কিলিমানজারো অভিযান-৬
এই গাছ শুধু কিলিমানজারোতেই পাওয়া যায়
আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে উঁচু পর্বত কিলিমানজারোতে গিয়েছিলেন ইফতেখারুল ইসলাম। পর্বত আরোহণ ছাড়াও তানজানিয়ায় জাতীয় উদ্যানে সাফারি করেছেন তিনি। এ সফরের গল্প নিয়েই আমাদের ধারাবাহিক আয়োজন। আজ পড়ুন ষষ্ঠ কিস্তি।
ট্রেকের তৃতীয় দিনে আমাদের লক্ষ্য শিরা-১ থেকে ট্রেক করে ৩ হাজার ৮৫০ মিটার উচ্চতায় শিরা-২-এ পৌঁছানো। এদিনের ৮ বা ৯ কিলোমিটারের ট্রেকে সময় লাগবে পাঁচ ঘণ্টা। আমাদের গাইড লিখেছে, ৮ কিলোমিটার; কিন্তু কিলিমানজারো জাতীয় উদ্যানের একটা সাইনবোর্ডে দেখেছি ৯ কিলোমিটার। ট্রেক খুব দীর্ঘ নয় বলে একটু আলসেমি করি সবাই। আমাদের ভোরবেলা যথারীতি ডাকাডাকি করে ব্রেকফাস্ট করিয়ে দেওয়া হলেও এদিন আমরা বের হতে একটু দেরি করে ফেলি।
আগেই ট্রি–লাইন ছাড়িয়ে এসেছি। ট্রি-লাইন মানে, যে উচ্চতার ওপরে আর কোনো বড় গাছ জন্মায় না। গাছ নেই বলে প্রকৃতির দেওয়া অক্সিজেন সরবরাহ কমে গেছে। এদিন ঘাস ও ছোট ছোট ঝোপের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় ভাবছিলাম, নেপালের হিমালয়ে অনেক উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে গ্রাম ও লোকালয় আছে বলে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। ছোট ছোট লজ ও টি-হাউস পাওয়া যায়। যেকোনো জায়গায় থেমে চা-কফি খাওয়া যায়। এখানে, আফ্রিকার এই খোলা প্রান্তরে রোদ–বৃষ্টি–তুষারপাত যা-ই তীব্র হোক, নিজেদের ক্যাম্প বা তাঁবু পর্যন্ত হেঁটে চলা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
তৃতীয় দিনের ট্রেকে চারপাশের প্রকৃতি প্রায় আগের দিনের মতোই। গাছপালাহীন প্রান্তরে একটি পাহাড়ের বাধা ডিঙিয়ে পরের পাহাড়ের দিকে পা বাড়ানোর আগে চোখে পড়ল কয়েকটা নতুন ধরনের গাছ। আমি একটু থেমে সেই জায়ান্ট গ্রাউন্ডসেল গাছের ছবি তুলে নিই। আমার সঙ্গীরা এগিয়ে যায়। আমাদের সঙ্গে গাইড ছিল হাফিজ। সে-ও অনুদের সঙ্গে গেছে। তাই আমি অপেক্ষা করি পেছনের গ্রুপের সঙ্গে থাকা গাইড হাওয়ার জন্য। হাওয়াকে প্রশ্ন করার আগেই ও আমাদের এই গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ‘ডেনড্রোসেনেসিও কিলিমাঞ্জারি’ নামের এই গাছ জায়ান্ট গ্রাউন্ডসেল নামেই বেশি পরিচিত। শুধু কিলিমানজারোতেই পাওয়া যায় এই গাছ। তবে এর জন্য জলের প্রয়োজন। এ অঞ্চলে যেখানেই এই গাছ দেখা যাবে, ধরে নেওয়া যাবে যে তার কাছাকাছি কোথাও জলের উত্স আছে। এখানে হাওয়া হাত তুলে আমাদের দেখিয়ে দেয় কাছেই একটা ছোট জলধারা ঝিরঝির করে বয়ে চলেছে।
আমাদের এবারের যাত্রাপথে সবচেয়ে কম দূরত্ব বোধ হয় এই দিনেই পেরোতে হয়েছে। ক্যাম্পের নাম যা-ই হোক, এলাকার নাম কিন্তু আলাদা। আমার আইফোন বলছে, আজ আমরা পূর্ব মাসামা থেকে যাত্রা করে পশ্চিম মাসামা চলেছি। নির্ধারিত ক্যাম্পে পৌঁছে যাই বিকেলের মধ্যেই। পৌঁছে দেখি মেঘের ওপরে চলে এসেছি। বেলা থাকতেই সবাই কাছাকাছি কয়েকটা উঁচু জায়গাতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে হেঁটে বেড়ান। শোনা যায়, কোনো কোনো উঁচু জায়গাতে মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে। আমরা সবাই চেষ্টা করি যার যার দেশে প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলতে। মেঘের সাগরে সাঁতার কেটে বেড়ায় পাখিরা। আমরা পাখিদের চেয়েও উঁচুতে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখি।
