ঢাকার যেসব জায়গার হান্ডি না খেলেই নয়
বেশ কয়েক বছর ধরেই রেস্তোরাঁয় জনপ্রিয় হয়েছে হান্ডি। মাটির হাঁড়িতে রান্না করা এই মাংস খেতে অনেকেই ছুটছেন পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে মিরপুর, পান্থপথ। রাজধানীজুড়ে একেক দোকানে একেকভাবে নিজস্ব মসলায় তৈরি হয় এই হান্ডি মাংস। যেকোনো সময়ের চেয়ে শীতের সন্ধ্যায় এই হান্ডির চাহিদা বেড়ে যায় অনেক।
আবেশ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, মিরপুর ১২
‘ঢাকায় আমরাই প্রথম হান্ডি আনছি।’ বলছিলেন আবেশ হোটেলের কর্মচারী জাহাঙ্গীর মিয়া। গল্পে গল্পে জানাচ্ছিলেন ২০১৯ সালে তাঁরা হান্ডি বিক্রি শুরু করেন। আবেশের হান্ডির চাহিদাও বেশি। ঢোকার মুখেই দেখা যায় সারি সারি হাঁড়িতে চলছে হান্ডি রান্না। রান্নায় ব্যবহার করা হয় ২২ পদের বিশেষ মসলা।
সপ্তাহের সাত দিনই খোলা থাকে আবেশ। হান্ডি বিক্রি চলে দুপুর ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত। এখানে হান্ডি ২৬০ টাকায় মিলবে। কেউ চাইলে পুরো হাঁড়িই কিনতে পারেন। সে ক্ষেত্রে দাম পড়বে ৩ হাজার টাকা। আবেশে রুমালি রুটি, নান, পরোটা, খিচুড়ি বা সাদা ভাতের সঙ্গে খেতে পারবেন হান্ডি।
অষ্টব্যঞ্জন, পান্থপথ
পশ্চিম পান্থপথ জামে মসজিদের বিপরীতে অবস্থিত অষ্টব্যঞ্জনের পান্থপথ শাখায় প্রতিদিনই রান্না হয় হান্ডি বিফ। এই শাখার ব্যবস্থাপক আল আমিন জানালেন, নিয়মিত চাহিদার কারণেই প্রতিদিন এই বিশেষ পদটি প্রস্তুত করা হয়।
কারওয়ান বাজার থেকে হান্ডি বিফ খেতে আসা শফি-রিপা দম্পতি জানালেন, শীতকালে গরম-গরম হান্ডি মাংসের স্বাদই তাঁদের এখানে টেনে আনে। বেলা দুইটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পাওয়া যায় হান্ডি বিফ। প্রতি বাটি হান্ডি বিফের দাম ২৫০ টাকা। আর পুরো এক হাঁড়ি কিনতে চাইলে খরচ পড়বে ৩ হাজার ৬০০ টাকা।
খিচুড়ি ভোজ, পুরান ঢাকা
পুরান ঢাকার জনসন রোডের মাথায় চোখে পড়বে ছোট্ট এক ফুডকার্ট। সন্ধ্যায় বৈদ্যুতিক বাতিতে জ্বলজ্বল করে নাম—খিচুড়ি ভোজ। নামে কেবল খিচুড়ি থাকলেও এখানে মিলবে হান্ডি বিফ ও হান্ডি হাঁস। খিচুড়ির সঙ্গে প্যাকেজ হিসেবে বিক্রি হয় হান্ডি। ভুনা বা ল্যাটকা—দুই ধরনের খিচুড়িই পাওয়া যাবে। খিচুড়িসহ হান্ডি বিফ ২০০ টাকা আর হান্ডি হাঁস ২৫০ টাকা। তিন পদের ভর্তাসহ মাটির থালায় পরিবেশন করা হয় হান্ডি।
এখানে হান্ডি খেতে চাইলে সন্ধ্যা ছয়টার পর আসতে হবে। ফুডকার্ট ঘিরে পাতা চেয়ারে জায়গা না–ও মিলতে পারে। দোকানি আবদুল মতিন জানালেন, তাঁদের হান্ডি রান্নায় ব্যবহার করা হয় ৪৫ পদের মসলা। মাটির হাঁড়িতে কয়লা দিয়ে কার্টের বাইরে আলাদা রান্নাঘরে হান্ডি রান্না করা হয়। খিচুড়ি ভোজ রাত দুইটা পর্যন্ত খোলা থাকলেও হান্ডির বিক্রি চলে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত।
আপ্যায়ন হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, মিরপুর ১০
মিরপুর ১০–এর বেনারসি পল্লিতে আপ্যায়ন হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। হোটেলটিতে পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের হান্ডি মাংস। হান্ডি বিফের পাশাপাশি এখানে রয়েছে হান্ডি মহিষ, হান্ডি ভেড়া, হান্ডি কলিজা ও হান্ডি নেহারি। হান্ডি বিফ খেতে খরচ পড়বে ২২০ টাকা, হান্ডি ভেড়া ২৮০ টাকা, হান্ডি কলিজার দাম ২০০ টাকা, হান্ডি নেহারি ২৫০ টাকা । প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এখানে হান্ডি মাংস পাওয়া যায়। তবে মহিষের মাংস খেতে হলে যেতে হবে শুক্রবার। দাম পড়বে ২৬০ টাকা।
সূর্য দীঘল বাড়ি, উত্তরা
উত্তরা উত্তর মেট্রোস্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে নামলেই চোখে পড়বে ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’। একেবারে সামনে গরম কয়লার ওপর রাখা মাটির হাঁড়ি। এখানে আছে দুই পদের হান্ডি-হান্ডি চিকেন ও হান্ডি বিফ। হোটেলের কর্মচারী আরমান শোনালেন হান্ডির ‘ইতিহাস’। তিনি বললেন, ‘তখনো দেশভাগ হয়নি। হান্ডি ছিল হায়দরাবাদের খাবার। দেশে আমরা যেভাবে রান্না করি এভাবে হান্ডি রান্না হতো না। হাঁড়ির মুখ বন্ধ করে কয়লা দিয়ে উচ্চ তাপে রান্না করা হতো।’
সূর্য দীঘল বাড়িতে হান্ডি খেতে খরচ হবে ২৫০ টাকা। কেউ চাইলে পুরো হাঁড়িই কিনতে পারেন। দাম পড়বে ৩ হাজার টাকা। হাঁড়িতে মাংস থাকে প্রায় ২ কেজি। সপ্তাহের সাত দিন সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিক্রি চলে। প্রতিদিন বিক্রি হয় ১০ থেকে ১৫ কেজি হান্ডি মাংস। এখানের হান্ডি গ্যাসের চুলায় রান্না করা হয়। তবে তাদের বিশেষত্ব হলো তারা ‘স্লো কুকিং’ পদ্ধতিতে রান্না করে অর্থাৎ গ্যাসের চুলায় মাটির পাতিলে ধীরে ধীরে রান্না করা হয় এই মাংস।