সবচেয়ে জরুরি মুহূর্তে আমার স্ত্রীর বুদ্ধিই কেন বেশি কাজে লাগে
ড. টমাস জেফরি মার্কিন মনোবিজ্ঞানী, থেরাপিস্ট ও লেখক। তিনি মূলত পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য, আবেগের প্রকাশ, পরিচয়সংকট ও ব্যক্তিগত বিকাশ নিয়ে কাজ করেন। ‘সাইকোলজি টুডে’তে ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন তিনি। লেখাটি তাঁর ভাষায় পড়ুন। তারপর এই লেখার আলোকে পড়ুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট রাউফুন নাহার–এর বিশ্লেষণ ও মতামত
‘প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা কী? কখন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয় না, তা জানা। আর সে রকম পরিস্থিতিতে নিজেকে সংবরণ করে পরিণত আচরণ করা।
‘আমি নিজেকে বুদ্ধিমানই মনে করি। অন্তত এত দিন তা–ই ভেবে এসেছি। আমি দ্রুত ভাবতে পারি। খুব সহজেই নানা বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পাই। অনেক সময় অন্যরা প্রশ্নটা শেষ করার আগেই আমার মাথায় উত্তর চলে আসে। আমাদের অনেকের কাছেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ বলে মনে হয়। আমারও তা–ই মনে হতো। কিন্তু একটা সময় বুঝেছি, সব সময় তা সত্যি নয়।
‘আমার স্ত্রীর মধ্যে এমন একধরনের বুদ্ধিমত্তা আছে, যা একসময় আমাকে বিরক্ত করত। সে হুট করেই থামে। বিরতি নেয়। আর তা কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের জন্য নয়। কখনো কখনো তা আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। ইচ্ছা করে নীরবতার তীব্র ফাঁকটা আমি নিজেই জোর পূরণ করে দিই।
‘কিন্তু সে কোনো তাড়াহুড়া করে না। বিষয়টা নিয়ে কিছুক্ষণ থাকে। তারপর ঠান্ডা মাথায় ভাবে। আপনি যদি আমার মতো হন, যিনি বুদ্ধিমত্তাকে গতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন, তাহলে এই বিরতি আপনার মনে অস্বস্তি আর দ্বিধা তৈরি করতে পারে। মনে হতে পারে যেন ইঞ্জিন চলছে, কিন্তু গাড়ি কোথাও যাচ্ছে না।
‘আমাদের অনেকেরই বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে ধারণাটা একটু পক্ষপাতদুষ্ট। আমরা ভাবি, সবচেয়ে বেশি জানাই বুদ্ধিমত্তা। সবচেয়ে বেশি নম্বর পাওয়া, সবচেয়ে দ্রুত কথা বলা কিংবা বিতর্কে জিতে যাওয়াই বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ। যেন দ্রুততা আর প্রজ্ঞা একই জিনিস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝেছি, সবচেয়ে আগে উত্তর দেওয়া আর সবচেয়ে ভালো উত্তর দেওয়া এক কথা নয়।
‘স্টোয়িক (প্রাচীন গ্রিস ও রোমের একটি ব্যবহারিক জীবনদর্শন) দার্শনিকেরা বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখতেন। তাঁদের মতে, বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় পরিচয় আপনি কতটা জানেন, তা নয়। বরং আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান, সেটাই আসল।
‘রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের জীবনে চাপ আর প্রত্যাশার শেষ ছিল না। স্বীকার করছি, তাঁর আশপাশে অসাধারণ মেধাবী মানুষও ছিল দেদার। কিন্তু তিনি সবার থেকে আলাদা। কেননা, পরিস্থিতি নিজের মতো না চললেও তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলতেন না। নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতেন। এই গুণটাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দিকনির্দেশনা ছাড়া শক্তি শেষ পর্যন্ত ক্ষতিই ডেকে আনে। আমি প্রায়ই সেই প্রথম ঘোড়াটির মতো। তাই আমি আমার লাগামটি স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছি। আমি যখন দ্রুত এগোতে চাই, সে তখন একটু থামায়।
