পাঠকের প্রশ্ন: আইন
আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া একটি অপরাধ
পাঠকের প্রশ্ন বিভাগে আইনগত সমস্যা নিয়ে নানা রকমের প্রশ্ন পাঠিয়েছেন পাঠকেরা। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এবার।
প্রশ্ন: সমবয়সী একটি মেয়ের সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক তিন বছর ধরে। আমরা দুজন দুজনকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু একটা সমস্যা আছে, মেয়েটি অনেক জেদি আর অন্তর্মুখী স্বভাবের। আর তাই সামান্য বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে ঝগড়া হলে সে আত্মহত্যা করতে চায়। আমি বুঝতে পারি না সে আমাকে ভয় দেখায়, নাকি এমন প্রবণতা তার মধ্যে রয়েছে। তার জেদি স্বভাব আর আত্মহত্যার প্রবণতা দূর করতে করণীয় কী, সেটা জানতে চাই। আর যদি সে আত্মহত্যা করেই ফেলে, সে ক্ষেত্রে তার প্রেমিক হিসেবে আমার আইনসংক্রান্ত কী কী জটিলতা হতে পারে? উল্লেখ্য, আমাদের বয়স ২৪ বছর প্রায়। এক বছরের মধ্যে আমরা পারিবারিকভাবে বিয়ে করতে যাচ্ছি।
কুবের মাঝি (ছদ্মনাম)
উত্তর: আপনার প্রশ্ন থেকে বোঝা যাচ্ছে যে আপনার বান্ধবী কোনো মনোমালিন্য হলে আত্মহত্যা করার হুমকি দিচ্ছেন। তাঁর আত্মহত্যার প্রবণতা না ভীতি প্রদর্শনের প্রবণতা রয়েছে, সেটা বোঝার জন্য এবং এই প্রবণতা দূর করার জন্য তাঁকে অবশ্যই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞর কাছে নিয়ে যেতে হবে। আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে। আবেগপ্রবণতা, মাদকাসক্তি বা মানসিক অসুস্থতার কারণে অনেক সময় এসব প্রবণতা দেখা দেয়। তবে এটাও ঠিক যে অনেক ক্ষেত্রেই কেউ কেউ আবার আত্মহত্যার পথ বেছে নেন অন্য কোনো ব্যক্তির প্ররোচনাতে।
আর এ জন্যই প্ররোচনা দানকারীর জন্য আমাদের দেশের আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। এবার আসা যাক আইনগত বিষয়ে। দণ্ডবিধি ১৮৬০–এর ৩০৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করে, তাহলে যে ব্যক্তি আত্মহত্যায় সাহায্য করবে এবং প্ররোচনা দান করবে, সে ব্যক্তিকে ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং তাকে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হবে।
তা ছাড়া সাক্ষ্য আইন ১৮৭২–এর ৩২ ধারায় বলা আছে, আত্মহত্যাকারীর মৃত্যুর আগে রেখে যাওয়া সুইসাইড নোট প্ররোচনা দানকারীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হবে। তবে শুধু একটি সুইসাইড নোটের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। সুইসাইড নোটের সমর্থনে আরও সাক্ষ্য–প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।
সে ক্ষেত্রে আপনার সঙ্গে কোনো মনোমালিন্যের সূত্র ধরে তিনি যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটান, তবে অবশ্যই আপনি আইনগত জটিলতার মুখোমুখি হতে পারেন। তীব্র অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, উত্তেজিত করার মাধ্যমে কাউকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া দেশের আইন অনুযায়ী একটি অপরাধ। তবে অভিযোগের সমর্থনে সাক্ষ্য–প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে কারও বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা গেলে তখনই শাস্তি প্রদান করা যাবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া বা তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তির ইচ্ছাকৃত কোনো কাজ দ্বারা সম্ভ্রমহানি হওয়ার প্রত্যক্ষ কারণে কোনো নারী আত্মহত্যা করলে তা আত্মহত্যার প্ররোচনার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। যার জন্য সে ব্যক্তির অনধিক ১০ বছর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হবে।
আরেকটি বিষয় বলে রাখা ভালো, আত্মহত্যা করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে সেই ব্যক্তিকে আত্মহত্যা বা নিজেকে ধ্বংস করার অপচেষ্টার অপরাধে এক বছরের জেলে যেতে হতে পারে। দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারামতে, যদি কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করার উদ্যোগ নেন এবং অনুরূপ অপরাধ করার উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করেন, তা হলে তাঁর এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা হতে পারে বা উভয় শাস্তিই হতে পারে। আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আপনার উচিত হবে মেয়েটির অভিভাবকদের এ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করা, যাতে তাঁরা একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞর কাছে মেয়েটিকে নিয়ে যথাযথ চিকিৎসা প্রদান করেন। কোনো মানুষকে আত্মহত্যার মতো পরিণতিতে নয় বরং সম্মান, ভালোবাসায় বাঁচিয়ে রাখতে পারার ভেতরেই আনন্দ ও সার্থকতা।
পাঠকের প্রশ্ন, বিশেষজ্ঞের উত্তর
পাঠকের প্রশ্ন পাঠানো যাবে ই–মেইলে, ডাকে এবং প্র অধুনার ফেসবুক পেজের ইনবক্সে।
ই–মেইল ঠিকানা: [email protected] (সাবজেক্ট হিসেবে লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’)
ডাক ঠিকানা: প্র অধুনা, প্রথম আলো, প্রগতি ইনস্যুরেন্স ভবন
২০–২১ কারওয়ান বাজার, ঢাকা ১২১৫।
(খামের ওপর লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’) ফেসবুক পেজ: fb.com/Adhuna.PA