মেহজাবীন ও আদনানের সম্পর্কের গল্প

মেহজাবীন চৌধুরী আর আদনান আল রাজীব। একজন পর্দার সামনে, আরেকজন দৃশ্যের পেছনের অদৃশ্য শিল্পী। এই দম্পতির বন্ধুত্ব, প্রেম থেকে পরিণয়ের বিস্তারিত জানাচ্ছেন মনজুর কাদের

১৩ বছরের বন্ধুত্ব ও প্রেমের পর আজ মেহজাবীন ও আদনান একসঙ্গেছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে

২০০৯ সালে লাক্স–চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতায় মেহজাবীন প্রথমবারের মতো সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন। এরপর নাটকের জগতে তাঁর পদচারণ আলো ছড়াতে থাকে।

এ সময়েই তাঁর পরিচয় হয় নির্মাতা ও প্রযোজক আদনানের সঙ্গে, যিনি ক্যামেরার পেছনে গল্পে প্রাণ দেন। কয়েক মুহূর্তের প্রথম দেখা একজন আরেকজনের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে আসে, যা বন্ধুত্বের ভিত্তি তৈরি করে।

কয়েক মুহূর্তের প্রথম দেখা একজন আরেকজনের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে আসে, যা বন্ধুত্বের ভিত্তি তৈরি করে
ছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রেমে রূপ নেয়, আর এখন তাঁরা পুরোপুরি সংসারী। সোশ্যাল মিডিয়ার গুঞ্জন তাঁদের সম্পর্ককে স্পর্শ করতে পারেনি; বরং একে অন্যের প্রতি বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং পাশে থাকার অনুভূতি দৃঢ় করেছে। নাটক ও চলচ্চিত্রের ব্যস্ততা, শুটিংয়ের তাড়া—এসবের মধ্যেও তাঁরা একে অপরের সান্নিধ্যে জীবনের মুহূর্তগুলো উপভোগ করেন।

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ভালোবাসা দিবসে মেহজাবীন ও আদনান বিয়ের সম্পর্কে জড়ান। ১৩ বছরের বন্ধুত্ব ও প্রেমের পর আজ তাঁরা একসঙ্গে। এরই মধ্যে বৈবাহিক জীবনের ১১ মাস পার করেছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন

প্রথম দেখায় যেমন

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ভালোবাসা দিবসে মেহজাবীন ও আদনান বিয়ের সম্পর্কে জড়ান
ছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে

মেহজাবীন ও আদনানের বিয়ের এক বছর পূর্ণ হবে ফেব্রুয়ারিতে। লাক্স–চ্যানেল আই সুপারস্টারের মুকুট জয়ের পর অভিনয় ও বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ শুরু করেন মেহজাবীন চৌধুরী। ধীরে ধীরে ব্যস্ততা বাড়ে। অন্যদিকে আদনান আল রাজীবও নির্মাণ, প্রযোজনা—এসব নিয়ে এগোচ্ছিলেন।

এমন সময় দুজনের প্রথম দেখা। সেই দেখায় দুজনের মনে গেঁথে থাকার মতো ঘটনা ঘটে। গল্পটা আদনান শোনালেন এভাবে, ‘আমি একটা বিজ্ঞাপনচিত্রে অভিনয় করেছিলাম। আমাদের দেখা হয় সিলন চায়ের একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের শুটিং সেটে।

মেহজাবীন গিয়েছিল সিলন ব্র্যান্ডেরই আরেকটি পণ্যের কাজে। আমরা একই মেকআপ রুম শেয়ার করেছিলাম। শুরুতে বিশেষ গুরুত্ব দিইনি। মেহজাবীনকে দেখে মনে হয়েছিল সে বেশ মুডি। সারাক্ষণ মুখটা বাঁকিয়ে ফোনে কিছু টাইপ করছিল আর সে ভেবেছিল আমি বুঝি কোনো নতুন মডেল, যে খুব বেশি কথা বলে। কারণ, আমি ওই দিন সবার সঙ্গে তুমুল আড্ডা দিচ্ছিলাম। যেহেতু কাজ করছি, সেই সুবাদে আমি তখন অমিতাভ রেজার টিমের প্রায় সবাইকে চিনতাম।’

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রেমে রূপ নেয়, আর এখন তাঁরা পুরোপুরি সংসারী
ছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে

আদনান সবার সঙ্গে হাসি–আড্ডায় মেতে থাকলেও মেহজাবীন ঠিক তার বিপরীত। চুপচাপ, শান্ত স্বভাবের। কারও সঙ্গে মিশতে সময় লাগে, তবে একবার যদি মেশেন, সম্পর্কটা দীর্ঘ পথ পর্যন্ত গড়ায়। মেহজাবীনের কথায় তেমনটাই বোঝা গেল।

তিনি বললেন, ‘আমি আসলে আদনানের একদম বিপরীত। কারও সঙ্গে মিশতে আমার অনেক সময় লাগে। সেদিন মেকআপ রুমে অন্যদের সঙ্গে আদনানের অত কথা, মজা করা, জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব নেওয়া—সবই আমার বিরক্ত লাগছিল। ভাবছিলাম, এই ছেলেটা অ্যাক্টিং করতে এসে নিজেকে ডিরেক্টর ভাবছে কেন! আমি তখনো জানতাম না, এই ছেলেটাই ডিরেক্টর আদনান আল রাজীব।’

আরও পড়ুন

বন্ধুত্ব আর নেই বন্ধুত্বে

সময় গড়াতে থাকে, মেহজাবীন ও আদনানের মধ্যে মায়া বাড়তে থাকে। না দেখে থাকতে না পারার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাত জেগে কথা বলতে মন চায়। মেহজাবীন যে এলাকায় থাকতেন, সেখানে বারবার ছুটে যেতে মন চাইত আদনানের। একই অবস্থা হয় মেহজাবীনেরও। দুজনের বুঝতে বাকি থাকল না, তাঁরা আর বন্ধুত্বে নেই। সম্পর্কটা বন্ধুর চেয়ে আরেকটু এগিয়েছে। মেহজাবীন থাকতেন উত্তরায় আর আদনান নিকেতনে।

বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের সম্পর্কের প্রসঙ্গ উঠতেই আদনান বললেন, ‘আমাদের বন্ধুত্বটা ধীরে ধীরে, অনেক দিনে গড়ে ওঠে। অনুভূতিটাও দুজনেরই প্রায় একসঙ্গে আসে। যখন বুঝলাম বারবার দেখা করার ইচ্ছায় উত্তরা যেতে মন চায়, সারা দিন–রাত ফোনালাপ করতে ভালো লাগে, তখনই বুঝতে শুরু করলাম, অনুভূতিটা অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে।’

নাটক ও চলচ্চিত্রের ব্যস্ততা, শুটিংয়ের তাড়া—এসবের মধ্যেও তাঁরা একে অপরের সান্নিধ্যে জীবনের মুহূর্তগুলো উপভোগ করেন
ছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে

এদিকে বিয়ের পর আবেগঘন ফেসবুক পোস্টে মেহজাবীন লিখেছিলেন তাঁদের প্রেমের গল্প। তাঁর সেই গল্পটা এ রকম, ‘একটা ছেলে এসেছিল দেখা করতে; বাঁকা দাঁত, মিষ্টি হাসি। এক শুটিং হাউসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়েছিল।

মাত্র ১৫ মিনিট আমরা কথা বলি, এরপর সে চলে যায়; যাওয়ার সময় মনে হলো, আমার হৃদয়ের একটা অংশ যেন চলে গেল। ১৩ বছর পর, আমরা এখানে পৌঁছেছি। আমরা একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি, সব সাফল্য একসঙ্গে উদ্যাপন করেছি, দুঃসময় পেরিয়ে এসেছি।

সাত বছরের বন্ধুত্ব নাকি আজীবন স্থায়ী হয়; আমরা প্রায় দ্বিগুণ সময় পার করেছি। ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আমাদের বন্ধন চিরস্থায়ী হয়েছে, শপথ করেছি হাতে হাত রেখে চলব। আদনান আল রাজীব, জীবনের সেরা বন্ধু হিসেবে তোমাকে পছন্দ করেছি।’

আরও পড়ুন

সম্পর্কের গোপনীয়তা

আদনান সবার সঙ্গে হাসি–আড্ডায় মেতে থাকলেও মেহজাবীন ঠিক তার বিপরীত
ছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে

দুজনের কাজের ধরন আলাদা হলেও একই অঙ্গনে কাজের সুবাদে কমবেশি সবাই পরিচিত ছিলেন। তাই প্রেমের সম্পর্ক পেশাগত অঙ্গনে চর্চা হোক, এমনটা কখনোই চাননি দুজন। এ জন্য দুজন বেশ সাবধানী ছিলেন।

তাঁদের মতে, ‘আমরা দুজনই প্রাইভেসি পছন্দ করি।’ প্রশ্ন ছিল, দুজন একই অঙ্গনে কাজ করেন। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে এমন কোনো সময় ছিল কি, যখন ব্যক্তিগত সম্পর্কটা আড়াল করতে হয়েছে? আদনানের কথায় উত্তরটা উঠে এল এভাবে, ‘শুরুর প্রায় অনেকটা সময় আমরা বিষয়টা প্রকাশ্যে আনতে চাইনি। আমরা দুজনই ভীষণ প্রাইভেসি পছন্দ করি। কখনোই চাইনি আমাদের ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা হোক। একসঙ্গে খুব একটা কাজ হয়নি আমাদের, তারপরও কাজ বাদে আমাদের নিয়ে কথা হোক আমরা একদমই চাইনি। আমাদের কাছে কাজটাই ছিল মুখ্য; এখনো তা–ই।’

মুগ্ধতা দুজনের গুণ

প্রেমের সম্পর্ক পেশাগত অঙ্গনে চর্চা হোক, এমনটা কখনোই চাননি দুজন
ছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে

বন্ধুত্ব–প্রেম–ভালোবাসা শেষে সংসারজীবন চলছে এখন। দুজনের এই পথচলায় ভালোবাসা আর ত্যাগ একের সঙ্গে অপরকে আরও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে দিয়েছে। এই সময়ে সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতনের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁরা পাশে থেকেছেন একে অপরের পরিবারের জন্যও। নীরব ও নিরবচ্ছিন্ন ত্যাগে গড়ে উঠেছে তাঁদের সম্পর্কের শক্ত ভিত।

সেই অভিজ্ঞতার কথা মেহজাবীন শোনালেন, ‘আদনানের একটা ব্যাপার, যা আমার অনেক পছন্দ, তা হলো সে অনেক বেশি পরিবার অন্তঃপ্রাণ ছেলে। পরিবারই ওর প্রথম প্রাধান্য। অনেক ছোট বয়স থেকেই আদনান অনেক দায়িত্ববান। ওর এই গুণটা আমি অনেক ভালোবাসি। আমিও আমার পরিবারের বড় সন্তান। ত্যাগ শব্দটা আমাদের অনেক পরিচিত। আমি অনেকবার দেখেছি আদনানের ছোট ছোট ত্যাগ, যা সে নিজের অজান্তেই করে ফেলে এবং টেরও পায় না।’

এরই মধ্যে বৈবাহিক জীবন প্রায় ১ বছরে পরতে যাচ্ছে
ছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে

আদনান বলেন, ‘আমার ও আমার পরিবারের প্রতি মেহজাবীনের অসংখ্য ত্যাগ রয়েছে, যা বলে শেষ করা যাবে না। তাকে চেনার পর থেকে আমার জীবনের এমন কোনো খারাপ সময় নেই, যেটায় সে আমার অথবা আমার পরিবারের পাশে ছিল না। এ জন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমিও চেষ্টা করি সবভাবেই তার পাশে থাকতে, কিন্তু ওর মতো পারি না।’

আদনান ও মেহজাবীনের ত্যাগের গল্প নাটকীয়তার নয়। প্রতিদিনের জীবনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত আর দায়িত্বের প্রতিফলন বলে মনে করেন পরিচিতরা। পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, একে অপরের পাশে থাকা আর নিঃস্বার্থ সমর্থনই তাঁদের সম্পর্ককে আলাদা করে তোলে।

আরও পড়ুন

আদনানের প্রেরণায় মেহজাবীন

একসঙ্গে চলার পথে কোনো সম্পর্কই সব সময় মসৃণ থাকে না। সময়ের সঙ্গে আসে চাপ, ভুল–বোঝাবুঝি আর কঠিন সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। তখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসে, একসঙ্গে থাকা সহজ নাকি আলাদা হয়ে যাওয়া?

আদনান বলেন, ‘মেহজাবীনের মতো শক্ত চিন্তার মানুষ পাশে থাকলে কঠিন সময়ও সহজ হয়ে যায়। তার চিন্তাধারা রেললাইনের মতো সমান্তরাল, স্থিত, পরিষ্কার। আলাদা হওয়া কখনোই সহজ বলে ভাবিনি। শুধু এটুকু জানতাম, একসঙ্গে থাকতে হলে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, বিশ্বাস আর সম্মান থাকা জরুরি। এই তিনটা দিয়ে একটি জীবন আরামসে পার করা যায়।’

বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে দাম্পত্য সম্পর্কে পা রাখেন মেহজাবীন আর আদনান
ছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে

আদনানের কাছে কঠিন সময় মানে সম্পর্কের ভাঙন নয়; বরং একে অপরকে আরও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা। সংকটের সময়ে শান্ত, স্থিরচিন্তার সঙ্গী পাশে থাকলে আলাদা হওয়ার ভাবনা আর সহজ মনে হয় না। বরং তখনই বোঝা যায়, একসঙ্গেই সবকিছু সামলে নেওয়াই আসল শক্তি, এমন মতামত মেহজাবীনেরও।

বিয়ের আগে যা শুনেছেন

বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন দাম্পত্য সম্পর্কে পা রাখা হয়, তখন অনেকের মনেই নতুন করে অজানা শঙ্কা কাজ করে। সংসারজীবনের ভিন্ন বাস্তবতা অনেককে ভীত করে। তবে আদনান ও মেহজাবীনের কাছে এই নতুন পরিচয় কোনো হঠাৎ পরিবর্তন নয়, বহুদিনের প্রস্তুতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

আদনান বললেন, ‘বিয়ের ব্যাপারটা বেশ মজার। বিয়ের আগে মানুষের কাছ থেকে নানা রকম পরামর্শ শুনেছি। অনেকে বলেন, মানুষ বদলে যায়, সংসারজীবন আলাদা। স্মুথ ট্রানজিশনের কারণে এগুলো আমরা এখনো ফেস করিনি। গত ১৩ বছরে আমাদের একটাই পরিকল্পনা ছিল, কীভাবে সংসারটা সুন্দরভাবে মেইনটেইন করা যায়। এখন তো মনে হয়, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই চলে আমাদের ফ্যামিলি গেট টুগেদার। দুই পরিবারকে আলাদা করে, শুধু ফরমালিটিতে না রেখে একটা পরিবার হিসেবে দেখলেই সবটা সহজ হয়ে যায়। অনেকে হয়তো বলবেন, সামনে বুঝবে। আমরা সেই “সামনের দিনগুলোকে” বুঝতেই চাই।’

আদনান ও মেহজাবীনের জীবনের এই পরিবর্তন তাঁরা সামলাচ্ছেন পারস্পরিক সমর্থনের মাধ্যমে
ছবি: অভিনেত্রীর সৌজন্যে

বিয়ের পর

শুধু একে অপরের সঙ্গে থাকা নয়, দায়িত্ব ভাগাভাগি করার বিষয়টিও সামনে আসে বিয়ের পর। আদনান ও মেহজাবীনের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন এসেছে, যেটা তাঁরা সামলাচ্ছেন পারস্পরিক সমর্থনের মাধ্যমে।

আদনান বললেন, ‘দায়িত্বটা আসলে মেহজাবীনই নিচ্ছে বেশি। আমার বাড়ি, ওর বাড়ি, নিজের বিষয়—সবই সে দেখে। এই সুযোগে আমি নিজের কাজটা করি। যেদিন সে বলবে যে কোনো কিছুতে আমাকে দরকার, সে জানে আমি সঙ্গে সঙ্গে তার পাশে দাঁড়াব।’

(লেখাটি প্রথম আলোর বিশেষ ম্যগাজিন ‘বর্ণিল বিয়ে’ জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)

আরও পড়ুন