বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ট্যাক্সি খুঁজতে গিয়ে বড়সড় লাইনে দাঁড়াতেই দুজনে বুঝে নিলাম, কাকে বলে জগতে শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন! আপাতত আমাদের গন্তব্য লিটল ইন্ডিয়া। যেখানে মূলত ট্যুরিস্টদের থাকার জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী অগুনতি হোটেল রয়েছে।

সিঙ্গাপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ হলেও বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশের তালিকায় অনেক আগেই নিজের নাম খোদাই করেছে।

সেই রাতে ডিনার করতে বেরোলাম, বাঙালিদের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত মুস্তফা সেন্টারে। চীনা, মালয়, ভারতীয়দের মুখাবয়ব দেখতে দেখতে, ভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির বিষয়টি সামনে এল। সিঙ্গাপুরে প্রায় ৭৫ ভাগই চীনা বংশোদ্ভূত, ১৪ ভাগ মালয়। কিন্তু আচরণে মনে হলো ওরা সিঙ্গাপুরী। একটাই জাতি। আমাদের দেশে যেমন আদিবাসীরা পাহাড়ে বসবাসে আগ্রহী, মূলধারায় মিশতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না, সিঙ্গাপুরে কিন্তু তেমন নয়। আদিবাসী মালয়রা সেখানে বরং মূলধারায় বসবাস করে একধরনের তৃপ্তিবোধ করেন।

ডিনারের পাশাপাশি অভিবাসীদের কাছ থেকে সিঙ্গাপুরের কোন জায়গা কেনাকাটা-ঘুরাঘুরির জন্য উৎকৃষ্ট, সে সম্পর্কে ধারণা পেলাম। ‘হোটেল ডিকশন’ মাঝারি মানের হোটেলে হলেও প্রভাতে বুফে ব্রেকফাস্ট ছিল ফ্রি। সেখানে বেশ কজন বাংলাদেশি পর্যটকের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় হলো। তাঁদেরই একজন শরীয়তপুরের নাঈম শেখ। মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এই ভদ্রলোকের কাছে জানা গেল, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যয়বহুল হলেও ফলদায়ক। প্রচুর বাংলাদেশি, নেপালি, শ্রীলঙ্কান ছাড়াও পাশ্বর্বর্তী থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম থেকে লোকজন প্রতিদিনই এখানে ছুটে আসছেন।

পরদিন সকালে আবার শহরটি ঘুরে ঘুরে দেখি, এখানে রাস্তায় কোনো রাবিশের সন্ধান পেলাম না। রাস্তায় সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফেলে দিয়ে ধরা পড়লে ১০ ডলার জরিমানা গুনতে হয়। মেট্রোতে চড়ে রওনা দিই সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় নাগোরদোলা ‘সিঙ্গাপুর ফ্লায়ার’ দর্শনে। এর অবস্থান মেরিনা বে। এটাকে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু নাগরদোলা বা ফেরিস হুইল, যার মাধ্যমে আপনি পুরো সিঙ্গাপুর শহর দেখতে পাবেন। আর আপনি চাইলে নাগোরদোলাতে অবস্থানকালে আপনার ডিনারটাও সেরে নিতে পারেন! ছোটবেলায় ভাবসম্প্রসারণে পড়েছি, ‘অর্থই অনর্থের মূল!’ এখন দেখছি, অর্থ থাকলে এ যুগে আর কোনো কিছুই সাধ্যাতীত নয়!

default-image

চীনে কখনো যাইনি, কিন্তু এখানে এসে দেখা হচ্ছে প্রচুর চীনা মুখ। অতঃপর দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতেই যেন ঢুকে পড়ি ‘চায়না টাউনে’। যতই দেখছি, চীনাদের প্রভাব দেখে ততই শিহরিত আমি, কী নেই ওখানে? চীনের ঐতিহ্যবাহী খাবার থেকে শুরু করে নান্দনিক সব পোশাক, উজ্জ্বল লাল লণ্ঠন—সবই দেখছি সহজলভ্য। জনশ্রুতি, পৃথিবীর বুকে এখানেই প্রথম চীনারা বসতি স্থাপন করে।

সিঙ্গাপুর এক জলঘেরা দ্বীপদেশ। উত্তরে মালয়েশিয়াকে পৃথক করা জোহর প্রণালি, দক্ষিণে ইন্দোনেশিয়ার বাটাম দ্বীপকে পৃথককারী সিঙ্গাপুর প্রণালি, পশ্চিমে মালাক্কা প্রণালির দক্ষিণ মুখ আর পূর্বে দক্ষিণ চীন সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ ঘিরে রেখেছে এই অনিন্দ্যসুন্দর দ্বীপদেশকে। প্রভাবটা আসলে দক্ষিণ চীন সাগরেরই। তাই সিঙ্গাপুরে বেড়াতে এসে আপনি জলে ভাসবেন না, এটা হয় নাকি?

একজায়গায় জলের রং গাঢ় নীল, আরেক জায়গায় টারকোয়েজ ব্লু। মনে হলো, মরুভূমিতে যেমন মরীচিকা ধাঁধা লাগিয়ে দেয় পর্যটকদের, এখানেও ঠিক তেমনই। আমরা ভাসছি জলে। সিঙ্গাপুর থেকে ফেরি ছেড়েছে সেই সাতসকালে। প্রথমে মেট্রোতে চেপে আমরা আসলাম সোজা হারবারফ্রন্টে। এখান থেকেই যাচ্ছি, বালি এবং জাকার্তার পর ইন্দোনেশিয়ার তৃতীয় ব্যস্ততম প্রবেশদ্বার বাটাম দ্বীপ দর্শনে। ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। সেই কারণে বাংলাদেশিদের জন্য আছে অন-অ্যারাইভাল ভিসা–সুবিধা।

এক পাশে সানতোসা আইল্যান্ড, অন্য পাশে সিঙ্গাপুর সমুদ্রবন্দরকে সাক্ষী রেখে আমাদের চোখ আটকে যাচ্ছে সৌন্দর্যের প্রাচুর্যে। বন্দরের দিকে জাহাজ ভিড়তেই দেখি, পাহাড়ের বুকে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘ওয়েলকাম টু বাটাম’। কেন বাটাম এত বিখ্যাত? কেন প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের প্রাণের স্পন্দনে ১০ লাখ মানুষের শহর বাটাম আলোড়িত হয়? কারণ একটাই, অধুনা ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর এই ত্রিবিধ দেশের উৎপাদনের ভিত হিসেবে ধরা হচ্ছে বাটাম দ্বীপকে। বাটাম চীনের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সমতুল্য। পরিকল্পিতভাবে এখানে রাখা হয়েছে ব্যবসা এবং বিনোদনের সুব্যবস্থা।

default-image

ইন্দোনেশিয়া ধনী দেশ না হলেও তাদের ইমিগ্রেশন সিস্টেম বেশ উন্নত আর দ্রুততর। আরও একবার পাসপোর্টে সিল। ভ্রমণ তালিকায় যুক্ত হলো ভিসামুক্ত একটি দেশ। কোনো ক্যামেরা নয়, চোখের পলকে ধারাবাহিকভাবে নজরবন্দী করছিলাম, ইনফরমেশন সেন্টার, মানি এক্সচেঞ্জ, ফাস্ট ফুডের দোকান, প্রসাধনীর দোকান, সঙ্গে চমৎকার দেহবল্লরির অধিকারী গুচ্ছ গুচ্ছ তরুণী।

কয়েকটি ফুড কোর্টে খানিকক্ষণ উঁকি মেরে একটিতে ঢুকলাম। ইন্দোনেশিয়ার জনপ্রিয় পদ ‘নাসিং গোরিং’। ভাতের সঙ্গে পছন্দ অনুযায়ী ভাজা মাছ অথবা ডিম পোচ। ব্রেকফাস্ট বিল ১ লাখ ২৫ হাজার ইন্দোনেশীয় রুপিয়া! শুনে আঁতকে ওঠার কিছুই নেই; ওখানে টাকার মান এমনই। ১ বাংলাদেশি টাকার বদলে আপনি পাচ্ছেন ১৬৫ ইন্দোনেশীয় রুপিয়া।

কফির চুমুকে তৃপ্ত হয়ে ইনফরমেশন সেন্টারে চোখ রাখি। জিনস, কুর্তার সঙ্গে ম্যাচিং ক্রিস্ট্রাল বসানো মাথার স্কার্ফ; নাম তার ডিয়ান পেলেঙ্গি। পুলকজাগানো হাসিতে ভদ্রমহিলা সম্ভাষণ জানালেন। বাংলাদেশি শুনে সাশ্রয়ী প্যাকেজে ডে ট্যুরের ব্যবস্থা করে দিলেন। পেয়ে গেলাম সিঙ্গাপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্টাডি ট্যুরে আসা ভিন্ন ভিন্ন দেশের ছাত্রদের সঙ্গে দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের নিশ্চয়তা। ভাবছি, মিনিবাসে চড়ে এক দিনেই শহরটা প্রদক্ষিণ কীভাবে সম্ভব? ওই দিকে বাসের ভেতরে চলছে হরদম বিভিন্ন দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের হল্লা, গান, খুনসুটি, র‌্যাফল‌ ড্র...আর কিছু সময় পরপর গাইডের ইংরেজি ভাষায় পরবর্তী স্পটের স্থাপত্যকীর্তির গাথাবর্ণনা।

default-image

এরপরেই গাইড নিয়ে গেলেন বাটামের অন্যতম প্রধান ‘মসজিদ রায়া’য়। এর সারা দেহ উদ্ভাসিত হয়ে আছে চমৎকার কারুকার্যময় শিল্পের বুনোটে। পিরামিডের আদল। একসঙ্গে ভেতরে সাড়ে তিন হাজার আর বাইরে ১৫ হাজার মুসল্লি এখানে নামাজ আদায়ে সক্ষম। এরপর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ‘দুতা বৌদ্ধ মন্দির’ দেখার পালা। বারবার নৈঃশব্দের ভেতর দিয়ে জেগে উঠছি, আর দেখছি কী করে বৌদ্ধ ছাত্রছাত্রীরা মেতে ওঠেন আরাধনায়? মনোলোকে প্রার্থনার সুর-ছন্দ মগ্নতর করার জন্যই বুঝি কিছু সময় বুজে রাখতে হয় দুচোখের পাতা!

কোনো কোনো মূর্তির গায়ে ফুলের মালা, আশপাশে জ্বলছে প্রদীপ আর ধূপধুনা। এখানেই গাইড জানালেন, বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রী এক বৌদ্ধদেবতা। যাঁরা এর পূজা করেন, তাঁরা জ্ঞান, উত্তম স্মৃতিশক্তি, বুদ্ধি, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এবং বাগ্মিতা লাভ করেন। বয়সে চল্লিশোর্ধ্ব গাইড উইরানতো দুদো মিশুক আর বাকপটু। সদালাপি মানুষটি জানালেন, চাকরি জোগাতে ব্যর্থ হয়ে এখন পর্যটকদের আনন্দদানই তাঁর পেশা এবং একমাত্র নেশা। এখানকার ক্যাথলিক চার্চ, রিসোর্ট, শপিং মল, ম্যাসাজ পারলার—কোনো কিছুই দেখানোর বাদ রাখলেন না।

ম্যাসাজ পারলারে এক ঘণ্টার ঐচ্ছিক ম্যাসাজ, যা প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত। শরীর মর্দনের পর দেওয়া হলো ইন্দোনেশিয় বিখ্যাত শরবত। তারপর গাইডের নির্দেশনায় আমরা ছুটলাম ‘বেরেলাং সি ফুড’ রেস্তোরাঁয়। ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশির ওপর ভাসছে পাশাপাশি বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁ। রাজদরবারের মতোই লম্বা টেবিল। প্রতিটি টেবিলেই ইন্দোনেশীয় ঐতিহ্যের ছোঁয়া, সারি সারি ফুলের টব, শিল্পকর্ম। থরে থরে সাজানো প্লেট, গ্লাস ও চামচ। ‘জিলবুবস’ আর আঁটসাঁট পোশাকে মেহমানদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন নারী পরিবেশকেরা। এখানকার নারীদের ফ্যাশন ট্রেন্ড ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশেষায়িত। খ্রিষ্টান আর বুদ্ধিস্টরা পরিধান করেন বাহারি মিনি স্কার্টের সঙ্গে ডেনিম শার্ট বা সলিড কালারের টপ।

গভীর সমুদ্রে জেলেরা যেমন জাল থেকে তুলে আনা মাছ রেঁধে খান, তেমনই তরতাজা মাছে আর দক্ষ পাচকদের তৈরি আহার পরিবেশন করা হলো। তাঁদের চেষ্টা সম্ভবত সি ফুড যেন তার নিজস্ব স্বাদ হারিয়ে না ফেলে। আড়ম্বরপূর্ণ লাঞ্চ সেরে মনে হলো, নীল ঝিনুকের শাঁস, মুচমুচে হাড়ের কাঁকড়া, ফ্রায়েড রাইস, নানা জাতের ইন্দোনেশীয় ইয়োগার্ট আর সালাদ বহুকাল জিবের স্বাদকোরকে লটকে থাকবে!

default-image

খাওয়াদাওয়ার পর বাস ছুটল কিছুটা প্রত্যন্ত এলাকার দিকে, নিউ কোস্টারিনা অভিমুখে। বিশাল এই অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ঘুরতে ঘুরতে বাঘ, সিংহ, ঘোড়া, সাপ, গরু, মোরগসহ অনেক প্রাণীর স্ট্যাচুর সঙ্গে বন্ধুত্বও হয়ে গেল। সঙ্গে বোনাস হিসেবে পাওয়া উপজাতিদের সার্কাস আর ক্রীড়াশৈলিতেও মনটা নড়েচড়ে উঠল।

আর ঠিক সে সময়টাতেই চোখ খুঁজে পেল সার্কাস রিংয়ের বাইরের মধ্যমণিকে। খোলা আকাশের নীচে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুর দিকেই ধাবিত হলাম। তিনিও সাড়া দিলেন। নাম ইউহানা পারদানা। তিনি এসেছেন রাজধানী জাকার্তা থেকে। লক্ষ্য করলাম, হাস্যোজ্জ্বল, সদালাপী এই তরুণি ইসলামী মূল্যবোধকে যেমন ধারণ করছেন পোশাকে ঠিক তেমনই মার্জিত আচরণেও। তাঁর মা ছিলেন যাত্রাসঙ্গী অথচ আমি ভেবেছিলাম বড়বোন! এদেশে মা এবং কন্যার বয়সের ফারাক ধরাটা বেশ দুঃসাধ্য। মা জানালেন, তরুণীটি সেখানকার আইএনটিআই ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন।

এবারে তরুণী ইউহানা পারদানা বাংলাদেশ সম্পর্কে বেশ কৌতুহলী হয়ে উঠলেন। নিজের জ্ঞানের ঝুলি থেকে আগ বাড়িয়ে জানালেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম শেখ হাসিনা আর তখনকার বিরোধী দলের নেতার নাম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়ার ভালো বন্ধু, সেজন্য বাংলাদেশে বেড়াতেও আসতে চান। গল্প শুনতে শুনতে তরুণীর দাঁড়িয়ে থাকাটা এতোক্ষণ উপভোগ্য ছিল কিন্তু এখন আমাকে বসতে অনুরোধ করায় মনের ভেতর ধুকপুকানি টের পাই! অতঃপর ভেতরে পরম স্বস্তির স্বাদও এনে দেয়; যখন তিনি বিজয়ের প্রতীক ভিক্টরি চিহ্ন দেখিয়ে আমার সঙ্গে ছবিখানা তুলেই ফেললেন!

গাড়ি ছুটছে ঘড়ির পেন্ডুলামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। গাইড বেশ দৃঢ়তায় বললেন, জাপান সূর্যোদয়ের দেশ হলে, ইন্দোনেশিয়া কেন নয় সূর্যাস্তের? তাঁর বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করতেই কি না, ধার্য হলো ‘বেয়ারল্যাং ব্রিজ’-এ আজকের সূর্যাস্ত দর্শন।

সেতু জীবনে অনেকবারই দেখেছি, কিন্তু বেয়ারল্যাং ব্রিজ নামের ঝুলন্ত সেতু দেখে তো আমাদের চোখ ছানাবড়া! এ যে শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য! পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে আছে সবুজের সমারোহ, সাগরসৈকত এবং ঝুলন্ত সেতু! কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরতে হবে বাটাম সেন্টার। ধরতে হবে সিঙ্গাপুর ফেরার ফেরি। পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম দেশ অথচ ধর্ম-সংস্কৃতি-জীবনাচরণে কত না ধর্মনিরপেক্ষ। এখানে যেমন ক্যাথলিক চার্চ আছে, তেমনি আছে স্থাপত্যকীর্তিতে অনন্য সব সুন্দর মসজিদ। আছে প্যাগোডা আর মন্দির এবং আছে রাস্তাজুড়ে বহাল তবিয়তে কৃষ্ণ, গণেশ, কার্তিক, হনুমানসহ অনেক দেব-দেবীর মূর্তি। এমনকি নাম দেখেও বোঝার উপায় নেই কে কোন ধর্মে বিশ্বাসী। এ থেকেই বোঝা যায়, পরমত ও পথকে ইন্দোনেশিয়রা কতটা শ্রদ্ধা করেন। আসলেই একটি সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ গড়তে প্রয়োজন ধর্মীয় বহুত্ববাদ, যা কিনা একটি গণতান্ত্রিক সমাজেরও ভিত্তি; ইন্দোনেশিয়ায় না এলে কোনো দিনই সেই উজ্জ্বল মহিমাটুকু উপলব্ধি করা যেত না।

বাইরে হইচই, ঠোকাঠুকির শব্দ। বিশাল যাত্রীদল থেকে ফিলিপাইনের দলছুট কলেজপড়ুয়ারা, একে একে বিশাল ছাউনির তলায় এসে জড়ো হলেন। একটা গ্রুপ এখানকার হোটেলেই রাত্রি যাপন করবে। বিদায় জানাতে গিয়ে অবসন্ন উইরানতো দুদো, কোলাকুলির ভঙ্গিতেই যেন আমাকে নিজ হৃদয়ে অন্তর্লীন করে নিলেন!

সবার মুখজুড়ে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, তবু বিদায়ের বিষণ্নতায় কারও কারও চোখ ছলছল। আকম্পিত।

হঠাৎ দেখা শ্বাসরুদ্ধকর স্থিরতাগুলো গোধূলির আলোর পথেই হারিয়ে গেল। আমার মাথাটা ছুঁয়ে একটা ঘাসফড়িং উড়াল দিল দূর শহরের পথে…আমরাও ট্যুরিস্ট বাসে উঠে পড়লাম বিড়ালের মতো শান্ত পদক্ষেপে। ধরতে হবে সিঙ্গাপুর যাত্রার শেষ ফেরি। ল্যাম্পপোস্টের ঝিলিমিলি আলো ফেলে হাইওয়ের রাস্তায় বাস ছুটছে দুরন্ত গতিতে। সঙ্গে চারপাশের গাছপালাও হেলছে-দুলছে। হৃদসরোবরে সতেজ ইন্দোনেশিয়ায় একটি অসাধারণ গ্রীষ্মদিন কাটানোর মুহূর্ত। সেই মানসিক আনন্দের তৃপ্তিতেই কি না, আকাশের মেঘ গুঁড়ি গুঁড়ি হয়ে বাতাসের ওপর ঢেউ রচনা করল! ওপরে সন্ধ্যাতারার শ্যেনচক্ষু! বাসের জানালায় সে কি ঝড়ের নাচন!

ছবি: লেখক ও উইকিডিয়ায়

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন