প্রায় এক ইঞ্চি লম্বা মাছের কাঁটা বিঁধেছিল বাবার গলায়, বের করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো আমাদের
২০২৬ সালের ২৫ মে। রাত প্রায় নয়টা। আমি আর ফুপি পড়াশোনা করছি। আব্বু বাজার থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়েই সবাইকে খেতে ডাকলেন। সকালে আনা সিলভার কার্প মাছের মাথা দিয়ে মুড়িঘণ্ট রান্না হয়েছিল। খেতে বসার পর আমার ছোট বোন মাছের মাথার বড় একটি অংশ তুলে নিল।
বাবা মজা করে বললেন, ‘খাওয়া শেখ!’
আমিও ছাড় দেওয়ার পাত্র নই। হেসে বললাম, ‘আমি যদি মাছের মাথা খেতাম, তাহলে তো তোমাকে দুইটা মাছ কিনতে হতো!’
হাসিঠাট্টার মধ্যেই খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এল।
বাবার একটা অভ্যাস আছে, পছন্দের কোনো খাবার হলে শেষ পাতে একটু তরকারি আলাদা করে নিয়ে খালি মুখে খান। সেদিনও ব্যতিক্রম হলো না, এক চামচ মুড়িঘণ্ট মুখে দিলেন। হঠাৎ গলা চেপে ধরলেন, ‘মনে হয় কাঁটা বিঁধেছে।’
মুহূর্তেই হুলস্থুল পড়ে গেল।
আমরা তাঁকে ভাত মুঠো করে গিলতে বললাম, লেবুর রস দিলাম, কলা খাওয়ালাম। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হলো না। কাঁটাটি গলায় আটকে রইল। আব্বু ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠলেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল তাঁর কষ্ট হচ্ছে।
দাদি একজনকে খবর দিলেন। তিনি নাকি দোয়া পড়ে গলার কাঁটা নামিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু আব্বুর অবস্থা দেখে আমরা আর অপেক্ষা করলাম না। কাক্কুকে ডেকে একটি ভ্যানের ব্যবস্থা করা হলো। আব্বুকে তাতে শুইয়ে নিয়ে যাওয়া হলো বাড়ির কাছের বাজারে।
প্রথমে একটি হোমিও চিকিৎসালয়ে গেলাম। ওষুধ দেওয়া হলো। কিন্তু তাতেও কোনো উপকার হলো না। এরপর তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলো। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, কোনো ডাক্তার নেই। কম্পাউন্ডাররা ফোন করে একজন ডাক্তারকে নিয়ে এলেন। তিনি ছিলেন অর্থোপেডিকস চিকিৎসক। তারপরও যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন। গলার ভেতর দেখার জন্য একটি বিশেষ যন্ত্র আনতে বললেন। কিন্তু হাসপাতালের কর্মীরা সেই যন্ত্রের নামই আগে শোনেননি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর যন্ত্রটি পাওয়া গেল। চিকিৎসক পরীক্ষা করে শেষ পর্যন্ত জানালেন, এই চিকিৎসা এখানে সম্ভব নয়।
এরই মধ্যে খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজন হাসপাতালে জড়ো হয়েছেন। চাচারা বগুড়ায় পরিচিত চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। কিন্তু ঈদের ছুটির সময় গভীর রাতে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যাবে না বলে জানা গেল। অর্থাৎ বগুড়ায় গেলেও সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
ঠিক তখনই আম্মু রংপুরে আমাদের পরিচিত আল-আমিন আংকেলকে ফোন করলেন। তিনি একটি হাসপাতালের মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক। সব শুনে বললেন, ‘আপনারা সরাসরি রংপুর চলে আসেন। যত রাতই হোক, আমি ডাক্তারের ব্যবস্থা করে রাখছি।’
বাবাকে কখনো এতটা অস্থির হতে দেখিনি। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, তিনি প্রচণ্ড যন্ত্রণার মধ্যে আছেন। দ্রুত একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে রাত প্রায় ১২টার দিকে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। আমাদের বাড়ি থেকে রংপুর যেতে আড়াই ঘণ্টার মতো লাগে। কিন্তু সেদিন মনে হচ্ছিল, পথ যেন শেষই হচ্ছে না।
রাত প্রায় ১টা ১৫ মিনিটে আমরা রংপুরের মডার্ন মোড়ে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়ে দেখি বিশাল যানজট। সঙ্গে প্রবল বৃষ্টি আর ঝোড়ো বাতাস। দীর্ঘ সময় জ্যামে আটকে থাকতে হলো। এদিকে আব্বুর অস্থিরতাও বাড়তে লাগল।
আল-আমিন আংকেল বারবার ফোন করে বলছিলেন, ‘আমি থাকব, সমস্যা নেই। কিন্তু ডাক্তার সাহেব চলে যেতে চাইছেন।’
অবশেষে রাত প্রায় তিনটার দিকে আমরা হাসপাতালে পৌঁছলাম। আব্বুকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হলো। ডাক্তার বাসায় চলে গিয়েছিলেন। আংকেল নিজে মোটরসাইকেলে গিয়ে তাঁকে আবার হাসপাতালে নিয়ে এলেন।
আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছি। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার, মাত্র দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই একটি গ্লাভসের প্যাকেটের ওপর কাঁটাটি নিয়ে বেরিয়ে এলেন আল-আমিন আংকেল।
কাঁটা দেখে আমাদের চোখ কপালে উঠে গেল। প্রায় এক ইঞ্চি লম্বা মাছের কাঁটা!
আংকেল আমার খালু আর মামার উদ্দেশে বললেন, ‘দেখেছেন? এত বড় কাঁটা! আজ রাতেই এটা বের না করলে কী বিপদ হতো, কে জানে!’
মুহূর্তেই যেন বুকের ওপর থেকে একটা পাহাড় নেমে গেল। প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আবার আমরা অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়ির পথে রওনা দিলাম।