সন্ধ্যার আগে আমাদের তাঁবু পেরিয়ে সূর্যাস্তের লাল আলো এসে ছিটকে পড়ে মেঘের ওপর। মনে হয় যেন মেঘের ওপর ভেসে আছে আমাদের এই দ্বীপ। আমরা এখনো মুরল্যান্ডে। চারদিকে ঘাস আছে। তবে ক্যাম্পের পুরো এলাকাটা শুকনা। পাথুরে ও ধূলিময়। বাতাসে ধুলা উড়ে বেড়ায়। তাঁবুর গায়ে ধুলা জমা হয়। ধুলা লেগে থাকে আমাদের গায়ে আর চুলে।
আমাদের জন্য সকাল-সন্ধ্যা দুবেলা ক্যাম্পে জলের বরাদ্দ আছে। কাছাকাছি কোনো ঝরনা বা জলের ধারা থেকে সংগ্রহ করে আনা জল ফুটিয়ে বিশুদ্ধ করে ফ্লাস্কে দেওয়া হয় চা-কফির জন্য। সেই জল ওরা আমাদের প্রত্যেকের বোতলেও ভরে দেয়। হাত–মুখ ধোয়ার জন্য বালতিতে দেওয়া হয় গরম জল। প্লাস্টিকের বাটিতে করে জল নিয়ে তাতে তোয়ালে ভিজিয়ে গা-হাত ও মুখ মুছে নিই আমরা। তারপর আছে আমাদের নিজেদের ডিসপোজেবল ওয়াইপস বা ভেজা টিস্যু। পাহাড়ে যে কয় দিন আছি, এই–ই ভরসা। পর্বতারোহী হতে হলে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে খুঁতখুঁতে হওয়া চলে না।
কয় দিন ধরে পোরিজ, পাউরুটি, স্যুপ, পাস্তা ও চিকেন খেয়ে কেউ কেউ বেশ ক্লান্ত। দিনের পর দিন খেতে হলে কোনো কিছুর স্বাদই আমাদের সবার পছন্দ হওয়ার কথা নয়; কিন্তু সেটা মেনে নিয়েছি আমরা। শিরা-২ ক্যাম্পে পৌঁছে জুঁই বললেন আজকের রান্না তিনি করবেন। আমাদের গাইড ও শেফরা এতে রাজি। আমাদের কেউ কেউ তাঁকে সহায়তা করতে চাইলেন। সত্যি সত্যিই সন্ধ্যায় রান্নার সময় জুঁই আমাদের শেফের সঙ্গে কিচেনে হাজির। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন লিজা। সেদিন রাতে আমরা ভাতের সঙ্গে গরম–গরম আলুভর্তা, দেশি ও আফ্রিকান মশলা মিশিয়ে রান্না করা তানজানিয়ান শুঁটকি আর একটা মুরগির ঝোল পেলাম। পুরো তৃপ্তি করে ভাত খেলাম সবাই। সন্ধ্যায় ডাইনিং টেন্টে বসে অনু জিজ্ঞেস করল, ‘কেউ কি বলতে পারবেন, আমাদের সহায়তার জন্য কিলিগ্লেসিয়ার এজেন্সির কতজন কর্মী আমাদের সঙ্গে আছেন?’ কেউই ঠিকমতো অনুমান করতে পারে না। আমি চুপ করে থাকি। কারণ, এর উত্তরটা আমার জানা।
কিলিমানজারো ভ্রমণের ওপর বিভিন্ন বইয়ে লেখকেরা এই বিষয়টা ভালো করে ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ এখানে একা অভিযানে এলে তাঁর সঙ্গে থাকে পাঁচজন স্টাফ। গাইড, শেফ, পরিচারক, টয়লেট মাস্টার ও পোর্টার। বড় দলে আছি বলে আমাদের ক্ষেত্রে পাঁচ গুণ দরকার নেই। চার গুণ হলেই চলে। তার মানে, আমাদের সঙ্গে আছে প্রায় আশি জন।
এদিন থেকে রাতের ব্রিফিং আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। খাওয়া শেষ হওয়ার পর কেউ আর ওই ডাইনিং টেন্টে বসে থাকতে চান না। ঠান্ডা তীব্রতর হচ্ছে। রাতের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে। সবাই চান তাড়াতাড়ি যাঁর যাঁর তাঁবুতে গিয়ে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর ঢুকে যেতে। ঠিক তখন আমাদের দলের প্রধান গাইড এসে পরের দিনের ট্রেক নিয়ে আলোচনা করে। কখন ট্রেকিং শুরু হবে, যাত্রাপথ ও আবহাওয়া কেমন হবে, পোশাক কেমন হওয়া চাই—এসব জানিয়ে দেয়। অন্য গাইডরা কাগজপত্র নিয়ে আসে। অক্সিমিটার দিয়ে সবার পালস ও অক্সিজেন স্যাচুরেশন মেপে দেখা হয়। প্রত্যেককে জানাতে হয় নিজ নিজ শারীরিক অবস্থার কথা। কোনো রোগের লক্ষণ আছে কি না। খাবার খেতে পারছি কি না, কতটুকু পানি খেয়েছি ইত্যাদি। যার যার কাগজে এসব তথ্য লিখে স্বাক্ষর করে দিই আমরা। (চলবে)