‘চাটগাঁইয়া মেজ্জাইন্যা খানা খাইলে বুঝিবা, ন খাইলে পস্তাইবা’

চট্টগ্রাম সমিতির উদ্যেগে রাজধানীতে মেজবান ও মিলনমেলা ছিল আজ। চট্টগ্রামবাসীর পদচারণে মুখর হয়ে ছিল মোহাম্মদপুর সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজের মাঠ। ভোজের পাশাপাশি আয়োজনে ছিল গুণীজন সম্মাননা, বলীখেলা, সংগীতানুষ্ঠান। চট্টগ্রামের নিজস্ব সাংস্কৃতি মেজবান নিয়ে লিখেছেন রশীদ এনাম

চলছে মেজবান রান্না
ছবি: লেখক

‘মেজবান’ শব্দটি ফারসি। এর অর্থ আপ্যায়ক, অতিথি সৎকারক, আতিথেয়তা, মেহমানদারি বা বিশেষ ভোজ। চট্টগ্রাম অঞ্চলের জনপ্রিয় ও পরিচিত বিশেষ ভোজনের নাম মেজবান। প্রতিবেশী সমাজের লোকজন ও অতিথি আপ্যায়নকেও মেজবান বলে। মেজবান শব্দটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘মেজ্জান’ হিসেবে প্রচলিত। সহজ কথায়, মেহমানদারি বা অতিথিদের জন্য বিশেষ ভোজের ব্যবস্থা করাই হচ্ছে মেজ্জান। চট্টগ্রামে সাধারণত কোনো আচার-অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ করে মেজবানের আয়োজন করা হয়। যেমন কুলখানি, চেহলাম ও বার্ষিকী উপলক্ষে ভোজ। এ ছাড়া আকিকা, খতনা, গায়েহলুদ কিংবা নতুন কোনো ব্যবসা আরম্ভ এবং নতুন বাড়িতে প্রবেশ করলেও কেউ কেউ মেজবানের আয়োজন করে থাকেন।

মেজবানের মাংস দিয়ে আতিথেয়তার জন্য সমগ্র বাংলাদেশে চট্টগ্রামের মানুষের সুনাম আছে। অন্য জেলার লোকজন একবার যিনি মেজবান খেয়েছেন, তাঁর পক্ষে মেজবানের স্বাদ ভোলা কঠিন। অনেকে বলেন, ‘চাটগাঁইয়া মেজ্জাইন্যা খানা খাইলে বুঝিবা, ন খাইলে পস্তাইবা’। যোগাযোগ ও অন্যন্যা সুযোগ–সুবিধার কথা ভেবে বেশির ভাগ মেজবান শুকনা মৌসুমে করা হয়। বিশেষ করে নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে মেজবানের বেশি আয়োজন করা হয়। চট্টগ্রামের এই আদি সংস্কৃতি সাম্প্রতিককালে গ্রাম ছাড়িয়ে শহর এলাকাও ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে গেছে মেজবানি গোশতের সুঘ্রাণ। বিশেষ করে বিদেশে বসবাসরত চট্টগ্রামের বাসিন্দারাও আজকাল নিজ নিজ অবস্থানস্থলে মেজবানের আয়োজন করেন।

পূর্ব লন্ডনের সুপরিসর মেফেয়ার বেঙ্কুয়েটিং হলে মেজবান আয়োজন
ছবি: সংগৃহীত

সুরগা, বুটের ডাল আর ঝাল মাংস

চট্টগ্রামের মেজবানের উৎপত্তির ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে জানতে পারি, চৌধুরী, খান, মিয়া, ভুঁইয়া বংশের বিশেষ করে বনেদি পরিবারের লোকজন মেজবানের আয়োজন করতেন। তখনকার দিনে মেজবানের খাবারের তালিকায় থাকত নলা বা নেহারির ঝোল বা কাঁজি বা সুরগা, মাষকলাইয়ের ডাল, ভুনা ডাল, লাউ দিয়ে বুটের ডাল, গরু, মহিষ বা ছাগলের ঝাল মাংস। চর্বি ও হাড়–মাংস দিয়ে রান্না করা হয় বুট বা ছোলার ডাল। অনেকে আবার মাছের পদ করতেন। মেজবানি মাংস রান্না করা হয় বাহারি রকমের মসলা দিয়ে। মাংস রান্না হওয়ার সময় মসলাপাতির ঘ্রাণ পেয়ে আশপাশের লোকজন জেনে যায়, অমুক বাড়িতে মেজবানের আয়োজন চলছে।

তখনকার দিনে মেজবানি মাংস রান্না হতো পিতল বা তামার তৈরি বড় বড় পাত্রে। বালতি বা মাটির মালশা ভর্তি করে, ডাব্ব মালা (শুকনা নারকেলের মালা ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি চামচ), বিশেষ মাটির শানকি বা কলার পাতায় করে বুটের ডাল বা নলার হাজি গরুর মাংস পরিবেশন করা হতো। মেহমানেরা সারিবদ্ধভাবে বসে একসঙ্গে মেজবানে অংশ নিতেন। মেজবানে আগত অতিথিরা তৃপ্তি সহকারে খেয়ে দোয়া করতে করতে মেজবানবাড়ি ত্যাগ করতেন।

রাজধানীতে চট্টগ্রাম সমিতির মেজবানের আয়োজন
ছবি: লেখক

আগদতি সভা

সে সময়ে মেজবানের দাওয়াতে ছিল ভিন্ন রকমের আমেজ। সামাজিক সভার মাধ্যমে, শুক্রবার মসজিদ বা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিংবা মাইকে ঘোষণা দিয়ে মেজবানের দাওয়াত পৌঁছানো হতো। কালের বিবর্তনে দাওয়াত প্রক্রিয়ায়ও এসেছে পরিবর্তন। এখন দাওয়াত কার্ড, মুঠোফোনে খুদে বার্তা ইত্যাদির মাধ্যমে মেজবানের দাওয়াত দেওয়া হয়ে থাকে।

মেজবানের আগের রাতে যে বাড়িতে মেজবানের আয়োজন করা হতো, সে বাড়িতে আবার সমাজের মান্যগণ্য লোকদের নিয়ে শলাপরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়। অনেকে এটাকে আগদতি অনুষ্ঠান বা পান সলাৎ (শলাপরামর্শ সভা) বলে থাকে। পান সলাতে নাশতার পাশাপাশি পান–সুপারি পরিবেশন করা হতো। আগদতি সভায় মেজবানের প্রকৃতি, অতিথির সংখ্যা, বাবুর্চি নির্বাচন, খাবারের পদ ও পরিমাণসহ পরিবেশনের নানান দিক আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।

রাজধানীতে চট্টগ্রাম সমিতির মেজবান হলো সবচেয়ে বড় আয়োজন। এই মেজবানে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষের ভোজের আয়োজন করা হয়। মেজবানের অনুষ্ঠানস্থল চাটগাঁইয়াবাসীর মিলনমেলায় পরিণত হয়। এতে ৩০ থেকে ৩৫টি বিশাল আকারের গরু, ৪০টির বেশি খাসি এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে মাছ ও মুরগি রান্না করা হয়।

মেজবানে এখন আর শানকি, নারকেলের মালার বাটি কিংবা মাটির তৈরি অন্য কোনো পাত্রের দেখা মেলে না। চট্টগ্রামের মেজবানের মাংসের রেসিপি অনুযায়ী এখন চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা ও সিলেটে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে মেজবানের মাংস পাওয়া যায়।

রশীদ এনাম: চাটগাঁইয়া মেজ্জান বইয়ের লেখক