দেবদূতের রেসিপি

মাহফুজুল হক জগলুল পেশায় স্থপতি, রসনায় খাদ্যপ্রেমী। খাদ্যের রস গ্রহণে তিনি উদার ও বহুগামী। রাজধানী কি গ্রাম–গ্রামান্তর, পুরান ঢাকার ফুটপাত কি মাদ্রিদের চৌকশ ভোজনশালা—কোনো সুখাদ্যই তাঁর অপাঙ্‌ক্তেয় নয়। খাবার সুস্বাদু হয়ে ওঠে সেসবের বংশলতিকায়, ব্যক্তিগত কোমল স্মৃতিতে, বিচিত্র মানুষের গল্পে। খাদ্য নিয়ে খাদ্যরসিকের লেখা।

গল্প-উপন্যাসে পড়েছি, সিনেমায়ও বহুবার দেখেছি, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে ফাঁসির আসামিকে জিজ্ঞেস করা হয়, শেষবারের মতো তিনি কী খেতে চান? সত্যি সত্যি এমন হয় কি না, জানি না। চরম সেই মুহূর্তে কি মানুষের জিবে কোনো স্বাদ থাকে? শুনেছি, ফাঁসির কয়েক মিনিট আগেও নাকি কর্নেল তাহের একদম স্বাভাবিক মানুষের ধীরেসুস্থে মতো বড় ফজলি আম নিজ হাতে কেটে খেয়েছিলেন। কর্নেল তাহেরের মতো এমন নিঃশঙ্কচিত্ত নিশ্চয়ই সবাই নয়। তবে আমার কৌতূহলের বিষয়টি হচ্ছে, মনের গভীরতর স্তরে মানুষের মনে কোন খাবারের স্বাদ চিরকাল জেগে থাকে?

মায়ের হাতের রান্না তো আছেই। তা ছাড়া পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরেছি। দেশের ভেতরেও গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছি অজস্রবার। তার সঙ্গে আছে বিভিন্ন অখ্যাত ও বিখ্যাত রেস্টুরেন্টে খাওয়ার অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া বাঙালি হিসেবে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের ঘরে ঘরে কত দাওয়াত যে খেয়েছি, তার হিসাব নেই। এটা কোনো বিশেষ অভিজ্ঞতা নয়, সবারই কমবেশি এমন ভোজনসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। কারও কারও হয়তো এ অভিজ্ঞতা আমার চেয়েও অনেক অনেক বেশি।

তবে আমার কৌতূহলের জায়গাটা হলো, এত নামীদামি ও অভিজাত খাবারের অভিজ্ঞতা ছাপিয়ে কিছু কিছু আপাত-এলেবেলে খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও রং কেন যেন এই বয়সে এসেও বারবার মনে পড়ে। নিজের অজ্ঞাতসারেই আজকাল প্রায়ই নাকের ভেতর আবছাভাবে সেসব খাবারের সুগন্ধ অনুভব করি; জিবে ফিরে আসে সেসব প্রায় অলৌকিক স্বাদের স্মৃতি।

অভিজাত সব খাবারের স্বাদকে পেছনে ফেলে সেসব আপাতসাধারণ খাবারের স্বাদ কেন হঠাৎ হঠাৎ আমার স্বাদগ্রাহী কোষসহ সম্পূর্ণ মনোজগৎকে দখল করে? এসব নিয়ে যখন ভাবি, মাঝেমধ্যে মনে হয়, আকাশ থেকে নেমে আসা একদল অলৌকিক দেবদূত বুঝি আমাদের জীবনের সুবর্ণ সময়ে সেসব রান্নার রেসিপি তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন।

আমি নিশ্চিত, পড়ন্ত বয়সের আমরা যারা আছি, আমাদের সবার মধ্যেই চেতনে বা অবচেতনে নিজস্ব একেকটি দেবদূতের রেসিপির তালিকা লুকিয়ে আছে। আমি আমার মনের গহিনে বাস করা একান্ত নিজস্ব দেবদূতের রেসিপির তালিকায় থাকা কিছু কিছু খাবারের কথা একে একে এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

ব্যায়গন কি সবজি আর রোটি

ব্যায়গন কি সবজি, দিল্লি, ভারত

সবার প্রথমে যে খাবারের কথা মনে পড়ে, সেটি হচ্ছে ১৯৮৬ সালে দিল্লির পুরোনো রেলস্টেশনের সামনে রাস্তার ওপারে উন্মুক্ত এক ইতালিয়ান হোটেলে খাওয়া ব্যায়গন কি সবজি আর লোহার কড়াইয়ের উল্টো দিক ব্যবহার করে বানানো লাল আটার ‘রোটি’। ঝাঁজালো ধোঁয়াটে গন্ধে ভরা সেই ব্যায়গনের সবজি আর গরম-গরম পোড়া পোড়া লাল আটার রুটি—আজও বারবার জিবে ফিরে আসে তার স্বাদ। ধুলোমাখা দিল্লি শহরের ব্যস্ত শীতের দুপুরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে হয়েছিল একদল অচেনা মানুষের মাঝখানে, পাশে ছিল আমার প্রিয় বন্ধুরা—বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের হাবিব, কামাল, মোস্তাফিজ, জামি আর লুৎফুল ভাই।

হাবিব এখন বেলজিয়ামে, বাকিরা সবাই কানাডায়। জানি না, তাদের কারও মনে পড়ে কি সেই দুপুর, সেই খাবার, সেই অস্পষ্ট অথচ গাঢ় অনুভূতি। আমি তাদের জিজ্ঞেসও করি না। ভয় হয়, যদি তারা হেসে ওঠে। ভাবে, আমি অতীতের পেছনে ছুটে চলা এক পাগল। তবু বিস্মৃতপ্রায় সেই দুপুরের সেই খাবার আমার কাছে থেকে যায়। কোনোভাবেই হিসাব মেলাতে পারি না, কেন জীবনে চেখে দেখা হাজার পদের খাবারের স্বাদ ছাপিয়ে অতি সামান্য বেগুন ভাজি আর লাল আটার রুটির স্বাদ এত প্রবল প্রতাপে আমার স্মৃতিতে ফিরে আসে বারবার।

চিটাগং হোটেলের বুটের ডালে গরুর মাংস

চিটাগং হোটেলের বুটের ডাল দিয়ে গরুর মাংস, বরিশাল স্টিমার ঘাট

শৈশবে, বছরে দু-তিনবার মা-বাবার সঙ্গে আমরা পাঁচ ভাই মিলে প্যাডেল স্টিমারে চড়ে পিরোজপুরের গ্রামের বাড়িতে যেতাম। নিয়মিত স্টিমারযাত্রায় তিনটি খাবারের কথা বারবার মনে আসে, অবচেতনে জিবেও তার স্বাদ আজকাল প্রায়ই টের পাই। সেসব খাবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যেটা মনে পড়ে, সেটা খুবই সাধারণ। বরিশাল স্টিমারঘাটের সামনের রাস্তায় চিটাগং হোটেলের বুটের ডাল দিয়ে রান্না করা গরম-গরম গরুর মাংস।

সেকালে স্টিমার ঠিক দুপুরবেলা বরিশাল ঘাটে এসে থামত। স্টিমার মোটামুটি এক থেকে দেড় ঘণ্টা ঘাটে থেমে থাকত। স্টিমার বরিশালে থামামাত্রই আব্বা বিরাট টিফিন ক্যারিয়ারসহ বড় সন্তান হিসেবে শুধু আমাকে নিয়ে চলে যেতেন ঘাটের সামনের চিটাগং হোটেলে। নামের সঙ্গে হোটেল থাকলেও সেটা ছিল একটি ব্যস্ত রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল নয়। বরিশাল শহরের একদম প্রবেশদ্বারে অবস্থিত হোটেলের নাম চিটাগং হোটেল কেন, কেন নয় ‘বরিশাল হোটেল’, সে রহস্যের সমাধান আজও বের করতে পারিনি। হোটেলে ঢুকে টেবিলে জায়গা পাওয়া ছিল অনেক কষ্টকর। হোটেলে ঢুকেই আব্বা আমাদের দুজনের জন্য বুটের ডালের সঙ্গে রান্না করা গরুর মাংস আর গরম ভাত অর্ডার দিতেন, আর অন্য সবার জন্য টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি করে একই খাবার নিয়ে নিতেন।

মনে আছে, খুব মজা করে আব্বার সঙ্গে চকচকে হলুদ রঙের বুটের ডাল ও গরুর মাংস গোগ্রাসে খেতাম। সঙ্গে থাকত লেবু ও কাঁচা মরিচ। গোগ্রাসে এ জন্য খেতাম যে আমার খালি ভয় হতো, কখন না আমাদের রেখে স্টিমার ছেড়ে দেয়।

এখনো চোখ বুজলেই স্পষ্ট দেখতে পাই, কোলাহলমুখর চিটাগং হোটেলের ময়লা ফ্লোর, ওয়েটারদের চিৎকার। সেখানে ময়লা টেবিলের ওপর সাদা প্লেটে ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত আর বুটের ডালের গরুর মাংস। আমি খাচ্ছি গোগ্রাসে, আর আব্বা খাচ্ছেন ধীরস্থির ও নিশ্চিন্ত মনে। আজ আব্বা নেই, সেই দিন আর কখনো ফিরে আসবে না, কিন্তু সেই স্বাদ আজও অনুভব করি।

স্টিমারঘাটের নারকেল-চিড়াভাজি

ঘাট থেকে স্টিমার ছাড়ার পরও নানা পণ্যের হকারে ভরে থাকত ডেক। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল অদ্ভুত রকমের সাহসী। স্টিমার পুরোপুরি গতিতে ওঠার আগমুহূর্তে স্টিমারের সঙ্গে দড়িবাঁধা নৌকায় বিপজ্জনকভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে যেত, কিন্তু কিছু কিছু হকার তারপরও স্টিমারেই অবস্থান করত। স্টিমারের মধ্যে বেশির ভাগ হকারই নানা রকমের মজাদার খাবার বিক্রি করত। তবে আমার বাবা আমাদের কোনো রকম খোলা খাবার খেতে দিতেন না। কচি শসা, পাকা পেঁপে, কলা, ডাবের পানি, সেদ্ধ ডিম বা নাবিস্কো গ্লুকোজ বিস্কুট—শুধু এ-জাতীয় আবৃত খাবারই আমাদের জন্য অনুমোদিত ছিল।

তবে চাঁদপুর, বরিশাল বা ঝালকাঠি থেকে ওঠা কিছু হকার ক্রেতা দাঁড়ানো অবস্থায় ফ্রেশ নারকেল কুরিয়ে তার সঙ্গে চিড়াভাজি মিশিয়ে একটা চমৎকার খাবার বিক্রি করত। শুধু এই খোলা খাবারটির ক্ষেত্রে বাবাকে তাঁর কঠোর নিয়ম ভাঙতে দেখেছি প্রতিবার। অর্থাৎ এটি তিনি নিজেও খুব মজা করে খেতেন আর আমাদেরও খাওয়াতেন।

চিড়াভাজির সঙ্গে কোরানো নারকেল মিশিয়ে পুরোনো বইয়ের কাগজে মুড়িয়ে দেওয়া সে খাবারও আমার দেবদূতের তালিকায় থাকবে। এটি শুধু তার স্বাদের কারণে, নাকি বাবা যে খাবারটির ক্ষেত্রে তাঁর আরোপিত কঠিন নিয়ম ভাঙতেন, স্নেহজড়িত সেই স্মৃতির কারণে, আমি নিশ্চিত নই।

লিটল জো’স আইসক্রিম

বাংলা কিশোরসাহিত্যে প্রায়ই একজন এমন ‘মামা’ চরিত্র থাকে, যে ভাগনে-ভাগনিদের ভীষণ ভালোবাসে। উদার ও রসিক স্বভাবের কারণে শিশুমহলে প্রচণ্ড জনপ্রিয়। তোতা মামা হুবহু সে রকমই এক ক্ল্যাসিক্যাল মামা। তবে মামা ডাকলেও তাঁর সঙ্গে আমাদের রক্তের কোনো সম্পর্ক ছিল না। পিরোজপুরে আমাদের মামাবাড়ির কাছেই ছিল তাঁর বাড়ি। রক্তের সম্পর্কের না হোন, তোতা মামা আমাদের সব ভাইকে আপন মামার মতোই খুব ভালোবাসতেন। ফার্মগেটের সালাম স্ট্যাম্প কর্নারে নিয়ে গিয়ে নিয়মিত স্ট্যাম্প ও দামি অ্যালবাম কিনে দিতেন। পরীক্ষায় ভালো ফল করলে দিতেন নানা উপহার। ঘুরতে নিয়ে যেতেন শহরের নানা জায়গায়। খাওয়াতেন আমাদের পছন্দের খাবার।

মনে আছে, একবার কলাবাগানের আমাদের বাসা থেকে তোতা মামা আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। সেখানে তাঁর এক বন্ধু চাকরি করতেন। সেই বন্ধুর দায়িত্ব ছিল বিদেশ থেকে আসা নতুন একধরনের আইসক্রিম এ দেশের শিশুরা কেমন পছন্দ করে, তা নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করে হেড অফিসে পাঠানো। তোতা মামা তাঁর কথাতেই আমাদের তিন ভাইকে সেই আইসক্রিম-স্টাডির এদেশীয় ‘গিনিপিগ’ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তবে এমন আইসক্রিম খাওয়ার সুযোগ পেলে গিনিপিগ হতে কোনো আপত্তি আমাদের ছিল না!

আমরা তখন কলাবাগানের এক টিনের ছাউনি দেওয়া বড় দোতলা ঘরে থাকতাম। ইন্টারকন্টিনেন্টালের লবিতে ঢুকে মনে হয়েছিল বেহেশতে প্রবেশ করেছি। আমাদের বসিয়ে দেওয়া হলো চকচকে সোফায় এবং প্লেটের ওপর ছোট চামচসহ পরিবেশন করা হলো আইসক্রিম। আইসক্রিম যে প্লেটে করে খাওয়া যায়, সে ধারণাই ছিল আমাদের কাছে একদম নতুন। আর চামচ দিয়ে কেটে কেটে যে আইসক্রিম খাওয়া যায়, তা আমরা জানতামই না।

আমরা তখন লেক সার্কাস স্কুলে পড়ি। টিফিন টাইমে ‘তেঁতুলতলা’য় তিন পয়সায় যেসব আইসক্রিম কিনতাম, সেগুলো ছিল মূলত বাঁশের কাঠিতে গেঁথে দেওয়া স্যাকারিন-মিশ্রিত এক টুকরা মিষ্টি বরফ। একটু বেশি পয়সা দিলে মিলত অর্ধেক সাদা আর অর্ধেক ম্যাজেন্টা রঙের বরফখণ্ড; যদিও ‘ইগলু’ ও ‘বেবি আইসক্রিম’ নামের দুটি স্থানীয় ব্র্যান্ডও তখন চলত।

এখনো স্মৃতির পাতা থেকে ভেসে আসে সেই ইন্টারকন্টিনেন্টালের আইসক্রিমের চেহারা—ক্রিম রঙের আইসক্রিমের ওপরে ও নিচে ছিল কফি রঙের বিস্কুটসদৃশ দুটি বস্তু। আইসক্রিমটির নামও ছিল অপূর্ব—লিটল জো’স আইসক্রিম।

লিটল জো! কী চমৎকার নাম!

কে এই লিটল জো, আমরা জানতাম না। কিন্তু তার নামে তৈরি আইসক্রিম আমাদের কাছে হয়ে উঠেছিল রূপকথার এক খাবার। আইসক্রিমের সঙ্গে থাকা বিস্ময়কর বিস্কুটের উপাদান আজ আর বিস্ময়কর নেই। আজ জানি, সেটা একধরনের ওয়েফার। কিন্তু সেই প্রথম অপার বিস্ময়ের যে স্বাদ, তা আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। পৃথিবীর নানা দেশে, নানা প্রান্তে, নানা স্বাদের কত-না আইসক্রিম খেয়েছি, কিন্তু তোতা মামার সঙ্গে শৈশবে খাওয়া সেই লিটল জো’স আইসক্রিমের স্বাদ যেন আজও জিবে লেগে আছে। অবচেতনে বারবার ফিরে ফিরে আসে সে স্বাদ।

ফ্ল্যামিংগোর চটপটি

আমাদের পাঁচ ভাইয়েরই সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন সালাম চাচা। তোতা মামা যেমন আদতে আমাদের মামা ছিলেন না, তেমনি পুরান ঢাকার নারিন্দার বাসিন্দা সালাম চাচাও প্রকৃত অর্থে আমাদের চাচা ছিলেন না, ছিলেন আব্বার অফিসের জুনিয়র কলিগ। ১৯৭৩ সালে মেজো খালাকে বিয়ে করে হঠাৎই তিনি চাচা থেকে খালুতে রূপান্তরিত হয়ে গেলেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের ‘চাচা’ ডাকের অভ্যাসের কারণে বিয়ের পরও আমরা কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে তাঁকে চাচা বলেই সম্বোধন করতাম। তবে আমাদের সেই অস্বস্তি খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বিয়ের মাত্র কয়েক মাস পর, হঠাৎ মুখের একটি ব্রণ খুঁটতে গিয়ে নববিবাহিতা মেজো খালার সেপ্টিসেমিয়া হয় এবং মাত্র তিন দিনের মাথায় তিনি মারা যান। খালু আবারও আমাদের কাছে ‘চাচা’ হয়ে ফিরে এলেন।

সালাম চাচার গোলাপি ও বেগুনি রঙের মাঝামাঝি বিকট রঙের একটি গাড়ি ছিল, টমাস ব্র্যান্ড। আমার জীবনে এমন ব্র্যান্ডের গাড়ি আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি, শুনিওনি। অমন ক্যাটক্যাটে রঙের গাড়িও জীবনে ওই একটিই দেখেছি; যদিও তিনি বলতেন, টমাস ব্র্যান্ডের গাড়ি নাকি ঢাকা শহরে মোট তিনটি ছিল।

এই টমাস গাড়িতে করেই সালাম চাচা হঠাৎ হঠাৎ আমাদের বাড়িতে আসতেন। এসেই বলতেন, চলো।

কোথায় চলো, কী চলো, কিছুই আমরা জিজ্ঞেস করতাম না। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে উঠে পড়তাম।

মনে আছে, এমন একবার ‘চলো’ বলায় গাড়িতে উঠতেই তিনি সোজা এককাপড়ে আমাকে চিটাগং নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে সাধারণত ‘চলো’ বলে তিনি আমাদের নিয়ে যেতেন বিজয়নগরে, বর্তমান সোয়াশে লাইটিংয়ের বিপরীতে রাস্তার ওপারে ফ্ল্যামিংগো নামের রেস্টুরেন্টে। সেখানেই একমাত্র রেস্টুরেন্টের ভেতরে পরিচ্ছন্ন অবস্থায় হাইজেনিকভাবে বানানো চটপটি ও ফুচকা পাওয়া যেত। ঢাকা শহরের আর কোথাও অভিজাত রেস্টুরেন্টে অমন পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বানানো চটপটি পাওয়া যেত কি না, তা আমার জানা নেই। মনে আছে, এক প্লেট চটপটি গোগ্রাসে সাবাড় করার পর লজ্জায় দ্বিতীয় প্লেট চাইতাম না। করুণ চোখে চাচার দিকে চেয়ে থাকতাম। চাচা ঠিকই বুঝতেন, আর দেরি না করে আমার জন্য দ্বিতীয় প্লেট অর্ডার করে দিতেন। এ মানুষটির ঋণ আমি কীভাবে শোধ করব জানি না। অথবা কী দরকার ঋণ শোধ করার, কিছু কিছু মানুষের কাছে ঋণী থাকা ভালো।

আবছাভাবে মনে আছে, স্বাধীনতার পরপর গুলিস্তানের কাছে চাং ওয়া নামে একটা রেস্তোরাঁয় সালাম চাচা নিয়ে গিয়েছিলেন। জীবনে প্রথম, একদম নতুন ও ভিন্নরকম স্বাদের চায়নিজ খাবারের সঙ্গে পরিচয়ের অভিজ্ঞতা আমাদের সেখানেই হয়। এখনকার অথেন্টিক চায়নিজ রেস্তোরাঁয় আমরা যেসব চায়নিজ খাবার খাই, তখনকার চাং ওয়ার চায়নিজ খাবারের স্বাদ তেমন ‘অথেন্টিক’ ধরনের ছিল না। সেসব চায়নিজ খাবারের মধ্যে পূর্ববঙ্গের সহজাত স্বাদের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করে একধরনের ফিউশন বা সিন্থেসিস করা হয়েছিল। আর তাই চাং ওয়ার চায়নিজ খাবারের স্বাদ ছিল এখনকার চেয়ে ভিন্নতর।

চাচার সঙ্গে শৈশবে বহুবার ফ্ল্যামিংগোর চটপটি খেয়েছি। চাচা ছাড়া একা একা বা অন্য কারও সঙ্গে কখনো খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। তাই ফ্ল্যামিংগোর চটপটির সে অসাধারণ অমৃতসম স্বাদ আর সালাম চাচার উপস্থিতি মিলেমিশে একাকার হয়ে আমার মনোজগতে প্রায়ই হানা দেয়। ফ্ল্যামিংগো এখন হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে। বৃদ্ধ সালাম চাচা মাঝেমধ্যে সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে খুব অস্পষ্ট কণ্ঠে ফোনে খোঁজখবর নেন।

আমাদের আর কোনো দিন একত্রে ফ্ল্যামিংগোর চটপটি খাওয়া হবে না।

ভিন্ডি কি ভুজিয়া

বাটানগর রেস্টহাউজের ভিন্ডি কি ভুজিয়া, কলকাতা, ভারত

১৯৭২ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিবছরই মা-বাবার সঙ্গে আমরা কয় ভাই কলকাতা যেতাম। কখনো কখনো বছরে দু-তিনবারও। আমার বাবা যেহেতু বাংলাদেশ বাটা কোম্পানির কর্তাব্যক্তি ছিলেন, তাই কলকাতা গেলে গঙ্গার পারে বাটানগরের বিশাল দোতলা গেস্টহাউসে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হতো।

গেস্টহাউসে ধবধবে ফরসা, খুব সুদর্শন ও অত্যন্ত মার্জিতভাষী একজন মুসলমান বাবুর্চি ছিলেন। নাম শাহজাহান আনসারি। উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে বাড়ি। আমার বয়স তখন ১০ বছরের কাছাকাছি, কিন্তু এখনো মনে আছে, উনি আমাকে সব সময় ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। গেস্টহাউসে সাদা ধবধবে ইউনিফর্ম পরা দুজন বাবুর্চি ছিলেন। শুধু ওনার নাম মনে আছে। অন্যজনের নাম বা চেহারা কিছুই মনে নেই। একজনের কথা এত মনে আছে, অন্যজনের কথা কেন মনে নেই, কে জানে। ওনারা আমাদের চিকেন, মাটন, ‘মছলি’সহ নানা রকম বাহারি উত্তর ভারতীয় নবাবি ঘরানার খাবার পরিবেশন করতেন।

কিন্তু ওই সবকিছু ছাপিয়ে, যেকোনো বিচিত্র কারণেই হোক, কেন যেন আমার শুধু মনে পড়ে ওনার রান্না করা অদ্ভুত স্বাদের ভিন্ডি কি ভুজিয়া। অর্থাৎ অত্যধিক পরিমাণে পেঁয়াজ দিয়ে রান্না করা আধা কাঁচা ঢ্যাঁড়সভাজির কথা। সামান্য ঢ্যাঁড়সভাজি কী করে এত সুস্বাদু হতে পারে, আমি আজও ভেবে পাই না।

নানির হাতের মলিদা

নানির বানানো পানীয় মলিদা

বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের যাদের শিকড়, তারা নিশ্চয়ই মলিদা নামের এক স্বর্গীয় পানীয়র স্বাদ সম্পর্কে অবহিত। আমাদের পরিবারে একমাত্র আমার নানি মলিদা বানাতে পারতেন। ভালো মলিদা সবাই বানাতে পারে না। কারণ, এটি তৈরি করতে হয় দীর্ঘ সময় ধরে, অসাধারণ ধৈর্যের সঙ্গে, নানা উপকরণ সুনির্দিষ্ট অনুপাতে, সঠিক সময়ে, নির্ধারিত ক্রমানুসারে একের পর এক মেশানোর জ্ঞান ও সৃজনশীলতা দিয়ে।

সাধারণত ধান ওঠার পর মলিদা তৈরি হতো। ছোটবেলায় বিভিন্ন ছুটিতে পিরোজপুর গেলে দেখতাম, নানি অনেকটা আচার-অনুষ্ঠানের মতো মহা আয়োজন করে মলিদা বানাতেন। আমাদের সাধারণত সকাল ১০টার দিকে মলিদা খেতে দেওয়া হতো, কিন্তু আগের রাত থেকেই শুরু হতো প্রস্তুতি। সকালবেলা রান্নাঘরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধৈর্যের সঙ্গে উপকরণগুলো ঘুটে যেতেন তিনি। আর আমরা বিস্ময়ভরে দেখতাম, কী নিখুঁত মনোযোগ আর যত্নে একেকটি উপাদান তিনি মিশিয়ে চলেছেন। নানির ব্যবহৃত উপকরণগুলোর মধ্যে ছিল: আতপ চালের গুঁড়া, ভাজা মুড়ির গুঁড়া, ডাবের পানি, ডাবের শাঁস, নারকেলের ফোপরা, নারকেলবাটা, আখের গুড়, আদাবাটা, ভিজিয়ে রাখা চিড়ার মণ্ড এবং অল্প পরিমাণ লবণ। আরও অন্য উপাদানও হয়তো ছিল, আমি মনে করতে পারছি না।

সব উপকরণ মিলিয়ে যখন মলিদা তৈরি হতো, আমাদের সবাইকে গ্লাসে করে সেই ঘন, সুস্বাদু তরল পরিবেশন করা হতো। সঙ্গে থাকত মোটা মোটা মচমচে মুড়ি, যা আমরা একটু একটু করে মলিদায় ভিজিয়ে খেতাম। যারা কখনো মলিদা খায়নি, তাদের কাছে এই স্বর্গীয় স্বাদের অনুভূতি বোঝানো অসম্ভব। আজ নানি, মা বা বয়সে বড় খালারা কেউ বেঁচে নেই। নিজের আত্মীয়দের মধ্যে এমন কাউকে চিনি না, যিনি মলিদা বানাতে পারেন। কয়েক বছর আগে আমার গ্রামের জায়গা দেখাশোনা করে—এমন একজনের বয়স্ক শাশুড়িকে দিয়ে মলিদা বানানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সেই এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল হয়নি।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা সবাই পরম আনন্দে মলিদা উপভোগ করতাম, কিন্তু নানিকে কখনো মলিদা খেতে দেখতাম না। জিজ্ঞেস করলে হাসিমুখে বলতেন, ‘পান খেয়ে ফেলেছি, পরে খাব।’ কিন্তু আমরা জানতাম, মলিদা পরে খাওয়া যায় না। কয়েক ঘণ্টা পরেই এর স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। আসলে একদল নাতিপুতি আর ছেলেমেয়েকে খাইয়েই তিনি আনন্দ পেতেন। নিজে খাওয়ার জন্য তিনি এত কষ্ট করে মলিদা বানাতেন না।

দেশি মুরগির সেদ্ধ ডিম

দেশি মুরগির সেদ্ধ ডিম, মান্দা উপজেলা বাজার, নওগাঁ

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমি আর আমার স্থপতি বন্ধু কামাল গাড়ি করে ঘুরছিলাম রাজশাহীর নানা প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট। সেই সময় এক সন্ধ্যাবেলা নওগাঁর মান্দা উপজেলার এক রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে স্থানীয় এক বৃদ্ধের কাছ থেকে পুরোনো খবরের কাগজের ওপর ধরিয়ে দেওয়া দেশি মুরগির সেদ্ধ ডিম খেয়েছিলাম।

সাধারণ সেদ্ধ ডিমে তেমন কিছু মনে রাখার মতো থাকে না। কিন্তু ওই ডিমের স্বাদ আজও মনে আছে; সম্ভবত আসল দেশি ডিমের স্বাদ আর বৃদ্ধের ‘সিক্রেট রেসিপি’র কালো রঙের লবণের কারণে। একটি ডিম খেতে গিয়ে সেদিন মাঝারি সাইজের তিনটি ডিম খেয়ে ফেলেছিলাম।

বৃদ্ধকে সিক্রেট লবণের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় তিনি মুচকি হেসেছিলেন, কিন্তু কোনো জবাব দিতে রাজি হননি। গর্ব করে শুধু বলেছিলেন, শুধু লবণ নয়, প্রতিটি ডিম তিনি নিজে বিভিন্ন গ্রামের ঘরে ঘরে ঘুরে গ্রামের নারীরা যেসব দেশি মুরগি পালেন, তা দেখে দেখে সংগ্রহ করেন বলেই তাঁর ডিমের এত স্বাদ।

বৃদ্ধের চেহারাটা এখন আর স্পষ্ট মনে নেই। মান্দার বাজারটিও দ্বিতীয়বার গেলে চিনে উঠতে পারব কি না, জানি না। তবু মান্দার বাজারের সেই সাধারণ সেদ্ধ ডিমকে আমি আমার দেবদূতের রেসিপির তালিকায় রাখব।

নীরবের পরোটা-মগজ ভুনা

নীরব হোটেলের মগজ ভুনা, চানখাঁর পুল, ঢাকা

১৯৮১ থেকে ১৯৮৮—এই সাত বছর বুয়েটে স্থাপত্যের ছাত্র হিসেবে কাটিয়েছি। ‘এরশাদ-ভ্যাকেশন’-এর কারণে পাঁচ বছরের কোর্স সাত বছরে শেষ হয়েছে। এ ছাড়া ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে মোটামুটি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বুয়েটের সঙ্গে সরাসরি যাওয়া-আসা ও রাত্রিযাপনের সম্পর্ক ছিল। সে হিসাবে ধরতে গেলে প্রায় এক দশক। হলের খাবার খেয়ে খেয়ে যখন ক্লান্ত হয়ে যেতাম, কখনো দল বেঁধে, কখনোবা একাই বকশীবাজারের রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে চলে যেতাম নাজিমউদ্দিন রোডের নীরব হোটেলে।

নীরব হোটেলে ভাত আর ভর্তা খেতে গেলেও প্রায়ই ভাত না খেয়ে খেতাম সদ্য ভাজা পরোটা আর উজ্জ্বল হলুদ ও লাল রঙের গরম-গরম মগজ ভুনা। ভাত না খেয়ে পরোটা-মগজ ভুনা খাওয়ার আইডিয়াটা সব সময় উসকে দিত সোহরাব নামের এক ওয়েটার। কী কারণে আমাকে যেন ও খুব পছন্দ করত। খেতে গেলেই আমাকে বলত, ভাইজান, কী সব ভাত-লতা-পাতা খাইবেন। আপনি সলিমুল্লাহ নবাবের মতো খাইবেন—পরোটা আর মগজ ভুনা।

সোহরাবের উসকানিতে নিমেষে মত পরিবর্তন করে ভাতের বদলে পরোটা আর মগজ ভুনা অর্ডার দিতাম। প্রথমবার ভুনার সঙ্গে দ্বিতীয়বার অল্প একটু ফ্রি ভুনা দেওয়ার রেওয়াজ আছে, তবে সোহরাব আমাকে দ্বিতীয়বারও প্রায় প্রথমবারের সমান মগজ ভুনাই এনে দিত। আর সঙ্গে একটার পর একটা গরম-গরম পরোটা দিতেই থাকত। আমাকে মুখফুটে কিছু বলতে হতো না।

পরোটা ছিঁড়ে মগজ ভুনাসহ যখন মুখে দিতাম, মসৃণ মগজের ক্রিমি টেক্সচার আর গরমমসলার সুগন্ধে জিবে এক চরম সুখানুভূতি ছড়িয়ে পড়ত। মগজের মোলায়েম ভাব আর ভাজা পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, আদা-রসুনের মিশ্রণে এমন এক ভারসাম্য তৈরি হতো, যা না বেশি ঝাল, না বেশি তৈলাক্ত—আর ঠিক ততটাই তৃপ্তিকর। শেষ টুকরা পরোটা পর্যন্ত চেটে খেতে ইচ্ছা করত।

রুচিতার এঁচোড়

১৯৭২-৭৩ সালে মা-বাবার সঙ্গে প্রথম কলকাতা গিয়েছিলাম। উঠেছিলাম ছোট নিউ ওয়েভারলি নামের একটা হোটেলে। সেই হোটেলে খাবারদাবার সব ছিল ব্রিটিশ স্টাইলের। সকালে দেওয়া হতো কর্নফ্লেক্স আর দুধ। প্রতিদিন ফ্লেক্সের মতো এসব স্বাদহীন বস্তু খেয়ে খেয়ে আমরা কিছুটা বিরক্ত। মা একপর্যায়ে বরিশাইল্লা তেজের সঙ্গে বললেন, আজ থেকে দেশি খাবার খেতে হবে। বাবাও পাশের গ্রামেরই জামাই, অর্থাৎ নির্ভেজাল বরিশাইল্লা, তাই মায়ের বরিশাইল্লা তেজের অনাগত তেজস্ক্রিয়তা সম্পর্কে সম্যক অবগত।

আমাদের কলকাতায় দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন বাটা ইন্ডিয়ার এক বাঙাল পাবলিক রিলেশনস অফিসার। বাবা তাঁকে আহার-সম্পর্কিত বিপৎসংকেতের কথা জানাতেই তিনি বললেন, কোনো চিন্তা নেই, বাংলা খবরের কাগজের জন্য যেমন আনন্দবাজার, তেমনি বাংলা খাবারের জন্য রুচিতা। ওনার কাছেই জানা গেল, এটি চালায় আমাদের মহিলা সমিতি-টাইপ রাষ্ট্রীয় এক নারীবাদী সংগঠন। সংগঠনের নারীরাই ম্যানেজার, ওয়েটার, কুক ও সংগঠক।

রুচিতায় গিয়ে সবাই মিলে বড় একটি টেবিলে বসার পর স্লিভলেস ব্লাউজ পরা স্কুলের প্রিন্সিপাল-টাইপ চেহারার এক নারী এসে অনেকটা ছড়ি ঘোরানোর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কী কী খাবার অর্ডার দেব, এ নিয়ে আমাদের একটা সাজেশন দিতে লাগলেন। একটা পদ অর্ডারের জন্য উনি বারবার খুব জোর দিয়ে বলছিলেন, আর সেটা হচ্ছে এঁচোড়ের তরকারি।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরা এমনিতেই কারণে-অকারণে প্রতি শব্দে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করে। ভদ্রমহিলা এঁচোড় বলতে গিয়ে মনে হয় একই শব্দে তিনটি চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করলেন। ওনার ওই অতিরিক্ত চন্দ্রবিন্দু ব্যবহারের কারণে আমরা সবাই হেসে ফেললাম। হেসে দিয়েই বুঝতে পারলাম, অভদ্রতা হয়ে গেছে। তাই পরিস্থিতিতে একটা সমতা আনতে আমরা চট করে এঁচোড়ের তরকারি অর্ডার দিয়ে ফেললাম, যদিও তখন পর্যন্ত জানি না—এঁচোড় আসলে মাছ, মাংস না অন্য কোনো কিসিমের বস্তু।

পরে খাবার সময় বুঝেছি, দিদিদের এঁচোড়ের তরকারি হচ্ছে কাঁচা কাঁঠালের সঙ্গে বুটের ডাল আর খুব অল্প মাত্রায় আমের আচারের জাদুকরি রন্ধনশৈলী—এক অভাবনীয় স্বাদের স্বর্গীয় মিশ্রণ। বুটের ডালের ঘন ঝোল আর এঁচোড়ের কোমল টুকরাগুলো একসঙ্গে যেন স্বাদের অপূর্ব মেলবন্ধন, আর তার সঙ্গে মসলার ঘ্রাণে ছড়িয়ে পড়ে শাশ্বত বাঙালি গৃহস্থবাড়ির চিরচেনা উষ্ণতার আবহ।

আমার নিজের হাতে লাগানো কয়েক ডজন কাঁঠালগাছ আছে। তরকারি খাওয়ার জন্য প্রতিবছর সেসব গাছ থেকে দেখে দেখে কাঁচা কাঁঠাল কেটে রাখি। যারা জন্ম থেকে নিরামিষভোজী, তাদের জন্য মাংসের সবচেয়ে নিকটবর্তী স্বাদের তরকারি হচ্ছে—আমার মতে—এই কাঁচা কাঁঠালের তরকারি।

আব্বাসের চুইঝাল খাসি

আব্বাস হোটেলের চুইঝালে খাসির মাংস, চুকনগর, খুলনা

সিডরকবলিত মানুষদের সুপেয় পানির ব্যবস্থা করে দিতে ২০০৯ সালে আমরা একটা বড় দল নিয়ে যাচ্ছিলাম কয়রা। পিরোজপুর-বাগেরহাট-খুলনা হয়ে সুন্দরবনের কোলঘেঁষা কয়রা যাওয়ার পথেই পড়ে চুকনগর। এই চুকনগরেই রাতে বিখ্যাত আব্বাসের দোকানের চুইঝাল দিয়ে রান্না করা গরম-গরম খাসির মাংস আর ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত খেয়েছিলাম। এমন অদ্ভুত সুন্দর ও বিচিত্র স্বাদের খাসির মাংস জীবনে খুব কম খেয়েছি।

সত্যি কথা বলতে গেলে চুই নামক বস্তু সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞানই আগে ছিল না। এখন চুইঝালের মাংস অনেক জায়গায়ই পাওয়া যায়। তবে চুকনগরের আব্বাসের দোকানের চুইঝালের খাসির মাংস অনেকটা লিজেন্ডারি আইটেম।

মায়ের হাতের মুরগির কালা ভুনা

অতিরিক্ত কালিজিরাবাটা আর নারকেলবাটা মিশিয়ে মুরগির মাংসের অসাধারণ একটা কালা ভুনা রান্না করতেন আমার মা। পিরোজপুর, কাউখালী, নাজিরপুর, মোরেলগঞ্জ বা বাগেরহাট অঞ্চলের অনেক জায়গাতেই এটা প্রচণ্ড জনপ্রিয়। এ খাবারে মুরগির মাংসের চেয়ে মনে হয় এর ঘন কালো মসলা দিয়ে ভাত মাখিয়ে খেতে বেশি ভালো লাগত। তখন তো হাই প্রেশার, উচ্চ ক্যালরি বা ডায়াবেটিসের আশঙ্কা—এসব ভাবনার অস্তিত্ব ছিল না আমাদের মনোজগতে। তাই ইচ্ছেমতো শুধু গরম ভাতের সঙ্গে কালিজিরা মুরগির মসলা দিয়েই প্লেটের পর প্লেট মেরে দিতাম।

মা আজ নেই, যে ভদ্রমহিলা দীর্ঘদিন আমাদের রান্নার কাজ করতেন, তিনিও নেই। খালাদের সবাই গত। শুধু ছোট খালা আছেন। তাঁর কাছ থেকেই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়ার আগেই এ রেসিপি লিখিয়ে নিয়েছি। নিচে সেটাই সরাসরি শেয়ার করলাম:

নিজের ঘরে পালা দেশি বড় রাওয়া মোরগ: ২টি

পেঁয়াজবাটা: ৩ টেবিল চামচ

রসুনবাটা: ২ টেবিল চামচ

আদাবাটা: ১ টেবিল চামচ

হলুদগুঁড়া: ১ টেবিল চামচ

মরিচগুঁড়া: ২ টেবিল চামচ

জিরাবাটা: ১ চা-চামচ

দারুচিনি: ২-৩ টুকরা

এলাচি: ৩-৪টি

লবণ: পরিমাণমতো

রান্নার তেল: ৪ টেবিল চামচ

নারকেল: ১টি (দুধ করে নেবে)

পেঁয়াজকুচি: ৪টি

রসুনকুচি: ২ কোয়া

কালিজিরা: ২ চা-চামচ

সাধারণ জিরা: ১ চা-চামচ

শুকনা মরিচ: ৪-৫টি

তেজপাতা: ২-৩টি

প্রথমে পেঁয়াজ-রসুনকুচি ও শুকনা মরিচ তেলে ভেজে নিতে হবে। ওই তেলে জিরা, কালিজিরা, দারুচিনি ও এলাচি দিয়ে হালকা ভেজে তুলে সব ভাজা মসলা একসঙ্গে বেটে নেবে। মুরগি টুকরা করে ধুয়ে সব বাটা মসলা দিয়ে মাখিয়ে অন্তত আধা ঘণ্টা ম্যারিনেট করলে ভালো। তবে সঙ্গে সঙ্গেও বসানো যায়। এভাবে মাংসটা কষাতে হবে। তারপর পানির বদলে নারকেলের দুধ দিয়ে একটু ফুটিয়ে স্পেশাল মসলাটা দিয়ে ভালো করে মেশাতে হবে।

কলাবাগানের তেঁতুলতলার সন্দেশ

মা-বাবার প্রথম সন্তানের ওপর এমনিতেই অনেক রকম এক্সপেরিমেন্ট চলে। আর বিশাল যৌথ পরিবারের সর্বপ্রথম সন্তান হওয়ার কারণে বোধ হয় আমার ওপর সেই এক্সপেরিমেন্টের মাত্রাটা ছিল আরও বেশি। সেই এক্সপেরিমেন্টেরই একটি নমুনা হিসেবে ক্লাস টুতে আমাকে কেন জানি লেক সার্কাস গার্লস স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। আজও জানি, না কী কারণে ওই বালিকা বিদ্যালয়ে কিছু বালক ভর্তি করা হতো। হয়তো এদের সবাই আমার মতোই এক্সপেরিমেন্টের স্পেসিমেন ছিল।

লেক সার্কাস স্কুলের যখন টিফিন টাইম হতো, তখন মাঠের একদম পুব মাথায়, দুলাল ভাইদের ঘরের পেছনে ছোট মুদিদোকান থেকে দারুণ সুস্বাদু পাতলা শুকনা সন্দেশ কিনে খেতাম। তিন পয়সা দিলে দোকানদার চাচা খুব নির্মোহভাবে কাচের ঘোলা বয়ামের ভেতর সুন্দর করে সাজানো হালকা ক্রিম রঙের সন্দেশের ভেতর থেকে একটি গোলাকার সন্দেশ তুলে আমাদের হাতে দিতেন।

স্কুলের টিফিন টাইম বাদেও আমাদের বাসায় যখন গ্রাম থেকে গুরুজন-আত্মীয়রা বেড়াতে আসত, তখনো তাদের পটিয়ে পয়সা নিয়ে এ দোকান থেকে নিয়মিত সন্দেশ কিনে খেতাম। আজও চোখ বন্ধ করলে সেই সন্দেশের স্বাদ টের পাই।

মাদ্রিদে কাচকি ভুনা

কাঁচকি মাছের ভুনা, মাদ্রিদ, স্পেন

মাদ্রিদের লাভা পিএস বাংলাদেশি-অধ্যুষিত বিশাল এলাকা। সেখানে অসংখ্য বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট। সেই জায়গায় ‘দেশ রেস্তোরাঁ’ নামের বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে প্রচুর পেঁয়াজ ও রসুন দিয়ে রান্না করা যে অপূর্ব সুন্দর কাচকি মাছের ভুনা খেয়েছিলাম, জীবনে এত সুন্দর কাচকি মাছের রান্না আর কোথাও খাইনি। দেশের এত জায়গা থাকতে ইউরোপে রান্না করা কাচকি মাছের প্রশংসা শুনতে কিছুটা অবাক লাগলেও ঘটনা কিন্তু সত্যি।

আসলেই এমন দারুণ স্বাদের কাচকি ভুনা আর কোথাও খেয়েছি বলে মনে করতে পারি না। বিদেশ-বিভুঁইয়ে অনেকটা মসলাবিহীন ইউরোপীয় সেদ্ধ খাবার খেতে খেতে ক্লান্ত অবস্থায় মসলাযুক্ত দেশি খাবারের স্বাদের জন্য আমার মস্তিষ্ক হয়তো একদমই প্রস্তুত ছিল না। তাই হঠাৎ এ খাবার জিবের টেস্টবাডে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমার মস্তিষ্কের মধ্যে একটা তোলপাড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। তাই ওই কাচকি ভুনাকে আমার কাছে হয়তো অতিরিক্ত সুস্বাদু মনে হয়েছে।

হাইওয়ে ইনের ভুনা খিচুড়ি

হাড়–ছাড়ানো মুরগির ভুনা খিচুড়ি, হাইওয়ে ইন, চৌদ্দগ্রাম

সড়কপথে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় মহাসড়কের পাশে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের কাছাকাছি হাইওয়ে ইনের দোতলার অভূতপূর্ব স্বাদ ও ঘ্রাণের কিছুটা মোটা চালে রান্না করা ভুনা খিচুড়ির সঙ্গে গরুর মাংস অথবা বোনলেস চিকেন ভুনা পরিবেশন করা হয়। এটিকেও আমি আমার তালিকায় রাখতে চাই।

আমার মতে, ওখানকার খিচুড়ি হচ্ছে এ গ্রহের সবচেয়ে সুস্বাদু খিচুড়ি। এতক্ষণ স্মৃতি হাতড়ে যেসব খাবারের কথা উল্লেখ করেছি, সেগুলোর মধ্যে একমাত্র হাইওয়ে ইনের এ খাবারই এখনো যেকোনো সময় ইচ্ছা করলে চেখে দেখার সুযোগ আছে।

গড়ের মাঠের পাওভাজি

বিহারি স্টলের পাওভাজির মসলা, গড়ের মাঠ, কলকাতা, ভারত

কলকাতার যখনই যেতাম, তখনই পাওভাজি খেতাম। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মেইন গেটের উল্টো দিকে মাঠের ধারে বিকেলের আলো যখন নরম হতে শুরু করে, তখনই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে বিশেষ এক ঘ্রাণ। মাখন, টমেটো, রসুন আর নানা জাতের মসলার মিশ্রণে ভেসে আসে বিহারি স্টলগুলোর পাওভাজির সুবাস। এসব বিহারি প্রধানত বিহারের ছপড়া বা মোজাফফরপুর অঞ্চলের নিম্নবর্গের মানুষ।

আড়াই থেকে তিন ফুট ব্যাসের গোল তাওয়ার ওপরে প্রথমে ঢেলে দেওয়া হয় আমুল ব্র্যান্ডের এক চামচ মাখন। তারপরে কুচি করা পেঁয়াজ, রসুন, আদা আর প্রচুর টমেটো একসঙ্গে ভাজা হয়, যতক্ষণ না ঘ্রাণে চারপাশ ভরে ওঠে। তারপর যোগ করা হয় সেদ্ধ আলু, ফুলকপি, মটরশুঁটি, সামান্য কিছু ক্যাপসিকাম আর অল্প গাজর। সব একসঙ্গে ওই বিশাল পুরু লোহার তাওয়ায় মিশিয়ে বড় আকারের একটা খুন্তি দিয়ে জোরে জোরে কেটে কেটে বাড়ি দেওয়া হয়। পাওভাজিওয়ালার হাতের তালু ও তাওয়ার আওয়াজে তৈরি হয় এক বিশেষ ছন্দ। খোলা মাঠে অনেক দূর থেকে শুনলেও বোঝা যায় পাওভাজি তৈরি হচ্ছে।

এরপর দেওয়া হয় মসলা। একটু ধনেগুঁড়া, সামান্য গরমমসলা, লাল মরিচ আর এক চিমটি অতি গোপন ‘বিহারি মিক্স’। প্রত্যেক ভাজিওয়ালার এই নিজস্ব গোপন মসলা নাকি আলাদা আলাদা। কেউ কেউ নাকি স্বপ্নে এ মসলার রেসিপি পেয়েছেন, কেউ পেয়েছেন তাঁর নানি-দাদির কাছ থেকে! এই মসলাতেই লুকানো রয়েছে আসল স্বাদের অমীমাংসিত রহস্য। সবকিছুর ওপর আবার দেওয়া হয় বেশ কিছুটা মাখন, যাতে ঝোলটা ঘন আর চকচকে হয়। সেই মাখন গলে গেলে ভাজি সরিয়ে বিশাল তাওয়ার পাশে রাখা হয়, আর পাউগুলোতে (অনেকটা বনরুটি-টাইপ) মাখন মেখে দুই পাশ হালকা খাস্তা খাস্তা করে ভাজা হয়।

পাউরুটি ও ভাজি, গড়ের মাঠ, কলকাতা, ভারত

এরপর ওয়ানটাইম কাগজের মণ্ডের প্লেটে ওই বনরুটি বা পাউ আর তাওয়ার পাশে রেখে দেওয়া গরম ভাজি একত্রে পরিবেশন করা হয়। মাখনভাজি, গরম পাউ আর মিশ্রিত ভাজির এক কামড় মুখে দিলে মনে হবে চারদিকের সব কোলাহল থেমে গেছে। বনরুটির ভেতর টমেটো ও মাখনের মোলায়েম ঘ্রাণ আর ভাজা মটরশুঁটির অপূর্ব স্বাদে মুখের টেস্টবাডগুলো সব একত্রে লাফিয়ে উঠবে। পাশে দেওয়া হয় কুচি করা পেঁয়াজ, ধনেপাতা আর লেবুর ফালি, যা পুরো স্বাদকে আরও জাগিয়ে তোলে।

ব্রিটিশরা তাজমহলকে হারানোর জন্য ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বানিয়েছিল, কিন্তু তারা তাজমহলকে হারাতে পারেনি। আমি তো বলব, ইংরেজদের নানান পদের এলিট ইংলিশ খাবার ওই বিহারি পাওভাজিওয়ালাদের কাছেও পরাজিত হয়েছে।

তাজা রুপচাঁদার তরকারি

রুপচাঁদা মাছের তরকারি, উখিয়া, কক্সবাজার

রুপচাঁদা মাছ সারা জীবন খেয়েছি কড়কড়া ভাজা বা ভুনা করে, কিন্তু জীবনে প্রথম কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের শফির বিল গ্রামের জমির ব্রোকার আজিজ মিয়ার বাড়িতে নিজস্ব জমির সারবিহীন চাষ করা মোটা চালের ধোঁয়া ওঠা ভাতের সঙ্গে খেয়েছিলাম ঝোলসহ রান্না করা বিরাট সাইজের ফালি ফালি করে কাটা একদম তাজা রুপচাঁদা মাছের খুব ঝাল তরকারি। সাগর থেকে মাত্র ধরে আনা রুপচাঁদা। আমরা বরফ দেওয়া যে রুপচাঁদা খাই, তার সঙ্গে এর স্বাদের তফাত আকাশ-পাতাল। কেউ সুযোগ পেলে আমার এ কথা পরীক্ষা করে দেখবেন।

একসময় কক্সবাজারে পাঁচ তারকা হোটেলসহ বহু প্রজেক্টের ডিজাইনের কাজে অজস্রবার আমাকে কক্সবাজার যেতে হয়েছে। বহুবার আজিজ মিয়ার সঙ্গে কক্সবাজারে দেখাও হয়েছে। আমি মনে মনে অপেক্ষা করেছি, সে হয়তো আবার দাওয়াত দেবে। আর আমি আরেকবার অন্তত সেই ফ্রেশ রুপচাঁদা মাছের অমৃত স্বাদ চেখে দেখার সুযোগ পাব। কিন্তু না, ব্যাটা অনেক চালাক। চালাক না হলে কি জমির দালালি করা যায়! দাওয়াত না দিয়ে সে আমাকে খেতে নিয়ে যেত ১৬ পদের ভর্তা সার্ভ করা পৌষী রেস্টুরেন্টে বা কক্সবাজার থানার ঠিক বিপরীতে অবস্থিত আল-গনি রেস্টুরেন্টে।

স্বীকার করতেই হবে, এ দুটো রেস্টুরেন্টের খাবারের স্বাদও অসামান্য; বিশেষ করে পৌষীর ভর্তার প্ল্যাটার আর আল-গনির লইট্টা ফ্রাই আর বাটিভর্তি ফ্রি বরইয়ের আচার। তবে সবকিছুর ওপরে আজিজ মিয়ার বাড়ির মোটা চালের ভাতের সঙ্গে সদ্য সাগর থেকে ধরে আনা রুপচাঁদার ঝাল পদ।

তন্দুরি রুটি, আলু-গোবি-মটর-টমাটরের তরকারি, নামকিন লস্যি

তন্দুর রুটি, গড়মুক্তেশ্বর, গাজিয়াবাদ, ভারত

বহু বছর আগের কথা। দিল্লি গিয়েছি একটি বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল ও ফার্নিচার এক্সিবিশনে। ভেবেছিলাম, বিরাট এক্সিবিশন, পুরোটা দেখতে বেশ কয়েক দিন লেগে যাবে, কিন্তু দুই দিনের মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল। ফেরার শিডিউল আর বিমানের রিটার্ন টিকিট অনুযায়ী হাতে তখনো কয়েক দিন বাকি। ঠিক করলাম আগামী দুই দিন হরিদ্বার-ঋষিকেশ ঘুরে আসব।

তখন শীতকাল। শীতে কাঁপছে উত্তর ভারত। তারপরও সাহস করে গেস্টহাউসের রিসেপশনে বসা লোকটিকে আবার পরিকল্পনা গুছিয়ে বলতেই উনি বললেন, পহলে নৈনিতাল যাও, উয়াঁহাঁসে হরিদুয়ার, ঋষিকেশ, লছমনঝুলা ঘুম কর আও।

রিসেপশনের এক কোনায় একটা পুরোনো চেয়ারে ঝিমুতে ঝিমুতে কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছিল মাঝবয়সী এক লোক। পরনে অতি মলিন কাপড়চোপড়। তাকে দেখিয়ে বললেন, উয়ো গুল্লু যাদব কো হি লিজিয়ে। বহুত আচ্ছা অউর ওয়াফাদার আদমি হ্যায়। অউর গাড়ি চালানে ওয়াক্ত কভি নিন্দ নহি জায়েগা।

দিল্লি থেকে নৈনিতাল প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার, নৈনিতাল থেকে হরিদ্বার প্রায় ২৫০ কিলোমিটার আর হরিদ্বার থেকে দিল্লিতে ফেরত আসা প্রায় ২২০ কিলোমিটার—সর্বমোট প্রায় ৮২০ কিলোমিটার; আর দুই রাতের জন্য ১০০ রুপি। তার মানে দুই দিনের এয়ারকন্ডিশনড অ্যাম্বাসেডর ট্যাক্সিতে পরিপূর্ণ যাতায়াত খরচ ২ হাজার ৯৭০ রুপি। এত কম খরচে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ, চিন্তাই করা যায় না!

পরদিন খুব ভোরবেলা যাত্রা শুরু হলো। গুল্লু যাদবের বকরবকর শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। ঘুম থেকে উঠতেই অনুভব করলাম খুব ক্ষুধা লেগেছে। গুল্লুকে বললাম, বহোত ভুখ লাগা হ্যায়।

উত্তরে ও বলল, সামনেই গাজিয়াবাদ জেলার গড়মুক্তেশ্বর শহর। তার আগেই কিছু পাঞ্জাবি ধাবা আছে, সেখানে গাড়ি থামিয়ে আমরা খেয়ে নেব।

কিছু পরেই রাস্তার পাশে একটা ধাবায় গাড়ি থামাল। সারি সারি ট্রাক পার্ক করা। বেশির ভাগই শিখ ড্রাইভার। চারপাশে দড়ির অজস্র খাটিয়া। সবাই সেখানে রোদ পোহাচ্ছে, কেউ ঘুমাচ্ছে আর কেউ কেউ খাবার খাচ্ছে। কারও মধ্যে কোনো তাড়াহুড়া নেই।

গুল্লু যাদব বলল, এটা একটা ‘শাকাহারি ধাবা’। অর্থাৎ এখানে শুধু ভেজ আইটেম পাওয়া যাবে।

ময়লা পাগড়ি আর তার চেয়েও ময়লা কম্বল দিয়ে বানানো মোটা একটা ওভারকোট পরিহিত এক বৃদ্ধ এসে জিজ্ঞেস করল, কী খেতে চাই?

গত কয়েক দিনে আমার অশুদ্ধ জংলি হিন্দিতে কাজ হচ্ছে দেখে আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে। জিজ্ঞেস করলাম, খানে কা কেয়া কেয়া হ্যায় তুমারে পাস।

বৃদ্ধ নির্বিকার মুখে গড়গড় করে এক নিশ্বাসে বলে গেল, তন্দুরি রোটি, ফুলকা চাপাটি, মাখনি রোটি, বাটার নান, গার্লিক নান, লাচ্ছা নান, পনির নান, মক্কি কি রোটি, জোয়ার রোটি, বাজরা রোটি, আলু পারাঠা, পনির পারাঠা, গোবি পারাঠা, মেথি পারাঠা। আর সবশেষে বলল, আজওয়াইন পারাঠা।

আলু-গোবি-মটর-টমাটরের তরকারি, গড়মুক্তেশ্বর, গাজিয়াবাদ, ভারত

এত বড় রুটি-পরোটার লিস্ট হজম করাই আমার জন্য কঠিন ছিল। তার মধ্যে আবার আজওয়াইন পরোটা শুনে রীতিমতো আঁতকে উঠলাম। গুল্লু যাদবের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আজরাইল পরোটা আবার কী বস্তু?

গুল্লু হেসে দিয়ে বলল, আজরাইল পারাঠা নেহি। হজম-সহায়ক আজওয়াইন বীজ থেকে তৈরি কিছুটা তেতো আজওয়াইন পরোটা।

এরপর শুরু হলো তরকারির লিস্ট। এবারও ব্যাটা যন্ত্রের মতো গড়গড় করে মুখস্থ বলে গেল তরকারির নাম—ডাল মাখানি, ছোলে মসালা, রাজমা মসালা, পনির বাটার মসালা, কড়াই পনির, মটর পনির, আলু–গোবি, আলু–টমাটর, ব্যায়গনভর্তা, ভিন্ডি মসালা, মিক্স ভেজ, পালক পনির, জিরা আলু, মালাই কোফতা, নওরতন কোর্মা, গট্টে কি সবজি, তড়কা ডাল, আলু মটর, পনির ভুরজি, চানা ডাল তড়কা।

আবার আমি অসহায় চোখে গুল্লু যাদবের দিকে তাকালাম। গুল্লু গ্র্যাজুয়েট, যথেষ্ট বুদ্ধিমান। যেভাবেই হোক, ততক্ষণে আমাকে সে মেপে ফেলেছে। ও আমাকে বলল, অর্ডার আমি দিচ্ছি, তুমি আমার ওপর ‘ইয়াকিন’ রাখো।

এরপর খুব দ্রুত এল এক গ্লাস নামকিন লস্যি।

গুল্লু বলল, এটা খাও। এটা হচ্ছে সাক্ষাৎ অমৃত। এটা খেলে তোমার শারীরিক ক্লান্তি পুরোটা কেটে যাবে। এখানে টক দইয়ের সঙ্গে ভাজা জিরাগুঁড়া, কালো লবণ, সামান্য কাঁচা মরিচ ও পুদিনাপাতা মেশানো হয়েছে। এই জিনিস তুমি আর কোথাও পাবে না।

এক চুমুক দিয়েই টের পেলাম, আসলেই অমৃত।

এরপর গরম-গরম পোড়া পোড়া লাল রুটি এল, আর এল ঝাল ঝাল লাল রঙের নানা রকম সবজির একটি তরকারি। ব্যস, এই দুটিই আইটেম। একের পর এক গরম-গরম রুটি আসছে, আর আমি গোগ্রাসে সে রুটি ওই তরকারি দিয়ে খাচ্ছি। গুল্লুও খাচ্ছে। তবে সে খাচ্ছে অনেক ধীরে ধীরে, মোলায়েমভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে। আর আমি খাচ্ছি গোগ্রাসে।

খাওয়া শেষ করে একপর্যায়ে আমাদের গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। ততক্ষণে পরিপূর্ণ ক্ষুধা নিবারণ হয়েছে। গভীর পরিতৃপ্তিতে আমার মন ও দেহ শান্ত। গুল্লুকে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা আজ যা খেলাম, তার নাম কী। ভবিষ্যতে আবার যদি খেতে চাই, তাহলে কী বলে অর্ডার দেব।

খুব বিজ্ঞের মতো গুল্লু আবার জ্ঞান দেওয়ার সুযোগ পেয়ে মহা আহ্লাদিত মেজাজে শুরু করল তার লেকচার, আমরা খেয়েছি তন্দুরি রোটি। তোমরা শহরের মানুষ। নান রোটি চেনো। তন্দুরি রোটি চেনো কি না জানি না। নান রোটি ময়দা, দই, দুধ, সোডা, ঘি দিয়ে তৈরি হয়। তাই এটি তুলতুলে, সাদা ও নরম হয়। অন্যদিকে তন্দুরি রুটি সাধারণত গমের লাল আটা দিয়ে বানানো হয়। এতে তেল বা ঘি বা দই থাকে না, তাই এটি শুকনা ও শক্ত হয়। আর তরকারি হিসেবে খেয়েছি আলু-গোবি-মটর-টমাটরের তরকারি। অর্থাৎ আলু, ফ্রেশ ফুলকপি, ফ্রেশ মটরশুঁটি আর ফ্রেশ টমেটো মসলার সঙ্গে মিশিয়ে এটি রান্না করা হয়েছে।

আমি বললাম, এ রকম মিক্সড ভেজিটেবল তো আমরাও খাই, কিন্তু এমন দারুণ স্বাদের তো হয় না কখনো আমাদের তরকারি।

গুল্লু বলল, পাঞ্জাবি ধাবার আলু-গোবির মূল স্বাদ আসলে গরমমসলা, জিরা, ধনেগুঁড়া, আদা-রসুন পেস্ট এবং হালকা লবণের সংমিশ্রণ থেকে আসে। আর একটা অতিরিক্ত জিনিস ওরা দেয়, যেটা তোমরা দাও না। সেটা হলো হিং।

কী জানি, রান্নার গুরুতাত্ত্বিক রসায়ন তো আমি বুঝি না। তবে গুল্লুর সাজেস্ট করা পাঞ্জাবি ধাবার আলু-গোবি-মটর-টমাটরের তরকারি আর গরম-গরম তন্দুরি রোটির স্বাদ আমি জীবনেও ভুলব না। এত সামান্য খাবার যে এত অদ্ভুত রকমের টেস্টি হতে পারে, আমি জীবনেও ভাবতে পারিনি।

কলাপাতায় পাঁচমিশালি মাছের সঙ্গে কচুর লতি

কলাপাতায় কচুর লতির সঙ্গে পাঁচমিশালি মাছ, বরিশাল

আমাদের বরিশাল-পিরোজপুর-বরগুনা অঞ্চলে খাল, বিল বা নদীতে অনায়াসে যে পুঁটি, ট্যাংরা, মলা, ভেদা, ছোট শোল, টাকি, বাইলা, নানান পদের কাঁঠালি, গোদা বা দোনা চিংড়ি ইত্যাদি পাঁচমিশালি মাছ পাওয়া যায়, তার সঙ্গে সরু কচুর লতি মিশিয়ে কলাপাতায় একধরনের বিশেষ পদ রান্না করা হয়। বরিশাল অঞ্চলের কথ্য ভাষায় একে বলে ‘পাতায় দেওয়া মাছ’।

পাঁচমিশালি মাছগুলো ভালো করে ধুয়ে লবণ ও হলুদ দিয়ে হালকা মাখিয়ে রেখে দিতে হয়। কচুর লতি ধুয়ে ছোট টুকরা করা হয় যেন মসলায় মিশে যায়। এরপর পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, আদাবাটা, শুকনা মরিচ ভাঙা, লবণ, কাঁচা মরিচ চেরা মিশিয়ে তারপর তিনটি বিশেষ জিনিস এর সঙ্গে যুক্ত করে ভালো করে মেশানো হয়। এ তিনটি উপাদান হচ্ছে—পর্যাপ্ত কোরানো নারকেল, শর্ষেবাটা ও খাঁটি শর্ষের তেল। এ মেশানোর কাজটি করতে হয় খুব আলতো হাতে। জোরে নাড়লে ছোট মাছগুলো ভেঙে যায়।

এ পর্যায়ে কলাপাতার দুই দিক চুলার আগুনে হালকা ছুঁইয়ে নরম করে নিতে হয় যেন ফেটে না যায়। এরপর মিশ্রণটি পাতার মাঝখানে রেখে ওপরে আরও কলাপাতা রেখে পুরোটা পাতায় মুড়িয়ে লাকড়ির চুলায় খুব ধীরে ধীরে তাপ দেওয়া হয়।

রান্না শেষে যখন কলাপাতা খোলা হয়, ভেসে আসে ধোঁয়াটে শর্ষে-নারকেলের মিশ্রিত ঘ্রাণ, যার সঙ্গে মিশে থাকে নদীর মাছের গন্ধ। পুরো জিনিস অনেকটা নরম পোড়া কেকের মতো হয়ে যায়। তখন সেটা ভেঙে ভেঙে পরিবেশন করা হয়।

প্রথম কামড়েই বোঝা যায় শর্ষে আর নারকেলের মোলায়েম স্বাদ, যা মাছের রসের সঙ্গে মিশে এক গভীর ঝাঁজালো-ঝাল-মিষ্টি স্বাদ তৈরি করে। আর এরই মধ্যে কচুর লতির খুব নরম একটা টেক্সচার জানান দেয় অন্য স্বাদের উপস্থিতি।

কলাপাতার ধোঁয়া মাছের গন্ধকে মৃদু করে। এনে দেয় একধরনের ধুনো দেওয়া ঘ্রাণ। গ্রামীণ মসলার ঘ্রাণ আর কলাপাতার ধোঁয়াটে সুবাস মিলেমিশে তৈরি হয় স্বর্গীয় এক স্বাদ। বিশেষ করে বেলে মাছ আর চিংড়ি পাতায় দেওয়া পদ্ধতিতে অনন্য এক ভিন্নমাত্রার স্বাদে রূপান্তরিত হয়। না খেলে যা বোঝানো যাবে না।

এ খাবারের সমস্যা হচ্ছে, এটি খাওয়ার সময় অজান্তেই প্রচুর ভাত খাওয়া হয়ে যায়। আর এ খাবার সামনে থাকলে অন্য যত সুস্বাদু খাবারই আয়োজনে থাকুক না কেন, সেগুলো আর চেখে দেখা হয় না, তার আগেই পেট ভরে যায়।

বাবার সঙ্গে ফিশ হেড কারি

ফিশ হেড কারি, সিঙ্গাপুর

বহু বছর আগের কথা। আব্বা আর আমি গিয়েছি সিঙ্গাপুর। আমার বাবা স্বল্পাহারী। হাতের কাছে যা পাবেন, তা-ই খাবেন না। খাবার সিলেকশনে তাঁর প্রধান শর্তই হচ্ছে, শরীরের জন্য সেটা নিরাপদ কি না। আমার এহেন বাবা অরচার্ড রোডে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বললেন, চল, ঝাল কিছু দিয়ে ভাত খাই।

ঝাল এখানে কই পাই? তা-ও আবার ভাত দিয়ে ঝাল তরকারি। সামনেই বিখ্যাত বা কুখ্যাত লাকি প্লাজা। পুরো সিঙ্গাপুরে এখানেই নাকি নকল ইলেকট্রনিকস ব্র্যান্ড বিক্রি হয়। ঢুকে গেলাম লাকি প্লাজার বেজমেন্টের ফুডকোর্টে। সেখানে ডিসপ্লেতে অনেক পদের খাবার সাজানো, ঝাল আর হালাল অপশনও আছে অনেক, কিন্তু আব্বার এগুলো নিরাপদ মনে হলো না।

ঘুরতে ঘুরতে দোতলায় গিয়ে দেখি বেশ পরিচ্ছন্ন একটা ইন্দোনেশীয় রেস্টুরেন্ট। সামনের এক্স ব্যানারে অতিরিক্ত লাল ঝাল ঝোলের বাটির মধ্যে বড় একটি মাছ অর্ধেক মাথা উঁচু করে আমাদের দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে। নিচে লেখা, হট অ্যান্ড স্পাইসি অরিজিনাল পাদাং ফিশ হেড কারি অব ওয়েস্ট সুমাত্রা।

আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আব্বা সোজা ওই রেস্টুরেন্টে ঢুকে গেলেন। অর্থাৎ রেস্টুরেন্টটি তাঁর পছন্দ হয়েছে।

এ খাবারের নায়ক হচ্ছে বড় একটা মাছের শুধু মাথাটা। ঝাল ফিশ হেড কারি শুধু একটি খাবার নয়, এ যেন ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জের রৌদ্রতপ্ত লবণাক্ত বাতাসে ভেসে আসা আগুনমাখা ঝাল এক অভিজ্ঞতা। এখানে মাছের মাথা কেবল একটি উপাদান নয়, বরং রান্নাটির মূল চরিত্র। এর চারপাশে ঘনীভূত হয় মরিচ, নারকেলের দুধ ও অন্যান্য মসলা। শুকনা মরিচ আর কাঁচা মরিচের আগ্রাসী ঝাল, দারুচিনি ও তেজপাতার সুগন্ধ আর নারকেলের দুধের হালকা মিষ্টতা মিলেমিশে এই কারিকে করে তোলে জিবে-লেগে-থাকা এক অভিজ্ঞতা। এখানে ব্যবহৃত টেরাসি (ফারমেন্টেড চিংড়ি পেস্ট) সেই গোপন চরিত্র, যার ঘ্রাণ প্রথমে ধাক্কা মারে, তারপর ধীরে ধীরে মুগ্ধ করে।

গরম ভাতের সঙ্গে মাছের মাথার নানা অংশের নানা রকম স্বাদ, সঙ্গে প্রচণ্ড ঝাল ঝোল। ঝালপ্রেমীদের জন্য এটি কেবল একটি রান্না নয়, বরং প্রতিটি লোকমা মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝালের ধাক্কায় মনে হয় মুখের মধ্যে জেগে উঠছে এক একটা স্বাদের আগ্নেয়গিরি। আব্বাকে দেখলাম, খুব মনোযোগ দিয়ে মাছের মাথার ভেতর থেকে নরম অংশ বের করে ধীরে ধীরে মজা করে খাচ্ছেন। পৃথিবীর মধ্যে দুধরনের মানুষের তৃপ্তিসহকারে খাওয়ার দৃশ্য দেখতে খুব ভালো লাগে—একটি হচ্ছে নিজের সন্তান, আরেকটি হচ্ছে বৃদ্ধ মা-বাবা।

ইন্দোনেশিয়ার মাছের মাথার এ খাবারের নাম গুলাই কাপালা ইকান। মূলত সুমাত্রা ও জাভার পাডাং অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার। ইন্দোনেশিয়ার উপকূলীয় মানুষ মাছের প্রতিটি অংশ ব্যবহার করে। মাছের মাথার কারি তাদের কাছে অতিথিদের জন্য পরিবেশিত সবচেয়ে সম্মানের খাবার। মাছের মাথার কারি রান্নার প্রক্রিয়াটি ধৈর্য ও বিশেষ দক্ষতার দাবি রাখে। হলুদ, আদা, লেমনগ্রাস ও লাইমপাতার মতো মসলাগুলো সঠিকভাবে প্রস্তুত করতে হয়, যাতে স্বাদটি হয় গভীর ও সুষম। স্বাদ মিষ্টি ও মোলায়েম করতে ব্যবহার করা হয় নারকেল দুধ। ধীরে কম আঁচে রান্না করলে মসলাগুলো মাছে পুরোপুরি মিশে যায়। তৈরি হয় অসাধারণ সুস্বাদু এক পদ। ভীষণ ঝাল হলেও আমার বাবার প্রিয় এ পদকেও আমি আমার দেবদূতের তালিকায় রাখতে চাই।

শিং দিয়ে শিম বিচির খাইস্যা

শিং মাছ দিয়ে শিমের বিচির খাইস্যা, লামা বাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম

১৯৮৮ সালে বুয়েট থেকে বের হয়েই কয়েকজন মিলে একটা ফার্ম বানিয়ে নিজে নিজে কাজ করা শুরু করি। প্রথম দুই বছরের মধ্যেই টুকটাক ডিজাইন আর ইন্টেরিয়র করে হাতে কিছু টাকাও এসে যায়। তখনো বিয়ে করিনি। আব্বা রিটায়ার্ড করেননি। হাতের টাকা খরচ করার কোনো জায়গা নেই। হাতে টাকা থাকলে নাকি পশ্চাদ্দেশ চুলকায়। এমনই চুলকানো পরিস্থিতিতে আমাদের ব্যাচের স্থপতি মাকসুদ সিনহা আর স্থপতি সাগরের মাধ্যমে একটা জমিদারি-টাইপ অ্যাডভেঞ্চারমূলক ইনভেস্টমেন্ট প্রপোজাল এল।

প্রপোজালটা এমন—বন বিভাগের হাতে বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে কিছু রাবারবাগান আছে। ইচ্ছা করলে সেগুলো কক্সবাজারের মালুমঘাটের ক্রিশ্চিয়ান হাসপাতালের ম্যানেজার মাকসুদের মামা আমাদের নামে বরাদ্দ করিয়ে দিতে পারবেন। এ রকম লোভনীয় প্রপোজাল আর কী হতে পারে! মাত্র ৪০ হাজার টাকায় ২৮ একর জমিদারির মালিক। সঙ্গে মহা দুর্গম অঞ্চল ভ্রমণের সম্ভাব্য চরম রোমাঞ্চ আর অভিযানের সমূহ হাতছানি।

ঠিক হলো মাকসুদ, সাগর আর আমি তিনজন তিনটা বাগান নেব। সবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েছি। ব্যবসার কিছুই বুঝি না। বোঝার কথাও নয়। আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও কেউ ব্যবসা করে না। তবে আমার সম্ভব-অসম্ভব সব প্ল্যান-প্রোগ্রামের সহজাত পার্টনার আছেন আমার এক মামা। ‘বাঘ শিকার যামু, বন্দুক লইয়া রেডি হইলাম আমি আর মামু’-টাইপ মামা। বয়সে আমার চেয়ে মাত্র ৪ বছরের বড়। ওনার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল বন্ধুর মতো। একসঙ্গে স্টেডিয়ামে বা সারা রাত জেগে টিভিতে খেলা দেখা, এদিক-সেদিক দেশে-বিদেশে ঘুরতে যাওয়া, পিরোজপুরের ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবে লিগ ফুটবল খেলা, কচিকাঁচার আসরে নানা রকম অনুষ্ঠান—সবই আমরা একত্রে করতাম। সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে ফেললাম, মামা আর আমি হব এই স্বপ্নীল রাবার প্রজেক্টের ফিফটি-ফিফটি পার্টনার। মামাকে বলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি একলাফে রাজি। ব্যবসার নামে দুর্গম অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানোর এমন সুন্দর নিয়মিত উসিলা আর কোথায় পাওয়া যাবে।

কয়েক সপ্তাহ মিটিংয়ের পর আমরা বন বিভাগ থেকে ৪০ বছরের জন্য বাগান লিজ নিয়ে ফেললাম। দেখতে দেখতে রাবার প্ল্যান্টেশনও শুরু করলাম।

সেই বাগানেরই কোনো প্রশাসনিক কাজে একবার যেতে হয়েছিল লামাবাজার। কাজ তো সব মামাই করে। আমি এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াই। শুধু যখন স্বাক্ষর বা বুড়ো আঙুলের ছাপ লাগে, আমাকে ডাকা হয়। দুপুরে খাওয়ার সময় মামা নিয়ে গেলেন বাজারের ভেতরই এক বড়সড় ছাপরা রেস্তোরাঁয়। মাছ, মুরগিসহ নানা রকম খাবার আছে, কিন্তু মামা অর্ডার দিলেন শিং মাছ দিয়ে শিমের বিচির খাইস্যা।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের টেবিলে দেখা গেল মোটা চালের ধোঁয়া ওঠা ভাত আর ঘন লাল ঝোলের মধ্যে অজস্র উজ্জ্বল সবুজ-হলুদ রঙের শিমের বিচির তরকারি। তা মাঝখানে মাঝখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে উঁকি দিচ্ছে শিং মাছের টুকরা। সঙ্গে বেগুন আর টমেটো। রান্নার গরমে শিমের বিচি গলে গিয়ে ঝোলকে আরও ঘন করেছে।

তেমন কোনো সফিস্টিকেটেড রেসিপি নয়, জটিল কোনো রান্নাও নয়, তবে স্বাদ বলতে গেলে একদম হাইয়েস্ট লেভেলের অমৃত। বেড়ার ঘরের মাটির মেঝের রেস্তোরাঁয় বসে অমৃত চাখা এক বিরল ও অনেকটা শকিং অভিজ্ঞতা। আমাকে জিজ্ঞেস না করেই দ্বিতীয় প্লেট খাইস্যার অর্ডার দিয়ে ফেললেন মামা। এখনো চোখ বন্ধ করলে স্পষ্ট দেখতে পাই দারুণ ঝাল সে খাইস্যা আমরা মামু-ভাগিনা গোগ্রাসে খাচ্ছি। আমার খুব ফরসা মামার নাকের পাশে জমে উঠছে বিন্দু বিন্দু উজ্জ্বল ঝাল ঘাম।

এখনো এটি আমার খুব প্রিয় পদ, যদিও লামাবাজারের কাছাকাছি স্বাদের খাইস্যা আর কেউ আমাকে কোনো দিন রেঁধে খাওয়াতে পারেনি এখন পর্যন্ত।

সিঙ্গেল ল্যাম্ব গ্রিলড চপ আর মালাওয়াচ রুটি

সিঙ্গেল লায়ন ল্যাম্ব গ্রিলড চপ, শা-বে-লু, গুয়াংজু, চীন

প্রফেশনাল কাজে বহুবার চীনে গিয়েছি। সঙ্গে চীনাভাষী থাকলে বুদ্ধি করে ওদের বিশাল মেনু থেকে মাছ, সি-ফুড ও সবজির পদগুলো হালাল খাবার হিসেবে অনায়াসে বেছে নেওয়া যায়। কিন্তু সঙ্গে যখন চীনাভাষী কেউ থাকে না, তখন গুয়াংজু শহর হলে চলে যাই শা-বে-লুতে। শা-বে-লু মানে উত্তরের ছোট সড়ক।

শা-বে-লু হচ্ছে আরব ও আফ্রিকান ব্যবসায়ী, ছাত্র ও পর্যটকদের জবরদস্ত ঘাঁটি। পুরো এলাকার রাস্তাজুড়ে হালাল রেস্তোরাঁ, আরব কাবাব, শর্মা, সোমালি-নাইজেরিয়ান খাবারের দোকান। সন্ধ্যার পর সিসা ক্যাফে, ছোট অ্যারাবিক চা ও কফি শপ আর নাইট স্ন্যাকের স্টলগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। এ ছাড়া চীনের পশ্চিমাঞ্চলের শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের উইঘুর মুসলিমরা এখানে ছোট ছোট রুটি ও নানা রকম শুকনা ফলের স্টল বসায় এবং রাস্তায় হকারি করে। সব মিলিয়ে শা-বে-লু হচ্ছে নানা দেশ থেকে আগত হালাল খাবারপ্রত্যাশী মুসলিমদের অনিবার্য গন্তব্য।

এই শা-বে-লুতে গেলে রাতে যে খাবার অবশ্যই খাব, সেটা হচ্ছে ইয়েমেনি রেস্তোরাঁয় অথেন্টিক সিঙ্গেল ল্যাম্ব গ্রিলড চপ। সঙ্গে প্রচুর কালিজিরা দিয়ে তন্দুরে বানানো তিনকোনা স্তরযুক্ত ভাঁজ করা সদ্য ভাজা গরম-গরম মালাওয়াচ রুটি। এসব রুটির ওপরে ছিটানো থাকে প্রচুর কালিজিরা। এটি খেতে হয় পর্যাপ্ত লাইম জুসে সিক্ত ফ্রেশ আরব সালাদের সঙ্গে।

ভাঁজ করা স্তরবিশিষ্ট মালাওয়াচ রুটি, শা-বে লু, গুয়াংজু, চীন

জটিল কোনো খাবার নয়, কিন্তু এক কথায় অসাধারণ স্বাদ। ল্যাম্ব চপে যে গুপ্ত মসলা দেয়, সেটা খুবই মাইল্ড হলেও কিছু মসলার অসাধারণ মিশ্রণ। তবে এটি খুব গরম-গরম সার্ভ করতে হবে। একটু দেরি হয়ে গেলে গরুর চামড়ার মতো শক্ত হয়ে যায় রুটি। চপের সেই টেস্টও আর থাকে না।

ক্যাফে কাশের চিংড়ি-পুঁইশাক

ক্যাফে কাশের চিংড়ি দিয়ে পুঁইশাক, বকশিবাজার, ঢাকা

বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলের সামনে বকশীবাজার রাস্তার ওপর বাঁশের বেড়া আর টিনের ছাউনি দেওয়া ভাতের হোটেলটির নাম ছিল খুবই খানদানি—ক্যাফে কাশ।

আমার রুমমেট এনামুল করিম নির্ঝর ডাকত কফ ও কাশ। কফ ও কাশের কথা মনে হতেই নাকি বমি বমি ভাব হতো নির্ঝরের মনে। তাই ওখানে ও নিজে সহজে যেত না। কিন্তু আমি যেতাম। তিতুমীর হল থেকে হেঁটে দুপুরবেলা মাঝেমধ্যেই যেতাম। যেতাম একটা বিশেষ খাবারের আকর্ষণে। যদিও বলছি ‘বিশেষ খাবার’, কিন্তু খাবারটা আসলে বিশেষ কিছু নয়। খুবই সাধারণ আর এলেবেলে। সবুজ পুঁইশাকের সঙ্গে খোসা না ছাড়িয়ে রান্না করা মাঝারি সাইজের চিংড়ি। রান্নার পরে মাছগুলো কমলা রং হয়ে সবুজ পুঁইশাকের ওপর ভেসে বেড়াত।

খাবারটা ওরা দারুণ রান্না করত। আরেকটা মজার বিষয় ছিল। দ্বিতীয়বার ফেউ চাইলে কিছু পুঁইশাকের সঙ্গে একটি বা দুটি চিংড়ি ওরা ফাউ দিত। আমাকে সব সময় দুটি ফাউ দিত। কেন দিত কে জানে?

শুধু রান্নার গুণে খুব সাধারণ খাবারও যে অনন্য স্বাদের হতে পারে এবং কয়েক দশক পার হয়েও স্মৃতিতে তার স্বাদ জাগ্রত থাকতে পারে, ক্যাফে কাশের ওই খাবার তার দারুণ উদাহরণ।

নভেল্টির ব্যানানা শেক

নভেলটির বানানা শেক, নিউমার্কেট, ঢাকা

আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন মাসিক বেতন পাওয়ার পর মধ্যবিত্ত বাঙালি পুরো মাসের মুদির বাজার এক দিনে একসঙ্গে করত—যার যার নির্দিষ্ট কিছু দোকান থেকে। আমার আব্বার ক্ষেত্রে সেই নির্দিষ্ট দোকানগুলো ছিল নিউমার্কেটের উত্তর-পশ্চিম কোণের কয়েকটি দোকান। দিনটি হতো আমাদের জন্য একধরনের পারিবারিক উৎসব। আব্বার নেতৃত্বে পরিবারের সবাই মিলে সেদিন বাজার করতে যেতাম।

বাজার শেষ হওয়ার পর পাশেই নভেল্টি নামের একটি ড্রিংক বার ও আইসক্রিম পারলারে আমাদের নিয়ে যেতেন আব্বা। নভেল্টি আইসক্রিম পারলার ছিল ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার এক অতিপরিচিত নস্টালজিয়ার নাম। ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত এটি ঢাকার তরুণসমাজ, বিশেষ করে লেখক, সাহিত্যিক, আড্ডাবাজ তরুণ ও মধ্যবয়সী বুদ্ধিজীবীদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। নিউমার্কেটে কেনাকাটার পর বন্ধুদের সঙ্গে আইসক্রিম খেতে যাওয়া ছিল অনেকের নিয়মিত অভ্যাস। নভেল্টি শুধু খাবারের দোকান ছিল না, বরং এটি ছিল এক সামাজিক মিলনকেন্দ্র। ছাত্রছাত্রী, পরিবার ও তরুণদের আড্ডায় মুখর থাকত এই স্থান। দোকানটি বন্ধ হয়ে গেলেও আজও পুরান ঢাকার নস্টালজিয়া ও স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে নভেল্টি।

নভেল্টি আইসক্রিমের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও আমি আইসক্রিম খেতাম না। আব্বার দেখাদেখি খেতাম ভ্যানিলা এসেন্সযুক্ত এক গ্লাস ব্যানানা শেক। জীবনে প্রথম ব্লেন্ডার আমি এখানেই দেখি। অবাক বিস্ময়ে দেখতাম তীব্র যান্ত্রিক শব্দ করা ব্লেন্ডারটির দুধের মধ্যে একটি বড় সাইজের কলা চোখের নিমিষে ভ্যানিশ হয়ে যায়। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটাই ম্যাজিকের মতো মনে হতো।

অল্প আলোয় কাঠের একটি মেজানাইন স্পেসের মধ্যে এমন অচেনা জগতের খাবারদাবারসহ পুরো পরিবেশটাই মনে হতো জাদুময় এক পরাবাস্তব জগৎ। জীবনে প্রথম কোনো মেজানাইন স্পেসও এই নভেল্টিতেই দেখা। কয়েকবার ব্যানানা শেক বানানো দেখতে দেখতে একটা বিষয় খেয়াল করলাম। দুধ আর কলা ছাড়া যে জিনিসটি এর স্বাদ সম্পূর্ণ বদলে দেয়, তা হলো ছোট্ট এক বোতল ভ্যানিলা এসেন্স। প্রতিটি ব্যানানা শেক বা মিল্ক শেকে দুধ আর কলার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হতো এক-দুই ফোঁটা ভ্যানিলা এসেন্স।

পরে জানতে পারি, নানা ফলের ছবি আঁকা ভ্যানিলা এসেন্সের ছোট বোতল পাশের মুদির দোকানেই পাওয়া যায়। দামও খুব বেশি নয়। মনে আছে, ঘরে বসে ব্যানানা শেক বানানোর জন্য মা এক বোতল ভ্যানিলা এসেন্স কিনে ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলেন। সামান্য এক-দুই ফোঁটা ভ্যানিলা এসেন্সে যদি খাবার এত সুস্বাদু হয়, তাহলে এক চামচ ভ্যানিলা এসেন্স খেলে কী মজাই না লাগবে—এই ভ্রান্ত ধারণা থেকেই একদিন ফ্রিজ থেকে চুরি করে সেই কাজ করেছিলাম।

যুবক-বুড়ো সবাইকে সাবধান করে দিই, ভুলেও এই কাজ করবেন না। এই জিনিস সরাসরি খেতে যে কী তীব্র পরিমাণে তেতো ও বিস্বাদ, ভাষায় তা বর্ণনা করা যাবে না।

তবে ছোটবেলায় মাসে একবার সপরিবার নভেল্টি নামের সেই পরাবাস্তব রেস্তোরাঁয় বসে ব্যানানা শেক খাওয়ার সুখময় নস্টালজিক অভিজ্ঞতা কোনো দিনই ভুলব না। আহা, কী স্বাদ! মুখগহ্বর থেকে গলা হয়ে সারা বুক ও শরীর ঠান্ডা হয়ে যেত। এক গ্লাস খেয়ে আরেক গ্লাস খেতে ইচ্ছা করত। কিন্তু তখনকার বাঙালি মধ্যবিত্তের সন্তানদের সংযমের ক্ষমতা ছিল অনেক বেশি। মা-বাবার ওপর অতিরিক্ত আবদার করে তাঁদের আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তখনো আমরা শিখিনি। তাই আরেক গ্লাসের অদম্য ইচ্ছা চেপে রাখতাম পরের মাস পর্যন্ত।

সুবরাত আলীর কাচ্চি বিরিয়ানি

সুবরাত আলির কাচ্চি

এককথায় বলতে গেলে আমাদের পরিবারের কাছে কাচ্চি বিরিয়ানি মানেই হচ্ছে সুবরাত আলী বাবুর্চির রান্না করা কাচ্চি বিরিয়ানি। আমাদের পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবারই বিয়ের রান্না করেছিলেন আব্বার প্রিয় সুবরাত আলী বাবুর্চি। ওনার ফর্মুলা অনুযায়ী বেস্ট কোয়ালিটির কাচ্চির জন্য জবাইকৃত খাসির ওজন হতে হবে ১০ থেকে ১৩ কেজি, আর সেখান থেকে প্রতি খাসিতে ৮ কেজির মতো মাংস পাওয়া যাবে। এই ৮ কেজি মাংসে মাত্র ৪ কেজি চাল দিয়ে অর্থাৎ চালের দ্বিগুণ পরিমাণ মাংস দিয়ে রান্না করতে হবে কাচ্চি। এ ওজনের খাসির মাংস নরম, সুস্বাদু এবং রান্নার সময় মসলা ও অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যেতে পারে।

ঢাকাই কাচ্চিতে কাচ্চা অর্থাৎ কাঁচা মাংস ও চাল একসঙ্গে দম (আবদ্ধ বিশাল তামার পাত্রে কম আঁচে রান্না) দিয়ে রান্না করা হয়। মাংস আগে থেকে ম্যারিনেট করা হয় এবং রান্নার সময় চালের সঙ্গে মাংসের স্বাদ মিশে যায়। নবাবের বাবুর্চিরা কাচ্চি রান্নার চুলায় সব সময় জ্বালানি হিসেবে তেঁতুল কাঠ ব্যবহার করতেন। ঢাকার নামকরা বাবুর্চিরাও, যেমন ফখরুদ্দিন বি সুবরাত আলীও সব সময় জ্বালানি হিসেবে তেঁতুল কাঠ ব্যবহার করতে চাইতেন। সেই ১৯৯২ সালে আমার বিয়ের অনুষ্ঠানে বাবা যখন সুবরাত আলী বাবুর্চিকে বিয়ের কাচ্চি রান্নার দায়িত্ব দেন, তখন বড় মামাকে দেখেছি কাওরান বাজার থেকে তেঁতুল কাঠ কিনে এনেছেন। আমার তো মনে হয় কাচ্চি বিরিয়ানির কারণেই এ দেশে তেঁতুলগাছ কমে গেছে।

ঢাকাই কাচ্চি বিরিয়ানিতে আলুর ব্যবহার একে ভিন্নতা দিয়েছে। কাচ্চিতে এই আলু কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো, তার পেছনের কাহিনি কিছুটা রহস্যময় এবং বিভিন্ন মতামতে ভরপুর। প্রধান মত হচ্ছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বা বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে খরচ বাঁচানোর জন্য মাংসের পরিমাণ কমিয়ে তার বদলে আলু দিয়ে সর্বপ্রথম কলকাতায় এটা চালু হয়। অনেকে মনে করেন, ১৮৫৬ সালে অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ ব্রিটিশদের হাতে রাজ্যহারা হয়ে কলকাতায় চলে আসেন। বাধ্য হয়ে তখন কাচ্চিতে আলু দেওয়া শুরু করেন এই গরিব নবাব। সেখান থেকে ঢাকার নবাবরাও তা শিখে ফেলেন। তবে আমি মনে করি, এতে শাপে বর হয়েছে। কেননা, বিরিয়ানির ভেতর হাড় থেকে ঝুলে থাকা অত্যন্ত নরম ধূমায়িত মাংসের ফাঁকে ফাঁকে মনিমানিক্যের মতো হঠাৎ খুঁজে পাওয়া অর্ধগলিত নরম আলুর স্বাদ অমৃতের মতো মনে হয়।

শেষ নাহি যে

আরও বেশ কিছু খাবারের পদ আছে, যেগুলোর স্বাদ আমার মনের গভীরে গেঁথে আছে, থাকবে আজীবন, যদি না ডিমেনশিয়া আক্রান্ত হয়ে সেগুলো ভুলে যাই। তবে শুনেছি ডিমেনশিয়া বা পারকিনসনস হলে মানুষ নিকট অতীতের কথা ভুলে যায়, কিন্তু সুদূর অতীতের অভিজ্ঞতার কথা ভোলে না।

লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে বলে সেগুলোর বিশদ বর্ণনায় আর যাচ্ছি না। শুধু সংক্ষেপে সেসব অমৃত স্বাদের তালিকাটি উল্লেখ করে যাচ্ছি। সময়, সুযোগ, সুস্থতা ও আয়ু থাকলে ভবিষ্যতে সেসবের পরিপূর্ণ বর্ণনা হয়তো দেওয়া যাবে।

দেবদূতের রেসিপির সাধারণ তালিকায় আমার বিবেচনায় এসব পদের নাম অবশ্যই থাকবে:

১. কোরবানির ঈদের দিনের সর্বপ্রথমবার রান্না করা গরুর মাংস। রান্না শেষ হওয়ার আগেই কষানো অবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু টুকরা (কোন কোন টুকরা, সেটা মা জানতেন) গোল গোল করে কাটা কাঁচা পেঁয়াজের সঙ্গে খাওয়া।

২. করলার সঙ্গে সামান্য আলুর কুচি দিয়ে ভাজা। পরিপূর্ণভাবে না ভেজে হালকা করে কিছুটা কাঁচা কাঁচা করে করলা ভেজে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন।

৩. মানকচু বা সাহেব কচু গোল গোল করে পুরু বিস্কুটের মতো করে কেটে অতিরিক্ত নারকেলবাটা দিয়ে রান্না করা।

৪. আব্বার সঙ্গে ছোটবেলায় গুলিস্তানের পূর্ণিমা রেস্তোরাঁর তেঁতুলের চাটনি দিয়ে চিকেন ফ্রাই বার্গার।

৫. পদ্মায় ফেরি পার হতে হতে তাজা ইলিশ ভাজা, ইলিশের তেল আর লাল পোড়া মরিচ দিয়ে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম দুই প্লেট ভাত।

৬. বেশি করে কুচি কুচি করে কাটা আদা দিয়ে আমার স্ত্রীর রান্না করা গরুর ঝাল মাংস, আর কম তেলের কড়কড়ে পরোটা।

ফাঁসিকাষ্ঠে আমার পছন্দের খাবারের তালিকা চাওয়া হলে যে এ তালিকার খাবারগুলোই থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো, পৃথিবীর যত দরদি জেলারই হোক, সে নিশ্চয়ই এতগুলো খাবার কোনো পাপী আসামির জন্য বরাদ্দ করবে না। তাই চিন্তার ব্যাপার হচ্ছে, এখান থেকে তিনটি বা চারটি খাবারের নাম বলতে হলে কোন তিনটিকে বেছে নেব? ফাঁসির মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে কী দেবদূতের এ তালিকার শর্টলিস্টিং করার মতো মানসিক অবস্থা থাকবে?

তার চেয়ে দোয়া করুন, আমাদের কাউকেই যেন এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে না হয়। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত জিবে দেবদূতের পুরো তালিকার স্বাদ অম্লান থাকুক। যাঁরা আমার এই প্রায় অপ্রয়োজনীয় লেখাটি পড়ে ফেলেছেন, তাঁদের অনুরোধ করব, আপনারাও আপনাদের তালিকাটি করে ফেলুন। দেখা যাক, আপনার সঙ্গে আমার তালিকায় কোন কোনটা মিলে যায়।

মৃত্যুবাড়িতে কাচ্চির স্বাদ

এই লেখার প্রথমেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলাম, ফাঁসিকাষ্ঠে যাওয়ার আগমুহূর্তে টেস্টবাডে খাবারের স্বাদ থাকে কি না। তবে এর কিছুটা কাছাকাছি অস্বাভাবিক মুহূর্তেও যে মানুষের টেস্টবাড কার্যকর থাকে, তার সুস্পষ্ট অভিজ্ঞতা আমার নিজেরই হয়েছে। দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ২১ মে। দুপুরের কিছু আগে আমার মা ইন্তেকাল করেছেন। পাঁচ ভাই আর এক বোনের মধ্যে আমি সবচেয়ে বড়। ভাইবোনদের মধ্যে দুজন বিদেশে থাকে। তাদের এখন ফোনে মায়ের মৃত্যুসংবাদ দিতে হবে। এর চেয়ে কঠিন কাজ একজন মানুষের জীবনে আর কী হতে পারে।

উত্তর আমেরিকায় তখন গভীর রাত। কী করে এই কঠিন সংবাদ ওদের জানাব, বুঝতে পারছিলাম না। নাতি হিসেবেও মায়ের পরিবারে আমি সবার বড়। বাবার দিক থেকেও বড় পুত্রের বড় সন্তান। তাই সব আত্মীয়স্বজনের খবর আমাকেই দিতে হবে। অন্যদিকে বাবা ডিমেনশিয়া আর পারকিনসনসে আক্রান্ত। তিনি নির্বিকার শিশুর মতো আচরণ করছেন। ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা নেই। তাকেও সামলাতে হচ্ছে।

কয়েক দশক আগে মিরপুর কবরস্থানে নানির কবরের পশ্চিম পাশে নিজের কবরের জায়গা কিনে রেখে গেছেন মা। সিটি করপোরেশনের সেসব কাগজপত্র কোথায় আছে, সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণাও আমার নেই, কিন্তু সেগুলো অনতিবিলম্বে খুঁজে বের করতে হবে। আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সন্ধ্যা নেমে আসবে। বাবাকে কবরের কাগজপত্র বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি মিটিমিটি হাসেন আর নানা রকম অপ্রাসঙ্গিক গভীর দার্শনিক উত্তর দেন। অথবা হয়তো এগুলোই মানবজীবনের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক উত্তর, আমি বুঝতে পারছিলাম না।

মায়ের গোসলের ব্যবস্থা করতে হবে। বরইপাতা কোত্থেকে আনা হবে, তা নিয়ে নানাজন নানা মতামত দিচ্ছেন। কামারপাড়া এতিমখানা থেকে একদল এতিম এনে পবিত্র কোরআন খতম দিতে হবে। হুজুর ডাকতে হবে। মসজিদে জানাজার আয়োজন করতে হবে। দুই দিন পরে সবাইকে ডেকে মিলাদের ব্যবস্থা করতে হবে। তবারকের অর্ডার দিতে হবে; আগেভাগে অর্ডার না দিলে সময়মতো এত তবারক দিতে পারবে না। সারা বাড়ি আত্মীয়স্বজনে গিজগিজ করছে। তাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এসব বিবিধ খরচের জন্য হাতে পর্যাপ্ত টাকার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

এর মধ্যে টেলিফোন আসছে অবিরাম, নানা রকম দীর্ঘ সান্ত্বনার বাক্য শুনিয়ে যাচ্ছেন সবাই। বিরাট একটা অংশের ফোন আসছে গ্রাম থেকে। গ্রামের মানুষ ফোন করলে ছাড়তে চায় না। এত শোকের মধ্যেও তাদের সুদীর্ঘ স্মৃতিচারণা আমাকে শুনে যেতে হচ্ছে। তাদের কান্নার সঙ্গে আমিও কেঁদে উঠছি। বেশির ভাগেরই মোদ্দাকথা, আমি পরিবারের সবার বড়। আমাকে সবচেয়ে বেশি ধৈর্য ধরতে হবে, সবাইকে সামলাতে হবে। আমি যেন ভেঙে না পড়ি। তাদের আর বলি না যে ভেতরে-ভেতরে আমি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছি। আক্ষরিকভাবেই মা আমাকে তাঁর কিশোরী বয়সে জন্ম দিয়েছেন। ভাবতেই পারছিলাম না, সেই মা আর নেই। মোটকথা, এসবের জন্য আমি একদমই প্রস্তুত ছিলাম না।

বিশাল ভয়াবহ দায়িত্বের এই মহাসাগরে আমি কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এতসব গুরুতর দায়িত্ব আর গভীরতম শোকের মধ্যে খুব লজ্জাজনকভাবে আমার ভয়ানক খিদে পেয়ে গেল। আমি নিজেই অবাক, এমন অস্বাভাবিক মুহূর্তে মানুষের খিদে পায় কী করে! তবে আমার অবচেতন মন বারবার আমাকে সিগনাল দিচ্ছিল, আগামী ৪৮ ঘণ্টা তোমার কোনো বিশ্রাম নেই, তোমাকে কিছু না কিছু খেতেই হবে, না হলে অসুস্থ হয়ে পড়বে।

টেবিলের ওপরে দেখি কয়েক প্যাকেট বিরিয়ানি সাজিয়ে রাখা। মৃত্যুসংবাদ শুনে বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজন দুপুরের খাবার হিসেবে নিয়ে এসেছে। কেউ লক্ষ করছে কি না, সেটা চিন্তায় না নিয়ে চট করে অনেকটা লুকিয়ে স্টারের এক প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে একটি রুমে ঢুকে পড়লাম। দরজাটা আটকে গোগ্রাসে খেতে শুরু করলাম। আজও মনে আছে, একটি বদ্ধ রুমে অস্বাভাবিক এক ঘোরের মধ্যে আমি একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে (বসে কেন নয়, নিজেও জানি না) পরাবাস্তব এক দানবের মতো বিরিয়ানি খাচ্ছি। আর আমার দুচোখ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে গড়িয়ে সেই বিরিয়ানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

সেদিন বিরিয়ানি স্বাদু লেগেছিল কি না মনে নেই। সেদিনের মতো নিজেকে এত অচেনা কখনো আমার মনে হয়নি। শুধু মনে আছে, অবচেতন মন বারবার আমাকে বলছিল, অভুক্ত থাকলে সামনের এত কাজ আমি করতে পারব না। প্যাকেটের কতটুকু বিরিয়ানি খেতে পেরেছিলাম, মনে নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে বদ্ধ দরজায় ঠোকাঠুকি শুরু হলো। বাইরে কোলাহলের শব্দ শোনা যেতে লাগল।

আমি দরজা খুলে দিই। মৃত্যুবাড়ি বদ্ধ কক্ষ পছন্দ করে না। প্রকৃতি চায়, মৃত্যুবাড়ি হবে কোলাহলমুখর।