যারিকেড ফাইটের পর প্রেসিডেন্সির সামনে কিছু রক্ত বন্ধক রেখে জানালার ধারের টেবিলে এসে বসেছেন যে যুবক, তাঁর চোখে উত্তরবঙ্গের ঝড়ে উড়ে আসা স্বপ্নের ধুলা কিচকিচ। চোখ থেকে চোখে লেগে যাচ্ছে আগামীর রং। দার্জিলিং থেকে শ্রীকাকুলাম, শ্রীকাকুলাম থেকে ডেবরা, ডেবরা থেকে ভোজপুর। কফি হাউসের টেবিলজুড়ে আগামী ভারতের মানচিত্র।

default-image

আমরা যারা সোভিয়েত–উত্তর প্রজন্ম, তারা অবশ্য এই কফি হাউসকে দেখিনি। আমরা বিশ্বায়নের সমবয়সী। আমাদের বয়স সোভিয়েতের মৃত্যুর সমান। ১৫ নম্বর বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে আমরা পা রাখার অনেক আগেই বদলাতে শুরু করেছিল পুরোনো কলকাতা। আমাদের খুব ছোটবেলায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দিকে উড়ে গিয়েছিল দুটি অলৌকিক বিমান। তারপর আগুন। তারপর ধোঁয়া আর আর্তনাদ। এরপরই শুরু হয়েছিল যুদ্ধ। আমরা দেশভাগ দেখিনি, মন্বন্তর দেখিনি। নকশালবাড়ি দেখিনি, ইমারজেন্সি দেখিনি। আমরা দেখেছি কারগিল আর আফগানিস্তান, দেখেছি নাইন ইলেভেন আর ২৬/১১।

আমরা কফি হাউসের অগ্ন্যুৎপাত দেখিনি, দেখেছি বারিস্তা, সিসিডি আর কফি ওয়ার্ল্ডের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত শলাকা একটু একটু করে ঢুকে যাচ্ছে কফি হাউসের সমুদ্রগর্জনের মতো শব্দের শরীরে। আর্তনাদহীন নিস্তব্ধতা গিলে ফেলছে নন-এসি কফি হাউসকে। শহরের আড্ডা মানচিত্র থেকে ক্রমে বাতিল হয়ে যাচ্ছে, উবে যাচ্ছে কফি হাউস। খাবারের গুণগত মান ও দামে তাকে আলোকবর্ষ পেছনে ফেলে দিচ্ছে শহরময় তৈরি হওয়া নতুন নতুন কফিশপ। কত রকমের কফি সেখানে! কত রকমের স্যান্ডউইচ, বার্গার, নাম না জানা হরেক বিদেশি খাবারের সমাহার! সেসব ফেলে কেন ১৫ নম্বর বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটের পোস্টারে পোস্টারে সয়লাব ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উঠবে একুশ শতকের কলকাতার যৌবন? কী আছে সেখানে? একঘেয়ে মিল্ক কফি, সাদামাটা ইনফিউশন, কোল্ড কফি উইথ ক্রিম আর টোস্ট, অমলেট, কবিরাজি, আফগানির নেহাতই নিম্নবিত্ত আয়োজনে ধরে রাখা সম্ভব পুরোনো জৌলুশ? শহরের অলিগলিতে যখন ‘হাজার বিদেশি উপহার’ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ঝাঁ–চকচকে কফির দোকান, তখন কফি হাউসের ভবিষ্যৎ কি আদৌ সুরক্ষিত? একটা বড় জাহাজের মতো আস্তে আস্তে ডুবে যাবে না তো ১৫ নম্বর বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটের কফিবাড়ি?

default-image

এই জিজ্ঞাসার কোনো একমাত্রিক উত্তর নেই। কারণ, কফি হাউসের অস্তিত্ব কেবল কফি হাউসের বাঁচামরা দিয়ে চিহ্নিত হতে পারে না। ১৯৪১ সালে পথচলা শুরুর পর থেকে শহর কলকাতার প্রাত্যহিকতার হাড়মজ্জায় মিশে গেছে এই কফিখানা। বাংলা তথা ভারতবর্ষের প্রতিটি সামাজিক, রাজনৈতিক ঘটনার অভিঘাতে দুলে উঠেছে সে। তাই কফি হাউসের গুরুত্বহীন হয়ে যাওয়া আসলে একটি রাজনৈতিক ঘটনা। বিশ্বায়িত কলকাতার আগ্রাসনের মুখে পুরোনো কলকাতার আত্মসমর্পণের চলমান দলিল। উনিশ শতকের যাবতীয় অর্জন, নগরকেন্দ্রিক রেনেসাঁ, কলকাতাকেন্দ্রিক ‘শিক্ষিত মধ্যবিত্ত’ বলে পরিচিত শ্রেণিটির দিন যে সত্যিই গেছে, তার প্রমাণ কফি হাউসের বাতিল হয়ে যাওয়া।

কলকাতার এলিট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছেলেমেয়েদের অধিকাংশের ফেবারিট হ্যাংআউট ডেস্টিনেশন এখন আর কফি হাউস নয়। হওয়ার কথাও নয়। একুশ শতকের ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সন্তান নব্য মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে কফি হাউস বা বাঙালি সংস্কৃতির আর তেমন কোনো আবেদন নেই৷ ঠিক যেমন আবেদন নেই ইস্ট বেঙ্গল বা মোহনবাগান ক্লবের। বাংলা গান, সাহিত্য বা সংস্কৃতির। হয়তো আমার সঙ্গে একমত হবেন না অনেকেই, কিন্তু এটাই সত্য। এখন যাঁরা কফি হাউসের টেবিলে টেবিলে ভিড় জমান, তাঁরা প্রায় কেউই ভারতীয় বাজারের অধুনা ‘মালিক’ একুশ শতকীয় নব্য মধ্যবিত্ত নন। যে ভারতীয় বাঙালি তাঁর ‘ভারতীয়’ পরিচয়টিকে অধিক গুরুত্ব দেন, সর্বভারতীয় ইংরেজি চ্যানেলের সান্ধ্য ডিবেটের মনোযোগী দর্শক যে বাঙালি; একটানা বাংলায় কথা বলতে ঈষৎ সমস্যায় পড়া সেই বাঙালির পছন্দের গন্তব্যে এখন আর কফি হাউস নেই।

default-image

তাহলে কফি হাউস এখন কাদের আড্ডাখানা? কারা এখনো প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পান কফি হাউসে? প্রতিদিন বিকেলে একবার ওই হট্টগোলের মধ্যে বসতে না পারলে কাদের ভাত হজম হয় না এখনো? এই ২০২০ সালেও কারা মুষড়ে পড়েছিলেন লকডাউনে কফি হাউস বন্ধ থাকবে জেনে? এখনো কি প্রেম হয় কফি হাউসে? মস্তিষ্ক থেকে মস্তিষ্কে বিনিময় হয় স্বপ্নের তেজস্ক্রিয় ইশতেহার? নাকি মর্গ-সভ্যতার কালসন্ধ্যায় ১৫ নম্বর বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট প্রস্তুতি নিচ্ছে আসন্ন রাত্রির অনিবার্য শব বহনের?

কফি হাউসের লড়াইটা কঠিন। তাকে লড়তে হচ্ছে সময়ের সঙ্গে। বদলে যাওয়া কলকাতায় কফি হাউস প্রতিনিধিত্ব করছে একটা হেরে যাওয়া সময়ের। এ এক আশ্চর্য কলকাতা, যেখানে ফ্ল্যাটবাড়ি উঠবে বলে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় শতাব্দীপ্রাচীন শরবতের দোকান। নজরুল, সুভাষ চন্দ্র, শিবরাম, কল্লোল যুগের সাহিত্যিকদের স্মৃতিমাখা চায়ের দোকান উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই কলকাতায় ক্রমে কোণঠাসা হতে হয় বাংলা ভাষাকে। শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে একটু একটু করে সরে যেতে হয় পুরোনো বাসিন্দাদের। পুরোনো বাড়িগুলো ভাঙা পড়ে, তার জায়গায় ওঠে বিলাসবহুল অতিকায় ফ্ল্যাট। এই শহরের রুচি বদলে গেছে। বদলে যাচ্ছে প্রতিদিন। বদলে যাচ্ছে কলকাতার আর্কিটেকচার। শহরের বুকে মাথা তুলছে এমন সব শপিং মল, যার চেহারায় একফোঁটা কলকাতাও নেই৷

বদলের দমকা হাওয়ায় দমবন্ধ হয়ে আসছে পুরোনো কলকাতার। কফি হাউসকে লড়তে হচ্ছে এই হাওয়ার বিরুদ্ধে। অসম এই সংগ্রামে তার এক হাতে মিল্ক কফি, ইনফিউশন বা সাবেক আমলের আফগানি, কবিরাজি, কাটলেট, স্যান্ডউইচের হাতিয়ার। অন্য হাতে তাবৎ কলকাতা—যাবতীয় স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ, প্রেম, বিচ্ছেদ, জীবন–মৃত্যুর আলোছায়ার অমোঘ আয়ুধ।

