বাটিক কিনতে রসমালাইয়ের দেশ কুমিল্লায় যাবেন নাকি
হিলটন টাওয়ারে কুমিল্লা বাটিক কালেকশন, কুমিল্লা বাটিক কর্নার, কুমিল্লা বাটিক ঘর, আনন্দ খাদি ফ্যাশন কিংবা খাদি হাতের ছোঁয়ার মতো দোকানগুলো এখন ক্রেতাদের প্রধান গন্তব্য। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের আছে তিনটির বেশি দোকান।
রসমালাই ও খাদির পাশাপাশি গত কয়েক দশকে ‘বাটিক’ও কুমিল্লার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে ছড়ানো-ছিটানো থাকলেও এখন কুমিল্লা শহরের মনোহরপুর এলাকার হিলটন টাওয়ার হয়ে উঠেছে বাটিকের সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য বাজার। বাটিকের খোঁজে কদিন আগে আমিও গিয়ে হিলটন টাওয়ারে হাজির হই।
কুমিল্লার কান্দিরপাড় থেকে রাজগঞ্জে যাওয়ার মাঝেই পড়ে মনোহরপুর। এই মনোহরপুরেই মেলে বিখ্যাত মাতৃভান্ডারের রসমালাই। মাতৃভান্ডারের কিছু আগেই রাস্তার উল্টো পাশে হিলটন টাওয়ার। মাঝের চলন্ত সিঁড়ি বাদে ডানে-বাঁয়ে যেদিকে তাকাই, রঙিন কাপড়ে ঠাসা বাটিকের দোকান।
প্রতিটি দোকানেই থরে থরে সাজানো বাটিকের শাড়ি, থ্রি-পিস, শার্ট, ফতুয়া, পাঞ্জাবি। কুমিল্লা বাটিক কালেকশন, কুমিল্লা বাটিক কর্নার, কুমিল্লা বাটিক ঘর, আনন্দ খাদি ফ্যাশন কিংবা খাদি হাতের ছোঁয়ার মতো দোকানগুলো এখন ক্রেতাদের প্রধান গন্তব্য। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের আছে তিনটির বেশি দোকান।
বাটিকের কোন ধরনের কাপড়ের চাহিদা বেশি—জানতে চাইলে আনন্দ খাদি ফ্যাশনের ব্যবস্থাপক মো. আবদুল্লাহ বললেন, ‘মেয়েদের শাড়ি, ওড়না, থ্রি–পিস আর ছেলেদের ফতুয়া, শার্ট, পাঞ্জাবি, লুঙ্গিই এখন বেশি চলে। যিনি একবার বাটিক কাপড় পরে আরাম পেয়েছেন, দ্বিতীয়বার এখানে আসতে তিনি ভুল করেন না।’
আবদুল্লাহ জানান, আদর্শ সদর উপজেলার আনন্দপুর গ্রামে নিজস্ব কারখানাতেই চলে তাঁদের বাটিকের কাপড় প্রস্তুতকরণ প্রক্রিয়া। আনন্দপুর ও কমলপুর—পাশাপাশি এই দুটি গ্রামেই মূলত কুমিল্লার সব বাটিকের পোশাক বানানোর কারখানা।
২০ জন কারিগরের একটি কারখানায় একটানা পরিশ্রমে দৈনিক প্রায় ২০০টি শাড়ি প্রস্তুত করা সম্ভব। প্রতিবছর গরমকাল আর ঈদ সামনে রেখে উৎপাদনের মাত্রা বেড়ে গেলে দৈনিক মজুরিতে বাড়তি লোক নেওয়ারও প্রয়োজন পড়ে।
কাজের ধাপ বর্ণনা করতে গিয়ে আবদুল্লাহ বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে আনা হয় বাটিকের প্রধান কাঁচামাল সুতি কাপড়। কাটা অবস্থায় কিংবা রোল করা অবস্থায় আসা এসব সুতি কাপড় থেকে শাড়ি কিংবা থ্রি–পিসের মাপে কেটে নেওয়া হয়।
নির্দিষ্ট মাপে কেটে নেওয়া কাপড় স্তূপাকারে রাখা হয়। একে একে মোমের মাধ্যমে সুতি কাপড়ের ওপর নকশা করা হয়। কাপড়টিকে কাগজ দিয়ে বেঁধে, পেঁচিয়ে রঙে ডুবিয়ে রং করা হয়। এক পাশ হয়ে এলে অন্য পাশেও রং করার প্রয়োজন পড়ে।
