মা, দাদি ও নানির রান্না করা সাদামাটা কোনো খাবারও কেন জীবনে বিশেষ হয়ে ওঠে

জীবনের নিয়মে মানুষ বদলে যায়। পুরোনোকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় সামনে। নতুনের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। তবু মানুষ পুরোনো কিছু জিনিস আঁকড়ে রাখতে চায়। পরিবারের, বিশেষত মায়ের হাতের পুরোনো রান্নার ব্যাপারটাই যেমন। কিন্তু অতীতের সাদামাটা কোনো পদও কেন বিশেষ হয়ে ওঠে আমাদের জন্য, তা ভেবে দেখেছেন কি?

মজাদার খিচুড়ি খেয়েও হয়তো কেউ কেউ নিজের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া কোনো স্বাদ খুঁজে ফিরেছেন
ছবি: কবির হোসেন

কয়েক দিন ধরেই বেশ বৃষ্টি। এই কয়েক দিনে অনেকেই হয়তো খিচুড়ির স্বাদ নিয়েছেন। তবে মজাদার খিচুড়ি খেয়েও হয়তো কেউ কেউ নিজের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া কোনো স্বাদ খুঁজে ফিরেছেন।

স্বাদে দারুণ হলেও কিছু একটা যেন ‘নেই’। হয়তো মা কিংবা এমন কোনো আপনজনের হাতের ছোঁয়া না থাকায়ই বৃষ্টিবিলাসের আয়োজনটা ঠিক জমে ওঠেনি।

একই ধরনের উপকরণ দিয়ে, একই পদ্ধতি মেনে রান্না করা হলেও পরিবারের খাবারের একটা নিজস্বতা থাকে। আর তাতেই ওই খাবার হয়ে ওঠে বিশেষ কিছু।

যে স্বাদ ছোটবেলা থেকে আপনার চেনা, তাতে একটা আপন আপন ভাব থাকে। শৈশবের খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক রকম স্মৃতি। জড়িয়ে থাকে আপনজনের ভালোবাসা। থাকে তাঁর যত্নের স্পর্শ। পুরোনো স্বাদের মধ্যে তাই হারিয়ে যেতে চায় স্মৃতিকাতর মন।

আরও পড়ুন
সেদিন হয়তো আপনার শরীর ছিল ভীষণ খারাপ। বাড়ির সবার জন্য রান্নাবান্না সেরে ছোট্ট আপনার জন্য পরম যত্নে আলাদা একটা পদ তৈরি করেছিলেন আপনার মা
অলংকরণ: আরাফাত করিম

যত্ন করে দাদি, নানি বা মা খাবারটা রাঁধছেন, আপনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, এমন স্মৃতি জেগে উঠতে পারে চেনা রান্নার ঘ্রাণে। কাজের চাপে ব্যতিব্যস্ত জীবনে একটুখানি স্থিতি আসতে পারে পুরোনো স্বাদে। আসতে পারে প্রশান্তি।

হয়তো পদটা খেতে গিয়ে মনে পড়ে যায়, সেদিন আপনার শরীর ছিল ভীষণ খারাপ। বাড়ির সবার জন্য রান্নাবান্না সেরে ছোট্ট আপনার জন্য পরম যত্নে আলাদা একটা পদ তৈরি করেছিলেন আপনার মা। বাটি এনে বিছানার পাশের টেবিলে রেখে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন আপনার কপালে। এমন কিছু পদের সঙ্গে ওই দিনের নানান খুঁটিনাটি স্মৃতিও জড়িয়ে থাকে।

আরও পড়ুন

কিছু পদ একটা পরিবারের রসনার ঐতিহ্যও হয়ে ওঠে। দাদি হয়তো একটা বিশেষ রান্না শিখেছিলেন তাঁর দাদির কাছে। সেই পদ তিনি রান্না করতেন প্রতি ঈদে কিংবা বিশেষ কোনো অতিথি এলে। অতিথি আপ্যায়নে আপনার পরিবারের ঐতিহ্য হয়ে উঠতে পারে ওই পদ।

তবে অনেক সময়ই এসব পদের রেসিপি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এর একটা বড় কারণ হলো, চোখের আন্দাজে মসলার পরিমাপ করেন অনেকেই। কখন কোন উপকরণ যোগ করতে হবে, কতক্ষণ ভাজতে হবে, কখন চুলার আঁচ কেমন রাখতে হবে—এ ধরনের নানান ব্যাপারস্যাপার জড়িয়ে থাকে রান্নার সঙ্গে।

আরও পড়ুন
বিশ্বের যেখানে যত মজাদার খাবারই খাওয়া হোক না কেন, মা, দাদি, নানি বা পরিবারের কারও রান্না করা পদের আবেদন থাকে অটুট
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

এসব কারণেও রান্নার স্বাদে ভিন্নতা আসে। রেসিপি লেখা কিংবা বলার মাধ্যমে এতটা নির্দিষ্ট করে বিস্তারিতভাবে বোঝানো সম্ভব হয়ে ওঠে না।

তারপরও পারিবারিক রেসিপিগুলো সংরক্ষণ করতে চেষ্টা করেন অনেকেই। অন্তত কাছাকাছি স্বাদের একটা পদ তৈরি করতে চেষ্টা করেন। ওই চেষ্টার মধ্যেও প্রশান্তি আছে। পারিবারিক কোনো পদ তো কেবলই একটা ‘পদ’ নয়; বরং তা ওই পরিবারের জীবনযাপনের একটা রূপ।

রান্নার মধ্য দিয়ে এভাবেই প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়া যায় নিজ পরিবারের ‘ট্রেডমার্ক’ স্বাদ। বিশ্বের যেখানে যত মজাদার খাবারই খাওয়া হোক না কেন, মা, দাদি, নানি বা পরিবারের কারও রান্না করা পদের আবেদন থাকে অটুট।

সূত্র: গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন