বিজ্ঞাপন

আবার এক শ্রেণির নিরামিষভোজী মানুষ রয়েছেন, যাঁদের খাদ্যতালিকায় দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যের প্রাধান্য দেখা যায়, যদিও তারা অন্যান্য প্রাণিজ খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে তেমন একটা আগ্রহ দেখান না। তাঁদের বলা হয় ল্যাকটোভেজিটেরিয়ান।

default-image

তবে ভেগানিজমের ধারণাটি আরও অধিক মাত্রায় বিস্তৃত, কেননা যাঁরা নিজেদের ভেগান হিসেবে পরিচয় দেন, তাঁরা যেমনিভাবে কোনো ধরনের প্রাণিজ খাবার গ্রহণ করেন না, ঠিক একইভাবে প্রাণীর শরীরের কোনো অংশ থেকে তৈরি কোনো জিনিসও তারা পুরোপুরি এড়িয়ে চলেন। এ কারণে চামড়ার ব্যাগ কিংবা স্যান্ডেল থেকে শুরু করে উল ও রেশমের কাপড় এবং মুক্তার ব্যবহার ভেগানদের কাছে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ বিষয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভেগানিজমের ধারণাটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। যাঁরা ভেগান, তাঁরা নিজেদের প্রাণীদের প্রতি যত্নবান হিসেবে দাবি করেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, যখন কোনো প্রাণীকে জবাই করা হয়, তখন তার মধ্যে এক ধরনের যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার সূচনা ঘটে। তাই তারা সব সময় প্রাণিজ খাবারের বিপক্ষে। অনেকে শখের বশে মাছ ধরেন, ভেগানরা মাছ ধরারও বিপক্ষে। পাশাপাশি বর্তমান সময়ে ভেগানিজমের প্রসারতা ঘটেছে আরও একটি কারণে।

default-image

ভেগানদের মতে, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও মধু থেকে শুরু করে প্রাণিজ খাবার উৎপাদনে পরিবেশে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন ধরনের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়। অন্যদিকে উদ্ভিদজাত খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে কার্বন ডাই-অক্সাইড কিংবা অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের তেমন একটা নিঃসরণ হয় না।

এ ছাড়া উদ্ভিদজাত খাদ্য উৎপাদনে অধিক পরিমাণে পানির সাশ্রয় সম্ভব হয় বলে তারা বিশ্বাস করেন। তাই একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর বাস্তুসংস্থানের ওপর সৃষ্ট ঋণাত্মক প্রভাব কমাতে তাঁরা ভেগানিজমের দর্শন বাস্তবায়নের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করেন। ভেগানিজমের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার আরও একটি কারণ হচ্ছে তুলনামূলক কম স্বাস্থ্যঝুঁকি। কেননা উচ্চ রক্তচাপ, কোলস্টেরল ও হৃদ্‌যন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা প্রায়ই প্রাণিজ আমিষ ও চর্বি পরিহারের পরামর্শ দেন। এ ছাড়া অনেকের মধ্যে এক ধরনের ধারণা প্রচলিত রয়েছে, উদ্ভিদজাত খাদ্যদ্রব্য মানুষের তারুণ্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে এবং বাহ্যিকভাবে তাঁকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

default-image

পাশ্চাত্যের দেশগুলোর মতো ভেগানিজম এখনো আমাদের এ উপমহাদেশে খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। এটা ঠিক যে বাংলাদেশ কিংবা ভারতে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যাঁরা নিজেদের নিরামিষভোজী হিসেবে দাবি করেন, তবে তাঁদের অনেকের খাদ্যতালিকায় দুধ কিংবা দুধ থেকে তৈরি বিভিন্ন খাবারের উপস্থিতি দেখা যায়। তা ছাড়া তাঁদের খাদ্যাভ্যাসও অনেকাংশে ধর্মীয় রীতিনীতি দ্বারা প্রভাবিত।

ইউরোপে আসার আগে ভেগানিজম সম্পর্কে আমার তেমন একটা ধারণা ছিল না, বাংলাদেশে সেভাবে ভেগান রেস্টুরেন্টও খুঁজে পাওয়া যায় না। গত বছর স্লোভেনিয়াতে আমি যে ডরমিটরিতে থাকতাম, সেখানে অ্যালেন ট্রেটিয়াক এবং অ্যাঙ্গেলা নামের দুই শিক্ষার্থীও ছিলেন। অ্যালেন ট্রেটিয়াক ছিলেন স্লোভেনিয়ার অধিবাসী, অন্যদিকে অ্যাঙ্গেলা মেসিডোনিয়ার নাগরিক। তাঁরা নিজেদের ভেগান হিসেবে দাবি করতেন। ব্যবহারিকভাবে তাই ভেগানিজম সম্পর্কে প্রথম তাঁদের থেকে জানার সুযোগ হয়। তাঁদের খাদ্যাভ্যাস ছিল আমাদের তুলনায় একেবারে আলাদা। প্রথম দিকে আমার খুবই আশ্চর্য লাগত এটা ভেবে, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ কিংবা মধু থেকে শুরু করে প্রাণিজ খাদ্যদ্রব্য ছাড়া মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকতে পারে।

default-image

ইউরোপের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে ভেগানিজমের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। তাই ভেগানিজমকে ঘিরে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইসরায়েল, সিঙ্গাপুর, জাপান, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলো ব্যাপক গবেষণা করছে। তাই বাজারে প্রচলিত মাংস কিংবা মাছের সংস্করণও তৈরি হয়েছে, যেগুলো শুধু ভেগানরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ভেগান বিফ, ভেগান চিকেন এবং ভেগান ফিশ। যদিও এসব পণ্য সম্পূর্ণভাবে উদ্ভিদজাত উপকরণ দিয়ে তৈরি। স্বাদ বা পুষ্টির দিক থেকে বিবেচনা করলে কোনোভাবে প্রকৃত গরুর মাংস কিংবা মুরগির মাংস অথবা মাছের সঙ্গে এদের পার্থক্য নিরূপণ করা যাবে না।

সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য জিন প্রকৌশল প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাণীর টিস্যু থেকেও কৃত্রিমভাবে মাংস তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের বাদাম কিংবা সয়াবিন থেকেও বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি দুধ ভেগানদের কাছে বর্তমানে বাজারে বিক্রি হওয়া গরুর দুধের বিকল্প হয়েছে। আখের রস কিংবা সুগাবিট থেকে কৃত্রিম উপায়ে ভেগানদের কথা মাথায় রেখে তৈরি হচ্ছে মধু। প্রচলিত চামড়া, সিল্ক ও উল কিংবা প্রাণীর দেহাবশেষ থেকে তৈরি অনেক প্রয়োজনীয় উপাদানও আজকের দিনে বিকল্পভাবে তৈরি করা হচ্ছে শুধু ভেগানদের কথা স্মরণ করে। ইউরোপের যেকোনো সুপারশপেও আজ তাই কোনো পণ্যের মোড়কে উল্লেখ করা থাকে সেটি ভেগানদের ব্যবহারের উপযোগী কি না।

default-image

স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুবলিয়ানাতে বেশ কয়েকটি ভেগান রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ভেগান রেস্টুরেন্ট হচ্ছে লাভিং হাট। এটা লুবলিয়ানার সেন্ট্রাল রেলওয়ের কাছে অবস্থিত। যেকোনো ভেগান রেস্টুরেন্টের প্রবেশমুখে কাণ্ডসহ দুটি পাতাবিশিষ্ট এক বিশেষ ধরনের সবুজ বর্ণের প্রতীক দেখতে পাওয়া যায়। এটাই বলে দেয় এখানে ভেগানিজমকে পৃষ্ঠপোষণা দেওয়া হয়। অন্যান্য ভেগান রেস্টুরেন্টের মতো লাভিং হাটের প্রায় সব খাবার অরগানিক উপায়ে তৈরি করা হয়। এমনকি কোনো পদ তৈরি করতে যেসব শাকসবজি, তরিতরকারি কিংবা ফলের ব্যবহার করা হয়, সেগুলো সম্পূর্ণ অরগানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা। কোনো ধরনের রাসায়নিক সার কিংবা কীটনাশক ছাড়াই সেগুলোর চাষ করা হয়।

পাশাপাশি কোনো ধরনের কার্বোনেটেড বেভারেজ কিংবা ডিস্টিলেশন পদ্ধতিতে তৈরি কোনো পানীয় দ্রব্যের উপস্থিতিও ভেগান রেস্টুরেন্টগুলোতে দেখা যায় না। অবশ্য বিয়ার কিংবা ওয়াইনের মতো অ্যালকোহলিক বেভারেজের উপস্থিতি ভেগান রেস্টুরেন্টগুলোতে লক্ষ করা যায়, কেননা বিয়ার ও ওয়াইন ফার্মেন্টেড পদ্ধতিতে তৈরি। লাভিং হাটে অনেকটা ব্যুফে পদ্ধতিতে খাবার পরিবেশন করা হয়। যে কেউই তাঁর পছন্দমতো খাবার নির্বাচন করতে পারেন। কেউ চাইলে একসঙ্গে কয়েকটি ভিন্ন পদও নিতে পারেন। খাবারের ওজন অনুযায়ী বিল প্রদান করতে হয়, কে কতগুলো পদের খাবার নিলেন সে বিষয়টি এখানে মুখ্য নয়।

default-image

আমি পাঁচটি ভিন্ন আইটেমের খাবার নিয়েছিলাম এবং মোট ওজন অনুযায়ী আমার বিল আসে সাড়ে ছয় ইউরো। অথচ আমার সামনের কাস্টমারের সঙ্গে ছয়টি ভিন্ন আইটেমের খাবার ছিল কিন্তু তাঁর বিল এসেছিল মাত্র পাঁচ ইউরো। স্লোভেনিয়াতে স্টুডেন্টদের জন্য একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। স্লোভেনিয়াতে শিক্ষার্থীরা সাবসিডাইজড মিল নামের এক বিশেষ ধরনের সুবিধা পান, যার আওতায় একজন শিক্ষার্থী রেস্টুরেন্ট থেকে সাধারণ দামের থেকে অপেক্ষাকৃত কমে যেকোনো খাবার গ্রহণ করতে পারেন। সাবসিডাইজড মিল সুবিধার আওতায় আমাকে সাড়ে ছয় ইউরোর জায়গায় মাত্র সাড়ে চার ইউরো প্রদান করতে হয়। প্রতিটি খাবার স্বাদের দিক থেকে ছিল অতুলনীয়। এমনকি মাংসের তৈরি পদের থেকেও সুস্বাদু।

default-image

বাংলাদেশে অবশ্য এখনো সেভাবে ভেগানিজমের প্রসার ঘটেনি, তবে আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ পাশ্চাত্য সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত। যেহেতু পশ্চিমের দেশগুলোতে প্রতিনিয়ত ভেগানিজমের বিস্তৃতি ঘটছে, তাই আশা করা যায় সামনে হয়তো বাংলাদেশেও ভেগানিজমের প্রভাব পড়বে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স,
ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

রসনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন