গ্রে ডিভোর্সে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানটির কথা ভাবছেন তো?

বিশ্বের অনেক দেশেই বয়স্ক দম্পতিদের অসুখী দাম্পত্য জীবন কাটানোর আগ্রহ কমে যাচ্ছে
ছবি: পেক্সেলস

জীবনের শেষভাগে এসে দাম্পত্য সম্পর্কে ইতি টানার ঘটনা দিন দিন যেন সাধারণ হয়ে উঠছে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে পুরো পরিবারের ওপর। বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ওপর মা–বাবার সম্পর্কে ভাঙনের এই প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা।
যুক্তরাষ্ট্রে বিবাহবিচ্ছেদের হার পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। দেশটিতে গত চার দশকে তরুণ দম্পতিদের বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা অনেক হ্রাস পেলেও পঁয়ষট্টি এবং তার চেয়েও বেশি বয়সী দম্পতিদের মধ্যে এই হার ক্রমেই বাড়ছে।

বর্তমানে দেশটিতে বিবাহবিচ্ছেদকারী প্রায় ৩৬ শতাংশ মানুষের বয়স পঞ্চাশ বছর বা তার বেশি। যেখানে ১৯৯০ সালে এই হার ছিল মাত্র ৮.৭ শতাংশ। এটিই মূলত ‘গ্রে ডিভোর্স’  বা ‘ধূসর বিবাহবিচ্ছেদ’ নামে পরিচিত।

মা-বাবা দুটি পক্ষের টানাপোড়েনের মধ্যে সন্তানেরা দমবন্ধ অনুভূতিতে আটকে পড়ে
ছবি: পেক্সেলস

গবেষণা অনুসারে জীবনের শেষভাগে এসে বিবাহবিচ্ছেদের এই প্রবণতার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রথমত মানুষের জীবনকাল দীর্ঘ হওয়ায় বয়স্ক দম্পতিদের মধ্যে আগের তুলনায় অসুখী দাম্পত্যজীবন টেনে বেড়ানোর আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

এই ধূসর বিবাহবিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়া কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিশ্বজুড়ে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যেও লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০০০ সালের পর থেকে কোরিয়াতেও বয়স্কদের মধ্যে ‘হোয়াং-হন’ বিবাহবিচ্ছেদ বা গোধূলি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে।

কোরীয় নারী-পুরুষের গড় আয়ু ৮০ বছরের বেশি হওয়ায় ৫০ ও ৬০–এর দশকের মধ্যে যাঁরা আছেন তাঁদের আরও ৩০ বা ৪০ বছর বেঁচে থাকার জোরালো সম্ভাবনা থাকে। এ কারণে অনেকেই অপ্রাপ্তির দাম্পত্যজীবনের ইতি ঘটিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনার কথা ভাবেন, যা ধূসর বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম কারণ।

আরও পড়ুন
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মা-বাবার মধ্যে পুত্রসন্তানের চেয়ে কন্যাসন্তানের প্রতি মানসিক সহায়তা আশা করার প্রবণতা বেশি
ছবি: পেক্সেলস

১৯৯০ সাল থেকে জাপানেও পরিণত বয়সে বিবাহবিচ্ছেদের হার২২ শতাংশ।
ছোট শিশুদের জীবনে মা–বাবার বিচ্ছেদের প্রভাব নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ওপর ডিভোর্সের প্রভাব নিয়ে গবেষণা বলতে গেলে উপেক্ষিত।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বিবাহ ও পারিবারিক থেরাপিস্ট এবং হোম উইল নেভার বি দ্য সেম অ্যাগেইন: আ গাইড ফর অ্যাডাল্ট চিলড্রেন অব গ্রে ডিভোর্স–এর সহলেখিকা ক্যারল হিউজ বলেন, অনেকবার তিনি প্রাপ্তবয়স্ক বাচ্চাদের মা–বাবার বিচ্ছেদের পর বলতে শুনেছেন, যে পরিবারকে তাদের কাছে পাহাড়ের মতো দৃঢ় মনে হতো, ভূমিকম্পের আঘাতে যেন তা চূর্ণ–বিচূর্ণ হয়ে গেছে।

মা–বাবার বিয়ে ভেঙে যাওয়া পরিবারের সন্তানদের মধ্যে পরিচয়সংকট প্রবলভাবে দেখা দেয়। এ কারণে ওই পরিবারের সন্তানদের মধ্যেও সম্পর্ক বা এনগেজমেন্ট ভেঙে দেওয়ার ঘটনাও অনেক বেশি লক্ষ করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার কুটজ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জোলিন গ্রিনউড ভেঙে যাওয়া পরিবারের ৪০ জন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সাক্ষাৎকার নেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দুটি পক্ষের টানাপোড়েনের মধ্যে সন্তানরা দমবন্ধ অনুভূতিতে আটকে পড়ে।

এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের বয়স ১৮ বছরের বেশি হলে অনেক মা–বাবাই সন্তানদের মানসিকভাবে তাঁদের সমকক্ষ, বন্ধু বা আস্থাভাজন হিসেবে দেখতে চান। আবার পুত্রসন্তানের চেয়ে কন্যাসন্তানের প্রতি নির্ভরশীলতা বা মানসিক সহায়তা আশা করার প্রবণতা মা–বাবার মধ্যে বেশি।

আরও পড়ুন
বেশির ভাগ সময়ই বিচ্ছেদের পর সন্তানের সঙ্গে বাবার দূরত্ব বাড়ে
ছবি: পেক্সেলস

কিন্তু এতে সন্তানদের মধ্যে মা–বাবার সঙ্গে সম্পর্কের সীমা বা পরিধি নিয়ে মানসিক সংকট তৈরি হয়। যেমন মা-বাবা তাদের কাছে ডেটিং পরামর্শ বা যৌন পরামর্শ চাইলে তারা একটি কঠিন ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদেরও এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যাপারে তেমন ধারণা থাকে না।
যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসি বিভাগের অধ্যাপক জোসেলিন এলিস ক্রাউলি বলেন, সন্তান পালন ও পরিবার দেখাশোনা করতে গিয়ে অনেক নারীই চাকরিবিহীন থাকেন বা চাকরি থেকে বিরতি নেন। তাই বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলে হঠাৎ করেই একটা আর্থিক সংকট তৈরি হয়। অন্যদিকে সাধারণত সামাজিকতা ও আত্মীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে পরিবারের গৃহকর্ত্রী বা স্ত্রীরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

স্বামীরা সামাজিক জীবনে স্ত্রীদের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। তাই যখন বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে তখন স্বামীরা তাঁদের সামাজিক যোগসূত্র ও যোগাযোগ হারিয়ে একা হয়ে যান। এমনকি সন্তানদের সঙ্গেও তাঁদের যোগাযোগ কমে যায়। প্রায়শই সন্তানরা মায়ের সঙ্গে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

আরও পড়ুন
পঁয়ষট্টি এবং তার চেয়ে বেশি বয়সী দম্পতিদের মধ্যে গ্রে ডিভোর্সের হার বাড়ছে
ছবি: পেক্সেলস

ক্রাউলি বলেন, বিভিন্ন দেশে কয়েক দশকের গবেষণায় ধূসর বিবাহবিচ্ছেদের পর প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের মধ্যে ম্যাট্রিফোকাল ঝোঁক (বিবাহবিচ্ছেদের পর শিশুদের মায়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে) লক্ষ করা গেছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ধূসর বিবাহবিচ্ছেদ যোগাযোগ ও মানসিক ঘনিষ্ঠতার দিক থেকে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের মায়ের আরও কাছে নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে পিতার সঙ্গে বন্ধনকে দুর্বল করে দিয়েছে।

অন্য একটি গবেষণায় সন্তানদের প্রতি সমর্থন ও আর্থিক ভরণপোষণ বাড়ানোর পরেও বাবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ কমে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। অনেক সময় সন্তানরা মা-বাবার দ্বন্দ্বে না জড়ানোর জন্যও যোগাযোগ কমিয়ে দিতে পারে। পারিবারিক সম্পর্কে এ ধরনের ছন্দপতন মা-বাবার পাশাপাশি সন্তানদের সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলে।

পরিশেষে কোনো পরিবারেই বিবাহবিচ্ছেদ আকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নয়। যদিও প্রত্যেক পরিবারের গল্প ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কিছু ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বপূর্ণ, অস্বস্তিকর পারিবারিক আবহ থেকে স্বস্তি পেতে সন্তানরাও বিচ্ছেদকে সমর্থন জানাতে পারে। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে একটি বিচ্ছেদের ঘটনায় মা-বাবার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানদেরও একটি বেদনাদায়ক পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করতে হয়।

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন