পারিবারিক ‘কারি ঐতিহ্য’ বহন করে মাস্টারশেফে লড়ছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রক্সি

বিবিসির জনপ্রিয় টেলিভিশন রান্নাবিষয়ক প্রতিযোগিতা মাস্টারশেফে অংশ নিয়েছেন আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিযোগী রক্সি খানম। রক্সির প্রথম পর্বটি প্রচারিত হয়েছে ৪ মে সোমবার বিবিসি আইপ্লেয়ারে।

বিবিসির জনপ্রিয় টেলিভিশন রান্নাবিষয়ক প্রতিযোগিতা মাস্টারশেফে অংশ নিয়েছেন আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিযোগী রক্সি খানম
ছবি: মাস্টারশেফ ইউকের সৌজন্যে

রক্সির জন্ম বার্মিংহামে, বাংলাদেশি অভিবাসী মা–বাবার ঘরে। সেখানেই বেড়ে ওঠা এবং লেখাপড়া। ৩৭ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বর্তমানে ফাইন্যান্স খাতে সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন। তবে পেশাজীবনের বাইরে রান্নাই তাঁর সবচেয়ে বড় আবেগ এবং মানসিক প্রশান্তির উৎস।

পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের কাছে তিনি ‘রুকু’ নামে পরিচিত। প্রয়াত চাঁদ মিয়ার সর্বকনিষ্ঠ মেয়ে রক্সি স্বামীর সঙ্গে থাকেন ইংল্যান্ডের রিডিং শহরে।

বিবিসি মাস্টারশেফে রক্সির গল্প কেবল একজন প্রতিযোগীর গল্প নয়; এটি ব্রিটেনে বাংলাদেশি অভিবাসীদের কয়েক প্রজন্মের রন্ধন ঐতিহ্যেরও প্রতিফলন। তাঁর পরিবারের ইতিহাস যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি ‘কারি সংস্কৃতি’ গড়ে ওঠার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রক্সির দাদা হান্দু মিয়া ১৯০৬ সালে ব্রিটিশ নৌজাহাজে কাজ করার জন্য বিদেশযাত্রা করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯১৮ সালে তাঁকে যুক্তরাজ্যে কারখানায় কাজের জন্য পাঠানো হয়।

সেই সময় তিনি নিজের মাতৃভূমির ঐতিহ্যবাহী মসলা ও রান্নার কৌশল সঙ্গে নিয়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে, ষাটের দশকে রক্সির বাবা বার্মিংহামে দক্ষিণ এশীয় রেস্তোরাঁ শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বাংলাদেশে তাঁদের পারিবারিক বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলায়।

প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে রক্সি বলেন, তাঁর রান্নার ধরন ‘ঐতিহ্য, কৌতূহল, ভালোবাসা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মিশ্রণ’। একদিন তিনি ক্ল্যাসিক ব্রিটিশ সানডে রোস্ট রান্না করেন, আবার পরদিন তৈরি করেন ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার। পুরোনো পারিবারিক রেসিপির পাশাপাশি রক্সি টেলিভিশনের রান্নাবিষয়ক অনুষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেও অনুপ্রেরণা নেন।

জিরা রক্সির ‘সিগনেচার মসলা’ এবং ধনেপাতা তাঁর সবচেয়ে প্রিয় উপকরণ। তাঁর ভাষায়, ‘এই উপাদানগুলো ব্রিটিশ ও দক্ষিণ এশীয় রান্নার মধ্যে স্বাদের একধরনের সেতুবন্ধন তৈরি করে।’

রান্নার প্রতি তাঁর ভালোবাসার শৈশব থেকেই। রক্সি বলেন, তাঁর মা যখন রান্না করতেন, তখন পাশে বসে দেখতেন। ছোট ছোট টিন ও কাঠের হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে তিনিও মায়ের রান্নার অনুকরণ করতেন। পরিবারের সঙ্গে টেলিভিশনে রান্নার অনুষ্ঠান দেখা ছিল তাঁর শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে ব্রিটিশ শেফ রিক স্টেইনের অনুষ্ঠান তাঁদের পরিবারে খুবই প্রিয় ছিল।

আরও পড়ুন

বিয়ের পর রক্সির রন্ধন ঐতিহ্যের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তাঁর শ্বশুর মুজাম্মিল আলী ইংল্যান্ডের সোয়িনডনের খ্যাতনামা ‘জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন’ রেস্তোরাঁর মালিক। দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের অন্যতম পুরোনো এই রেস্তোরাঁ রন্ধনশিল্পে অবদানের জন্য বহু পুরস্কার অর্জন করেছে।

মাস্টারশেফে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে রক্সি বলেন, এটি ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। পরিবার ও বন্ধুরা তাঁকে বছরের পর বছর ধরে উৎসাহ দিয়ে এসেছে। তাঁর মতে, মাস্টারশেফ শুধু রান্নার দক্ষতা প্রদর্শনের একটি মঞ্চ নয়; বরং এটি শেখা, নিজেকে আরও উন্নত করা এবং নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচনের সুযোগ।

ভবিষ্যতে খাদ্য ও স্বাস্থ্য শিক্ষা নিয়ে কাজ করার ইচ্ছার কথাও জানান রক্সি। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির মধ্যে খাদ্যাভ্যাস, প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে চান। রক্সি বলেন, ‘আমাদের প্রিয় ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোকে আরও স্বাস্থ্যকরভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। আমি চাই, মানুষ নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেই সচেতন খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুক।’

আরও পড়ুন