গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী-নাজিম কামরান চৌধুরী
৫৫ বছরের দাম্পত্যে বোঝাপড়াটাই আসল
বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনী জগতের অগ্রণী নাম, অ্যাডকমের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী। তাঁর স্বামী সাবেক সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ ও পর্যটন ব্যবসায়ী নাজিম কামরান চৌধুরী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে ঢাকার মেয়ে গীতিআরার প্রেমে পড়েন সিলেটের ছেলে নাজিম কামরান। বিয়ে করে একই ছাদের তলায় অর্ধশত বছরের বেশি সময় কাটিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। ৫৫ বছর পর এসে প্রেম–বিয়ের সেই স্মৃতি রোমন্থন করলেন গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী। তেজগাঁওয়ে অ্যাডকমের অফিসে বসে সেই গল্প শুনলেন বিপাশা রায়
‘আমাদের সময়টা ছিল অন্য রকম। প্রেম, বিয়ের মতো বিষয়গুলো নিয়ে এখনকার মতো তখন এত হইচই ছিল না। এমন সম্পর্কগুলো একরকম লুকিয়েই রাখা হতো। এমন সমাজব্যবস্থার মাঝেই আমাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।’ ৫৫ বছর আগের জীবনে ফিরে গেলেন অ্যাডকমের চেয়ারম্যান গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী। শোনান তাঁর প্রেম–বিয়ের দিনগুলোর গল্প। গল্পচ্ছলে এটাও জানান যে এই বয়সে এসে অনেক কিছুই ঠিকমতো মনে করতে পারেন না।
প্রেমের দিনগুলো
১৯৬৫ বা ’৬৬ সালের কথা, তখন গীতিআরা সাফিয়া দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষে পড়তেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের জন্য এমন নিয়ম ছিল যে ছেলেদের সঙ্গে প্রকাশ্যে কথা বলা যাবে না, একসঙ্গে বসা তো যাবেই না। ছেলেরা বসবে পেছনে, মেয়েরা সামনের দিকের বেঞ্চে।
এ সময় তাঁরাই মনে হয় একমাত্র ব্যাচ ছিলেন, যাঁরা এসব নিয়ম মানতেন না। গীতিআরা বলেন, ‘কিছুটা দুষ্টু ছিলাম বলা চলে। যা–ই হোক, নাজিম কামরান চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয় এই বিশ্ববিদ্যালয়েই। সে পড়ত পলিটিক্যাল সায়েন্সে।
আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের ফ্রেঞ্চ ক্লাসে ভর্তি হই। ক্লাস করতে গিয়ে পরিচয়, চেনাজানা, বন্ধুত্ব। ফ্রেঞ্চ ক্লাসেরই এক পিকনিকে গিয়ে নাজিম কামরান চৌধুরী আমাকে প্রথম তার ভালো লাগার কথা জানায়। আমারও তাকে ভালো লাগত। তাই হ্যাঁ বলে দিলাম।’
তখনকার দিনে প্রেম করাটাকেও বেশ খারাপ চোখে দেখা হতো। তাই গোপনে দেখা করতেন দুজন। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে, ফ্রেঞ্চ ক্লাসে না হয় লাইব্রেরিতে। এভাবেই ভালোবাসার সম্পর্ক তিন–চার বছরে গড়াল। দুই পরিবারের সদস্যরাও জানলেন তাঁদের সম্পর্কের কথা। হবু শ্বশুর এলেন ফল নিয়ে।
গল্প বলতে লাগলেন গীতিআরা
‘যদিও আমাদের প্রেমের বিয়ে, কিন্তু পুরোটাই অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের মতো ছিল। আমাদের পরিবার যখন আমাদের পছন্দের কথা জানল, তখন তারা তাদের মতো করে বিয়ের ব্যাপারে এগোতে লাগল। এর মধ্যে আমার মাস্টার্স শেষ হলো।’ একদিন হঠাৎ করেই তাঁর হবু শ্বশুর আবদুল মুনিম চৌধুরী এলেন দেখা করতে।
‘আমার আব্বার (এ এফ এম সফিয়্যুল্লাহ) সঙ্গে তাঁর আগের থেকেই অল্প জানাশোনা ছিল। আমার ডাকনাম চম্পা। নাজিম কামরানের বাবা এসে বললেন, “চম্পার জন্য কিছু ফল নিয়ে এসেছি।” বাবা (আমার শ্বশুর) আমার জন্য বাঁশের টুকরিতে করে আপেল আর কমলা নিয়ে এসেছিলেন। তখন আমার আব্বা সরাসরি বললেন, “আমার মেয়ে পরিমাণে অনেক ফল খায়। আপনি টুকরিতে এইটুকু ফল এনেছেন!” শুনে শ্বশুর তাৎক্ষণিক বললেন “আমার তো জানা ছিল না, এরপর এলে অবশ্যই বেশি করে আনব।”
‘এরপর তাঁরা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলেন। আব্বা বললেন, “আমার মেয়ে তো রাঁধতে পারে না। ওকে কখনো আমি রান্নাঘরে ঢুকতে দিইনি।” কামরানের মা-বাবা বললেন, “আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমরাও ওকে দিয়ে রান্না করাব না।” কেন জানি না, আব্বা তাঁদের সামনে অনেক কিছুতেই নেতিবাচক কথা বললেন। কিন্তু আমার শ্বশুর-শাশুড়ি সবকিছুতেই ইতিবাচক ছিলেন।’
দেনমোহর দুই লাখ টাকা
গীতিআরার আব্বা প্রথম দিকে সবকিছুতেই নেতিবাচক ভাব দেখালেও বিয়ের দু–একদিন আগে এক অদ্ভুত কাজ করে বসেন। বিয়েতে দেনমোহর এক লাখ টাকা ধার্য করা হলে তিনি বাদ সাধেন। দুই পরিবারের আত্মীয়রাই ভেবেছিলেন, দেনমোহরের টাকা কম হওয়ায় তিনি এমন করছেন।
তখন নাজিম কামরানের পরিবারের সদস্যরা ইতস্তত করে বলছিলেন, ছেলে নতুন চাকরিতে ঢুকেছে, এর চেয়ে বেশি দেনমোহর দেওয়া তো এখন সম্ভব নয়। ‘আব্বা সবাইকে অবাক করে দিয়ে বললেন, “এই বিয়েতে কোনো দেনমোহর দিতে হবে না।” স্বাভাবিকভাবেই আমার শ্বশুর অপমানিত বোধ করেন।
আব্বা বললেন, “যে বিয়েতে বিশ্বাস নেই, আস্থা নেই, ভালোবাসা নেই, সেখানে দেনমোহরের দরকার হয়। কিন্তু আমার মেয়ে এই ছেলেকে বিশ্বাস করে ভালোবেসেছে, সেখানে দেনমোহরের কী দরকার? আমি এই বিয়েতে মত দিয়েছি শুধু ওদের ভালোবাসা দেখে।”’ বলতে বলতে আবেগতাড়িত হয়ে পড়লেন গীতিআরা।
যদিও তখন বাড়িভর্তি আত্মীয়রা তাঁর (গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরীর) আব্বাকে বলেছিলেন, ‘এ কী পাগলামি করছ?’ কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ছিল, সম্পর্কে ভালোবাসা থাকলে সেটা কখনো অসুখী হয় না। তাঁর সেই বিশ্বাস সত্যি হয়েছে।
গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী-নাজিম কামরান চৌধুরী পার করেছেন তাঁদের ৫৫ বছরের বিবাহিত জীবন। দীর্ঘ এই দাম্পত্য জীবনে তাঁদের ঘরে আসে দুই সন্তান—নাজিম ফারহান চৌধুরী ও ফাহিমা চৌধুরী। সন্তান ও এক নাতিকে নিয়ে এখন তাঁদের ভরপুর সংসার।
এই সাক্ষাৎকার নিতে আমরা যখন অ্যাডকমের অফিসে যাই, সেদিন কাজের কারণে নাজিম কামরান চৌধুরী সিলেটে ছিলেন। তবে ছবি তোলার দিন (১৫ জানুয়ারি) দুজনই ছিলেন উপস্থিত। এই যে দুজনের এত ব্যস্ত জীবন, তার মধ্যেও তাঁদের সম্পর্কে বোঝাপড়াটা বদলায়নি।
বিয়ের আয়োজন
১৯৬৯ সালের ২৬ এপ্রিল শাহবাগ হোটেলে (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী ও নাজিম কামরান চৌধুরীর বিয়ে সম্পন্ন হয়। গীতিআরা বলেন, ‘তখন তো আর ঘটা করে বউসাজের চল ছিল না।
তারপরও বউ সেজেছিলাম লাল বেনারসিতে। অনেক বছরের পুরোনো কথা। যদিও গয়না পরতে আমি অতটা ভালোবাসি না, তবে তখনকার রেওয়াজ ছিল বউদের ভারী গয়না পরার। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।’
সে সময় পারলারে গিয়ে বউ সাজাটাকে সমাজ বা পরিবারের মধ্যে খুব নেতিবাচকভাবে দেখা হতো। বাড়ির বোন বা ভাবিদের মধ্যে যাঁদের সাজানোর হাত ভালো ছিল, তাঁরাই গীতিআরাকে কনে সাজিয়েছিলেন।
নাজিম কামরান চৌধুরী বর সেজেছিলেন শেরওয়ানি পরে। একইভাবে বউভাতের দিনও নাজিম কামরান চৌধুরীর বাড়ির লোকজনই গীতিআরাকে বউ সাজিয়ে লম্বা ঘোমটা টেনে দিয়েছিলেন।
নতুন পরিবার, নতুন জীবন
বিয়ের পর হানিমুনে শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে গিয়েছিলেন গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী ও নাজিম কামরান চৌধুরী। সেখানকার স্মৃতিগুলো এখনো জ্বলজ্বলে গীতিআরার চোখে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, ‘বিয়ে হয়েছে, এখন সংসার করব—এগুলো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল তখন। আব্বা–আম্মা শিখিয়ে দিয়েছিলেন যেন শ্বশুর–শাশুড়িসহ নতুন পরিবারের সবাইকে যত্নে রাখি।
আলাদা করে বরের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, সময় কাটানো—এসব বিষয়ের তেমন চর্চা পরিবারে তখন ছিল না। কিন্তু আমার শাশুড়ি (যাকে আমি মা বলে ডাকতাম), তিনি চাইতেন আমরা যাতে খুব সুন্দর একটা দাম্পত্য জীবন কাটাই।
বিয়ের পরদিনের কথা; সেদিন ছিল পূর্ণিমা। বাসার একটা খোলা জায়গায় গিয়ে দেখি, মা বেলি ফুল দিয়ে মালা গাঁথছেন। আমি গিয়ে দাঁড়াতেই আমার বড় জাকে বললেন, আমার চুলে যেন খোঁপা করে দেয়। আমি কিছুটা অবাক হলাম। পরে মা আমার খোঁপায় সেই বেলির মালা জড়িয়ে দিয়ে বললেন, “যাও, কামরানের সঙ্গে হুডখোলা রিকশায় ঘুরে আসো।” আসলে নাজিম কামরান আর আমার এত বছরের দাম্পত্য সম্পর্কে শুধু যে আমরা দুজনই ছিলাম তা নয়, ছিলেন আমাদের দুই পরিবারের সদস্যরাও। আমরা কখনো তাই কোনো কিছু একা ভাবতে পারতাম না। পরিবারের সদস্যরাও চাইতেন, আমরা যেন অনেক ভালো থাকি। এভাবেই কেটে গেল আমাদের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন।’
ভোলাভালা সংসার
নাজিম কামরান চৌধুরী কিছুটা আত্মভোলা, ছেলেমেয়েরা কোন ক্লাসে পড়ছে, এটাও তিনি ঠিকমতো মনে রাখতে পারতেন না। এত ব্যস্ততার ভেতরও গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরীকেই তাঁদের সবার খেয়াল রাখতে হতো। তবে এ নিয়ে তাঁর কখনো কোনো অভিযোগ ছিল না।
‘ভালোবাসা প্রদর্শনের বিষয়টি নাজিম কামরান চৌধুরীর মধ্যে একেবারেই নেই। যেমন জন্মদিন এলে সে এমন ভাব ধরত যেন তার মনে নেই যে আজ আমার জন্মদিন। কিন্তু দিন শেষে দেখতাম, আমার পছন্দের জিনিস নিয়ে সে উপস্থিত। একবার ভারতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। বম্বের (মুম্বাই) এক শাড়ির দোকানে যাই। দুটো শাড়ি দেখে সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়ি। নাজিম কামরানের কথা, “দুটোই নিয়ে নাও।” আমি ভাবছিলাম, এতগুলো টাকা নষ্ট হবে! দোকানদার বললেন, “নিয়ে নেন তো। খুব কম স্বামীই স্ত্রীকে পছন্দের জিনিস কিনে দিতে চায়।” আমাদের বোঝাপড়াটা আসলে এমনই।’
এই দীর্ঘ দাম্পত্যে তাঁদের দুজনের যে ঝগড়া হয়নি, তেমনটা নয়। তবে মনোমালিন্য তাঁরা দীর্ঘক্ষণ পুষে রাখেননি। ছাড় দিয়েছেন একজন আরেকজনকে। গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী বলেন, ‘এটা আসলে সম্ভব হয়েছে অভিভাবকদের জন্য। তাঁরা আমাদের মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টি শিখিয়েছিলেন। তাঁরা বলতেন, “মানুষের দোষ থাকবেই। জীবনে সবকিছুই যে তোমার মনের মতো হবে, তা কিন্তু নয়।” আসলে পারিবারিক শিক্ষাগুলোই আমাদের দাম্পত্যকে এত মসৃণ হতে সাহায্য করেছে। আমরা হয়েছি একে অপরের পরিপূরক।’
(লেখাটি প্রথম আলোর বিশেষ ম্যাগাজিন বর্ণিল বিয়ে জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)