প্রয়াত স্বামীর কণ্ঠ শুনতে প্রতিদিন যেতেন মেট্রোস্টেশনে, তারপর...
লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ের এক স্টেশনে ট্রেন ঢোকার আগে একটা পরিচিত ঘোষণা ভেসে আসে, ‘মাইন্ড দ্য গ্যাপ’। বাংলায় যার অর্থ, ট্রেন আর প্ল্যাটফর্মের মাঝখানের ফাঁকটির দিকে খেয়াল রাখুন। প্রতিদিন লাখো যাত্রী এই ঘোষণা শোনেন। বেশির ভাগের কাছেই এটি কেবল একটি নিরাপত্তাবার্তা। ট্রেনে ওঠার তাড়ায় কজনই–বা কণ্ঠটা আলাদা করে মনে রাখেন? কিন্তু একজন নারীর কাছে এ কয়েকটি শব্দই ছিল তাঁর প্রয়াত স্বামীর সঙ্গে ‘দেখা করার’ একমাত্র উপায়।
স্বামী মারা যাওয়ার পর মার্গারেট ম্যাককলাম প্রায়ই লন্ডনের এমব্যাঙ্কমেন্ট স্টেশনে চলে যেতেন। কোনো কাজ ছিল না, কোথাও যাওয়ার তাড়া ছিল না; শুধু একটা ট্রেন আসার অপেক্ষায় বসে থাকতেন।
তারপর স্পিকারে ভেসে আসত সেই পরিচিত কণ্ঠ, ‘মাইন্ড দ্য গ্যাপ’। ওটাই ছিল তাঁর স্বামী অসওয়াল্ড লরেন্সের কণ্ঠ।
‘ও গানঅলা আরেকটা গান গাও
আমার আর কোথাও যাবার নেই
কিচ্ছু করার নেই…।’
মার্গারেটের এই গল্প কবির সুমনের গাওয়া গানটার কথাই মনে করিয়ে দেয়, তাই না?
একদিন হঠাৎ কণ্ঠটা হারিয়ে গেল
অসওয়াল্ড লরেন্স ছিলেন মঞ্চাভিনেতা। সত্তরের দশকে লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডের জন্য তিনি এই ঘোষণা রেকর্ড করেছিলেন। কয়েক দশক ধরে অসংখ্য যাত্রী তাঁর কণ্ঠ শুনে ট্রেনে উঠেছেন, অথচ খুব কম মানুষই জানতেন, সেই কণ্ঠটা আদতে কার। অসওয়াল্ড মারা যান ২০০৭ সালে।
এরপর থেকে তাঁর অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক স্ত্রী ডা. মার্গারেট ম্যাককলাম সুযোগ পেলেই এমব্যাঙ্কমেন্ট স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করতেন। কখনো কখনো শুধু স্বামীর কণ্ঠ আরেকবার শোনার জন্য একটা ট্রেন চলে যেতে দিতেন, পরের ট্রেনের অপেক্ষা করতেন।
কিন্তু ২০১২ সালের একদিন তিনি স্টেশনে এসে শুনলেন, সেই পরিচিত কণ্ঠ আর নেই। লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড নতুন ডিজিটাল ঘোষণাব্যবস্থা চালু করেছে। বদলে ফেলা হয়েছে পুরোনো সব রেকর্ডিং।
পরে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্গারেট বলেছিলেন, ‘আমি যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। অসওয়াল্ড আর সেখানে ছিল না।’
একটা অনুরোধ
মার্গারেট ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডনের (টিএফএল) কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর অনুরোধ ছিল, ‘আমার স্বামীর কণ্ঠের সেই রেকর্ডিংটা কি আরেকবার পাওয়া যাবে?’
প্রথমে কর্মকর্তারা ভেবেছিলেন, সেটি আর নেই। বহু বছর আগে টেপে ধারণ করা সেই রেকর্ডিং হয়তো হারিয়েই গেছে। তবু তাঁরা খুঁজতে শুরু করলেন। অবশেষে সংরক্ষণাগারের পুরোনো টেপের মধ্য থেকে খুঁজে পাওয়া গেল অসওয়াল্ডের কণ্ঠ।
কর্মকর্তারা শুধু সেই রেকর্ডিংয়ের একটি কপি মার্গারেটকে দিলেন না, আরও একটি সিদ্ধান্ত নিলেন। এমব্যাঙ্কমেন্ট স্টেশনের উত্তরমুখী নর্দার্ন লাইন প্ল্যাটফর্মে আবার ফিরিয়ে আনা হলো অসওয়াল্ড লরেন্সের সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা।
আজও সেখানে ট্রেন এলে শোনা যায়—‘মাইন্ড দ্য গ্যাপ’।
নতুন ভিডিওতে পুরোনো গল্প
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মার্কিন কনটেন্ট নির্মাতা রেড বাস রাস এমব্যাঙ্কমেন্ট স্টেশনে এসে একটি বিষয় খেয়াল করেন। এখানকার ঘোষণার কণ্ঠ অন্য স্টেশনগুলোর মতো নয়। কৌতূহল থেকে বিষয়টি খুঁজতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন মার্গারেট ও অসওয়াল্ডের এই গল্প।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর হাজারো মানুষ মন্তব্য করে নিজেদের অনুভূতি জানাতে থাকেন।
একজন লিখেছেন, ‘আমি প্রতিদিন এমব্যাঙ্কমেন্ট স্টেশন দিয়েই যাতায়াত করি। কখনো খেয়ালই করিনি যে এখানকার কণ্ঠ অন্য রকম। গল্পটা জানার পর ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডনের প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল।’
আরেকজন লিখেছেন, ‘এখন বুঝতে পারছি, কেন কণ্ঠটা এত পরিচিত লাগছিল। ১৯৮৫ সালের পর নিয়মিত টিউবে চড়া হয়নি। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, সত্তর ও আশির দশকে পুরো টিউব নেটওয়ার্কেই এই কণ্ঠ ব্যবহার করা হতো। তাই এত বছর পরও শুনে মনে হলো, যেন বহুদিনের চেনা একজন কথা বলছেন।’
মার্গারেট কি বেঁচে আছেন
নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, ডা. মার্গারেট ম্যাককলাম জীবিত। নীরবে–নিভৃতে থাকেন। সম্প্রতি তাঁকে নিয়ে একাধিক লেখা ও তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
মার্গারেট ছিলেন মূলত জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) বা পারিবারিক চিকিৎসক। ১৯৯২ সালে মরক্কো ভ্রমণে তাঁর পরিচয় হয় মঞ্চাভিনেতা অসওয়াল্ড লরেন্সের সঙ্গে। তখন অসওয়াল্ড অভিনয় ছেড়ে একটি ট্যুর ও ক্রুজ কোম্পানিতে কাজ করছিলেন।
সেই পরিচয় থেকেই ভালোবাসা, তারপর সংসার। উত্তর লন্ডনে সুখেই কাটছিল তাঁদের জীবন। কিন্তু ২০০৭ সালে অসওয়াল্ড মারা গেলে মার্গারেটের জীবনে নেমে আসে গভীর শূন্যতা।
শুধু একটি ঘোষণা নয়
আজও এমব্যাঙ্কমেন্ট স্টেশনে ট্রেন ঢোকার আগে শোনা যায় সেই কণ্ঠ। হয়তো হাজারো যাত্রীর কাছে এটি কেবলই একটি ঘোষণা কিংবা নিরাপত্তা–বার্তা; কিন্তু মার্গারেট ম্যাককলামের কাছে সেটি প্রিয় মানুষের রেখে যাওয়া এক অমলিন স্মৃতি।
সূত্র: বিবিসি ও মাই লন্ডন