এই শহরের দুই বড় ক্লাব ইস্ট বেঙ্গল আর মোহনবাগানের সিংহভাগ স্বত্ব বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন ক্লাবের কর্তারা। ক্রমে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে কলকাতার চীনেপাড়া। রোজগারের জন্য শহর ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি দিচ্ছেন মানুষ। আর্মেনিয়ানরাও ক্রমে ছেড়ে যাচ্ছেন শহর। বদলের দমকা হাওয়ায় দমবন্ধ হয়ে আসছে পুরোনো কলকাতার। কফি হাউসকে লড়তে হচ্ছে এই হাওয়ার বিরুদ্ধে। অসম এই সংগ্রামে তার এক হাতে মিল্ক কফি, ইনফিউশন বা সাবেক আমলের আফগানি, কবিরাজি, কাটলেট, স্যান্ডউইচের হাতিয়ার। অন্য হাতে তাবৎ কলকাতা—যাবতীয় স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ, প্রেম, বিচ্ছেদ, জীবন–মৃত্যুর আলোছায়ার অমোঘ আয়ুধ।

একুশ শতকের পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে জরুরি হাতিয়ার—স্মৃতি। কুন্দেরা লিখেছিলেন, ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই আসলে বিস্মরণের বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম। তাই কফি হাউসের গুরুত্ব কেবল কফির পেয়ালায় নয়, তার টেবিলময় বিছিয়ে রয়েছে বাঙালির স্মৃতির অদৃশ্য মানচিত্র। সেই স্মৃতি একটি জাতির নিজস্বতার দালিলিক প্রমাণ। আমাদের গর্ব। আমাদের অহংকার। গোটা ভারতবর্ষজুড়ে যে একমাত্রিক আইডেনটিটি নির্মাণের প্রচেষ্টা চলছে, তার উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির কফি হাউস। দুর্বল, শ্লথ, জৌলুশহীন; কিন্তু এখনো জীবন্ত।

default-image

১৯৪১ সালে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া অ্যালবার্ট ইনস্টিটিউটের হাত থেকে বাড়িটি কিনে নিয়েছিলেন রাজা প্রমথ মল্লিক। ভাড়া দিয়েছিলেন কফি বোর্ডকে। এখন পরিচালনার দায়িত্বে কফিশ্রমিকদের কো-অপারেটিভ সোসাইটি। এখানকার ওয়েটারদের সঙ্গে কেতাদুরস্ত কফিশপের কর্মীদের কোনো মিল নেই৷ ওয়েটারদের অধিকাংশই মেজাজি মানুষ। বছরের পর বছর, দশকের পর দশক ধরে ক্রেতাদের সঙ্গে তাঁদের মানবিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সে সম্পর্কে রাগ, অভিমান, ঝগড়াঝাঁটি আছে। আছে ক্রমে জটিল হয়ে আসা জীবনযাপনের সমস্যাগুলো শেয়ার করাও। সাদাপোশাকে কফির দাগ হয়তো ভালো করে ওঠে না প্রতিদিন। লম্বাটে কাচের গ্লাসে জল হয়তো খানিক বিস্বাদ লাগতে পারে। চমৎকার সব কফির ঠেক ছেড়ে নিতান্ত সাদামাটা কফি খেতে হয়তো ভালো লাগবে না তেমন। কিন্তু কফি হাউস মানে তো শুধু কফি হাউস নয়, এক নাছোড় কলকাতা, যে এখনো হারতে শেখেনি। টেবিলের অনেক উঁচুতে ছাদ। সেখান থেকে ঝুলে আছে লম্বা, গম্ভীর সিলিং ফ্যান। গুনগুন করে সমুদ্রগর্জনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে আড্ডার আওয়াজ। ধ্যানমগ্ন তপস্বীর মতো টেবিলে বসে রয়েছেন নিরুচ্চার, প্রাজ্ঞ বঙ্কিম গবেষক। তাঁর একটু দূরেই প্রবল তর্কে ভাসছেন গণ–আন্দোলনের কর্মীরা। প্রেসিডেন্সি থেকে, সংস্কৃত কলেজ থেকে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দলবেঁধে এল উলোঝুলো তরুণের দল। শনিবার বিকেলে গ্রামের বাঁধানো পুকুরের মতো লেখক-সম্পাদকের আড্ডা বসেছে। এই সবটুকুর জন্যই তো কফি হাউসে যাওয়া; শীতের রাতে লাল লেপের মতো যে কফিখানায় গচ্ছিত আছে এই শহরের রাগ-দুঃখ-কান্না-অভিমান।

যে মেয়ে পা টেনে হাঁটছে, তার কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। বাঁ দিকের টেবিলে বসল। চটি ছিঁড়ে গেছে বুঝি?

তোমার নাম নিশ্চয় নীতা নয়?

রসনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন