ভ্রমণের নতুন ট্রেন্ড স্লিপ ট্যুরিজম কী, কেন জনপ্রিয় হচ্ছে
দুই-তিন বছর ধরে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘স্লিপ ট্যুরিজম’ বা ঘুমকেন্দ্রিক পর্যটন। ভ্রমণের পাশাপাশি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে আরামদায়ক ঘুমও।
একসময় বেড়াতে গিয়ে ঘুমিয়ে সময় কাটানো ছিল যেন অপরাধ। সকাল হলেই বেরিয়ে পড়া, সারা দিন ঘোরা, রাতে ফিরে ঘুম—এটাই ছিল ভ্রমণের রুটিন।
এখন সেই ধারণা বদলাচ্ছে। দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেতে বেড়াতে গিয়ে আবারও ব্যস্ত থাকতে চান না অনেকে। বরং ছুটির সময়টুকু কাজে লাগাতে চান বিশ্রাম ও ভালো ঘুমে।
স্লিপ ট্যুরিজম কী?
স্লিপ ট্যুরিজম বা ঘুমকেন্দ্রিক পর্যটন এমন একধরনের ভ্রমণ, যেখানে ভালো ঘুমই হয়ে ওঠে ভ্রমণের মূল বিষয়। দর্শনীয় স্থান বা বিলাসবহুল হোটেল নয়, এখানে মূল হিসেবে থাকে ঘুমের মান উন্নত করা।
বেড়াতে গিয়ে কেউ বেছে নিচ্ছেন বিশেষ রিট্রিট, ঘুম ভালো হওয়ার কৌশল শেখার জন্য। আবার কেউ স্পা, মেডিটেশন অথবা নানা ধরনের প্রশান্তিমূলক সেবা পাওয়া যাবে, এমন জায়গা বেছে নিচ্ছেন ভ্রমণের জন্য।
ভারতীয় বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এইচটিএফ মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে স্লিপ ট্যুরিজমের বাজার ৬৯০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ২০২৪ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে এতে আরও ৪০০ বিলিয়ন ডলার যোগ হতে পারে।
কেন বাড়ছে এই প্রবণতা?
ব্রিটিশ ঘুম ও স্বপ্নবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, লেখক ও শিক্ষক চার্লি মর্লে মনে করেন, ‘মানুষ অনেক দিন ধরেই খাবার ও শরীরের সুস্থতার দিকে নজর দিচ্ছে, বিশেষ করে শরীরচর্চার মাধ্যমে। এখন সুস্থতার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠছে ঘুম।’
মর্লে মেক্সিকোর তুলুমের নোমাদে হোটেল (ওয়েলনেস ও বুটিক হোটেল, যেখানে ঘুম, বিশ্রাম ও সুস্থতাকেন্দ্রিক বিভিন্ন অভিজ্ঞতার আয়োজন করা হয়) এবং লন্ডনের কিম্পটন ফিটজরয়সহ বেশ কয়েকটি হোটেলের সঙ্গে ঘুম ও স্বপ্নকেন্দ্রিক বিভিন্ন আয়োজন ও কর্মসূচিতে কাজ করেছেন।
তাঁর মতে, হোটেলগুলোও বিষয়টি এখন বুঝতে শুরু করেছে। কাজ কিংবা সন্তানদের দায়িত্ব থেকে কিছুদিন দূরে থাকার এই সময়টাকে মানুষ ভালোভাবে ঘুমাতে চান। এটাই তাঁদের জন্য হলিডে বা ভ্যাকেশন।
প্রযুক্তির হাত ধরে ঘুমের নতুন অভিজ্ঞতা
প্রযুক্তি যেমন আমাদের ঘুমের সমস্যা বাড়াচ্ছে, তেমনি ভালো ঘুমের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি করছে। এর একটি উদাহরণ চার্লি মর্লের ‘রুম টু ড্রিম’ প্যাকেজ। লন্ডনের কিম্পটন ফিটজরয়ের সঙ্গে মিলে তৈরি এই আয়োজনে অতিথিরা এআইয়ের সাহায্যে ‘লুসিড ড্রিমিং’ বা স্বপ্ন দেখার সময় স্বপ্ন সম্পর্কে সচেতন থাকার অভিজ্ঞতা নিতে পারেন।
ভিআর হেডসেটের মাধ্যমে নির্দেশিত মেডিটেশন ও বিশেষ হারবাল চায়ের সাহায্যে তৈরি করা হয় এই অভিজ্ঞতা। সকালে ঘুম থেকে উঠে অতিথিরা তাঁদের দেখা স্বপ্নের কথা এআই শিল্পীকে জানান। সেই বর্ণনা থেকেই এআই তৈরি করে স্বপ্নের একটি ছবি।
ভবিষ্যতে ঘুমের মান ভালো রাখতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। যেমন স্মার্ট বেড ঘুমের সময় ও মান পর্যবেক্ষণ করে জানাতে পারে, কোন অভ্যাসে ঘুম ভালো হচ্ছে। ঘুমকে আরও মজার করে তুলতে গেমের মতো প্রযুক্তিও ব্যবহার হতে পারে ভবিষ্যতে।
তবে প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, স্লিপ ট্যুরিজমের মূল আকর্ষণ থাকবে একই—ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমানো এবং শরীর-মনকে বিশ্রাম দেওয়া।
দামি হোটেলে থাকলেই কি ঘুম ভালো হবে?
স্লিপ ট্যুরিজমের অন্যতম লক্ষ্য হলো, ঘুমের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। আরামদায়ক বিছানা, ভালো ম্যাট্রেস ও বালিশ, নিরিবিলি ঘর এবং ঘুমের আগে শরীর-মনকে শান্ত করার অভ্যাস—সবই ভালো ঘুমের জন্য জরুরি।
এসবই ‘স্লিপ হাইজিন’ বা স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাসের অংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব অভ্যাস নিয়মিত মেনে চললে ঘুমের মান ও সময় দুটিই ভালো হতে পারে। তবে হোটেলে ঘুম ভালো হওয়ার আরেকটি কারণ আছে।
ছুটিতে গেলে কাজের চাপ, পারিবারিক দায়িত্বসহ দৈনন্দিন জীবনের নানা ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে থাকা যায়। বাড়ির মতো বাড়িতে কাজের নানা শব্দ, পাশের বাড়ির নির্মাণকাজ কিংবা শিশুর ঘুম ভাঙানোর মতো বিষয়গুলোও তখন থাকে না।
তাই ভালো ঘুমের জন্য সব সময় দামি হোটেল বা বিশেষ স্লিপ সার্ভিসের প্রয়োজন নেই। শান্ত পরিবেশ, আরামদায়ক বিছানা আর দুশ্চিন্তামুক্ত মন—এই তিনটিই হতে পারে ভালো ঘুমের সবচেয়ে বড় উপকরণ।
ভ্রমণে ঘুম পুষিয়ে নেওয়া যায় কি?
স্বল্প মেয়াদে ঘুমের ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। এক রাতে কম ঘুম হলে শরীরে তৈরি হয় ‘স্লিপ প্রেশার’ বা ঘুমের তাগিদ। ফলে পরের রাতে সহজে ঘুম আসতে পারে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সময় ঘুমও হতে পারে।
তবে বেশি সময় ঘুমালেই আগের রাতের ঘুমের ঘাটতির সব প্রভাব দূর হয় না। ভালো ঘুম শরীরকে বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে, পাশাপাশি দিনের নানা ঘটনা ও তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতেও মস্তিষ্ককে সহায়তা করে। তাই ছুটিতে কয়েক দিন বেশি ঘুমিয়ে ক্লান্তি কমানো গেলেও এটি নিয়মিত স্বাস্থ্যকর ঘুমের বিকল্প নয়।
ছুটির পর আবার প্রতিদিনের ঘুমের সময় বদলে গেলে তৈরি হতে পারে ‘সোশ্যাল জেট ল্যাগ’। কর্মদিবসে সকালে তাড়াতাড়ি ওঠা আর ছুটির দিনে রাতে দেরি করে ঘুমানো ও সকালে দেরি করে ওঠার অভ্যাসে শরীরের ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটে। ফলে সপ্তাহের শুরুতে ঘুম ঘুম ভাব ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকতে পারে।
তাই ছুটিতে গিয়ে ভালো ঘুমানোর পাশাপাশি বাড়িতেও ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাসই দীর্ঘ মেয়াদে ভালো ঘুমের সবচেয়ে সহজ উপায়।
বাড়িতেই ‘স্লিপ হলিডে’ কাটানোর ৫ উপায়
বাড়িতে ঘুমের জন্য ঘরটিকে আরামদায়ক করে তোলা যায়। মেনে চলতে পারেন সহজ এই পাঁচটি নিয়ম—
১. রাতে আলো কমান
সন্ধ্যার পর ঘরের তীব্র আলো, মোবাইল ও ল্যাপটপের স্ক্রিন যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
২. বিছানা আরামদায়ক করুন
পরিষ্কার ও আরামদায়ক বালিশের পাশাপাশি ভালো মানের ম্যাট্রেস বেছে নিন।
৩. ঘর রাখুন অন্ধকার ও ঠান্ডা
জানালায় ব্ল্যাকআউট পর্দা ব্যবহার করতে পারেন। ঘরের তাপমাত্রাও আরামদায়ক ও কিছুটা ঠান্ডা রাখুন।
৪. ঘুমের আগে নিজেকে শান্ত করুন
হালকা গরম পানিতে গোসল, বই পড়া কিংবা অন্য কোনো আরামদায়ক অভ্যাস দিয়ে ঘুমের আগে শরীর ও মনকে ধীরে ধীরে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করুন।
৫. ঘুমের সময় ঠিক রাখুন
প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন। ছুটির দিনেও এই সময়সূচি যতটা সম্ভব মেনে চলুন।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, দ্য কনভারসেশন