৩৫ টাকায় ভাত আর ৫-৬ রকমের ভর্তা দিয়ে পেটপূজা

default-image

‘ক্যাম্পাসের ডেইরি গেটে খাঁটি দুধের এক কাপ চা দিয়ে সকালটা শুরু হতে পারে,’ বলছিলেন প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী তন্ময় মেহেদী। বোঝা গেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথ থেকেই তিনি অতিথির জন্য ভোজন-আয়োজন রাখতে চান।

তারপর?

‘এরপরে একটু ঝাল খেলে মন্দ হয় না। সেন্ট্রাল ফিল্ডের কোণে থাকে ঝালমুড়ির ভ্যান। মামার ১০ টাকার ঝালমুড়িটা আমার বেশ লাগে, অন্যদের কেমন লাগবে জানি না। সমাজবিজ্ঞানের সামনে থেকে ১০ টাকার ভেলপুরি খাইয়ে ঘুরতে থাকব ছবি চত্বরের গাছের সারির মধ্য দিয়ে। রাস্তার দুই পাশে লাল বাস দেখতে দেখতে এগিয়ে যাব।’

১০ টাকার কুলফি মালাই আইসক্রিম খাইয়ে তারপর তন্ময় অতিথিকে নিয়ে যেতে চান মূল আকর্ষণ, বটতলায়। খাবারদাবারের জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা বিখ্যাত। দুপুরে সবচেয়ে বেশি সরগরম থাকে এই এলাকা। তন্ময় বলছিলেন, ‘ফুলপ্লেট ভাত আর ৫-৬ রকমের বাহারি ভর্তা দিয়ে মাত্র ৩৫ টাকায় পেটপুরে খাওয়া যাবে।’ চা, ভেলপুরি, আইসক্রিম, ভরপেট ভাত খেয়েও হাতে থাকবে আরও কিছু টাকা। অতএব এই পর্যায়ে তন্ময় অতিথিকে নিয়ে যেতে চান ক্যাম্পাসের টারজান পয়েন্টে। জানা গেল, সেখানে ২৫ টাকায় তাজা ফলের জুস পাওয়া যায়। ঋতুভেদে নানা ফলের জুস থাকে। তবে কাঁচা আমের শরবতটাই তন্ময়ের সবচেয়ে পছন্দ।

অতিথি একবার এই দই চিড়া খেলে বারবার খেতে চাইবে

default-image

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া নাজমিন। আমাদের প্রশ্ন শুনে একটু ভাবনায় পড়লেন। বললেন, ‘ক্যাম্পাসের স্বাধীনতা চত্বরসংলগ্ন কাসেম মামার দোকান হবে প্রথম গন্তব্য। জায়গাটা চুয়েটের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। কাসেম মামার এক কাপ কড়া চা খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে যাব তাপবিদ্যুৎ। না না, তড়িৎ প্রকৌশলের লেখাপড়ার কোনো জটিল বিষয় জানতে নয়। খাওয়াদাওয়াই উদ্দেশ্য। ক্যাম্পাসের কয়েকশ গজ দূরেই তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান। কেন্দ্রের সামনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রতিদিনই জমে ওঠে আমাদের আড্ডা। এখানকার দই-চিড়া অনেক বিখ্যাত। মাত্র ৪০ টাকায় চিড়ার সঙ্গে কলা আর ঠান্ডা দই খেয়ে অন্তরটাই ঠান্ডা হয়ে যায়। আমরা তো প্রায়ই খাই। অতিথিও একবার এই দই–চিড়া খেলে বারবার খেতে চাইবে বলে বিশ্বাস।’ এসবের বাইরেও আছে আরও নানা খাবারের বন্দোবস্ত, জানালেন সুমাইয়া। ১৫ টাকার ছোলা–মুড়িটা নাকি মন্দ নয়। সঙ্গে থাকতে পারে ডিম চপ, আলুর চপ ও পেঁয়াজুর মতো টুকিটাকি খাবার।

লেবুচুর দেখলেই জিহ্বায় জল আসে

default-image

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে বেরোলেই পাওয়া যায় রেস্তোরাঁর নানা খাবার। কিন্তু ওসবের চেয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরের ‘টুকিটাকি’ খাবারগুলোই শিক্ষার্থীদের প্রিয়। চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী মুক্তাদির করিম বলছিলেন, ‘সকালটা শুরু করব নাসির ভাইয়ের দোকানের ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম চা দিয়ে। সঙ্গে থাকতে পারে টুকিটাকির গরম তেলে ভাজা পুরি।’ ও হ্যাঁ, যাঁরা জানেন না, তাঁদের জানিয়ে রাখি—বেশ কয়েক বছর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির কাছে ‘টুকিটাকি’ নামের ছোট্ট একটি দোকান চালু হয়েছিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে টুকিটাকি নামটি ছড়িয়ে পড়ে। দোকানটি জনপ্রিয়তা পায়। সবার অজান্তেই একসময় লাইব্রেরি চত্বর হয়ে যায় টুকিটাকি চত্বর। একসময় যেখানে একসঙ্গে পাঁচজন শিক্ষার্থী দাঁড়াতেন না, এখন সারা দিন সেখানে শত শত শিক্ষার্থীর আনাগোনা। একজন আরেকজনকে ফোন করে বলেন, ‘টুকিটাকি চত্বরে চলে আয়। বাবুর দোকানে আছি।’ ব্যস, আর কিছু বলতে হয় না। ঠিকানা সবার চেনা।

মুক্তাদির জানালেন, ২০-২৫ টাকায় বেশ একটা নাশতা হয়ে যায় এই চত্বরে। তবে অতিথিকে তিনি দুপুরে খাওয়াতে চান ২৫ টাকার ‘সিক্স আইটেম’। ভাত, ভর্তা, ভাজি দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ নাকি মন্দ হয় না। মুক্তাদির বলেন, ‘কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে খাওয়াব সাজ্জাদ ভাইয়ের লেবুচুর। দাম ২০ টাকা। লেবু ফালি ফালি করে কেটে বিট লবণ ও অন্যান্য মসলা দিয়ে বানানো এই খাবার দেখলেই জিহ্বায় জল চলে আসে। টক যাঁদের পছন্দ, তাঁদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় লাগবে নতুন ধরনের এই খাবার। ১০ টাকার চানাচুর মাখাটায় বেশ মজা। সন্ধ্যায় আলি ভাইয়ের দোকানের ভালোবাসা মিশ্রিত এক কাপ চায়ের সঙ্গে দিনের শেষটা নিশ্চয়ই মনে রাখার মতো হবে।’

৬০-১০০ টাকার মধ্যে ভরপুর খাওয়া

default-image

ঢাকার অভিজাত বসুন্ধরা এলাকায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অবস্থান। পাশেই যমুনা ফিউচার পার্ক। আশপাশে নামীদামি রেস্তোরাঁর অভাব নেই। কিন্তু হাতে যদি থাকে ১০০ টাকা, কী খাওয়ানো যায় অতিথিকে? ইলেকট্রিক্যাল ও কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আমাদের ইউনিভার্সিটির ভেতরে কাসুন্দি নামের একটা বিখ্যাত রেস্তোরাঁ আছে। বিশাল এই রেস্তোরাঁ পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের খাবারের জোগান দেয়। খাবারের দাম খুব যে বেশি, তা নয়। মাত্র ৩০-৫০ টাকার সকালের নাশতায় পাওয়া যাবে পরোটা, ডিম ভাজি, সবজি, ডাল, হালুয়া, ইত্যাদি। অতিথির সঙ্গে এখানে বেশ ভালোভাবে সকালের নাশতা শেষ করব। ৬০-১০০ টাকার মধ্যে দুপুরে পাওয়া যাবে সাদা ভাত, ডাল, পোলাও, মাংস, মাছের ঝোল তরকারি, ডিম ভুনা, কিংবা চাইনিজের নানা পদ। পছন্দমতো পদে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু চা হলে ভালোই লাগে। চা বা কফির জন্য আছে ক্যাফে জেডের আলাদা অংশ। মাত্র ১০-২০ টাকায় মিলবে চা ও কফি।’

১৫ টাকার আইস টি খেয়ে প্রাণ জুড়িয়ে যায়

default-image

বন্ধু বা অতিথিকে ১০০ টাকার মধ্যে খাওয়ানো সম্ভব? আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নওরীন নাহার জানলেন, সম্ভব৷ ‘শুরুটা হবে হামিদ ভাইয়ের ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা–র সঙ্গে বাকরখানি দিয়ে। সকালে অনেক সময় বাসা থেকে নাশতা করে বের হওয়া হয় না। এই ১৫ টাকার খাবার খেয়ে সকালটা কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব। আমি চাইব আমার বন্ধুরও সেই অভিজ্ঞতা হোক।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ব্র্যাকেরও আছে বটতলা, তবে একটু অন্যরকম। ব্র্যাকের পাশের বটতলায় পাওয়া যায় মজাদার টিক্কা রোল। নওরীন বললেন, ‘পরোটা আর টিক্কাটা খুব সাধারণ। কিন্তু খেতে কেন যেন বেশ লাগে। দুপুর ১২টার ব্রেকে হালকা নাশতার জন্য ২০-৩০ টাকার এই খাবারটা বেস্ট। পাশেই চোখে পড়বে ভাজাপোড়া নানা কিছু। এর মধ্যে ৫ টাকা দরে পুরি, আলুর চপ, বেগুনি, শিঙাড়া খেতে ভিড় লেগেই থাকে। এই গরমে লেবুর জুস বেশ স্বস্তি দেয়। ২০ টাকায় লেবুর জুসও খাওয়াতে পারি অতিথিকে। ক্যাম্পাসের চার নম্বর বিল্ডিংয়ের সামনে বসে ভেলপুরির দোকান। বেশ কুড়মুড়ে। ওপরে হালকা লেবুর রস ও কিছু পেঁয়াজ বেরেস্তা ছিটানো থাকে। দুই নম্বর বিল্ডিংয়ের পেছনের প্রিন্টিং আর স্টেশনারির দোকানগুলোর দিকে খোরশেদ ভাইয়ের চায়ের দোকান। তাঁর বানানো আইস টি সবার প্রিয়। ১৫ টাকার আইস টি খেয়ে প্রাণ জুড়িয়ে যায়।’

রসনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন