প্রশ্ন: আমি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। একটা ছেলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল প্রায় তিন বছর। আমরা সমবয়সী, একই বিদ্যালয়ে চার বছর পড়েছি। আমাদের ধর্ম আলাদা। আবেগের বশে কোনো কিছু না ভেবেই তিন বছর সম্পর্ক চালিয়ে গেছি, এক মুহূর্তের জন্যও ভাবিনি আমাদের এই প্রেমের পরিণতি কী হবে। সে চায় সব ছেড়েছুড়ে আমি তার কাছে যাই। কিন্তু আমার পরিবার কখনো ভিন্নধর্মী একজনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক মেনে নেবে না। বাসায় মাকে আমি জানিয়েছি। মা বলেছেন, যোগাযোগ বন্ধ করলেই একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে। পাঁচ মাস যোগাযোগ বন্ধ করে রেখেছিলাম। তবু কেউ কাউকেই ভুলতে পারিনি। কদিন আগে জানতে পারি, সে ভালো নেই, সিগারেট খাওয়া শুরু করেছে। শোনার পর থেকে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছি। আমি সব মেনে নেওয়ার চেষ্টা করলেও সে কোনোভাবে মানতে পারছে না। সত্যিই সে আমাকে অনেক ভালোবাসে। সে বলছে, ভর্তি পরীক্ষার পর তার পরিবার আমার পরিবারকে সব জানাবে। কিন্তু আমি জানি এতে হিতে বিপরীত হবে। নানা ব্যস্ততায় ভালো থাকার চেষ্টা করছি কিন্তু যখনই ভাবি সে ভালো নেই, অপরাধী লাগে। যদি এমন হতো সে সব মেনে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে, তবেই শান্তি লাগত। এখন আমি কী করি?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

উত্তর: এই বিচ্ছিন্নতা তোমাদের দুজনের জন্যই যে খুব পীড়াদায়ক, সহজেই তা অনুমেয়। অল্প বয়সে লম্বা সময়ের জন্য রোমান্টিক সম্পর্কে ছিলে। কৈশোরের অনুভূতিগুলো খুব তীব্র থাকে বলে ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তিসংগতভাবে চিন্তা করতে পারোনি। পরিবার ও সমাজের বাকি মানুষদের ভিন্নধর্মী দুজনের সম্পর্ক নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সে ব্যাপারে মনোযোগী হওয়াও সম্ভব হয়নি। তবে এই বিষয়ে তোমাদের দুজনকেই প্রশংসা করছি যে, ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয়টি যে অনেক সমস্যার কারণ হবে, তা নিয়ে দেরিতে হলেও সচেতন হয়েছ। ছেলেটি যখন সিদ্ধান্ত দিল, পরিণত বয়সে সবকিছু ছেড়ে ওর কাছে চলে যাবে তুমি, তোমার কাছে এটিও হয়তো খুব একটা বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত মনে হয়নি।

যে বিষয়টি তোমাদের কারও মাথায়ই আসেনি, তা হচ্ছে, প্রেমের সম্পর্ক আসলে মাদকাসক্তির মতো। হঠাৎ করে মাদক ছেড়ে দিলে যেমন শরীর ও মনে ভয়ংকর উপসর্গ দেখা দেয়, হুট করে সম্পর্ক বন্ধ করে দিলেও তেমনি অনেক কষ্ট হতে থাকে। পারস্পরিক নির্ভরশীলতার আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসা অনেকের জন্যই খুব কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের মস্তিষ্কের যে কেন্দ্রটি ভালোবাসার সম্পর্কের মাদক গ্রহণ করে, হঠাৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে সেটি বঞ্চিত হয়েছে। তুমি তো তবু মাকে কথাটি জানিয়ে কিছুটা হালকা হতে পেরেছ। ছেলেটি কি তার মা বা পরিবারের আর কাউকে জানিয়েছে? ব্যক্তিগত বিষয়গুলো ছেলেরা সাধারণত খুব একটা শেয়ার করতে চায় না। ফলে তাদের মানসিক পীড়াও হয় অনেক বেশি। বন্ধুবান্ধবের কাছে মেয়েরা তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা করতে খুব একটা দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু ছেলেরা সেগুলো ভেতরেই পুষে রাখে। আর সে কারণে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মাদক বা সিগারেটে আসক্ত হওয়ার ঘটনা অনেক বেশি।

ভর্তি পরীক্ষার পর বাড়ি থেকে প্রস্তাব নিয়ে আসার যে পরিকল্পনা ছেলেটি নিচ্ছে, সেটি কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা নিয়ে তোমরা ভালো করে ভেবে দেখবে। তোমাদের কিশোর বয়সের মনটি কিন্তু প্রাপ্তবয়সে গিয়ে অনেক পরিবর্তিত হয়ে যাবে। দুজনের সঙ্গেই অনেক মানুষের পরিচয় ঘটবে, তোমাদের ভাবনা ও জ্ঞানের জগতের পরিসর আরও বাড়বে। তাই এখনই পাকাপোক্ত কোনো বন্দোবস্তের কথা না ভাবলেই ভালো। তার চেয়ে বরং দুজনের ভবিষ্যৎ জীবনটি সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য যা যা করণীয়, সেগুলোর প্রতি একটু মনোযোগী হতে চেষ্টা করো।

ছেলেটি যে সিগারেটে আসক্ত হয়েছে, সেটির দায়িত্ব ওকেই নিতে হবে। আমরা যদি কারও জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ করি, সেটিতে কিন্তু নিজের প্রতি অত্যন্ত অবিচার করা হয়। অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মস্তিষ্ক দিয়ে সৃষ্টিকর্তা আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আমাদের সবার প্রচেষ্টা হবে নিজেকে যত্ন করে, জীবনের লক্ষ্যগুলোকে বাস্তবায়ন করা। ওর একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে ক্ষতিকর এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে ওকে উৎসাহিত করো। প্রয়োজনে ওর পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের সাহায্য নিতে পারো। তাদের কেউ একজন যদি পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব নিতে পারেন, তাহলে খুব ভালো হয়। তুমিও কিন্তু নিজের যত্ন নেবে ভালো করে, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় যাতে ভালোভাবে উত্তীর্ণ হতে পারো।

ঘোষণা পাঠকের প্রশ্ন পাঠানো যাবে ই–মেইলে, ডাকে এবং প্র অধুনার ফেসবুক পেজের ইনবক্সে। ই–মেইল ঠিকানা: [email protected] (সাবজেক্ট হিসেবে লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’) ডাক ঠিকানা: প্র অধুনা, প্রথম আলো, ১৯ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫। (খামের ওপর লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’) ফেসবুক পেজ: fb.com/Adhuna.PA