রং করা হয়ে গেলে গরম পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হয়, যাতে নকশা করার জন্য ব্যবহৃত মোম গরম পানিতে গলে কাপড় থেকে সরে যায়। এবার মাড় দিয়ে শুকানোর পর ইস্তিরি করে বাজারজাত করার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
যা যা পাওয়া যাচ্ছে
‘খাদি হাতের ছোঁয়া’ নামক দোকানের বিক্রেতা মো. সায়মন বলছিলেন, পোশাক থেকে শুরু করে বিছানার চাদর, এমনকি দরজা-জানালার পর্দা—বাটিকের কাপড় থেকে সবই তৈরি হচ্ছে। মেয়েদের পোশাকের মধ্যে শাড়িকে ঘিরেই থাকে প্রধান আকর্ষণ।
শাড়ির মধ্যে আছে সুতি শাড়ি, সিল্ক শাড়ি, হাফ সিল্ক শাড়ি, সিঁদুর সিল্ক শাড়ি, টারসেলযুক্ত শাড়ি, ভেজিটেবল ডাই শাড়ি, মোম বাটিক শাড়ি, টাইডাই শাড়ি, মাখন বুটিকস শাড়ি, ব্লক বুটিকস শাড়ি।
আছে থ্রি–পিস, ওড়না। ছেলেদের বাটিক পোশাকের মধ্যে আছে ফতুয়া, শার্ট, পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। এ ছাড়া আছে বিছানার চাদরসহ আরও অনেক কিছু।
দাম
মেয়েদের পোশাকের মধ্যে বাটিক শাড়ির দাম ৫০০ টাকা থেকে শুরু। সুতি শাড়ির দাম ৬৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা। সিল্কের শাড়ি ৮৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। টারসেলযুক্ত শাড়ি ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। বাটিকের মাঝে হাতের কাজ করা শাড়ি ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা।
থ্রি-পিস ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। সিল্ক কাপড়ের থ্রি-পিস ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় মিলছে ওড়না।
ছেলেদের পোশাকের মধ্যে শার্ট আর ফতুয়া পাবেন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়। পাঞ্জাবি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আর লুঙ্গি পাবেন ২০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। বিছানার চাদর মিলবে ৪০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়।
কুমিল্লা বাটিক কালেকশনের ব্যবস্থাপক শাহাদাত হোসেন জানান, হিলটন টাওয়ারের এই বাটিক মার্কেট থেকে দোকানের পাশাপাশি অনলাইনে, ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও সারা দেশে বাটিকের পোশাক পৌঁছে যায়।
যেভাবে যাবেন
ঢাকার দিক থেকে এলে কুমিল্লা আলেখারচর বিশ্বরোড থেকে শাসনগাছা হয়ে কান্দিরপাড়ে আসুন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে এলে কুমিল্লা পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড থেকে টমছম ব্রিজ হয়ে কান্দিরপাড়।
সেখান থেকে ১০ টাকা অটোরিকশাভাড়ায় চলে আসতে পারবেন বাটিকের বাজার মনোহরপুরের হিলটন টাওয়ারের সামনে। দোকান ঘুরে ঘুরে নানা রং ও নকশা দেখেশুনে বেছে নিতে পারেন আপনার পছন্দের বাটিকের পোশাক।
এবার কয়েক কদম এগিয়ে কুমিল্লার বিখ্যাত মাতৃভান্ডারের রসমালাই কিনে ফেরার পথ ধরতে পারেন।