বাঙালির চা খাওয়া

চা পান বাঙালিজীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। চা ছাড়া একটি দিনের কথা আজ অনেকেই ভাবতে পারেন না। কিন্তু চায়ের এই অনিবার্যতা অবশ্য খুব বেশি দিনের নয়। সময়ের হিসাবে ২০০ বছরেও পৌঁছায়নি। ঝোপজাতীয় এই উদ্ভিদ সুদূর অতীতকাল থেকে পূর্ব এশিয়ানদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত।

হালদা ভ্যালি চা বাগান, চট্টগ্রাম
ছবি: প্রথম আলো

চিরহরিৎ এই উদ্ভিদের শুকনা পাতা থেকে চা-পানীয় প্রস্তুত করার কলাকৌশল চীনারাই প্রথম আয়ত্ত করেছিল। চীনা ‘টেই’ শব্দ থেকে ‘চা’ শব্দটির উদ্ভব হয়েছে বলে অনেকে মনে করে থাকেন। প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যের আলোকে বলা যায়, চীনা ইতিহাসবিদ চেন শৌ (২৩৩-২৯৭) তাঁর ‘স্যান কুহ চিহ’ নামের ইতিহাসগ্রন্থে চায়ের প্রথম উল্লেখ করেছিলেন। চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে চা-সংস্কৃতি জড়িয়ে আছে সূদুর অতীতকাল থেকে। পৃথিবীব্যাপী কড়া পানীয় হিসেবে চায়ের কদর অনেক দিন ধরেই বজায় আছে। মাদকতাপূর্ণ স্বাদ এবং একই সঙ্গে অবসাদ দূর করার অলৌকিক ক্ষমতার জন্য চায়ের জয়জয়কার উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম—পৃথিবীর সর্বত্র।

জানা যায়, ১৫০০ সালের দিকে চীনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের আধা ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিস্বরূপ এটি প্রথমে জাপানে প্রবর্তিত হয়েছিল। এর বেশ কিছুকাল পরে আনুমানিক ১৬০০ সালের দিকে ওলন্দাজ বণিকদের মাধ্যমে সারা ইউরোপে চায়ের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৬০ সাল নাগাদ এটিকে ইংল্যান্ডের মানুষের কাছে পরিচিত করায় এবং সেই থেকে সমগ্র ইউরোপে পানীয় হিসেবে চায়ের ব্যবহার শুরু হয়। এরপর এর যাত্রা বিস্তৃত হয় সমগ্র আফ্রিকায়। বেশি একটা সময় লাগেনি এশিয়ার চৌহদ্দি পেরিয়ে ইউরোপ-আফ্রিকায় চায়ের ব্যবহার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে। চা আজ পৃথিবীর নাম্বার ওয়ান পানীয়। আর তা যদি হয় ভারতীয় চা, তাহলে তো কথাই নেই।

ইংরেজরা চলে গেলেও বাঙালি চা পানের সঙ্গে আড্ডা মেরেই চলেছে
ছবি: সৈয়দ লতিফ হোসাইন

ভারত উপমহাদেশে চায়ের ব্যবহার ইংরেজদের হাত ধরে। যদিও চা–গাছ অনেক দিন ধরেই এ অঞ্চলে আছে, কিন্তু পানীয় হিসেবে এর ব্যবহার বাঙালিদের জানা ছিল না। বাংলায় চা–শিল্পের প্রথম প্রচলন করেন রবার্ট ব্রস নামের এক ইংরেজ সিভিলিয়ান। তিনি ১৮৩৪ সালে আসামে প্রথম চা-গাছের সন্ধান পান। ‘আসাম চা কোম্পানি’র মাধ্যমে ভারতে ১৮৩৯ সালে আসামেই বাণিজ্যিকভাবে চায়ের চাষ শুরু হয়। পরের বছর ১৮৪০ সালে ইংরেজরা চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে চা–বাগান তৈরির প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশে ১৮৫৫ সালে সিলেটের চাঁদখানি পাহাড়ে তারা চায়ের কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। মূলত ব্রিটিশদের মাধ্যমেই বাংলায় চায়ের চাষ শুরু হয় এবং তা খুব দ্রুততার সঙ্গে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও প্রথম দিকে চা পানীয়টিকে বাংলায় পরিচিত করাতে ইংরেজদের বেশ গলদঘর্ম হতে হয়েছিল।

চা উৎপাদনের পাশাপাশি ইংরেজরা চা বিপণনের জন্য নিত্যনতুন প্রচারণা চালাতে থাকেন। প্রথমাবস্থায় কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্র বৌবাজার ও ঠনঠনিয়ায় তারা বিনা মূল্যে চা খাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এমনকি সে সময় বাড়িতে চা-পাতা নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা চালু ছিল। বাঙালিকে চায়ের নেশায় বুঁদ করার আপ্রাণ চেষ্টা ইংরেজরা অব্যাহত রাখে। এর পেছনে তাদের বাণিজ্যিক চিন্তা ছিল মুখ্য।

দার্জিলিং-আসাম-সিলেট-চট্টগ্রাম অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি ছিল চা চাষের জন্য উৎকৃষ্ট। সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার শ্রীপুর চা-বাগান
ছবি: আনিস মাহমুদ

দার্জিলিং-আসাম-সিলেট-চট্টগ্রাম অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি ছিল চা চাষের জন্য উৎকৃষ্ট। সে কারণে ১৯৪৭ সালে ইংরেজদের দেশত্যাগের আগেই বাংলাদেশের চট্টগ্রাম-সিলেট অঞ্চলের প্রায় ১৩৩টি চা–বাগান প্রতিষ্ঠা করেছিল। এসব বাগানে ৩০ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বার্ষিক প্রায় ১ দশমিক ৮৮ কেজি চা উৎপাদিত হতো। এত বিপুল পরিমাণ চা বাজারজাতকরণে ইংরেজরা প্রথমে হিমশিম খেয়েছে। তারা চাইত বাঙালিদের যদি চায়ের প্রতি আসক্তি বাড়ানো যায়, তাহলে তাদের বিক্রি ভালো হবে। বিক্রি ভালো হলে লাভও ভালো হবে।

এই চিন্তা থেকে এ অঞ্চলের মানুষের কাছে খানিকটা অপরিচিত পানীয় চাকে পরিচিতকরণের জন্য ইংরেজরা নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত নৌ যোগাযোগই ছিল বাংলার মূল যোগাযোগমাধ্যম। তাই চায়ের প্রচারণায় টি অ্যাসোসিয়েশন প্রথমে নদীপথকে বেছে নেয়। নৌযাত্রীদের বিনা মূল্যে চা–পানের ব্যবস্থা করে টি অ্যাসোসিয়েশন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলার যোগাযোগব্যবস্থা রেলের ওপর অনেকটা নির্ভর হয়ে পড়ে।

আর ইংরেজরা চায়ের প্রচারণায় এরপর রেলকে ব্যবহার করে তাদের নিজেদের মতো করে। তারা বড় বড় রেলস্টেশন, বিশেষত জংশনগুলোতে চা-পানের উপকারিতা–সংবলিত অভিনব বিজ্ঞাপন বোর্ড স্থাপন করে। বোর্ডগুলো চারটি অংশে বিভক্ত ছিল। ভাষা ছিল মজাদার। রঙিন এসব বিজ্ঞাপনের প্রথম অংশে চা–পানের উপকারিতাবিষয়ক কিছু বক্তব্য থাকত, যেমন চা খেতে খুব সুস্বাদু, এতে কোনো অপকার হয় না, জীবনীশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক, মাদকতাসক্তি নেই, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, কলেরা, আমাশয়, প্লেগ, অবসাদ দূর হয় ইত্যাদি। দ্বিতীয় অংশে ‘থাকলে মায়ের বাপের আশীর্বাদ, ভালো চা আর কাপড় যায় না বাদ’—এমন বাক্যসংবলিত সচিত্র বক্তব্য। তৃতীয় ও চতুর্থ অংশে গরম চা পান করার উপকারিতা বলা হতো।

বিলাসী বাঙালির চা আয়োজন
ছবি: প্রথম আলো

ইংরেজদের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে চায়ের প্রতি তাদের অভিলাষ ও ভালোবাসার কথা জানা যায়। শুধু বিজ্ঞাপন দিয়েই যে তারা ক্ষান্ত ছিল, তা নয়। লোকজনকে বিনা মূল্যে চা পানের জন্য রেলে করে ঈশ্বরদী, কাউনিয়া, পোড়াদহসহ বিভিন্ন জংশনে নিয়ে আসা হতো। চা খাওয়ার পর রেলে করে আবার যাত্রীদের নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হতো। গ্রামীণ মানুষদের চায়ের প্রতি আসক্তি বাড়ানো হয়েছে এভাবেই। অভ্যস্ততা তৈরির পর কিনে খাওয়া শুরু হয়।

বাঙালিদের একটি অংশ এভাবে বিনা মূল্যে চা খাওয়াকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি। ইংরেজদের এ পদক্ষেপকে ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে জোরালো বিরোধিতা করা হয়। চা–বাগানের শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে তারা জোর দাবি জানায়। কারণ, বিভিন্ন চা-বাগানে পরিশ্রমী কাজ করার জন্য ছোট নাগপুর, ভাগলপুর থেকে সাঁওতাল–ওঁরাও আদিবাসীদের ভূমির প্রলোভন দেখিয়ে জোর করে নিয়ে আসা হয়।

মানবিক ও স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা করে বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায় চা-পানের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। তিনি এর সপক্ষে ‘চায়ের প্রচার ও দেশের সর্বনাশ’ বিষয়ে দেশ পত্রিকায় লিখিত বক্তব্য দেন। চা চাষের ফলে বাঙালি অর্থনীতি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেসব কথাও তিনি তাঁর লেখায় তুলে ধরেন। ব্রাহ্মসমাজের অনুগামীরা প্রায় সবাই চা পানের আসক্তির ঘোরবিরোধী ছিলেন। বাঙালির বিশাল এক অংশ চা-পানের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ফলে বাঙালিকে চা পানে অভ্যস্ত করতে ইংরেজদের প্রথমে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছিল, কিন্তু ইংরেজরা তাদের প্রখর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিদ্যমান সমস্যা থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসেছিল।

মানবিক ও স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা করে বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায় চা-পানের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলেছিলেন। ভাড়াউড়া চা-বাগান, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার
ছবি: প্রথম আলো

বিচিত্রমুখী উদ্যোগের ফলে উনিশ শতকের শেষ দিকে এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে চা বাঙালিদের কাছে আস্তে আস্তে সম্ভ্রম আদায় করে। চা পানের উপকারিতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি পুস্তিকা পর্যন্ত প্রকাশিত হয় এবং তৎকালীন সংবাদপত্রে চায়ের সুখ্যাতি বিষয়ে একাধিক বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞাপনের ভাষা যেমন ছিল চটকদার, তেমনি দৃষ্টিনন্দন। চায়ের গুণাগুণ–সংবলিত ১৯০০ সালের দিকে গিরিশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘চা প্রস্তুতপ্রণালী শিক্ষা’ নামের পুস্তিকাটির কলকাতার বিদ্বৎসমাজে আলোড়ন তোলে। আস্তে আস্তে পরিস্থিতি ইংরেজদের অনুকূলে চলে আসে। চা হয়ে ওঠে বাঙালির নিত্যসঙ্গী।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ বাঙালি চা পানের সুখ্যাতি করতে থাকেন। তাঁদের লেখালেখিতে প্রকাশ পেতে থাকে চায়ের প্রতি তাঁদের অনুরাগের কথা। শুরু হয় বাঙালির চা পানের প্রতি তীব্র আসক্তি। আর এভাবেই বাঙালির মননের সঙ্গে চিরস্থায়ী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে চা ও চা–কাহিনি।