নীল পনিরের দেশে

প্রথম আলো

উচ্চশিক্ষার জন্য ফরাসি সরকারের বৃত্তির আনুকূল্যে ফ্রান্সে এসেছি সে অনেক দিন। আমার স্কুল প্যারিস থেকে ৩৬০ কিলোমিটার (২২৪ মাইল) দূরে ফ্রান্সের আলিয়েঁ নদীর তীরে ভিশি শহরে। বিদেশি ক্যালেন্ডারে দেখা ছবির চেয়েও সুন্দর একটি ছিমছাম ছোট্ট শহর ভিশি। শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে ছোট্ট একটি পাহাড়ি নদী। নদী দেখেই আমার খুব ভালো লাগল। নদীর নাম আলিয়েঁ, অর্থাৎ ‘মিলন’। সন্ধ্যার খানিকটা আগে আগেই অদূরে অনুচ্চ পাহাড় থেকে দল বেঁধে সাদা রাজহাঁস উড়ে এসে নদীর বরফগলা জলে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়। তীরঘেঁষা রেস্তোরাঁগুলোতে যখনই ভিড় জমতে শুরু করে, ঠিক তখনই হাঁসেরা ঠিক তার আশপাশে সাঁতার কেটে বেড়ায়। তাদের ভাগ্যেও জুটে যায় অনেক খাবার। আমি তন্ময় হয়ে প্রায় প্রতিদিন এমন দৃশ্য দেখি।

ভিশির উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে খনিজ সমৃদ্ধ পানি সংগ্রহের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা আছে
ছবি: সি. মোরেল

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ভিশি ছিল তথাকথিত মুক্ত ফ্রান্সের রাজধানী। এ ছাড়া ভিশি শহরের আরও নাম আছে এখানকার নানা খনিজসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক পানির উৎসের কারণে। প্রতিবছর তাই পাল্লা দিয়ে ভিড় জমায় অসংখ্য ট্যুরিস্ট। আরোগ্য লাভের আশায় চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ভিশির ভূগর্ভস্থ উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে খনিজসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক পানি পান করতে আসেন তাঁরা। এ শহরেই এক ক্যাফে বারে নাচতে-গাইতে গিয়ে কিংবদন্তি ফ্যাশন ডিজাইনার গ্যাব্রিয়েল বনোহওর শ্যানেল নাম নিয়েছিলেন কোকো শ্যানেল হিসেবে।

সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, ফ্যাশন, রুচি, বিলাস, স্বাধীনতা, সাম্য ও ভালোবাসার এক রোমান্টিক দেশ। আমার কৌতূহলের আর অন্ত নেই। নামকরা গবেষণাগারে অণুজীব থেকে চকলেট উৎপাদনের উপায় খুঁজে বের করতে হবে আমাকে। তার আগে অবশ্যই বিভাষা ফরাসি রপ্ত করতে হবে, তেমনই শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। নিজ দেশ থেকে এ দেশে আসার সময় প্রিয় বন্ধু ও সতীর্থ সিলভী কয়েকটি ফরাসি শব্দ শিখিয়ে দিয়েছিল, তা–ই সম্বল করে নামকরা স্কুল কেভিলামে সপ্তাহে পঁচিশ ঘণ্টা, অর্থাৎ দিনে টানা পাঁচ ঘণ্টা করে ফরাসি শিখতে গিয়ে গলদঘর্ম হচ্ছি। ফরাসিরা যা লেখে, তা সেভাবে উচ্চারণ করে না। অনুনাসিক শব্দেরও কমতি নেই। আবার উচ্চারণের সময় ঠোঁট, নাক, মুখ, দাঁত, তালু আর জিহ্বার কসরত করা দেখেই আমি অনেকখানি হতাশ হয়ে পড়েছিলাম।
আমাদের ক্লাসে ফরাসি শিক্ষিকা নোয়েমি খুব প্রাণবন্ত ও সিরিয়াস। আমরা প্রায় জনা বিশেক ভিনদেশি। আমাদের মুখে বিভাষা ফরাসি তুলে দেওয়ার অসাধ্য সাধনে তার চেষ্টার ত্রুটি নেই। নানা কায়দায় চলে ভাষা শেখার প্রাথমিক পাঠ।

তৃতীয় নেপোলিয়ঁ প্রতিষ্ঠিত ভিশির বিখ্যাত 'অপেরা দ্য ভিশি'
ছবি: সি. মোরেল

একদিন ক্লাসে ভাষা শেখার জন্য একজন পনিরবিক্রেতা এবং একজন ক্রেতা ঠিক করা হলো। সংলাপ নিম্নরূপ:
(কাল্পনিক পনিরের দোকানে)
ক্রেতা: শুভ দিন জনাব (মশিয়েঁ) ।
বিক্রেতা: শুভ দিন। আপনার জন্য কী করতে পারি?
ক্রেতা: আমি খানিকটা পনির কিনতে চাই।
বিক্রেতা: আমাদের এখানে ৩৬৫ রকমের পনির আছে, অর্থাৎ প্রতিদিনের জন্য একটি করে। আপনি কোনটি চান?
ক্রেতা (খানিকটা বিব্রত): অনুগ্রহ করে আমাকে আজকেরটা দিন।

আমি ফরাসি শিখতে গিয়ে অন্য কথা ভাবছিলাম। আমার শুধু মনে হচ্ছিল, এদের দেশে এত রকমের পনির আছে! পরে জেনেছিলাম, পনির উৎপাদনে এরা ৩৬৫–তে থেমে নেই। কত রকম স্বাদের পনির আছে এ দেশে, তার পরিসংখ্যান পাওয়া অনেকটা কষ্টকর। আজ থেকে ১০ হাজার বছর আগে সেই নব্যপ্রস্তরযুগ, অর্থাৎ যখন থেকে মানুষ চাষাবাদ এবং পশুপালন শুরু করেছে, তখন থেকেই মানুষ এমন উপাদেয় দুগ্ধজাত খাবারের সঙ্গে পরিচিত।

পনির রকফোর্ত
ছবি: লেখক

ফ্রান্সে, একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে পনির উৎপাদন প্রসার লাভ করে। তখনকার গণনানুসারে প্রায় হাজারেরও বেশি পনির ছিল এ দেশে। এর আগে ১৮৬৫ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের আরেকটি বিস্ময়কর উদ্ভাবন পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতি উদ্ভাবনের পর পনির উৎপাদন আলাদা মাত্রায় উন্নীত হয়। আর বর্তমানে তা পৌঁছে গেছে প্রায় ১ হাজার ৮০০–তে। সৃষ্টি–সুখের উল্লাসে নানা কায়দায়, কৌশলে পনির উৎপাদনের বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলেছে শিল্পের সখ্য, রুচির অনন্য উৎকর্ষতা। প্রতিটি পনিরের আছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।

রকফোর্ত পনির কারখানায় তৈরির একপর্যায়ে
ছবি: পি থেবাউ, সি.আর.টি-অক্সিতানি

সে যা–ই হোক, ফরাসিরা ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস পনির খেতে খুব ভালোবাসে। প্রতিবার খাবারের পর একটুখানি পনির চাই, সে দুপুরে হোক বা রাতেই হোক কিংবা সকালের খাবারের সঙ্গেই হোক। তা ছাড়া নানা পদের স্যুপ, রান্নায় নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টিতে পনিরের ব্যবহার অনেক এবং অনেকটাই ফরাসি রন্ধনশিল্পের কৌলিন্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক।

ফ্রান্সের জনপ্রিয় পনিরগুলোর অন্যতম হচ্ছে ক্যামোমবার্ত, এম্মেতাল, কমতে, ব্রি, কান্তাল, মিমোলেত, রকফোর্ত ইত্যাদি।

রকফোর্ত নিয়ে একটি প্রচলিত লোককাহিনি রয়েছে। এক মেষপালক রাখাল যুবক পাহাড়ি গুহায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। দুপুরে খাবার সময় হলে সে দেখতে পেল অদূরে পায়চারি করছে এক অনন্য সুন্দরী তরুণী। সে তখন তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অভিপ্রায়ে এগিয়ে যায়। যতই সে এগিয়ে যায়, তরুণীটি মরুভূমির মরীচিকার মতোই আরও দূরে সরে যায়, সে এক মায়াবী বিভ্রম। বেশ কিছুদিন পর বিভ্রম কেটে গেলে তরুণ মেষপালক ফিরে আসে সেই পাহাড়ি গুহায়, যেখানে সে রেখে গিয়েছিল দুপুরের খাবারের সঙ্গে নিয়ে আসা মেষদুগ্ধ। সে দুধ জমাট বেঁধে পরিণত হয়েছে ‘নীল পনিরে’।

ফরাসিরা ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস পনির খেতে খুব ভালোবাসে
ছবি: সংগৃহীত

নীল পনিরের রহস্য আসলে Penicillium roqueforti নামের এক ছত্রাকে। ১৯২৮ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার (পৃথক) করার অনেক আগে থেকেই পচন (গ্যাংরিন) নিরাময়ে এ ছত্রাকের ব্যবহার করা হতো। প্রতিবছর নীল পনির উৎপাদন হয় প্রায় ১৯ হাজার টন। প্রধান ক্রেতা দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই ১৯২৫ থেকে উৎপাদিত হচ্ছে এ পনির। আগে ছাগল ও মেষের টাটকা দুধ থেকে উৎপাদন করা হতো। বর্তমানে শুধু লাকুন জাতের মেষের দুধ ব্যবহার করা হয়। এক কেজি পনিরের জন্য দরকার হয় ছয় থেকে সাত লিটার দুধ।

ফ্রান্সের দোকানে বিক্রির জন্য বিভিন্ন ধরনের পনির
ছবি: লেখক

আমার ছোট মামা সৈয়দ এনায়েত হোসেন একজন বরেণ্য চিত্রশিল্পী। খুব সুন্দর ছবি আঁকেন। ঢাকা থেকে আমাদের বরিশালের বাসায় যখন আসতেন, সঙ্গে রং-তুলি আর আমার মায়ের প্রিয় ঢাকাই পনির নিয়ে আসতেন। মা খুব খুশি হতেন। সফেদ রঙের ও লবণ দেওয়া এ বস্তুর স্বাদ প্রথম প্রথম বিস্বাদ বা লবণ কটা লাগলেও মায়ের নির্মল হাসি দেখে মনে মনে ভাবতাম ‘খুবই সুস্বাদু’। পনিরের সঙ্গে প্রথম পরিচয় এভাবেই। তখন কে জানত যে ভাগ্যতরি আমাকে সঙ্গে করে সুগন্ধি, দ্রাক্ষা সুধা আর পনিরের জাদুর এক অনন্য জগৎ ফ্রান্সে এনে তার নোঙর ফেলবে।