সৈকতে কেউ কম্বল জড়িয়ে বালুর ওপর বসে, কেউ সঙ্গে আনা চেয়ারে বসে বিশাল পর্দায় সিনেমা দেখছে

১২ থেকে ২৩ মে ফ্রান্সের কান শহরে বসেছিল ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নবীন-প্রবীণ অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা ও কলাকুশলীদের এই উৎসবে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন প্রথম আলোর আলোকচিত্রী সৌরভ দাশ

খোলা আকাশের নিচে ছবি দেখার আয়োজনছবি: সৌরভ দাশ

উৎসব শুরুর কয়েক দিন পর ঢাকা ছেড়েছিলাম। নীল আকাশের সাদা মেঘ ফুঁড়ে উড়োজাহাজটি যখন কানের দিকে এগোচ্ছিল, ছোট জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল নীল সমুদ্র, পাহাড়ের সারি আর ছবির মতো সাজানো শহর। ওপর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, এখানে বিশেষ কিছু ঘটতে চলেছে। শহরে পৌঁছে সেই অনুভূতি আরও গভীর হলো।

রাস্তাঘাট, ভবনের দেয়াল, হোটেলের প্রবেশপথ, এমনকি দোকানের শোকেস পর্যন্ত উৎসবের রঙে রাঙানো। কানে আসছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভাষা। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, যেন একসঙ্গে কয়েক ডজন দেশের মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে যাচ্ছে। কয়েক দিনের জন্য ছোট্ট এই শহরটিই হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক মিলনমেলা।

অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড সংগ্রহের পর প্রথমেই চলে গেলাম উৎসবের প্রাণকেন্দ্র ‘পালে দে ফেস্টিভ্যাল’ ভবনের সামনে। এখানেই বসে সেই লালগালিচার আসর। বহুবার ছবিতে দেখা জায়গাটি সামনে দেখে কিছু সময়ের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাস্তবে এটি যেন আরও বেশি জাঁকজমকপূর্ণ, আরও বেশি প্রাণবন্ত।

চারপাশে উৎসুক মানুষের ভিড়। কেউ ক্যামেরা, কেউ মুঠোফোন, কেউবা খালি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন প্রিয় তারকাকে একঝলক দেখার আশায়। লালগালিচার দুই পাশে তৈরি করা হয়েছে নিরাপত্তাবেষ্টনী। তার বাইরেও মানুষ, তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট উত্তেজনা।

নির্ধারিত সময়ে ফটোসাংবাদিকদের সারিতে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার চারপাশে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের আলোকচিত্রী। কারও হাতে বিশাল টেলিফটো লেন্স, কারও সঙ্গে একাধিক ক্যামেরা। সবার লক্ষ্য এক—সেরা ছবিটি তুলতে হবে।

কানের লালগালিচায় বলিউড তারকা আলিয়া ভাট
ছবি: সৌরভ দাশ

বাস্তবের লালগালিচা

ভেতরে নিজের নির্ধারিত স্থানে গিয়ে দাঁড়াতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমার অবস্থান ছিল চতুর্থ সারিতে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক ফটোগ্রাফারের উচ্চতা আমার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে সামনে কী ঘটছে, পরিষ্কারভাবে দেখা কঠিন; কিন্তু এখানে অভিযোগ করার সুযোগ নেই। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ছবি তুলতে হবে।

শুরু হলো প্রতীক্ষা। হঠাৎ ফ্ল্যাশের ঝলকানি, দর্শকদের করতালি আর উপস্থাপকের কণ্ঠে মুখর হয়ে উঠল পুরো এলাকা। একে একে লালগালিচায় পা রাখতে শুরু করলেন বিশ্বের নামী তারকারা। প্রথম কয়েক মিনিট যেন ক্যামেরা ধরতেই ভুলে গিয়েছিলাম। এত দিন যাঁদের বড় পর্দায় দেখেছি, তাঁরা এখন কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে। বাস্তব আর কল্পনার মাঝের দূরত্ব যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

এমন সময় উপস্থাপকের কণ্ঠে বারবার ভেসে এলো বলিউড তারকা আলিয়া ভাটের নাম। চারদিকে তাকিয়ে তাঁকে খুঁজতে লাগলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল গোলাপি রঙের একটি ঝলক। অস্ট্রেলিয়ান ফ্যাশন ডিজাইনার তামারা রালফের নকশা করা স্ট্র্যাপলেস বল গাউনে আলিয়া ভাট যেন পুরো লালগালিচার আলো নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন। তাঁর উপস্থিতিতে দর্শকদের মধ্যেও বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখা গেল। আমি আর একমুহূর্ত সময় নষ্ট করিনি। সামনে থাকা ফটোগ্রাফারদের কাঁধের ফাঁক দিয়ে, কখনো কনুইয়ের নিচ দিয়ে, কখনো ক্যামেরা মাথার ওপর তুলে ছবি তুলতে শুরু করলাম। কয়েক সেকেন্ডের সুযোগ; কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডই একজন ফটোসাংবাদিকের জন্য অমূল্য।

