প্রথমে ভাবলাম নিজের দাঁড়ানোর ভঙ্গির কথা। পরে মনে হলো, মানুষ যে জাতি, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি বা জেন্ডারেরই হোক না কেন, স্বাভাবিকভাবে একই রকমভাবে দাঁড়ায়; দুই পায়ের ওপর ভর করে। আমি সেভাবেই ছিলাম।

তারপর ভাবলাম নিজের বেশভূষার কথা। মাথায় একরাশ এলোমেলো চুল, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর কালো রঙের হুডি পরা আমাকে কোনোভাবেই মেয়েলি বলা যাবে না।

তারপর ভাবলাম, হয়তো আমার গলার স্বর তার কাছে মেয়েসুলভ লেগেছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল, পুরোটা সময় আমি তো একটা শব্দও উচ্চারণ করিনি।

এসব ভেবে শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে এলাম যে প্রাণবন্ত আড্ডার মধ্যে মলিন মুখে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকাটাই তার কাছে ‘মেয়েদের মতো’ মনে হয়েছে।

আমার চুপচাপ স্বভাব আর নতুন মানুষের সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে না পারাটা তার কাছে আমার জেন্ডারই বদলে ফেলল!

ঘটনা ২

আরও কয়েক মাস কেটে গেল। ব্যাচের সবচেয়ে চুপচাপ আর ‘কেমন জানি’ ছেলের তকমাটা তত দিনে আমার গায়ে সেঁটে গেছে।

সেই সময় সবচেয়ে চর্চিত বিষয় ছিল ‘ব্লু হোয়েল’ নামক এক ভয়ানক ইন্টারনেট গেম। সেই খেলায় অংশগ্রহণকারীকে একের পর এক চ্যালেঞ্জ দেওয়া হতো। যেমন নিজেকে জখম করা কিংবা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করা। আর সর্বশেষ চ্যালেঞ্জ ছিল আত্মহত্যা।

এ রকম এক ভয়ানক খেলার খপ্পরে কীভাবে কেউ পড়তে পারে, সেটাই ছিল তখন আলোচনার ‘হট টপিক’।

একদিন ক্লাস শুরু হওয়ার আগে রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। পাশেই আমার কিছু সহপাঠী কথা বলছিল। আড্ডার বিষয় যথারীতি ‘ব্লু হোয়েল’।

কথা বলতে বলতে তাদের একজন আমার দিকে তাকাল। চোখে চোখ পড়তেই বলল, ‘তোর মতো ছেলেরাই এসব জিনিসের মধ্যে পড়ে!’

বলেই মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার সে নিজের আড্ডায় মশগুল হয়ে গেল। অন্যদিকে আমি পড়ে গেলাম অথই সাগরে। আত্মহত্যা তো দূরের কথা, নিজের শরীরে কখনো কোনো আঁচড় পর্যন্ত না দেওয়া এই আমাকে কি তাহলে মানুষজন আত্মহত্যাপ্রবণ ভাবছে!

কেন? আমি কথা একটু কম বলি, মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারি না, তাই?

উপলব্ধি

স্নাতক, স্নাতকোত্তর জীবনের দিকে পেছনে ফিরে তাকালে এ রকম আরও অনেক ঘটনা মনে পড়ে। ঘটনাগুলো তুচ্ছ হলেও সেগুলোর ক্ষত এখনো আমি বয়ে বেড়াচ্ছি। প্রথম দিকে এসব ঘটনা আমাকে অনেক ভাবাত। বারবার মনে করিয়ে দিত যে আমার আচার-আচরণ স্বাভাবিক না, আমার এই অস্বাভাবিকতা রীতিমতো অপরাধ। কীভাবে স্বাভাবিক হওয়া যায়, সে বিষয়ে সহপাঠীদের কাছ থেকে নানা সময় কিছু উপদেশও পেয়েছি। ‘সব সময় চোখে চোখ রেখে কথা বলবে’, ‘মুখ গোমড়া রাখা যাবে না’, ‘মুখে সব সময় হাসি এঁটে রাখতে হবে’, ‘সবার সঙ্গে আগ বাড়িয়ে কথা বলবে’, ইত্যাদি ইত্যাদি…

এসব উপদেশ শুনলে মনে হতো যে আমার কথা কম বলাটা যেন একটা রোগ, যার তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না করা গেলে মৃত্যু নিশ্চিত। মাঝেমধ্যে মনে হতো অন্যরা সবাই জন্মের সময় স্বাভাবিকতার সনদ হাতে করে এসেছিল, আর কোনো কারণে আমার কপিটা আমি হারিয়ে ফেলেছি।

কিন্তু এখন আমি মেনে নিয়েছি যে কথা কম বলা, চুপ থাকাটাই আমার স্বভাব। এখানে সঠিক বা ভুলের কোনো ব্যাপার নেই। কারও চোখে আমি অন্তর্মুখী, কারও কাছে লাজুক, কেউ কেউ মনে করে আমি দেমাগি। আবার কিছু মানুষের কাছে আমি হয়তোবা অস্বাভাবিক। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, আমি এর কোনোটিই নই। আমি আমিই।