১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত পোস্ট অফিসটি এখনো চালু আছে
আমরা যখন কলম্বো পৌঁছালাম, তখনো ২৫ ডিসেম্বরের দিনের আলো ফুটতে বেশ দেরি। বন্দরনায়েকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি আকারে অতটা বড় নয়, তবে বেশ গোছানো, পরিচ্ছন্ন। ইমিগ্রেশন শেষে ফ্রি ওয়াই–ফাই পেয়ে ফোন করলাম ড্রাইভার নাদুনকে। তিনি বাইরে অপেক্ষা করছেন জানালেন। বাইরে আসতেই দেখি এক হাতে ঝিনুকের মালা আর অন্য হাতে নেমপ্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে হাসছেন নাদুন।
সকাল পর্যন্ত নিগম্বোর একটি রিসোর্টে বিশ্রামের ব্যবস্থা হয়েছে। সেখানে যেতে যেতে লক্ষ করলাম, ছোট শহরটি যেন বড়দিনের উৎসবে সেজেছে। ক্রিসমাসের ঝলমলে আলোকসজ্জায় শেষ রাতের অন্ধকার যেন হারিয়ে গেছে! কে বলবে দেশটির ৭০ শতাংশ জনগোষ্ঠী বৌদ্ধধর্মাবলম্বী! প্রথম দর্শনেই শ্রীলঙ্কার প্রেমে পড়ে গেলাম।
সকালে নাশতা সেরে রওনা হলাম নুয়ারা এলিয়ার উদ্দেশে। পথে প্রথম বিরতি নিলাম পিন্নাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফানেজে। এখানে হাতির দল যেন এক স্বর্গরাজ্যের ঠিকানা পেয়েছে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, অরফানেজ নামের পেছনে রহস্য কী? জানতে পারলাম, এই হাতিগুলো হয় কখনো অসুস্থ হয়ে কিংবা দলছুট হয়ে এখানে আশ্রয় পেয়েছে। টিকিটের মূল্য বেশ চড়া। তবু দর্শনার্থীর অভাব নেই। হাতির কী কী কাজকারবার দেখা হবে, তার ওপর নির্ভর করছে টিকিটের মূল্য। আমরা হাতির জলকেলি আর তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলাম।
কলম্বো থেকে নুয়ারা এলিয়া গাড়িতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার পথ। যতই নুয়ারা এলিয়ার কাছাকাছি যাচ্ছি, তাপমাত্রা ততই কমে আসছে। বিকেল প্রায় চারটা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম রামবোদা জলপ্রপাতে। জায়গাটা শান্ত, সৌম্য। জলপ্রপাতের পাস দিয়ে চলে গেছে বিখ্যাত রামবোদা পাস; যা ব্রিটিশ শাসনামলে ব্যবসা–বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রামবোদা পাস ধরে এগিয়ে গেলাম শ্রীলঙ্কার অন্যতম বৃহৎ চা কারখানা কিংস উডে। কারখানায় ঢুকতেই এগিয়ে এলেন ছিপছিপে গড়নের এক তরুণী। বিশুদ্ধ ইংরেজিতে আমাদের চা–পাতা সংগ্রহ করা থেকে চা তৈরির প্রতিটি ধাপ আন্তরিকতার সঙ্গে বুঝিয়ে দিলেন।
চা কারখানা দেখা শেষে ছুটে চলেছি নুয়ারা এলিয়ার মূল শহরে। সূর্যাস্তের আলোয় নুয়ারা এলিয়ার যে সৌন্দর্য দেখলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। নুয়ারা এলিয়াকে বলা হয় ‘লিটল ইংল্যান্ড’। চারদিকে চা–বাগান, ছোট–বড় পাহাড়ি ঝরনা, পাইনগাছের সারি, অভিজাত নির্মাণশৈলীর কাঠের বাড়ি—সব মিলিয়ে নুয়ারা এলিয়া আমার মনে স্থায়ী আসন করে নিল।
পরদিন নুয়ারা এলিয়ার বিখ্যাত হাকগালা বোটানিক্যাল গার্ডেন, গ্রেগরি লেক, সীতা আম্মান মন্দির, স্ট্রবেরিবাগান, ঔপনিবেশিক স্থাপনা আর শতবর্ষী পোস্ট অফিস ঘুরে দেখলাম। অবাক করার ব্যাপার হলো, ১৮৯৪ সালে নির্মিত পোস্ট অফিসের কার্যক্রম আজও অব্যাহত রয়েছে।
পরদিন সকালে রওনা হলাম এল্লার উদ্দেশে, আমাদের গন্তব্য নাইন আর্চ ব্রিজ। ‘ব্রিজ ইন দ্য স্কাই’ বা ‘আকাশের ব্রিজ’ নামে পরিচিত এই স্থাপনা শ্রীলঙ্কার গৌরবময় ইতিহাসের প্রতীক। ১৯২১ সালে এই ব্রিজ নির্মিত হয়েছিল একজন শ্রীলঙ্কান প্রকৌশলীর নকশায়, সম্পূর্ণ দেশীয় কৌশলে আর দেশীয় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে। নির্মাণকালে ব্রিজটির সক্ষমতা নিয়ে ব্রিটিশদের সব ধরনের সন্দেহকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তার রাজকীয় সৌন্দর্য নিয়ে। এই ব্রিজটি মূলত এল্লাকে ডেমোদারা স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষে ছুটলাম রাভানা ফল বা রাবণের ঝরনা দেখতে। এই ঝরনার বিশালত্ব আর স্বর্গীয় সৌন্দর্য দেখে মনে হচ্ছিল ঝরনাধারা বুঝি স্বর্গ থেকে ধাপে ধাপে পৃথিবীতে নেমে এসেছে। এরপর রাবণের গুহা দেখার পালা। কথিত আছে, সীতাকে অপহরণ করার পর নাকি এখানেই রাখা হয়েছিল। ৭০০ সিঁড়ি পেরিয়ে গুহার মূল অংশ; যা খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না আমার কাছে। শেষের সিঁড়িগুলো ছিল খুব খাড়া আর ভয়ংকর। পৌরাণিক চরিত্র সীতা কীভাবে এই গুহায় দিন কাটাত, তা ভাবতে ভাবতে দিনের আলো প্রায় ফুরিয়ে এল। কেমন একটা গা ছমছমে অনুভূতি! দ্রুত নেমে এলাম গুহা থেকে।
নেমেই পাশে বৌদ্ধমন্দির। মন্দিরটির ছাদ ছিল গুহার সঙ্গে যুক্ত। খুবই দৃষ্টিনন্দন আর স্থাপত্য কলাকৌশলে অনন্য মন্দিরটি তখন সন্ধ্যার বাতাসে পরিপূর্ণ। আমাদের অবসন্ন ঘর্মাক্ত শরীর যেন এক মুহূর্তে প্রশান্ত হয়ে গেল। মাইকে ভেসে আসছিল পালি স্তোত্র। শান্ত মন্দিরের স্নিগ্ধতা, পাহাড়ি শীতল বাতাস আর স্তোত্রের আবহে চারদিক অলৌকিক হয়ে উঠল।
এল্লা থেকে মিরিসা
এল্লার মূল শহরটি পর্যটকের প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। রঙিন আলো, রেস্তোরাঁ, বার, স্যুভেনির শপ আর গানের সুর চারদিকে। এল্লার মূল শহর থেকে খানিকটা দূরে নিভৃত একটি হোটেলে উঠেছিলাম।
সকালে ঘুম ভাঙতেই জানালা দিয়ে এল্লার স্নিগ্ধ আর মায়াবী সৌন্দর্যের সাক্ষী হলাম। এরপর সকালের নাশতা সেরেই সমুদ্র শহর মিরিসার উদ্দেশে রওনা হলাম। পথে আরেকবার দেখা হলো রাবণ ঝরনার সঙ্গে। মিরিসার পথে টাটকা তাজা আর রসালো রাম্বুটানের স্বাদ নিতেও ভুললাম না।
মিরিসা ইউরোপীয়দের আনাগোনায় মুখর। আচমকা মনে হয় ইউরোপের কোনো সমুদ্রসৈকতে চলে এসেছি। কোকোনাট বিচ, প্যারোট বিচ, সিক্রেট বিচ, জঙ্গল বিচে পর্যটকের আনাগোনা বেশি। আমরাও কয়েকটি ঘুরে গলের পথ ধরলাম। সেখানেই রাতে থাকার ব্যবস্থা।
সকালে সোজা চলে গেলাম গল ডাচ ফোর্টে। সূর্যের তেজ খুব বেশি থাকায় দ্রুত ফোর্ট দর্শন শেষ করতে হলো। পরের গন্তব্য কলম্বো। পথে আহুগালা সি টার্টেল কনজারভেশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার দেখে নিলাম। এটি মূলত কচ্ছপদের একটি হাসপাতাল। যে কচ্ছপরা সমুদ্রে কিংবা ডাঙায় নানাভাবে আহত হয়, মূলত তাদেরকেই সেবা–শুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তোলা হয় এখানে। বিকেল নাগাদ কলম্বো পৌঁছে গেলাম। এরপর কলম্বো শহর ঘুরে দেখা।
সিগিরিয়া দিয়ে শেষ
শ্রীলঙ্কা সফর শেষ হয়েছে সিগিরিয়া ভ্রমণ দিয়ে। শ্রীলঙ্কার গর্ব ইউনেসকোর তালিকাভুক্ত ঐতিহ্যবাহী স্থান সিগিরিয়া রকে গেলাম। কথিত আছে, পঞ্চম শতাব্দীর কোনো এক সময়ে রাজা কাশ্যপ সুউচ্চ এই দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। স্থানটি তৎকালীন শ্রীলঙ্কার রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল। সৎভাই মোগাল্লানার হাতে পরাজয়ের ভয়ে ভীত ছিলেন রাজা। তাই এই দুর্গের চূড়ায় বসে আশপাশের সবকিছুর ওপর নজর রাখতেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, শেষ পর্যন্ত সেই ভাইয়ের হাতেই পরাজিত হন এবং আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। দুর্গের মাঝামাঝি অবস্থিত সিংহের বিশাল দুটি থাবা যেন সামলে রেখেছে প্রকাণ্ড এই পাথুরে স্থাপনাকে। লায়ন’স পো নামে পরিচিত এই স্তম্ভ দুটি যেন দুর্গটির গাম্ভীর্য আর রাজকীয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এই স্থাপনা যেন এক জীবন্ত বিস্ময় হয়ে আজও হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকছে।
সিগিরিয়া ভ্রমণ অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে যদি সেখানকার গ্রাম ঘুরে দেখা না হয়। গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য আছে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার ভ্রমণ প্যাকেজ। সেখানে আছে গরুর গাড়ি, ট্রাক্টর, নৌকা আর টুকটুকের মতো কয়েকটি বাহনে ভ্রমণের সুযোগ; আর স্থানীয় নারীদের হাতে রান্না করা উপাদেয় দুপুরের খাবার। এহালাগালা লেক পার হওয়ার সময় মাঝিরা উপহার দিয়েছিলেন তাঁদের বিশেষ শিল্পশৈলীতে নির্মিত পদ্মপাতার হ্যাট আর নেকলেস। লেকের নীল পানিতে রাজহাঁস আর পানকৌড়ির ডুবসাঁতার আর দূরে সিগিরিয়া আর পিদুরাঙ্গালা রক যেন জাগতিক সব সৌন্দর্যের সীমাকে অতিক্রম করেছিল।
এই কয়েক দিনের ভ্রমণে শ্রীলঙ্কার মাটি আর মানুষ কী এক অদ্ভুত মায়ার বাঁধনে বেঁধেছে আমাকে। নিশ্চয়ই আবারও দেখা হবে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে।