বাবাকে হারানোর পর পিটিএসডিতে ভুগেও যেভাবে বেরিয়ে এলাম
বাবাকে হারানোর পর পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে (পিটিএসডি) ভুগতে শুরু করেন আরিফ রহমান খান। আজ ১০ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন তিনি।
জীবনের অর্থটা ঠিকমতো বুঝে ওঠার আগেই যখন কোভিডে আব্বুকে হারালাম, তখন মনে হয়েছিল, আমার পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তেই থমকে গেছে। এমন এক শূন্যতা ঘিরে ধরেছিল, যেখান থেকে কোনো দিন উঠে দাঁড়াতে পারব, এমনটা কল্পনাও করতে পারিনি। আব্বু আমার শিক্ষক, মেন্টর এবং আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার জায়গাও ছিলেন। অথচ একটা সময় এসে জীবনের সবচেয়ে কঠিন পাঠটা আমার তাঁকে ছাড়াই শিখতে হচ্ছে—আব্বুকে ছাড়া বেঁচে থাকা।
আব্বুকে হারানোর পর আমি পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে (পিটিএসডি) ভুগতে শুরু করি। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলাম না। ধীরে ধীরে নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিতে থাকি। বন্ধু, সহপাঠী, আত্মীয়স্বজন—সবার কাছ থেকেই যেন দূরে সরে যাচ্ছিলাম। বাইরে থেকে হয়তো আমাকে স্বাভাবিক মনে হতো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে লড়াই করছিলাম। যে জীবনটা একসময় এত পরিচিত ছিল, সেটাই যেন হঠাৎ অচেনা হয়ে গেল।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো ছিলাম। তাই পরিবারও আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখত। হয়তো পরিবারের বড় ছেলে হওয়ার কারণে সেই প্রত্যাশার ভারটাও একটু বেশি ছিল। কিন্তু কেউ যখন নিজের ভেতরেই ভেঙে পড়তে থাকে, তখন বাইরের প্রত্যাশাগুলোও একসময় অসহনীয় মনে হতে পারে। আমার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। একটা সময় মনে হয়েছিল, পড়াশোনাটা ছেড়েই দিই। আর পারছিলাম না।
জীবনের সেই কঠিন সময়ে একটা বিষয় খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি—আপনি যখন ভালো করছেন, তখন অনেকেই আপনার পাশে থাকে; কিন্তু যখন কোনো কারণে পিছিয়ে পড়েন, তখন কিছু মানুষ আপনার সেই পিছিয়ে পড়াকেই আপনার পরিচয় বানিয়ে ফেলতে চায়। কেউ কেউ যেন অপেক্ষা করছিল, আমি কখন থেমে যাব, কখন হাল ছেড়ে দেব। তাদের কথা, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইটা আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও একটা জায়গায় আমি কখনো পুরোপুরি হেরে যাইনি। নিজের ওপর বিশ্বাসটা কোথাও না কোথাও রয়ে গিয়েছিল। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর একদিন মনে হলো, আব্বু তো চেয়েছিলেন আমি পড়াশোনা করে জীবনে ভালো কিছু করি। তিনি তো আমাকে থেমে যাওয়ার জন্য বড় করেননি। তাঁর সেই স্বপ্নের কথা মনে পড়তেই নিজের ভেতরে নতুন করে একটা তাগিদ অনুভব করলাম। বুঝতে পারলাম, আব্বুকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, কিন্তু তিনি আমাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নের পথে আবার হাঁটা সম্ভব।
পিটিএসডি থেকে যেভাবে বেরিয়ে এলাম
পিটিএসডি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার জন্য প্রথমেই নিজের কষ্টকে স্বীকার করতে শিখেছি। বুঝতে পেরেছি, প্রিয়জনকে হারানোর পর ভেঙে পড়া কোনো দুর্বলতা নয়, আর সবকিছু স্বাভাবিক আছে, এমন অভিনয় করাটাও জরুরি নয়। নিজেকে সময় দিয়েছি, নিজের অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করেছি এবং মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য নিয়েছি।
ধ্যানের মাধ্যমে মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেছি। নিজের চিন্তাগুলোকে বুঝতে, অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করতে এবং বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দিতে শিখেছি। একসঙ্গে সবকিছু ঠিক করে ফেলার চাপ না নিয়ে ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়েছি। প্রতিদিন অল্প করে পড়াশোনা করা, ছোট কোনো কাজ শেষ করা কিংবা ধীরে ধীরে নিয়মিত রুটিনে ফিরে আসার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছি।
এই পুরো প্রক্রিয়াটা সহজ ছিল না, আর এক দিনে সবকিছু বদলেও যায়নি। তবে ধৈর্য, আত্মোপলব্ধি, ধ্যান, প্রয়োজনীয় সাহায্য এবং ছোট ছোট পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি।
রাতারাতি সব বদলে যায়নি
সবকিছু এক দিনে ঠিক হয়ে যায়নি, আত্মবিশ্বাসও এক রাতের মধ্যে ফিরে আসেনি। তবু ধীরে ধীরে আবার পড়াশোনায় ফেরার কথা ভাবলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, যত সময়ই লাগুক, নিজের জীবনটা নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব। আব্বুর স্বপ্ন পূরণের পথে আবারও হাঁটব।
আব্বুকে কোভিডে হারানোর পর থেকেই অণুজীব কীভাবে মানবদেহে কাজ করে, তা জানার প্রতি আমার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। যে অদৃশ্য জীবাণু একটি মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে, তার সম্পর্কে জানার ইচ্ছা আমাকে তাড়িত করত। এই আগ্রহ থেকেই মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিই। অনেকটা বিরতির পর ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির (আইইউবি) মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে ভর্তি হই।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও চারপাশ থেকে অনেকের সংশয় টের পেয়েছি। অনেকেই বলেছিলেন, পড়াশোনায় লম্বা বিরতির পর এত কঠিন একটি বিষয়ে ভালো ফল করা কঠিন হবে। কেউ কেউ হয়তো ভেবেছিলেন, আমি খুব বেশি দূর এগোতে পারব না।
জানতাম কী করতে হবে
কিন্তু এবার আমি জানতাম, আমাকে কী করতে হবে। আমি জানতাম, কেন এই বিষয়ে পড়তে চাই। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শিখছিলাম।
আমি এখনো শিখছি, এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি, নিজের স্বপ্নের পথে হাঁটছি। আমার গল্প হয়তো এখনো অনেকটাই বাকি। সামনে কী আছে, জানি না। তবে এটুকু জানি, আমি কোথা থেকে উঠে আসার চেষ্টা করেছি, কেন আবার শুরু করেছি এবং কোথায় পৌঁছাতে চাই।
এখন মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে পড়ছি, বিষয়টিকে উপভোগও করছি। প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার ও জানার সুযোগ আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমার কাছে পড়াশোনা এখন শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন নয়; এটি নিজের মনের কথা শোনা, আগ্রহকে অনুসরণ করা।
শেষ কথা
পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, জীবনের সেই বিরতি আমার জন্য সহজ ছিল না। শোক, মানসিক বিপর্যয়, অনিশ্চয়তা আর চারপাশের মানুষের সংশয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এমন সময়ও এসেছে, যখন অনেকে বলেছেন, আর পড়াশোনা করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি জানতাম, আমার ভেতরে এখনো অনেক কিছু শেখার বাকি আছে। আমি জানতাম, কোথায় পৌঁছাতে চাই।
জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমার স্বপ্ন খুব স্পষ্ট। ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে গবেষণা করতে চাই। এই বিষয়ে গভীরভাবে জানতে চাই, গবেষণার মাধ্যমে কিছুটা অবদান রাখতে চাই। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে একাডেমিয়ায় থাকতে চাই, জ্ঞানচর্চা করতে চাই এবং অন্যদের শেখার পথেও ভূমিকা রাখতে চাই।
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোয় বাবার অনুপস্থিতি এখনো অনুভব করি। কিছু শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না, কিছু মানুষকে হারানোর ব্যথাও পুরোপুরি মুছে যায় না। তবু তাঁদের ভালোবাসা, শিক্ষা আর স্বপ্ন আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকতে পারে। আমার কাছে আব্বুর স্মৃতি ঠিক তেমনই—একটি শক্তি, যা আমাকে বারবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।