বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কথা প্রসঙ্গে জামাল উদ্দিন বলে, ‘আমি মদিনাতে প্রথম এসেছি।’ সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তাব দিল, ‘আমাকে নিয়ে মসজিদ-ই-নববিতে জুমার নামাজ পড়বে। করোনার জন্য মসজিদে ঢুকতে নাকি টিকিট লাগে, যা আমি সময় স্বল্পতার জন্য নিতে পারিনি।’ জালাল উদ্দিনের নাকি বেশ জানাশোনা আছে। আমার জন্য টিকিট জোগাড় করে দেবে বলল।

নামাজ শেষে পেটে ছুঁচো দৌড়াচ্ছিল। জালাল উদ্দিন তখনো আমার সঙ্গে।

বলল, ‘তোমাকে নিয়ে খুব দারুণ এক রেস্তোরাঁয় যাব।’

খাবার অর্ডার দেওয়ার সময় জামাল উদ্দিন জবরদস্তি করে বিল দিল। অকৃত্রিম হাসি হেসে বলল, ‘মানুষ মদিনায় আসে আল্লাহর রসুল (সা.)-এর দেখা পাওয়ার জন্য। সেই জন্য সবার মনে থাকে নমনীয়তা, কণ্ঠে ও আচরণে থাকে কৃতজ্ঞতা। রসুল (সা.)-এর টানে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা এই মানুষদের আন্তরিকতা ও ভালোবাসাতেই গড়ে উঠেছে আমাদের মদিনা। এই অতিথিদের সেবা করা আমাদের জন্য এক ইবাদত।’ বিশ্বের সব জায়গার ট্যাক্সিচালকেরা আন্তরিকতা প্রকাশ করেন, যেন ভ্রমণ শেষে ভালো বকশিশ পান। এই জামাল উদ্দিন দেখি ঠিক উল্টো। বকশিশ তো দূরের কথা, আমার আতিথেয়তার জন্যই মূল্যবান সময় ও সম্পদ ব্যয় করল। তার অভূতপূর্ব আন্তরিকতায় অভিভূত হলাম।

default-image

রেস্তোরাঁটা সত্যিই বেশ অভিনব। খাবার অর্ডার দেওয়ার পর চারদেয়ালে ঘেরা একটি ব্যক্তিগত ঘরে খাবার নিয়ে আসে বেয়ারা। খেতে হয় মাটিতে বসে। আরবীয় কায়দায়।

খাবার নিয়ে এলেন ২০-২২ বছরের এক যুবক। কথা বলে জানতে পারলাম, তিনি মাত্র ছয় মাস আগে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। নাম শুভ। বাংলাদেশে থাকতেন উত্তরায়। এখানে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা কাজ করেন। সপ্তাহান্তেও কাজের কোনো বিরতি নেই। আমি শুভকে আমাদের সঙ্গে একই কাতারে বসে খাবারের জন্য আহ্বান জানালাম। যেহেতু কক্ষটি উঁচু দেয়ালে ঘেরা, বেশ গোপনীয়তা আছে। শুভও কোনো কুণ্ঠা না করে আমাদের সঙ্গে খেতে বসে গেলেন।

একই কাতারে বসে, একই প্লেট থেকে খেতে খেতে আমাদের মধ্যে অল্প সময়ের জন্য হলেও সমতা চলে এল। উপলব্ধি করলাম, কেন আমাদের প্রিয় নবী (সা.) সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে একই প্লেট থেকে খেতেন।

খেতে খেতে ভাবলাম, একটা সেলফি তুলব। শুভ খুবই অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার সঙ্গে সেলফি তুলবেন? রেস্তোরাঁয় খেতে আসা খদ্দেররা বেয়ারাকে নিয়ে সেলফি তুলবেন?’ ব্যাপারটা বেমানান।

আমি সুদৃঢ় কণ্ঠে বললাম, ‘অবশ্যই। প্রিয় নবী (সা.)-এর শহরে আমরা সবাই সমান।’

খাবার শেষে জালাল উদ্দিন বলল, ‘চলো। তোমাকে মদিনা ঘুরিয়ে দেখাই। আজকে আর কাজ করব না। তোমার সঙ্গেই সময় কাটাব।’

ঘুরিয়ে দেখাল ওহুদের যুদ্ধের প্রান্তর। পাশেই শুয়ে আছেন মহানবী (সা.)-এর চাচা হামজা (রা.)। তিনি ওহুদের যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। ইসলামের এত বড় এক ব্যক্তিত্ব, অথচ সমাধিটা একদম সাদামাটা। এটাই মদিনার বিশেষত্ব। সবকিছুর আয়োজন খুব আটপৌরে ও অনাড়ম্বর। কিন্তু তারপরও সবার চাহনিতে এক অসীম প্রশান্তি।

সৌদি আরবে যাওয়ার লম্বা ফ্লাইটে কথা হয়েছিল এক সৌদি ভদ্রলোকের সঙ্গে। তিনি বসেছিলেন আমার পাশেই। মদিনায় যাব, জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে তাঁর এক বন্ধুর ফোন নম্বর দিয়েছিলেন। বন্ধুটি খেজুরের ব্যবসা করেন। অগাধ তাঁর জ্ঞান। নাম ফাহাদ। আমি গেলে অবশ্যই যেন ফাহাদের সঙ্গে দেখা করি।

আমাদের রসুল (সা.)-এর জীবনের এক অনন্য শৈলী ছিল সাধারণ ও পরিমিত জীবনযাপন। জীবনে যেন কমই অনেক বেশি। মদিনা ভ্রমণে এ উপলব্ধি আবার নতুন করে অনুধাবন করলাম।

মদিনায় ঘুরতে ঘুরতে ফাহাদের কাছ থেকে ফোনও চলে এল। তাঁর বাসায় নাকি যেতেই হবে। এভাবে অচেনা একজনের বাসায় যাব? তারপরও গেলাম। গিয়ে দেখি, ফাহাদ আমার বয়সী। দুই কন্যা আর স্ত্রী নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। ফাহাদের কথায় আর চালচলনে এক অদ্ভুত কোমলতা, প্রশান্তি। খুব ধীরগতিতে গুছিয়ে কথা বলেন, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। অনেকটা মানসিক ব্যাধির নিরাময় করেন যাঁরা, সেই থেরাপিস্টদের মতো। হেসে হেসে বললেন, ‘মদিনা এমনই এক আমলময় জায়গা, এখানকার শান্ত পরিবেশ ও সুস্থ জীবনধারায় জীবন হয়ে ওঠে প্রশান্তিময়। এটা বাইরের কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।’

ফাহাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময়ে দেখি, টেবিলভর্তি একগাদা আয়োজন। আমি নাকি রসুল (সা.)-এর অতিথি। আপ্যায়ন না করে ছাড়বেনই না।

আমাদের রসুল (সা.)-এর জীবনের এক অনন্য শৈলী ছিল সাধারণ ও পরিমিত জীবনযাপন। জীবনে যেন কমই অনেক বেশি। মদিনা ভ্রমণে এ উপলব্ধি আবার নতুন করে অনুধাবন করলাম।

আর বোনাস হিসেবে পেলাম অকৃত্রিম কিছু মানুষের সান্নিধ্য। মদিনায় বেড়াতে গেলে আমার বন্ধু জালাল উদ্দিন ও ফাহাদকে খুঁজে নিতে ভুলবেন না। আর তাদের যদি খুঁজে না পান, তাদের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা নিশ্চয়ই আপনাকে খুঁজে নেবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, কম্পিউটার বিজ্ঞান, ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টার, যুক্তরাষ্ট্র

ই-মেইল: [email protected]

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন