নিজের টাকায় ব্যাগ কেনার পরও কেন ক্রেতাদের নজরদারিতে থাকতে হয়
বর্তমানের ফাস্ট ফ্যাশন যুগে টাকা থাকলেই যেন সবকিছু কেনা যায়। তবে ফ্রেঞ্চ কোম্পানি হার্মিসের ক্ষেত্রে কথাটা যেন খাটে না। তাদের আইকনিক ‘বারকিন’ ব্যাগ কিনতে গেলে শুধু টাকা থাকলেই চলে না, বরং ব্র্যান্ড নিজেরা খুঁজে নেয় তাদের পছন্দসই ক্রেতা। হার্মিসের কাছে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কটাই একেবারে উল্টো। এখানে ক্রেতা পছন্দ করে পণ্য বেছে নেন না, বরং বিক্রেতা বেছে নেয় কার কাছে বিক্রি করা হবে তাদের পণ্য।
হার্মিস নিজেদের ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করেছে ‘এক্সক্লুসিভিটি’র ওপর। বিশেষ করে তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাগ বারকিন ও কেলি ব্যাগ যতটা না জনপ্রিয় তাদের নিজেদের গুণে তার থেকে বেশি জনপ্রিয় তাদের এক্সক্লুসিভের জন্য।
এ কারণে এই ব্যাগগুলোকে ‘কোটা ব্যাগ’ও বলা হয়। কারণ, হার্মিসের আউটলেটে গিয়ে আপনি কখনোই এই ব্যাগগুলো দেখবেন না। তার মানে যে এই ব্যাগগুলো আউটলেটে নেই, তা কিন্তু নয়। বরং ব্যাগগুলো কখনোই দোকানের তাকে সাজানো থাকে না। দোকানের ম্যানেজার বা সেলস অ্যাসোসিয়েটরা যখন মনে করেন—কোনো গ্রাহক এই ব্যাগ কেনার ‘যোগ্য’, তখনই কেবল পর্দার আড়াল থেকে ব্যাগটি বের করা হয়।
‘যোগ্য’ ক্রেতা খুঁজে পাওয়া
কাগজে–কলমে ‘যোগ্যতা’র মাধ্যমে ক্রেতা খুঁজে নেওয়ার কোনো লিখিত নিয়ম নেই। কিন্তু পর্দার আড়ালে রয়েছে হাজারো নিয়মের বেড়াজাল। কীভাবে এই ‘যোগ্য’ ক্রেতা খুঁজে পান দোকানের ম্যানেজাররা? হার্মিসের আউটলেট থেকে কে কবে কোন পণ্য কিনেছেন, তার একটা তালিকা রয়েছে তাদের কাছে।
সেখান থেকে ঘেঁটে যে কারও আগের কেনাকাটার ইতিহাস এবং কী পরিমাণ খরচ করতে আগ্রহী, সে ব্যাপারে পুরোপুরি ধারণা পাওয়া যায়। কারণ, হাতে অঢেল টাকা আর ব্র্যান্ড লয়্যালিটি না থাকলে আপনি বারবার একই দোকানে আসবেন না। সেখান থেকেই নির্দিষ্ট করা হয়—কারা ‘বারকিন’ ব্যাগ কেনার ‘যোগ্য’।
‘যোগ্য’ হলেই যে সঙ্গে সঙ্গে আপনার হাতে ব্যাগ ধরিয়ে দেওয়া হবে, ব্যাপারটা তেমনও নয়। বরং প্যারিসে ব্যাগ দেখার জন্য অনলাইনে আবেদন করে ‘লেদার অ্যাপয়েন্টমেন্ট’ নিতে হয়। সেখান থেকে বাছাই করে বেছে নেওয়া হয় ঠিক কার কপালে জুটবে হার্মিসের ব্যাগ। তাদের ক্রয়ক্ষমতা, কী কিনছে, কবে কিনেছে, তাদের বর্তমান অবস্থা কী—সব বুঝেশুনেই হার্মিস নিজেদের ব্যাগ তুলে দেয় তাঁদের কাঁধে।
কেনার পরও নজরদারি
ব্যাগ একবার হাতে পেয়ে গিয়েছেন মানেই যে শেষ তা কিন্তু নয়। হার্মিস তাদের ব্যাগ বিক্রি করার আগে ক্রেতার সব তথ্য নিয়ে নেয়। এরপর শুরু হয় নজরদারি। গ্রাহকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জীবনযাত্রার দিকেও আলাদা করে নজর রাখেন।
কারণ একটাই, আর যাই হোক, এই বারকিন ব্যাগ যাতে অন্য কারও হাতে না পড়ে। অনেকেই আছেন চড়া দামে ব্যাগ কিনে তা রিসেল মার্কেটে বিক্রি করে দেন। সেটা যাতে না হয়, তাই নিয়মিত রিসেল মার্কেটে নজর রাখা হয়।
আর হার্মিসের প্রতিটি ব্যাগ একটি থেকে আরেকটি আলাদা করা সম্ভব হয় খুব সহজেই। কারণ, তাদের নিজেদের ডেটাবেজে প্রতিটি ব্যাগের সূক্ষ্ম ছবি তুলে রাখা হয়, যাতে পরবর্তী সময়ে সেগুলো শনাক্ত করা যায়।
কর্মীদের ওপরও নজরদারি
শুধু যে ক্রেতাদের ওপর নজরদারি থাকে, তা কিন্তু নয়। বিক্রয়কর্মীরাও থাকেন প্রচণ্ড চাপে। কোটা ব্যাগ বিক্রিতে তারা কোনো বাড়তি কমিশন পান না। বরং কোনো ব্যাগ বিক্রির পর সেটি যদি আবারও রিসেল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে কালো তালিকাভুক্ত করা হয় এবং কর্মীকে শাস্তির মুখে পড়তে হয়।
হার্মিসের এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও অলিখিত নিয়মের কারণে অনেক অনুগত গ্রাহক এখন বিরক্ত। একে তাঁরা আভিজাত্যের চেয়ে ‘নিগ্রহ’ হিসেবেই দেখছেন। ফলে অনেকেই এখন দীর্ঘ প্রতীক্ষার বদলে চড়া দামে ব্যবহৃত ব্যাগ বা অন্য ব্র্যান্ডের দিকে ঝুঁকছেন। তবু হার্মিস তাদের এই ‘খেলা’ বন্ধের কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
হার্মিসের নিজেদের ব্র্যান্ড আর ব্যাগের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং অলিখিত কড়াকড়ি অনেককেই হার্মিস থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অনেকেই অন্যান্য ব্র্যান্ডের দিকে নজর দিচ্ছেন, যা সহজেই পাওয়া যায় নিজেদের মতো করে। যেখানে খেলতে হয় না কোনো গেম, ধরতে হয় না কোনো লাইন। দেখা যাক, এ পন্থায় নিজেদের আভিজাত্য কতটা ধরে রাখতে পারে হার্মিস।
সূত্র: এনডিটিভি, ডেইলি মেইল