ঢাকার কাছেই যে গ্রামীণ বাজারে মিলবে তাজা শাকসবজি, ফলমূল ও মাছ

পূর্বাচলে নীলা মার্কেটের একটু পরেই মাজার রোড। সেখানে বসে আরেকটা কাঁচা বাজার। টাটকা শাকসবজির খোঁজে স্থানীয় লোকজন তো বটেই, ঢাকা থেকেও লোকজন গাড়ি নিয়ে এখানে আসেন।

পূর্বাচলে মাজার রোডের কাঁচা বাজারে টাটকা শাকসবজি
ছবি: এম এ হান্নান

পূর্বাচলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেদিন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। গিয়ে দেখি শুধু ঢাকাবাসী নয়, বিদেশি লোকজনও আছেন। শুরুর দোকানটায় চারজনের একটি দলের কেউ টমেটো হাতে নিয়ে দেখছে, কারও হাতে মিষ্টিকুমড়া। কথা বলতে চাইলে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জানালেন, চীন থেকে ঢাকায় এলেই তাঁরা এখানে ঘুরতে আসেন। তখন কিছু বাজারও করে নেন।

আরও পড়ুন
বিক্রেতাদের বেশির ভাগই নিজের জমিতে চাষ করা অল্প পরিমাণ তাজা সবজি নিয়ে প্রতিদিন বাজারে হাজির হন
ছবি: এম এ হান্নান

কত শাক

এই বাজারে বড় দোকানের সংখ্যা কম। বিক্রেতাদের বেশির ভাগই নিজের জমিতে চাষ করা অল্প পরিমাণ তাজা সবজি নিয়ে প্রতিদিন বাজারে হাজির হন। কেউবা আবার হেঁটে হেঁটেও সংগ্রহ করেন কলমিশাক, মালঞ্চশাক, কচুশাক, ঢেঁকিশাক, ঘেটকচুশাক, তেলাকুচাশাক।

বেশির ভাগ শাকসবজিই নিকটবর্তী এলাকা থেকে আসে। পুঁইশাক, লাউশাক, মিষ্টিকুমড়া শাক, চালকুমড়া শাক প্রতি আঁটি ৩০ থেকে ৬০ টাকা। সাদার পাশাপাশি পাবেন লাল আর নীলাভ শাপলা, প্রতি আঁটি ৪০ থেকে ৫০ টাকা। পুঁইশাক, লাউপাতা, মিষ্টিকুমড়ার পাতা, চালকুমড়ার পাতা প্রতি আঁটি ২০ টাকা।

আবার হরেক রকম শাকের মিশেলে পাঁচমিশালি শাকও আছে, আঁটি ৫০ টাকা। চুকুর বা টক পাতা ও বিলাতি ধনে, মিষ্টিকুমড়ার ফুল প্রতি আঁটি ১০ টাকা, শজনেপাতা ৫০ টাকা।

আছে দেশি ফল
ছবি: এম এ হান্নান

তাজা সবজির পসরা

সবজির মধ্যে আছে চিচিঙ্গা, ঝিঙে, ধুন্দুল, ঢ্যাঁড়স, পটোল থেকে শুরু করে আলু, বগুড়ার লাল আলু, বরবটি, টমেটো, কাঁকরোল, কচু, কচুর লতি, কচুমুখি, করলা, ডাঁটা, বেগুন, কাঁচা পেঁপে, শসা, গাজর, কাঁচা মরিচ, বোম্বাই মরিচ। কাঁচা চালকুমড়া যেমন আছে, তেমনি আছে মোরব্বা বানানোর উপযোগী পাকা চালকুমড়াও। কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে পুঁইশাকের বীজ ও কাঁঠালের বীজ। জাতভেদে লেবু মিলবে প্রতি ডজন ৭০ থেকে ১০০ টাকা। শীতের সবজি শিমও পাবেন, প্রতি কেজি ১৮০ টাকা। আর ভর্তা হিসেবে খাওয়ার জন্য মৌ শিম পাবেন প্রতি কেজি ২০০ টাকায়।  

আছে দেশি ফল

ক্যালেন্ডারের পাতায় এখন ভাদ্র মাস। বাজারে পাকা তালও আছে। কালচে হলুদ রঙের ছোট–বড় পাকা তাল। আকারভেদে প্রতিটি তাল ৩০ থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাচ্ছেন বিক্রেতারা। আমের মৌসুম ফুরিয়ে এলেও এখনো কিছু জাতের আম পাওয়া যাচ্ছে। হলুদ রঙের বারোমাসি থাই কাটিমন, বারি ৩, আশ্বিনা আম। পাকা আমের পাশাপাশি কাঁচা আমও আছে।

দাম পড়বে ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। আকারভেদে ১৫০ থেকে ৭০০ টাকায় মিলছে কাঁঠাল। আরও আছে ড্রাগন ফল, লটকন, আমড়া, দেশি পেয়ারা, বাইরে সবুজ তো ভেতরে লাল এমন থাই পেয়ারা, পাকা পেঁপে, করমচা, শরিফা, লুকলুকি, আমলকী, আপেল, দেশি সবুজ মাল্টা, কমলা, আনার, ডাব, কতবেল, তরমুজ, বাঙ্গি, বেল, জাম্বুরা, চালতা। কলার মধ্যে আছে চম্পা কলা, বাংলা কলা, নরসিংদীর সাগর কলা ও তরকারির হিসেবে খাওয়ার উপযোগী আনাজি কলা।

আরও পড়ুন
রাস্তার দুই পাশে মাছের দোকান
ছবি: এম এ হান্নান

হাঁস, মুরগি ও অন্যান্য

এখানে দেশি জাতের হাঁস–মুরগির প্রাধান্যই চোখে পড়ে বেশি। দেশি মুরগি ও হাঁসের একই দর—প্রতি কেজি ৭০০ টাকা। দেশি হাঁসের ডিম প্রতি হালি ১০০ টাকা। দেশি মুরগির ডিম প্রতি হালি ১২০ টাকা। আর প্রতি হালি কোয়েল পাখির ডিম পাবেন ৭০ টাকায়। আছে গরুর দুধও। প্রতি লিটার ১০০ টাকা।

মাছের বাজার

রাস্তার দুই পাশে দুটি মাছের দোকানও চোখে পড়ল। এই বাজারে স্থানীয় নদী ও পুকুরের দেশি শিং, কই, টাকি, চিংড়ি, পাবদা ও ছোট মাছের কদর বেশি। দেশি শিং বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০০ টাকায়, কই ১ হাজার ২০০ টাকায়, টাকি ৫০০ টাকায়, চিংড়ি ৯০০ টাকায়, ছোট মাছ ৩০০ টাকায়।

দাম একটু বেশি হলেও সব সময়ই থাকে ক্রেতাদের ভিড়

যাঁরা নিয়মিত কারওয়ান বাজারের মতো বড় পাইকারি বাজারে কেনাকাটা করেন, তাঁদের কাছে এখানকার দাম তুলনামূলক কিছুটা বেশি মনে হতে পারে। তবে দাম একটু চড়া হলেও কেন মানুষ এত দূর থেকে ছুটে আসেন? আসল রহস্য লুকিয়ে আছে বিষমুক্ত তরতাজা সবজি পাওয়ার নিশ্চয়তায়।

এখানকার অধিকাংশ সবজিই মাঠ থেকে তোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাজারে চলে আসে। ফলে এর স্বাদ ও পুষ্টিগুণ থাকে অক্ষুণ্ন। বিশেষ করে পূর্বাচল ও জলসিঁড়ি আবাসন এলাকায় যাঁদের ফ্ল্যাট বা বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে, তাঁরা দিনের কাজ তদারকি শেষে ঢাকা ফেরার পথে এখান থেকে তাজা সবজি কিনে নেন।

আবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যাঁরা পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে নীলা মার্কেট বা পূর্বাচলের মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াতে আসেন, তাঁদের অনেকের জন্যই ফেরার পথের বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠে মাজার রোডের এই বাজার।

দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সপ্তাহের সাত দিনই বাজার বসে
ছবি: এম এ হান্নান

যেভাবে যাবেন

ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমেই আসতে হবে কুড়িল বিশ্বরোড বিআরটিসি কাউন্টারে। এখান থেকে ২০ টাকা ভাড়ায় বিআরটিসি বাসে চলে আসতে পারবেন এই মাজার রোডের কাঁচা বাজারে। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৩০ টাকা। আর নিজস্ব গাড়ি থাকলে তো কথাই নেই।

বাজার চলে সপ্তাহের সাত দিনই, দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। সময় করে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন যেকোনো একদিন। বাজার শেষে ফেরার পথে বিভিন্ন ভর্তার আইটেমের সঙ্গে মাটির তাওয়ায় বানানো চিতই পিঠার স্বাদ নিতে ভুলবেন না।

আরও পড়ুন