‘ধরুন, দুজন ব্যক্তি একসঙ্গে একই খারাপ খবর শুনলেন। একজন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখালেন। সমস্যা ঠিক করে ফেলার তাড়া থেকে কিছু একটা করার চেষ্টা করলেন। ব্যাপারটা এমন যে এক্ষুনি কিছু না কিছু করতেই হবে।
‘বাইরে থেকে সেটাকে খুব কার্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু তাড়াহুড়ায় সাধারণত এমন কথা বলা হয়, যা বলা উচিত ছিল না। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা পরে ভুল প্রমাণিত হয়।
‘অন্যজন চট করে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে থামলেন। উদাসীন বলে নয়। বরং বিষয়টি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলেই। তিনি নিজের অনুভূতিটাকে একটু জায়গা দিলেন। আর সেই ছোট্ট বিরতির মধ্যেই কিছু একটা ইতিবাচক পরিবর্তন এল। কাগজে-কলমে দুজনের বুদ্ধিমত্তা হয়তো একই। কিন্তু ফল এক নয়।
‘একটি রথকে টানছে দুটি ঘোড়া। একটি শক্তিশালী, দ্রুত, অস্থির। সামান্য ইশারাতেই ছুটে যেতে চায়। অন্যটি শান্ত, নিয়ন্ত্রিত, স্থির। রথচালকের কাজ প্রথম ঘোড়াটিকে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
‘কারণ, দিকনির্দেশনা ছাড়া শক্তি শেষ পর্যন্ত ক্ষতিই ডেকে আনে। আমি প্রায়ই সেই প্রথম ঘোড়াটির মতো। তাই আমি আমার লাগামটি স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছি। আমি যখন দ্রুত এগোতে চাই, সে তখন একটু থামায়। একটা খুব সাধারণ প্রশ্ন করে—“আসলে এখানে কী ঘটছে?” এই একটি প্রশ্ন আমাকে কতবার যে ভুল সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে এনেছে, তা গুনে বলা কঠিন।
‘দার্শনিক এপিকটিটাস বলেছিলেন, “আপনার সঙ্গে কী ঘটল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি তার প্রতিক্রিয়া কীভাবে জানালেন।” বিষয়টি শুনতে সহজ। বাস্তবে মোটেও সহজ নয়। কারণ, কোনো ঘটনা ঘটার পর আর আপনার প্রতিক্রিয়ার মাঝখানে একটি ছোট্ট ফাঁক থাকে। সেই ফাঁকেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত উত্তর।
‘গরম কোনো জিনিসের কথা ভাবুন। খুব তাড়াতাড়ি ধরলে হাত পুড়ে যাবে। আবার অনেক দেরি করলে সেটি ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক সময়ে ধরতে পারলে সেটিকে নিজের মতো গড়ে নেওয়া যায়। অনুভূতিগুলোও অনেকটা এমন।
‘খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিলে তা এমন জায়গায় চলে যায়, যেটা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যেখানে আপনি বিষয়টিকে নিতে চাননি। আবার খুব বেশি দেরি করলেও মুহূর্তটা হারিয়ে যায়। কিন্তু যথেষ্ট সময় নিয়ে, স্থির থেকে, সেটিকে অন্যভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমার স্ত্রী ঠিক সেটাই করে। তাঁর নিজেকে প্রমাণ করার তাড়া নেই। জিততেই হবে, এই মানসিকতাই তাঁর নেই।
‘আবেগের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কাঁচা বুদ্ধিমত্তা দেখতে হয়তো চমৎকার লাগে। কিন্তু তা বেশির ভাগ সময় সমস্যা বাড়ায়, কমায় না। আমি নিজের জীবনেই সেটা দেখেছি। খুব দ্রুত এগোতে গিয়ে আদতে কী প্রয়োজন ছিল, সেটাই মিস করে গেছি।
‘আমার স্ত্রী সেটা করে না। সে প্রতিক্রিয়া জানায়। আর যখন জানায়, সেটি ঠিক জায়গায় গিয়ে পৌঁছায়। সেটা জোরে নয়, ধারালো নয়; বরং আরও নির্ভুল আর কার্যকরভাবে।
‘তাই হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে আমার স্ত্রী আমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান। সে বেশি জানে বলে নয়। আর দ্রুত ভাবে বলেও নয়। বরং সে জানে, কখন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত নয়।’
ওপরের লেখার আলোকে মনোবিজ্ঞানীর কিছু কথা
রাউফুন নাহার
সহকারী অধ্যাপক, এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট
বিষয়টি অবশ্যই ব্যক্তিভেদে আলাদা। এটি ড. টমাস জেফরির ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা। তবে কখনোই ঢালাওভাবে বলা যাবে না যে সমস্যা সমাধানে নারীরা বেশি পজ-প্র্যাকটিস করেন, পুরুষেরা কম। এ রকম কোনো গবেষণা নেই। বরং যেসব গবেষণা আছে, সেখানে বিভিন্ন ধরনের ফলাফল উঠে এসেছে।
আমাদের মস্তিষ্কের একটা অংশ আবেগ দ্বারা তাড়িত। তবে পজ-প্র্যাকটিস করলে সাধারণত সমস্যা সমাধানকারী যৌক্তিক অংশকে সঙ্গে নিয়ে আবেগ ও যুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে সঠিক, টেকসই, ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
আমরা সাধারণভাবে বলি যে ‘যত গতি তত ক্ষতি’। এটা ওপরে যে ঘোড়ার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে মিলে যায়। যে সিদ্ধান্ত যত দ্রুত নেওয়া হয়, সেটি ভুল হওয়ার আশঙ্কা তত বেশি। তাই গতিটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই জরুরি।
নারী না পুরুষ কারা বেশি পজ-প্র্যাকটিস করে
এ বিষয়ে জাজমেন্টে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেননা, অ্যাটাচমেন্ট থিওরি অনুসারে, নারীদের ভেতরে আবেগীয় সত্তার বেশি ব্যবহার, আঁকড়ে ধরার প্রবণতা বা সম্পর্কে আবেগীয়ভাবে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বেশি লক্ষণীয়। আমাদের মতো রক্ষণশীল সমাজের জন্য তা আরও বেশি প্রযোজ্য।
অন্যদিকে পুরুষদের অ্যাটাচমেন্ট অনেকটা ‘এভয়ডেন্ট’ ধরনের। একটু দূরত্ব রেখে চলা, প্র্যাকটিক্যাল চিন্তা করা বা সহজে কাট অফ করার প্রবণতা লক্ষণীয়।
পার্থক্যটা কোথায়
নারী সয়ে নিতে চায়। নারী চায় যে পুরুষ তাঁর কথা শুনুক, সময় দিক। অন্যদিকে পুরুষের ব্যাপারটা হলো ‘এই আছি, এই নাই’। এর পেছনে আছে মেয়েশিশু আর ছেলেশিশুর বেলায় প্যারেন্টিংয়ে ভিন্নতা। আবার কিছু হরমোনাল ব্যাপারও প্রভাব ফেলে।
মেয়েদের ভেতরে অক্সিটোসিন হরমোনের প্রভাবে সহানুভূতির আবেগ বেশি কাজ করে। ইস্ট্রোজেন হরমোনের কারণে মায়া বা সন্তানের সঙ্গে আবেগ ও ভালোবাসার বন্ধন তৈরিতে সাহায্য করে। আবার গবেষণায় দেখা গেছে, একটা ছেলেশিশুকে যদি প্যারেন্টিংয়ের সময় থেকেই সহানুভূতি, মায়া, আবেগের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ শেখানো হয়, তার ভেতরে অক্সিটোসিন, ইস্ট্রোজেন হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়।
একই ব্যাপার ঘটে নতুন বাবারা যখন সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর সঙ্গে সময় কাটান। তখন তাঁদের ভেতরেও এই সহানুভূতি, মায়া, বন্ধনের অনুভূতি বেশি কাজ করে।
শেষ কথা
এককথায়, পুরো ব্যাপারটা যথেষ্ট জটিল। তাই হুট করে মন্তব্য করা কঠিন। তবে কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি সব সময় কেবল যৌক্তিক অংশ ব্যবহার করাও ‘টক্সিক পজিটিভিটি’। এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটিয়েই পরিস্থিতি বুঝে প্রতিক্রিয়া দেখানোই সমীচীন।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে