আপনা মাংসে হরিণা বৈরী
মাইক যখন তার জিপ নিয়ে বাড়ির পোর্চে পৌঁছাল, তখনো অন্ধকার কাটেনি। বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ আর ওকগাছের পাতা ঝরার শব্দ ছাড়া চারদিক সুনসান। দোতলা থেকেই ব্রেক কষার মৃদু শব্দ কানে এল। সঙ্গে সঙ্গে নিচে নেমে এলাম। দরজা খুলতেই মধ্য আমেরিকার তীব্র শীত গায়ে কাঁটা দিয়ে গেল।
আমরা কয়েক প্রস্থ ভারী কাপড় পরে নিয়েছি। হাঁটু পর্যন্ত বুট, দুই হাত দস্তানায় ঢেকে মারুফ ভাই ও আমি মাইকের জিপে চড়ে বসি। বাড়ি থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে ওয়েস্ট প্লেইনের এক জঙ্গলে হরিণ শিকারে যাচ্ছি। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মাত্র ১০ দিনের জন্য শিকারের অনুমতি দেয় স্টেট সরকার। নির্দিষ্ট রাইফেলের লাইসেন্স, শিকারের অনুমতিপত্র সব জোগাড় করে আগেই ব্যাকপ্যাকে নেওয়া হয়েছে।
গোলাম মারুফ ভাই যখন শিকারে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন, আমি তখন নিউইয়র্ক শহরে। নির্দিষ্ট দিনে নিউইয়র্ক থেকে শিকাগোগামী প্লেনে চড়ে বসলাম। তারপর শিকাগো হয়ে কানেক্টিং ফ্লাইট ধরে মিজৌরি রাজ্যে। ছবির মতো সুন্দর স্প্রিংফিল্ড–ব্র্যানসন ন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। বাক্স–পেটরা নিয়ে যখন বাইরে এলাম, সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে। মারুফ ভাই এয়ারপোর্টে নিতে এলেন। এয়ারপোর্ট থেকে টানা তিন ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে আমরা মিজৌরি রাজ্যের আরও গহিনে চললাম।
রাতে বিশ্রাম নিয়ে খুব ভোরে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে। আরও কয়েকটি দল বেরিয়েছে অভিযানে। তবে অঞ্চলটি এত বিস্তীর্ণ যে কারও সঙ্গে পথে দেখা হয়নি। তবে তাদের গর্জে ওঠা রাইফেলের শব্দ কানে এসেছে নিয়মিত বিরতিতে।
আমাদের বহনকারী এসইউভি ছুটছে মিজৌরি রাজ্যের প্রেইরি অঞ্চল থেকে। এখানকার প্রকৃতি ভীষণ বুনো আর মানবসঙ্গ বিরল। কয়েক মাইল দূরে দূরে একেকটি বাড়ি। আস্তাবলে ঘোড়া আর বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে নিজের মতো চরে বেড়ানো গরু ছাড়া প্রাণীর চিহ্ন নেই।
আমরা বনের প্রান্তে গাড়ি রেখে পায়ে হাঁটতে শুরু করি। কোমর পর্যন্ত বেড়ে ওঠা সেইজগাছের ঝোপ ভেঙে এগোতে হয়। আলো ভালোভাবে ফোটার আগেই আমাদের হরিণ চলার ট্রেইলে পৌঁছে যেতে হবে। বনের মধ্যে মাচা তৈরি করা আছে। মই বেয়ে প্রায় নিঃশব্দে আমরা ওতে চড়ে বসি।
ভোর আসে বনে। সঙ্গে কত বিচিত্র পাখির ডাক! আলো ফুটতে শুরু করলে সঙ্গের রেমিংটন রাইফেল শিকারের জন্য প্রস্তুত হয়। মারুফ ভাই রাইফেলের ট্রিগারে হাত রেখে বসে থাকেন। বাইনোকুলারে চোখ লাগিয়ে বন দেখি। বাতাসে দোল খাওয়া সিডারের শাখা দেখি। দেখতে দেখতে চোখের পাতা ভারী হয়, তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হই। মারুফ ভাই প্রায় ফিসফিস করে বলেন, ‘ঝোপের দিকে কোনো নড়াচড়া দেখছ?’
মুহূর্তেই তন্দ্রা টুটে যায়। চোখ রগড়ে দেখি, দুটি হরিণ দুলকি চালে বেরিয়ে আসছে। মারুফ ভাই গুলি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাইনোকুলারে চোখ রেখে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছি। তারপর বাজ পড়ার শব্দের মতো তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল মাচা। বাইনোকুলার চোখ থেকে ছিটকে গেল। ধাতস্থ হয়ে আবার চোখ রাখলাম লেন্সে। হরিণটিকে মারা যায়নি। তামাটে বর্ণের সেইজ ঝোপের আড়ালে হারিয়ে গেল। তারপর শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা। দুপুর গড়ালে আবার আমরা ডেরায় ফিরে আসি।
চার দিন পেরিয়ে গেছে। এভাবে দুই বেলা করে আমরা জঙ্গলে পড়ে থাকি। মোক্ষম শিকার আর মেলে না। কখনো মা হরিণ এসেছে তার শাবক নিয়ে, আবার কখনো জোড়া জোড়া ছোট হরিণ এসেছে খেলতে। ওদের শুধু আমরা তাকিয়েই দেখেছি। আমাদের দরকার একটা তাগড়া পূর্ণবয়স্ক হরিণ।
পঞ্চম দিন সকালে সূর্য ওঠার আগে আমরা মাচায় উঠে বসেছি। কয়েক দিনের অভিজ্ঞতায় দেখছি, সূর্য ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে আর সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার পরপর হরিণের চলাচল বেশি থাকে। সূর্য ডুবে গেলে ঘন গাছপালায় যে অন্ধকার নামে, সেখানে শিকার প্রায় অসম্ভব। তাই আমাদের ভোরই ভরসা।
সকালের বাতাসের ঘ্রাণ তাজা আর বুনো। ঘুম পাড়িয়ে দিতে চায়। নিজেদের খুব কষ্ট করে জাগিয়ে রাখি। কয়েক দিনের টানা পরিশ্রমে ক্লান্তও বটে। তারপরও বনের প্রান্ত থেকে নজর ফেরাই না। ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টিতে ভর করে বাতাস হয়ে উঠল আরও শীতল; ভারী পোশাকেও মানছে না। বৃষ্টি–শীতে যখন হাল ছেড়ে দেব ভাবছি, তখন সেইজ ঘাসের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল আমাদের শিকার। বন পেরিয়ে খোলা জায়গায় নামল। ঘাস খেতে খেতে দূরত্ব কমিয়ে আনছে। কোথা থেকে যেন একঝাঁক পাখি তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকতে ডাকতে বন ছুঁয়ে উড়ে গেল। আমার স্পষ্ট মনে হলো, পাখিগুলো বলছে, বিপদ বিপদ পালাও। হরিণ মুহূর্তের জন্য ঘাস খাওয়া বন্ধ করে কান খাড়া করে কিছু শোনার চেষ্টা করল। মারুফ ভাই সতর্ক হয়ে গেলেন আরও। ইশারায় বললেন, ‘সামান্যতম নড়াচড়াও নয়!’
প্রায় রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছি। হরিণটি আবার ঘাসে মন দিয়েছে। মারুফ ভাইয়ের রেমিংটন রাইফেলটি স্থির হলো। ট্রিগারে চেপে বসল তর্জনী। মুহূর্তের মধ্যে গর্জন করে ছুটে গেল কার্তুজ। সং স্প্যারো পাখির গান থামল, আমেরিকান রবিন চুপ মেরে গেল। সবকিছু ছাপিয়ে কোনো পশুর হৃদয় ছিন্ন করা গোঙানির শব্দ এল কানে।
রেমিংটন রাইফেলটি আমার কাঁধে দিয়ে মারুফ ভাই ছুটলেন শব্দ লক্ষ করে। ছুটলাম তাঁর পিছু। বড়সড় হরিণের দেহটা চোখে পড়ল দূর থেকেই। খুব আনন্দ হওয়ার কথা, কিন্তু কেন জানি বুকের ভেতর বিষাদে ভরে গেল। আহা রে!