ফরাসি অভিনেত্রী ইসাবেলা হুপার্ট
ছবি: সৌরভ দাশ

এই লালগালিচায় আরও দেখা মিলল ডাকোটা জনসন, কিম্বার্লি গার্নার, বারবারা পালভিন, ডিলান স্প্রাউজ, জন ট্রাভোল্টা, এলা ব্লু ট্রাভোল্টা, আদিতি রাও হায়দারি, কলম্যান ডোমিনগো, কেট ব্ল্যানচেট, কার্লা ব্রুনি, মাইকেল ফাসবেন্ডার, অ্যালিসিয়া ভিক্যান্ডারসহ অনেক তারকার। বিশ্বের এত পরিচিত মুখকে এক স্থানে দেখা সত্যিই এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা। দিন যত গড়াতে লাগল, লালগালিচার প্রতি আমার আকর্ষণও তত বাড়তে লাগল। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রথম কাজ ছিল উৎসবের সূচি দেখা। কোন ছবির প্রিমিয়ার হবে, কখন তারকারা আসবেন, কোন সময় লালগালিচা জমে উঠবে—সব খোঁজ রাখতাম।

ফ্রান্স ও বাংলাদেশের সময়ের পার্থক্যের কারণে ছবি দ্রুত পাঠানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত ছবি বাছাই, সম্পাদনা এবং অফিসে পাঠানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হতো। কখনো রাত গভীর হয়েছে, কখনো খাবারের সময়ও হয়নি; কিন্তু কাজের আনন্দে ক্লান্তি তেমন অনুভূত হয়নি। লালগালিচার বাইরেও কান শহর যেন প্রতিনিয়ত নতুন গল্প উপহার দিচ্ছিল।

আরও পড়ুন
কান সৈকত
ছবি: সৌরভ দাশ

সৈকতে সিনেমা দেখা

শুনেছিলাম, কানে খোলা আকাশের নিচে ছবি দেখানো হয়। এক রাতে কাজ শেষ করে চলে গেলাম সৈকতে। দেখলাম, বিষয়টা কল্পনার চেয়েও সুন্দর। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দের সঙ্গে বিশাল পর্দায় চলছে চলচ্চিত্র। ঠান্ডা বাতাস বইছে অবিরাম। সেই ঠান্ডা উপেক্ষা করে সিনেমা দেখছেন হাজারো মানুষ। কেউ কম্বল জড়িয়ে বালুর ওপর বসে, কেউ সঙ্গে করে নিয়ে আসা চেয়ারে বসে, কেউবা দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন চলচ্চিত্র।

রাতের সেই দৃশ্য এতটাই আকর্ষণীয় ছিল যে পরদিন সকালে আবার সৈকতে ফিরে গেলাম। কিন্তু সকালের কান সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাতের সিনেমাপ্রেমী জনতার জায়গা দখল করেছেন পর্যটকেরা। কেউ সূর্যের আলোয় সমুদ্র উপভোগ করছেন, কেউ পরিবার নিয়ে হাঁটছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন। উৎসবের লোগোর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার জন্যও ছিল লম্বা সারি। দূরে কিছুক্ষণ পরপর সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে হেলিকপ্টার। সেই হেলিকপ্টারে করে আসছেন বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা তারকারা। আমি ক্যামেরা হাতে ঘুরে বেড়িয়েছি সৈকতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

কখনো ঢেউ, কখনো পর্যটকদের আনন্দময় মুহূর্ত, কখনো উৎসবের সাজে সজ্জিত শহরের খুঁটিনাটি ছবি তুলে কেটে যেত সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা। এভাবে কীভাবে যে পার হয়ে গেল সাতটি দিন। ফেরার সময় হয়ে গেল। হাতছানি দিয়ে ডাকছে প্যারিস। আইফেল টাওয়ার, লুভর জাদুঘর, স্যেন নদীর তীর, মমার্ত—আরও কত কত স্বপ্নের জায়গা। তবু কান ছাড়ার মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, কিছু একটা যেন এখানেই রেখে যাচ্ছি। সম্ভবত সেটি ছিল সেই লালগালিচার মায়া।

আরও পড়ুন