হোস্টেলে সকালে খাবারের বন্দোবস্ত নেই। হোস্টেল থেকে বেরিয়ে হাতের বাঁয়ে হেঁটে প্রধান সড়কে পৌঁছে একটা ম্যাকডোনাল্ডসের দোকান পেয়ে গেলাম। ভ্রমণে কোনো শহরে একটা ম্যাকডোনাল্ডসের দোকানে পাওয়া মানে ভাগ্য খুলে যাওয়া। বিদেশ বিভুঁইয়ে খুব কম টাকায় খানাখাদ্য মেলে ম্যাকডোনাল্ডসে। একটা সিটি বাসে নদী অবধি পৌঁছাতে দুই মিনিট সময়ও লাগল না। বাস থেকে নেমেই একটি দীর্ঘকায় ব্রিজ। নাম তার সেন্ট অ্যান্থনি ফলস ব্রিজ। ব্রিজ থেকে দেখা যায় সেন্ট অ্যান্থনি ফলস। ব্রিজ থেকে নিচে তাকালে গা শিওরে ওঠে। কোনো দিকে জনমানব নেই, আমি একা। আধা কিলোমিটার লম্বা ব্রিজটি হেঁটে ওপারে গেলাম। নদীর ওপারে লোহার বেঞ্চি পাতা। নদীর পাড়ে বসার জন্য বেশ জুতসই।

default-image

এই সেই মিসিসিপি, কৃষ্ণাঙ্গ শোষণ আর নিপীড়নের সাক্ষী। এই নদীই তো কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন সংগীতশিল্পী পল রবসনকে (১৮৯৮-১৯৭৬) সাম্যের গান শিখিয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনসংগ্রামের কথা গানের সুরে তুলে নিতে বলেছে। অসমতার দেয়াল ভাঙার প্রেরণা দিয়েছে! রাজনীতি, সংগীত, অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আজীবন কালোদের জন্য লড়েছেন রবসন। কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের বঞ্চনা আর নিপীড়নের আখ্যান তুলে ধরতে গিয়ে পল রবসন গেয়েছেন, ‘ওল’ম্যান রিভার’। ১৯৩৬ সালে গানটি গেয়েছেন রবসন। এর আগে ১৯২৭ সালে শো বোট নামে একটি নাটকের জন্য গানটি তৈরি হয়েছিল প্রথম। এ গানের মধ্য দিয়ে মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ কয়লাশ্রমিকদের সংগ্রাম তুলে ধরেছেন তিনি। এ গানে চিত্রায়িত হয়েছে মিসিসিপির বুকে চলমান নৌকা বা জাহাজে কর্মরত কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের সংগ্রাম, জীবনগাথা, অবর্ণনীয় নিপীড়ন আর দুর্দশা। শিল্পী সংগ্রামী পল রবসনের সব অভিমান আর ক্রোধ কিংবা অধিকারবোধ যেন এই নদীর ওপর। কারণ, এই নদীই তো সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। মিসিসিপি নদীর কাছে গিয়ে বুঝতে আর বাকি থাকে না, মিসিসিপির স্রোত থেকেই সে সংগীতের সুর নিয়েছেন পল রবসন।

default-image

এ ইতিহাস তো কেবল মার্কিন মুলুকে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমাদের মানবতাবাদী ভূপেন সে ইতিহাসকে বয়ে এনেছেন ভারতবর্ষ পর্যন্ত। ভূপেন হাজারিকা তখন আমেরিকার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলেন। পল রবসন তখন প্রায় যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সে সময়ে গণসংগীত বা সাম্যবাদের সংগীত মার্কিন মুলুকের জন্য হুমকি। পল রবসন আসবেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গান গাইতে। রবসনের সঙ্গে কথা হলো ভূপেনের। ভূপেন প্রভাবিত হলেন। এরপর চারদিকে মানবতার বিপর্যয় দেখে ভূপেন অভিযোগ করে লিখেন, ‘...ও গঙ্গা বইছো কেন?’ এভাবে এক হয়ে গেল গঙ্গা–মিসিসিপি, ভূপেন–রবসন।

আমার চোখেমুখে এসে পড়ছে সেন্ট অ্যান্থনি ফলসের পানির ঝাপটা। মিসিসিপির পাড়ে বসে আমার মনও গাইছে, ‘...নৈতিকতার স্খলন দেখেও, মানবতার পতন দেখেও, নির্লজ্জ অলসভাবে বইছো কেন?’

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন