ঝুম বৃষ্টির সেই দিনটাতেই বাবার সঙ্গে সম্পর্কের ধরনটা বদলে গিয়েছিল
বাবাকে কাছে পেয়েছি ২২ বছর। জীবনের এই প্রথম ২২ বছরজুড়ে বাবাকে মনে হয়েছে ছায়াবৃক্ষ। চিরহরিৎ ছায়াবৃক্ষ, সমাজ বইতে যেমন পড়েছি। তন্দ্রার মতো আবছাভাবে মনে পড়ে, ভ্যাপসা গরমের দুপুরে আমার সামনে খোলা সমাজ বই। বাবা পাশ থেকে এক শ উদাহরণসহ বুঝিয়ে যাচ্ছে, দেশে কত রকমের বন আছে, সেখানে কত রকম গাছ হয়। কোন গাছটা চিরহরিৎ, কোন গাছটা পর্ণমোচী। বাবা বেশিক্ষণ একটানা পড়াতে পারত না, পথ ভুলে খুব সহজেই ঢুকে পড়ত গল্পের গলিতে। পাহাড়ি বনের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য আর উদাহরণের পর আমাদের পড়ার কথা সমতল ভূমির শালবনের কথা। অথচ পাহাড়ি বনের প্রথম বৈশিষ্ট্য থেকে আমরা কখন চলে গেছি চুয়েটের ঘন জঙ্গলে! সেই জঙ্গলে তখন আশির দশক, সদ্য তরুণ ও সদ্য বন্ধু হওয়া এক দলের সঙ্গে বাবা হেঁটে বেড়াচ্ছে এবং সম্ভবত গুন গুন করে গানও গাইছে। সেই গানে সুর বা তালের কোনো বালাই নেই।
আমাদের সামনে সমাজ বই খোলা পড়ে থাকে আরও বহুক্ষণ। কখন যেন ভ্যাপসা গরম কেটে গিয়ে বাইরে বৃষ্টিও শুরু হয়ে যায়, ঘরজুড়ে ভেজা মাটির ঘ্রাণ। চুয়েট থেকে আমরা চলে গেছি চা–বাগানে। বাবা ভারী গলায় বলে যাচ্ছে, চা–বাগানের মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকে আকাশমণিগাছ। চা–গাছকে কড়া রোদ আর অতিবৃষ্টি থেকে রক্ষা করে এই আকাশমণি। বেশিক্ষণ অবশ্য আমাদের চা–বাগানেও থাকা হয় না। কারণ, বাবা মনে মনে ততক্ষণে শান্তিনিকেতনে চলে গেছে। সেখানে এক বনের নাম সোনাঝুরি। রবীন্দ্রনাথ ভালোবেসে আকাশমণিগাছের নাম দিয়েছেন সোনাঝুরি। সব কথা বুঝে উঠলাম কি না জানি না, তবে টুকরো শব্দরা মনে গেঁথে গেল—ছায়াবৃক্ষ, আকাশমণি, সোনাঝুরি…।
এতক্ষণে পাঠকের বুঝে যাওয়ার কথা, অত গল্পের গলি ঘুরে এসে আমার মাথায় আর সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, উদাহরণের জায়গা হয়নি। শুধু মাথায় রয়ে গেছে একটা প্রিয় ছবি। সেই ছবিতে আমি চা–গাছ আর বাবা ছায়াবৃক্ষ। চিরহরিৎ ছায়াবৃক্ষ, সমাজ বইতে যেমন পড়েছি তেমন।
২২ বছর রোদ–বৃষ্টিতে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে আমার ছায়াবৃক্ষ এক সময় বিশ্রামে গেল। অনন্ত বিশ্রাম। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, শূন্যতা, কড়া রোদ আর ঘোর বৃষ্টি তাদের তীব্রতম শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসছে। অমন প্রকট আবহাওয়ায় বেশ অনেক দিন কাটালাম। এমনকি অন্য কোনো গ্রহে না গিয়েও একসময় নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে পৃথিবীই জঘন্যতম ঠিকানা।
বেশ অনেক দিন পর দুপুরবেলায় বিজয় সরণির জ্যামে বসে আছি। বাইরে ভ্যাপসা গরম, গা চিটচিট করছে। ঘণ্টা পেরিয়ে গেল, দুপুরের ক্লাস মিস করে ফেললাম, বিকালেরটাও ধরতে পারব কি না, জানি না। ঠিক তখনই প্রচণ্ড বিরক্তি আর গরমের ওপর ঝুম বৃষ্টি নামল। ভেজা মাটির ঘ্রাণে ছেয়ে গেল জ্যামের শহর। নিজের অজান্তেই মনে মনে বলে উঠলাম, ছায়াবৃক্ষ, আকাশমণি, সোনাঝুরি। ছায়াবৃক্ষ, আকাশমণি, সোনাঝুরি। ভাগ্যিস মনে মনে বলা কথা লোকে শুনতে পায় না, শুনলে ভাবত ভরদুপুরে সিএনজিতে বসে মন্ত্র পড়া পাগল! মন্ত্রই বটে! কারণ, ওই তিন শব্দের পথ ধরেই মন চলে গেছে ছায়াবৃক্ষের কাছে। বাবা যেমন বনের প্রকারভেদ পাশ কাটিয়ে গল্পে ঢুকে যেত, আমিও তেমনি ছায়াবৃক্ষের অনুপস্থিতিকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে পড়ি স্মৃতির শহরে। সেই শহরের রাস্তারা আমাকে একের পর এক মনে করিয়ে দেয়, সোনাঝুরির বনটা একবার দেখতে যেতে হবে। আর দেখতে হবে চা–বাগান। ঝুম বর্ষার চা–বাগান। কড়া রোদ আমার পোষাবে না। তাই যেতে হবে তুমুল বর্ষার দিনে। স্বচক্ষে দেখে আসব, কেমন করে চা–গাছকে আগলে রাখে আকাশমণি।
আমার ধারণা, ট্রাফিক জ্যাম আর ঝুম বৃষ্টির সেই দিনটাতেই বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কের ধরনটা বদলে গিয়েছিল। বুঝে গিয়েছিলাম, মৃত্যু কোনো কোনো সম্পর্কের তুলনায় বেশ ছোট একটা ঘটনা। সব সম্পর্ক ওই এক নিষ্ঠুর বিষয় দিয়ে ঘিরে ফেলা যায় না; বরং মৃত্যু তার তীব্রতম শক্তি নিয়ে ছুটে এলে সম্পর্ক নদীর মতো গতিপথ বদলায়। সেই বদলের ধরনটা বুঝতে হয়তো সময় লাগে। আমারও লেগেছিল। কিন্তু যেদিন নতুন গতিপথের খোঁজ পেয়েছি, সেদিন থেকে দেখছি, ২২ বছর ধরে ছড়িয়ে আছে অজস্র গল্প আর ইচ্ছার মানচিত্র। এই মানচিত্রটি এখন আমার প্রিয়তম! এই মানচিত্রে ঘোরাফেরা করতে করতেই অনেকের সঙ্গে নিবিড় করে জানাশোনা হয়েছে, যেমন গিরিজা দেবী। তাঁর অন্যান্য গান আমি এখনো ভালোবাসতে শিখিনি, তবে ইদানীং বৃষ্টি হলে স্পটিফাই থেকে উনি নিয়মিত গাইছেন, ‘বারসান লাগি বাদরিয়া/রুম ঝুম কে!’ গানের পূর্বদেশীয় হিন্দি লিরিক আমি ভালো বুঝি না, তবু তিনি প্রতিবার ‘রুম ঝুম কে’ গেয়ে উঠলে মনে হয় বিশ্বচরাচরজুড়ে বর্ষা নেমেছে। ‘বাবা থাকলে কী হতো’ আর ‘না থাকলে কী হচ্ছে না’ জাতীয় আফসোস বা আক্ষেপ প্রবল বর্ষণে ধুয়ে যাচ্ছে। উপস্থিতি-অনুপস্থিতির দেয়াল পেরিয়ে আমরা এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে শুধু গল্প আর ইচ্ছারাই আসল এবং সত্য। এখান থেকে বাবার সঙ্গে কথোপকথনের ঠিকানাও অজস্র। এই যেমন সমারসেট মম, মেরিল স্ট্রিপ, খিচুড়ি-বেগুনভাজা। কিংবা তিথিডোর, টম জোন্স, ফিশ অ্যান্ড চিপস। এবং অতি অবশ্যই ছায়াবৃক্ষ, আকাশমণি, সোনাঝুরি।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, আলস্টার ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য