অবিবাহিত নারী বিদেশে যেতে পারবেন না—এমন আইন বা নিয়ম কোথায় আছে
বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা বা এন্ট্রি পারমিশন ও বিমান টিকিট থাকা সত্ত্বেও তিনজন নারীর বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া অভিযোগ উঠেছে। ইমিগ্রেশনের সময় ওই নারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তাঁদের বাসায় জানে কি না; এরপর বাসায় ফোন করতে বলেন এবং তাঁরা ফোনও করেন। ওই তিন নারীর অভিযোগ, তাঁরা অবিবাহিত এবং নিজেরা যাচ্ছেন বলে হয়রানি করা হয়েছে। এরপর তাঁরা বিদেশযাত্রায় কেন বাধা দেওয়া হয়েছে, তা তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বরাবর অভিযোগ করেন। তাতে সাড়া না পেয়ে তাঁরা আদালতে রিট করেন। তিন নারীকে বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে গতকাল ২৯ সেপ্টেম্বর রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক নারী নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। ইমিগ্রেশনে নারীদের হয়রানি প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন ভ্রমণকন্যা–ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশের সহপ্রতিষ্ঠাতা সাকিয়া হক
সারা পৃথিবী যখন নারীর স্বাধীন চলাচল, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সম–অধিকার নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশে তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নেপাল ভ্রমণে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে আটকে গেলেন! তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাসায় জানে কি না, অবিবাহিত অবস্থায় নিজেরা কেন যাচ্ছেন ইত্যাদি প্রশ্ন করে ভ্রমণে বাধা দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালে এসে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী অবিবাহিত হওয়ার বিষয়টি সেখানে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল যে তাঁদের বেড়াতে যাওয়ার অনুমতি মিলল না! ভাবা যায়?
ইমিগ্রেশন নিয়ে এই অভিজ্ঞতা দেশের বাইরে যাওয়া নারীদের জন্য নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর আমরা শুনে আসছি নানা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। ‘বিয়ে হয়েছে?’ যদি বিবাহিত হয়ে থাকেন, তাহলে বলবে, ‘আপনার স্বামী আপনাকে একা যেতে দিলেন?’, ‘এত টাকা কোথায় পান?’ ইত্যাদি।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে যাবেন, একা যাবেন নাকি বন্ধুদের সঙ্গে যাবেন—এসব সিদ্ধান্ত কি তাঁর বৈবাহিক অবস্থার ওপর নির্ভর করার কথা?
আইন ও নিয়ম কী বলে
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে নাগরিকের বাংলাদেশ ত্যাগ ও পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যদিও আইনে নির্ধারিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ থাকতে পারে। আবার ২৮ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সম–অধিকারের কথা বলা হয়েছে এবং কেবল নারী-পুরুষভেদে রাষ্ট্রের বৈষম্য না করার নীতি স্পষ্ট করা হয়েছে।
তাহলে আমার প্রশ্ন খুব সাধারণ, বাংলাদেশের কোন আইনে বলা আছে যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক, অবিবাহিত নারী—যাঁর বৈধ পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় ভিসা বা ভ্রমণ নথি এবং অন্যান্য বৈধ কাগজপত্র আছে—অবিবাহিত হওয়ার কারণে তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না?
বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩ অনুযায়ী, বৈধ পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথি ছাড়া দেশ ত্যাগ করা যায় না। তবে নির্দিষ্ট আইনগত কারণে পাসপোর্ট প্রত্যাখ্যান, সীমিত বা বাতিল করার বিধান আছে। কিন্তু ‘অবিবাহিত নারী’ নামে কোনো স্বতন্ত্র নিষেধাজ্ঞার কথা তো সেখানে উল্লেখ নেই।
নারীর বেলায় বৈষম্য কেন
নিরাপত্তার প্রয়োজনে ইমিগ্রেশনে প্রশ্ন থাকবে, যাচাই থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোন প্রশ্নটি নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কোনটি একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবনে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ, সেই সীমারেখাও কি আমাদের নির্ধারণ করা দরকার নয়?
কয়েক বছর আগে আমি ও আমার বান্ধবী মানসী সাহা (ভ্রমণকন্যার সহপ্রতিষ্ঠাতা) ইমিগ্রেশন পুলিশের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ‘জেন্ডার ইকুইটি’ নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল খুব সাধারণ—একজন নারী ভ্রমণকারীকে কীভাবে পেশাদার, সম্মানজনক এবং বৈষম্যহীনভাবে সেবা দেওয়া যায়, সেই আলোচনার জায়গা তৈরি করা। শুনেছি, সেই উদ্যোগ এখন আর নেই।
তাই আবারও প্রশ্নটা সামনে আনতে চাই, একজন পুরুষ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের বিদেশভ্রমণ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো অপ্রাসঙ্গিক, একই প্রশ্ন একজন নারীর ক্ষেত্রে হঠাৎ প্রাসঙ্গিক হয়ে যায় কেন? কেন নারীকে হাজারটা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে?
ইমিগ্রেশন নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক। কিন্তু একজন নারীর বৈবাহিক অবস্থা যেন তাঁর স্বাধীনভাবে ভ্রমণের অনুমতিপত্র হয়ে না দাঁড়ায়।