আইসল্যান্ড: উত্তরের শীতল দেশে

ব্ল্যাক স্যান্ডবিচ, আইসল্যান্ড


পারলেন হাউস থেকে সরাসরি পা বাড়ালাম হালগ্রিমসকিরকিয়ার দিকে। হালগ্রিমসকিরকিয়া বলতে গেলে রেইকইয়াভিক সিটির একদম সেন্টারে অবস্থিত। পারলেন হাউস থেকে হালগ্রিমসকিরকিয়ার দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটারের মতো। পুরো পথটা পায়ে হেঁটে পাড়ি দিলাম। বাস্তবে যে বাতাস কতটা শক্তিশালী হতে পারে, সেটা সেদিন বুঝলাম। কোনো উপমা ব্যবহার করে আমি বোঝাতে পারব না আইসল্যান্ডের বাতাস বাস্তবে কতটা শক্তিশালী। আমার মতো ৮০ কেজি ওজনের এক মানুষকে রীতিমতো উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে এ বাতাস।

হালগ্রিমসকিরকিয়ার সামনে লেখক
ছবি: সংগৃহীত

বাতাসের কারণে ডিএসএলআর সেটআপ দিতেও কষ্ট হচ্ছিল। আইসল্যান্ডের এক স্থানীয় অধিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, এ বাতাস এতটা শক্তিশালী যে বাইরের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকলেও এ বাতাসের কারণে অনেক সময় সে তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস মনে হয়। এ রকম শক্তিশালী বাতাসে টিকে থাকাটা যুদ্ধ জয়ের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আর্কটিক সাগর এবং উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের সংগমস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার বাতাস বেশির ভাগ সময় শীতল হয়ে থাকে।

হালগ্রিমসকিরকিয়ার মূলত একটি লুথেরান চার্চ। ক্যাথলিক কিংবা অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটির মতো লুথেরান ক্রিশ্চিয়ানিটি খ্রিষ্টধর্মের একটি শাখা। ষোড়শ শতাব্দীতে বিখ্যাত জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদ ও সংস্কারক মার্টিন লুথারের আদর্শের ওপর ভিত্তি করে লুথেরান ক্রিশ্চিয়ানিটির যাত্রা শুরু হয়। হালগ্রিমসকিরকিয়ার নামকরণ করা হয়েছে আইসল্যান্ডের বিখ্যাত কবি হালগ্রিমুর পিটারসনের নামানুসারে। রেইকইয়াভিক শহরের প্রধান ল্যান্ডমার্ক এ হালগ্রিমসকিরকিয়ার, গুগলে রেইকইয়াভিক লিখে সার্চ দিলে প্রথমে হালগ্রিমসকিরকিয়ার ছবি ভেসে আসে।

ক্রিসমাসের সাজে সজ্জিত আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকইয়াভিক
ছবি: লেখক

আইসল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম লুথেরান ক্রিশ্চিয়ানিটির, তবে গত শতাব্দীতে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। আর এ কারণে নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক কিংবা ফিনল্যান্ডের মতো আইসল্যান্ড থেকেও বর্তমানে ধর্মে বিশ্বাস কিংবা ধর্ম পালন করেন, এমন মানুষ এখন শূন্যে নেমে এসেছে। বিশেষ করে দেশটির বর্তমান প্রজন্মের বেশির ভাগ মানুষ তেমন একটা ধর্মে বিশ্বাসী নন।

হালগ্রিমসকিরকিয়ার সামনে বিখ্যাত নর্স পরিব্রাজক লেইফ এরিকসনের স্মরণে একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। অনেকে এর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে, আমি নিজেও এ ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছি। সলো ট্রাভেলারদের ক্ষেত্রে একটা বিপত্তি ঘটে ছবি তোলা নিয়ে, আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এক ভদ্রমহিলাকে অনুরোধ করে আমিও সেখানে দাঁড়িয়ে আমার কিছু ছবি নিলাম।

পাঠ্যপুস্তকে আমরা পড়ে এসেছি বিখ্যাত ইতালিয়ান নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস হচ্ছেন আমেরিকা মহাদেশের আবিষ্কারক। তবে সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড—এসব দেশের অধিবাসীদের দাবি হচ্ছে, ক্রিস্টোফার কলম্বাসেরও বহু আগে প্রথম মানুষ হিসেবে আমেরিকায় পা রাখেন লেইফ এরিকসন। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, লেইফ এরিকসন নরওয়ে থেকে আইসল্যান্ড হয়ে গ্রিনল্যান্ডে আসেন এবং পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ড দ্বীপে পাড়ি জমান। তাই এসব দেশের মানুষ বিশ্বাস করেন, কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারেরও অনেক আগে আমেরিকায় ভাইকিংদের বসতি গড়ে উঠেছিল। সাম্প্রতিক অনেক গবেষণায় তাঁদের এ দাবির পক্ষে সত্যতা পাওয়া গেছে।

রেইকইয়াভিকের কালচারাল ও সোশ্যাল সেন্টার হারপা
ছবি: লেখক

হালগ্রিমসকিরকিয়ার থেকে সোজা চলে গেলাম হারপার দিকে। হারপা হচ্ছে রেইকইয়াভিকের কালচারাল ও সোশ্যাল সেন্টার। আইসল্যান্ডের বিভিন্ন উৎসবকে ঘিরে এখানে দেশটির সাধারণ মানুষেরা সমবেত হন। উত্তর আটলান্টিক সাগরের তীর ঘেঁষে অবস্থিত হারপা স্থাপত্যশৈলী বিবেচনায় আধুনিক সুরম্য যেকোনো ইমারতকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে অনায়াসে।

বাইরের শীতল বাতাসের কাছে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছিলাম, তাই বাধ্য হয়ে হারপার ভেতরে বসলাম একটু বিশ্রাম নিতে। ভেতরের হিটারের তাপে যেন আবার স্বস্তির নিশ্বাস ফিরে এল, একটু একটু করে আবার যেনও সঞ্জীবনী শক্তি জাগ্রত হচ্ছিল। তবে ভেতরের হারপাকে আমার কাছে অত্যাধুনিক শপিং মলের মতোই মনে হয়েছে।
প্রাচীন নর্ডিক ক্যালেন্ডারে হারপা মূলত গ্রীষ্মকালকে ইঙ্গিত করত। স্টিলের ফ্রেমওয়ার্ক এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন জ্যামিতিক সজ্জাবিশিষ্ট কাচের সমন্বয়ে তৈরি হারপার স্থাপত্যশৈলীও সত্যিকার অর্থে দৃষ্টিনন্দন এবং চোখ ছানাবড়া করার মতো।

হারপা থেকে কয়েক গজ সামনে হাঁটলে দেখা মিলে সান ভয়েজারের। সান ভয়েজার আইসল্যান্ডের বিখ্যাত ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে একটি। গ্রানাইটের চাকতির ওপর স্টেইনলেস স্টিলে নির্মিত এ ভাস্কর্যটির কারিগর বিখ্যাত আইসল্যান্ডিক ভাস্কর জন গুনান অ্যারনানসান।

নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে এ ভাস্কর্য দেখতে অনেকটা নৌকা কিংবা পালতোলা সমুদ্রগামী জাহাজের মতো। আসলেও তাই। বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের মতে, ভাইকিংদের সমুদ্রযাত্রাকে স্মরণ করার উদ্দেশে এ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছিল। একসময় গোটা ইউরোপের মানুষ ভাইকিংদের কথা শুনলে ভয়ে কাঁপত। অষ্টম শতাব্দী থেকে শুরু করে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গোটা ইউরোপে তারা দাপিয়ে বেড়িয়েছে। নরওয়ে, সুইডেন কিংবা ডেনমার্কের সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে এদের বসবাস ছিল। ভাইকিংরা ছিল জলদস্যু। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর বাইরে আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড, ফিনল্যান্ড—এসব স্থানে তাদের পদচারণ ছিল। সান ভয়েজারের আরও একটি অন্তর্নিহিত অর্থ রয়েছে। ইংরেজি সান শব্দের বাংলা অর্থ সূর্য। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ সব সময় তার কল্পনাকে ছাপিয়ে সব ধরনের অসাধ্য সাধন করতে চেয়েছে। আকাশের চন্দ্র, সূর্য, এমনকি বিভিন্ন তারকারাজি নিয়ে মানুষের কৌতূহলের সীমা ছিল না কখনো।

সান ভয়েজারের সামনে লেখক
ছবি: সংগৃহীত

আইসল্যান্ডের প্রাচীন বিভিন্ন গীতিকাব্যে উল্লেখ পাওয়া যায়, আটলান্টিক মহাসাগর থেকে একদল অভিযাত্রী নৌকা চালিয়ে সূর্যের অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছে। তাদের এ প্রচেষ্টাকে স্মরণ করতেও এ ভাস্কর্য। আজকের এ যুগে সান ভয়েজার আইসল্যান্ডের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের প্রতীক। এক পাশের আটলান্টিক মহাসাগর ও সারি সারি বিভিন্ন পাহাড়-পর্বত আর অন্যদিকে আইসল্যান্ডের নিজস্ব স্থাপত্যকলার অনুসারে নির্মিত বিভিন্ন ঘরবাড়ি—সব মিলিয়ে এ জায়গা সত্যি মনে রাখার মতো। বিশেষ করে শীতকালে আটলান্টিক মহাসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত এসব পাহাড়ের উপরিভাগ তুষারের আবরণে ছেয়ে যায়।

একবার ভেবে দেখুন, এমন একটা জায়গায় আপনি দাঁড়িয়ে আছেন, যার একপাশে সাগর আর তুষারে আবৃত সারি সারি পর্বত আর অন্যদিকে মানুষের সৃষ্ট দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যকলার নিদর্শন। প্রকৃতি ও মানুষ যেন এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে। সেই সঙ্গে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভেসে আসা শীতল ও বিশুদ্ধ বাতাস। সৈয়দ মুজতবা আলীর ভ্রমণসাহিত্য যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই ‘পাঞ্জশির’ নামটির সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। অনেকে অবশ্য পানশির উচ্চারণ করে থাকেন।

‘একটা আস্ত দুম্বা খেয়ে এক ঢোঁক পানি খান, আবার খিদে পাবে। আকাশের দিকে মুখ করে একটা লম্বা দম নিন, মনে হবে তাজি ঘোড়ার সঙ্গে বাজি রেখে ছুটতে পারি। পানশিরের মানুষ তো পায়ে হেঁটে চলে না, বাতাসের ওপর ভর করে যেন উড়ে চলে যায়।..., যে হাওয়া দম নিয়ে বুকে ভরবেন, তাতে একরত্তি ধুলো নেই, বালু নেই, ময়লা নেই, ছুরির মতো ধারালো ঠান্ডা হাওয়া নাক মগজ গলা বুক চিরে ঢুকবে, আবার বেরিয়ে আসবে ভেতরকার সব ময়লা ঝেঁটিয়ে নিয়ে। দম নেবেন, ছাতি এক বিঘত ফুলে উঠবে—দম ফেলবেন এক বিঘত নেমে যাবে। এক এক দম নেওয়াতে এক এক বছর আয়ু বাড়বে—এক একবার দম ফেলাতে একশটা বেমারি বেরিয়ে যাবে।’

আইস্যলান্ডের নিজস্ব স্থাপত্য শৈলির বাড়িঘর
ছবি: লেখক

সান ভয়েজারের সামনে দাঁড়িয়ে আমার একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সান ভয়েজার থেকে এরপর সরাসরি লগা-ভে-গুরের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। গুগল ম্যাপ আর নিজের স্মার্টফোন সারা দিনের অবলম্বন। তবে স্মার্টফোনের চার্জ যেনও শেষ না হয়ে যায়, সে জন্য স্মার্টফোনটিকে সব সময় পাওয়ার ব্যাংকের সঙ্গে সংযুক্ত করে রেখেছিলাম। লগা-ভে-গুর রেইকইয়াভিকের একটি প্রসিদ্ধ এলাকা। ঢাকা শহরের অধিবাসীদের কাছে পুরোনো ঢাকা যেমন কিংবা দিল্লির অধিবাসীদের কাছে পুরোনো দিল্লি যে রকম রেইকইয়াভিকের অধিবাসীদের কাছে লগা-ভে-গুর, ঠিক একই রকম তাৎপর্য বহন করে।

রেইকইয়াভিকের যে জিনিসটি আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে সেটি হচ্ছে, এখানকার অধিবাসীদের নির্মিত ঘরবাড়িগুলো। আপনমনে শুধু হেঁটেছি আর এসব ঘরবাড়ির ছবি তোলার চেষ্টা করেছি। এ রকম একটি বাড়িতে থাকার সুযোগ পেলে আমার জীবনে কখনো অন্য কিছুর দরকার পড়বে না।

আইসল্যান্ডের ভাষায় এসব ঘরবাড়িকে টার্ফ হাউস নামে ডাকা হয়। টার্ফ সম্পূর্ণভাবে আইসল্যান্ডের নিজস্ব স্থাপত্যকলার আলোকে নির্মিত। এ ধরনের ঘরবাড়ি মূলত পাথর কিংবা কাঠের সাহায্যে নির্মাণ করা হয়।

টার্ফ হাউস
ছবি: লেখক

লগা-ভে-গুরের প্রতিটি ঘরবাড়ি আইসল্যান্ডের নিজস্ব ভঙ্গিতে নির্মিত। তবে বিভিন্ন ধরনের রেস্টুরেন্ট ও বার এবং স্যুভেনিরের দোকানের উপস্থিতির কারণে সেখানে সব সময় দর্শনার্থীর সমাগম লেগে থাকে। এখানকার এক রেস্টুরেন্ট থেকে দুপুরের খাবার সেরে নেওয়ার জন্য মনস্থির করলাম। দুপুরের খাবারের পরিবর্তে রাতের খাবার বললেও ভুল হবে না। তখন প্রায় বেলা তিনটার কাছাকাছি। তবে চারদিকে বলতে গেলে অনেকটা অন্ধকার নেমে এসেছে। শীতপ্রধান দেশ হওয়ায় আইসল্যান্ডের মানুষের মধ্যে কফি পানের প্রবণতা অনেক বেশি। তাই ওয়েলকাম ড্রিংক হিসেবে আমাকে কফি দেওয়া হলো।

শীতের আইসল্যান্ডে দেখা মেলে নীলাভ সবুজ আটলান্টিকের সঙ্গে তুষার ঢাকা পর্বতের সৌন্দর্য
ছবি: লেখক

আইসল্যান্ডে আসার পর যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, বিশেষত এখানকার স্থানীয় অধিবাসী যারা, সবার একটা পরামর্শ ছিল, অন্তত এক বেলা হলেও আইসল্যান্ডের কোনো রেস্টুরেন্ট থেকে মাছের কোনো আইটেম যেন চেখে দেখি। আইসল্যান্ড ও নরওয়ে—এ দুটি দেশের জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ আসে মৎস্য খাত থেকে। বলা হয়ে থাকে, বিশ্বের শতকরা ৬০ ভাগ তিমি কেবল নরওয়ে ও আইসল্যান্ডে ধরা হয়। আইসল্যান্ডে গ্রিনহাউস পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়। আমাদের মতো আইসল্যান্ডের সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় মাছ প্রধান একটি উপাদান। নিজস্ব প্রজাতির ভেড়া আছে, যেটি অভিস এরিস নামে পরিচিত। এ ভেড়ার মাংস দেশটিতে খুবই জনপ্রিয়।

দুপুরের খাবারের জন্য যে রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম, তাদের দাবি অনুযায়ী তারা আইসল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করে। কিন্তু সে রেস্টুরেন্টে কাজ করেন আইসল্যান্ডিক এমন কাউকে খুঁজে পেলাম না। রেস্টুরেন্ট স্টাফের প্রায় সবাই ব্রিটিশ এবং একজন ছিলেন আমেরিকান। যিনি আমার খাবার পরিবেশন করলেন, তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলাম। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি আমাকে জানালেন, ব্রিটিশদের কাছে বর্তমানে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আইসল্যান্ড সবচেয়ে পছন্দের জায়গাগুলোর একটি। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের অর্ডার করেছিলাম।

কর্ড মাছের ফিলে, সামান্য সেদ্ধ ভাতসহ অন্যান্য উপকরণের খাবারের দাম বাংলাদেশের মুদ্রায় প্রায় ৩,৮০০ টাকা
ছবি: লেখক

আমরা যারা মসলাদার খাবারে অভ্যস্ত, আমাদের কাছে এ খাবার পানসে আর জৌলুশহীন মনে হবে। কর্ড মাছের এক ফিলে, সঙ্গে সামান্য সেদ্ধ ভাত, দুই ধরনের সস ও সামান্য কয়েক দণ্ড লবণ সেদ্ধ ব্রোকলি, গাজর ও মিষ্টিকুমড়া। পেটের সিকি ভাগও ভরার মতো নয় কিন্তু খাবারের বিল প্রায় ৫ হাজার ৭০০ আইসল্যান্ডিক ক্রোনা। বাংলাদেশের মুদ্রায় হিসাব করতে গেলে ৩ হাজার ৮০০ টাকার কাছাকাছি। আমার মতো ছাত্রের কাছে এ রীতিমতো অদ্ভুতুড়ে এবং উচ্চ মাত্রার বিলাসিতা বৈ অন্য কিছু নয়। বুক চিরে আর্তনাদ ভেসে আসছিল। যদিও সে আর্তনাদ শোনার মতো আশপাশে কেউই ছিল না।

অভিস এরিস আইসল্যান্ডের নিজস্ব জাতের ভেড়া
ছবি: লেখক

আইসল্যান্ডের বেশির ভাগ মানুষই নিজেদের মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজি এবং ড্যানিশ—এ দুই ভাষায় পারদর্শী। যেহেতু আইসল্যান্ড সুদীর্ঘকাল ডেনমার্কের উপনিবেশ ছিল, এ কারণে দেশটির বেশির ভাগ স্কুলে শিক্ষার্থীদের ড্যানিশ ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক।

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে একটা কথা প্রচলিত আছে। সেটি হচ্ছে, ইউরোপে আপনি যত উত্তরের দিকে অগ্রসর হবেন, আপনার হৃদয় ততটা শীতল আর আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে। এ কথা পুরোপুরি সত্য কি না জানি না, তবে একেবারে অগ্রাহ্য করার মতো নয়। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ড নর্ডিক—এ চার দেশে আমার ঘোরার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এ চার দেশের কোনোটি সেভাবে আমার ভালো লাগেনি। অর্থনৈতিকভাবে দেশগুলো খুবই উন্নত। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় এ চার দেশের জীবনযাত্রার মানও অপেক্ষাকৃতভাবে ভালো। চিকিৎসাসেবা থেকে শুরু করে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা আইনের অনুশাসন, শান্তি ও শৃঙ্খলা, জনকল্যাণমূলক সরকারি পরিষেবা—সব দিক থেকেই এ দেশগুলো আন্তর্জাতিক প্রায় সব সূচকে সবার ওপরে। প্রাচুর্যের অভাব নেই। তারপরও কোথায় যেন কী একটি নেই।
আসলে নর্ডিক দেশগুলোর মানুষ বলতে গেলে অনেকটা শীতল প্রকৃতির। সুইডেন অবশ্য কিছুটা ব্যতিক্রম। কিন্তু নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড—এসব দেশের মানুষকে আপনি সেভাবে বন্ধুবৎসল বলতে পারবেন না। ঢাকা কিংবা কলকাতা, যেখানে আপনি যান না কেন, প্রাণের স্পন্দন সব সময় আপনি খুঁজে পাবেন, কোলাহলপূর্ণ রাস্তাঘাট কিংবা যানবাহন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু নর্ডিক এসব দেশে প্রাণের স্পন্দন বলতে কিছুই নেই, মানুষের অনুভূতিও যেন সেখানে শুকিয়ে কাঠের পুতুল হয়ে গিয়েছে।

আইসল্যান্ড ইউরোপের উত্তরের দেশ হলেও সেখানকার স্থানীয় লোকজন নর্ডিক অন্যান্য দেশের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সত্যি কথা বলতে গেলে আইসল্যান্ডের অধিবাসীরা অনেক বেশি আন্তরিক এবং বন্ধুবৎসল। এ কারণে সলো ট্রাভেলার হলেও আইসল্যান্ড ঘুরতে, বিশেষ করে নিজের ছবি তোলার ক্ষেত্রে তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি। অনেক স্থানীয় অধিবাসী বিদেশি দেখলে নিজের থেকেই কথা বলার চেষ্টা করে এবং মাঝেমধ্যে তাদের ভাষা থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ বিদেশিদের সামনে তুলে ধরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

লগা-ভে-গুরের পর রেইকইয়াভিকে আমার সবশেষ গন্তব্য ছিল টিয়োরনিন। রেইকইয়াভিক সিটি হলের কাছে অবস্থিত টিয়োরনিনে গ্রীষ্মকালে আশপাশের এলাকাগুলো থেকে অসংখ্য মানুষের সমাগম হয়। মূলত টিয়োরনিন হচ্ছে ছোট একটি লেক। কেউ আসেন শরীরচর্চার জন্য, কেউ আসেন লেকের পাড়ের বাতাসের সজীবতার স্বাদ উপভোগ করার জন্য। অনেকে আবার আসেন লেকের রাজহাঁসগুলোকে খাওয়ানোর জন্য। সকালে কিংবা বিকেলের দিকে অনেকে শরীরচর্চার জন্য এখানে জড়ো হন। দিনের বেলা অনেকে আসেন রাজহাঁসকে খাবার দিতে।

গোধুলীতে লেক টিয়োরনি
ছবি: লেখক

যখন আমি টিয়োরনিনে পৌঁছাই, তখন একেবারে অন্ধকার হয়ে গেছে। লেকের দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাজহাঁসগুলো কেমন যেন একটা সুরে ডেকে যাচ্ছে, যদিও তাদের মাঝের স্বাভাবিক উচ্ছ্বাসটুকু খুঁজে পাওয়া গেল না। অন্ধকারেও তারা সাঁতার কেটে চলেছে, ক্রিসমাস উৎসব সামনে রেখে আশপাশের ঘরবাড়িগুলোকে বর্ণিল আলোকসজ্জায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কোনো কোনো বাড়ির সামনে শোভা পেয়েছে ক্রিসমাস ট্রি এবং ক্রিসমাসের বলগা হরিণ। এ বলগা হরিণের রথ চেপে সান্তা ক্লজ বের হবেন পৃথিবী পরিভ্রমণে। রাতের অন্ধকারে এসব ঘরবাড়ি দেখে মনে হচ্ছিল আকাশের তারাগুলো বুঝি রেইকইয়াভিকের মাটিতে নেমে এসেছে।


পরদিন বেলা ১১টার দিকে বুদাপেস্ট যাওয়ার রিটার্ন ফ্লাইট। তাই রাতের বেলা থাকার জন্য এয়ারপোর্টের কাছে একটা হোস্টেল ভাড়া করলাম। এক রাত থাকার জন্য ২৮ ইউরোর মতো ভাড়া গুনতে হয়েছিল। টিয়োরনিন থেকে সরাসরি ৫৫ নম্বর বাসে চড়ে রওনা দিই সেখানে। সেই ৫৫ নম্বর বাস, যেটি মূলত রেইকিয়াভিকের সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাল থেকে কেফ্লাভিক এয়ারপোর্টে যাতায়াত করে। এয়ারপোর্ট থেকে ছয় স্টপেজ আগে বোগাবরাউট নামক স্থানে বেজ হোটেলের অবস্থান। যেখানে রাতটা কাটানোর জন্য বুকিং ডটকম ব্যবহার করে আগের থেকে বুকিং দিয়ে রেখেছিলাম। পাঁচ তারকা থেকে শুরু করে হোস্টেল পর্যন্ত সব ধরনের আবাসনব্যবস্থা রয়েছে তাদের।

ফিশ জেরকি, আমাদের দেশের চিপসের মতোই এটি আইসল্যান্ডে জনপ্রিয় খাবার
ছবি: লেখক

হোটেলের ম্যানেজার দেখলাম এক ব্রিটিশ ভদ্রমহিলা। আরেকজন স্টাফের সঙ্গে পরিচয় হলো, যিনি ছিলেন একজন কানাডীয়। হোটেলের ম্যানেজার আমাকে বললেন, সে বছর তাদের ট্যুরিজম ব্যবসায় খুব একটা লাভ আসেনি। তাই আমাকে ২৮ ইউরোতেই তিনি হোস্টেলের পরিবর্তে থ্রি স্টার হোটেলে রাখার ব্যবস্থা করলেন। তাঁর মাধ্যমে পরদিন হোটেল থেকে সরাসরি এয়ারপোর্ট যাওয়ার শাটল ঠিক করলাম। শাটল সার্ভিসের সঙ্গে আমাদের দেশের রেন্ট–এ–কার সার্ভিসের খানিকটা তুলনা চলে। বেজ হোস্টেল থেকে কেফ্লাভিক এয়ারপোর্টে যাতায়াতের ভাড়া ছিল ১০ ইউরোর কাছাকাছি। আমি তাঁকে আরোরার ব্যাপারে প্রশ্ন করলাম। তিনি আমাকে জানালেন, তাঁদের সে হোটেল থেকেই আরোরা দেখা যায়। সে রাতেও না ঘুমিয়ে অপেক্ষায় ছিলাম, যদি আরোরার প্রকৃত সৌন্দর্য একবারের জন্যও দেখা যায়। ভাগ্য ফিরে তাকাল না এবারও। কিন্তু আমি ফিরে গেলাম স্লোভেনিয়ায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।