default-image
বিজ্ঞাপন

ইডলি-দোসার রাজ্য তামিলনাড়ুতে প্রতিবছর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে পা রাখেন লাখো বাংলাদেশি। অ্যাপোলো হাসপাতাল–সংলগ্ন গ্রিমস রোড অঞ্চলে হোটেল, লজ আর গেস্ট হাউজগুলোতে তাঁরা থাকেন মাসের পর মাস। সেখানে রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা থাকায় স্থানীয় খাবারের স্বাদ চেখে দেখার অবসর কমই হয়। আর যাই–বা মুখে দেওয়া, লাল মরিচের ঝাল আর কারিপাতার সৌরভের সঙ্গে আমাদের দেশি স্বাদে অভ্যস্ত জিব খুব একটা মানিয়ে নিতে না পারায় অল্পতেই ক্ষান্ত দিতে হয়!

default-image

মার্চের মাঝামাঝি স্ত্রীর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে চেন্নাইতে আসা। নিজেরা রান্না করে খেলেও মাঝেমধ্যেই স্বাদবদল আর হাসপাতালে যাওয়া-আসার সময়সূচির চক্করে বাইরের রেস্তোঁরায় খাওয়া হয়েছে বেশ কয়েকবারই। চেট্টিনাড় ঘরানার রান্না থেকে শুরু করে ভেজিটেরিয়ান, চাইনিজ, বাদ পড়েনি কোনো কিছুই। মোমো থেকে চাউমিন, দোসা থেকে পিৎজা অবরে–সবরে চেখে দেখা হয়েছে অনেক কিছুই। কখনো বিকল্পের অভাবে, কখনো শখের বশে।

আমাদের দেশে রেস্তোঁরায় আমিষ-নিরামিষ একসঙ্গেই পাওয়া যায়; তবে চেন্নাইতে অনেক রেস্তোরাই শুধু নিরামিষ খাবার পরিবেশন করে। আমিষ কিংবা নিরামিষ, সব খাবারের দোকানেই ‘সিক্সটি ফাইভ’ নামের একটি পদের সরব উপস্থিতি। তা সে মুরগির মাংসের হোক, পনিরের হোক অথবা ফুলকপির। আমিষ খাবার বিক্রি হয় এমন রেস্তোঁরা থেকে শুরু করে পথের ধারের খাবারের দোকানেও চিকেন সিক্সটি ফাইভ নামের খাবারটি সুলভ, নিরামিষ খাবারের দোকানে মিলবে ‘পনির সিক্সটি ফাইভ’ অথবা ‘গোবি সিক্সটি ফাইভ’।

default-image

এই চিকেন সিক্সটি ফাইভ নামের খাবারটা আদতে আমাদের বটি কাবাব ঘরানার। বিহারি ক্যাম্পের কাবাবের দোকানগুলোতে চাপের পাশাপাশি যে খাবারটাও বেশ মুখরোচক। ছোট করে টুকরো করা মুরগির বুকের মাংস টক দই, আদা–রসুনের ক্বাথ আর অনেক রকম মসলায় ডুবিয়ে রেখে কড়াইতে গণগণে আঁচে ফুটন্ত তেলে ডুবিয়ে ভেজে নেয়া হয়। তারপরই আসল কেরামতি! এবারে আরেকটা কড়াইতে কড়া আঁচে নানান রকম সস, মসলা, ভাঁজ খোলা পেঁয়াজ আর ক্যাপসিকামকুঁচির সঙ্গে সেই কড়কড়ে ভাজা মুরগির মাংসের টুকরোগুলো সাঁতলে নিলেই হয়ে যাবে চিকেন সিক্সটি ফাইভ। এরপর চাট মসলা ছিটিয়ে লেবুর রস ছড়িয়ে কুঁচানো পেঁয়াজের সঙ্গে পরিবেশন করা হয় লালচে রংয়ের মুচমুচে আর মসলাদার চিকেন সিক্সটি ফাইভ। যাঁরা আমিষ খাবার খান না, তাঁদের জন্য এই খাবার তৈরি করা হয় পনির, মাশরুম, আলু অথবা ফুলকপি দিয়ে।

বিজ্ঞাপন

কেন খাবারটার নাম চিকেন সিক্সটি ফাইভ হলো, তা নিয়ে আছে অনেক গল্প। কেউ বলেন ৬৫ দিন বয়সের মুরগি দিয়ে এই খাবারটা বানানো হয়, কারও মতে ৬৫টা মরিচের ব্যবহার হয় এই রান্নায়! তবে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য গল্পটা হচ্ছে, ১৯৬৫ সালে চেন্নাইয়ের বুহারি হোটেলের বাবুর্চির হাতে জন্ম এই লা জওয়াব রেসিপির। চেন্নাই বা সে সময়কার মাদ্রাজে, সৈনিকদের ক্যান্টিনে খাবারের যে লম্বা তালিকা ছিল, তাতে মুরগির মাংসের এই পদের নম্বর ছিল ৬৫। সৈনিকেরা এসে চটজলদি অর্ডার দিতে বলতেন ৬৫ নম্বরে মুরগির যে পদটা আছে সেটা দিতে, আর এভাবেই হয়ে গেল চিকেন সিক্সটি ফাইভ!

default-image

এভাবেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠা চিকেন সিক্সটি ফাইভ পাওয়া যায় চেন্নাইয়ের বেশির ভাগ মিলিটারি হোটেল বা আমিষ খাবারের রেস্তোঁরায়। নিরামিষ ভোজনালয়ে মিলবে গোবি সিক্সটি ফাইভ বা পনির সিক্সটি ফাইভ। বাড়িতে বানিয়ে খাওয়ার জন্য আছে বিভিন্ন কোম্পানির এমন অনেক মসলার ব্র্যান্ডের চিকেন সিক্সটি ফাইভ মসলা।

ঢাকায় বসে অবশ্য এসব রেডিমেড মসলা জোগাড় করা দুরূহ ব্যাপার হলেও কী কী মেশাতে হবে সেটা জানা থাকলে কাজটা শক্ত নয়। হলুদ গুঁড়া, কাশ্মীরি লাল মরিচের গুঁড়া, শুকনা মরিচগুঁড়া, জিরা ও ধনিয়াগুঁড়া, গোলমরিচগুঁড়া আর গরম মসলা গুঁড়ার মিশ্রণে সহজেই বানিয়ে ফেলতে পারবেন সিক্সটি ফাইভ মসলা। তারপর টক দই, আদা ও রসুনবাটা আর লবণের সঙ্গে পরিমাণমতো মসলা মিশিয়ে ম্যারিনেট করে রাখুন। ঘণ্টাখানেক পর মাংসের টুকরোগুলোয় ডিমের সাদা অংশ আর কর্নফ্লাওয়ার মাখিয়ে মুচমুচে করে গরম তেলে ভেজে তুলুন।

default-image

এরপর চটজলদি ফ্রাইং প্যানে খানিকটা তেল গরম করে তাতে ভাঁজ খোলা পেঁয়াজ (বড় ভারতীয় পেঁয়াজগুলো ব্যবহার করবেন), ফালি করে রাখা কাঁচা মরিচ, খানিকটা চিলি সস, সয়া সস দিয়ে নাড়াচাড়া করে তাতে ভেজে রাখা মুরগির টুকরোগুলো দিয়ে একটু ‘টস’ করে নিন আর ছিটিয়ে দিন এক চিমটি গুঁড়া মসলার মিশ্রণ। তারপর ওপরে ছড়িয়ে দিন টাটকা ধনেপাতাকুঁচি আর খানিকটা লেবুর রস। হয়ে গেল চিকেন সিক্সটি ফাইভ, যেটা আপনি চেখে দেখতে পারবেন চেন্নাইতে না গিয়েও।

রসনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন