৩৬ ঘণ্টায় ২৩৩ কিলোমিটার দৌড়ালেন সুনামগঞ্জের এবাদ উল্লাহ

প্রথমবারের মতো ‘ঢাকা স্টেডিয়াম রান ২০২৫’ অনুষ্ঠিত হলো ২৬ ডিসেম্বর। এতে ৩৬ ঘণ্টায় ২৩৩ কিলোমিটার দৌড়ে সেরা হয়েছেন সুনামগঞ্জের এবাদ উল্লাহ। তাঁর মুখেই শুনুন সেই দৌড়ের অভিজ্ঞতা।

৩৬ ঘণ্টায় ২৩৩ কিলোমিটার দৌড়ে সেরা হয়েছেন সুনামগঞ্জের এবাদ উল্লাহছবি: কোস্টাল আলট্রা বাংলাদেশ

ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে বিশ্বের খ্যাতিমান দৌড়বিদেরা দুই পায়ে গতির ঝড় তোলেন। টেলিভিশনের পর্দায় তাঁদের দৌড়ের দৃশ্য কত দেখেছি। গত ২৬ ডিসেম্বর কুয়াশামোড়া সকালে সে রকম ট্র্যাকেই পা রাখলাম। তবে তাঁদের মতো ক্ষিপ্রতা নিয়ে নয়, খুবই মন্থরগতিতে শুরু হলো আমাদের দৌড়। আসলে আমাদের কোনো তাড়া নেই। কারণ, কাউকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেয়ে ট্র্যাকে টিকে থাকাই এ দৌড়ের বড় লক্ষ্য। ৩৬ ঘণ্টা শাখায় ফিনিশার হতে আমাকে টিকে থাকতে হবে অন্তত ২৮ ঘণ্টা কিংবা দৌড়াতে হবে অন্তত ১৭০ কিলোমিটার। এ শাখায় আরও ২২ জন দৌড়বিদ আছেন।

বাংলাদেশে আয়োজনটা প্রথম। আমি অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছি ভেবেই ভেতরে–ভেতরে রোমাঞ্চ বোধ করছিলাম। ঢাকা স্টেডিয়ামের ৪০০ মিটার ট্র্যাকে দৌড়াতে দৌড়াতেই প্রতিজ্ঞা করলাম, ফিনিশার হতে হবে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে দৌড়বিদদের জন্য নানা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চার–পাঁচ কিলোমিটার দৌড়ে পানি খেয়ে আবার শুরু করি। ২০, ৩০ করে করে ১২ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট শেষ করলাম ১০০ কিলোমিটার। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ফ্লাডলাইটের আলোয় উজ্জ্বল স্টেডিয়াম। ৬ ঘণ্টা ও ১২ ঘণ্টা বিভাগের দৌড়বিদেরা বিদায় নিয়েছেন। এখন আমাদের সঙ্গে আছেন ২৪ ঘণ্টা বিভাগের দৌড়বিদেরা। রাতভর তাঁরাই থাকবেন পাশে।

রাত যত বাড়ল, ততই বাড়ল শীত। কুয়াশায় ঢেকে গেল স্টেডিয়াম। ঢাকায় এত শীত পড়ে, ধারণা ছিল না। তীব্র শীতে দৌড়াতে বেগ পেতে হচ্ছিল। মাঝরাতে কিছুটা ঝিমুনিও এল। কিন্তু ঘুমালে তো শরীর বসে যাবে আর এগোতে পারব না। রাতে ট্র্যাকের হাইড্রেশন পয়েন্টে রাখা রানারবান্ধব খাবার খেলাম, ওয়াশরুমে যাওয়া ছাড়া আর বিশ্রাম নিলাম না। ট্র্যাকেই কেটে গেল নির্ঘুম রাত।

দেশে ম্যারাথন, আলট্রা ম্যারাথন আয়োজনে চেনা মুখ এবাদ উল্লাহ (বাঁয়ে)
ছবি: কোস্টাল আলট্রা বাংলাদেশ

ভোরের আলো ফুটল। ধীরে ধীরে কুয়াশা কেটে গেল। সকাল ১০টার দিকে সূর্যের দেখা মিলল। মিষ্টি রোদে এতই আরামবোধ হলো যে মনে হচ্ছিল, একটু ঘুমিয়ে নিই। কিন্তু ঘুমালেই শেষ! আর উঠতে পারব না। শুরু হলো আবার পথচলা। দৌড়ে আনন্দ পাই। মনের আনন্দে দৌড়াই। একসময় ২০০ কিলোমিটার শেষ করি। ততক্ষণে প্রায় ৩০ ঘণ্টা কেটে গেছে। মাইকে ঘোষণা আসে, বাংলাদেশের জন্য এটা একটা ‘মাইলফলক’। বলা হয় সামনে দারুণ এক রেকর্ডের হাতছানি। তখন ছয় ঘণ্টা সময় বাকি।

নির্ধারিত সময়ে ২৩৩ কিলোমিটার দৌড়াই। দৌড় শেষ হওয়ার পর জানতে পারি, বাংলাদেশে এটা দীর্ঘতম দৌড়ের রেকর্ড। দেশের বাইরে ভারতে এর আগে অন্য একটি ইভেন্টে ২২০ কিলোমিটার দৌড়েছেন বাংলাদেশি মাহফুজ শাওন।

যেভাবে দৌড় শুরু

২০১৯ সালে আমি সিলেট এমসি কলেজে পড়তাম। একদিন ম্যারাথনের খবর পাই। সাইক্লিং করি। তাই ভাবি ম্যারাথনে অংশ নিলে কেমন হয়। ওই ম্যারাথনে ১০ কিলোমিটার দৌড়ে অংশ নিলাম। ম্যারাথনে এটাই প্রথম অংশগ্রহণ। এরপর ধাপে ধাপে ২১, ৪২, ৫০, ১০০ কিলোমিটার হাফ ম্যারাথন, ম্যারাথন ও আলট্রা ম্যারাথনে অংশ নিতে থাকি। এখন ম্যারাথনের খবর পেলেই অংশগ্রহণের জন্য উৎসুক হয়ে থাকি। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০টির বেশি ইভেন্টে অংশ নিয়েছি। দেশের সব বিভাগে গিয়েছি। একেকটা ম্যারাথনে অংশগ্রহণ, একেক রকম অভিজ্ঞতা। শত শত রানারের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। এখন তো অনেক রানাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব। আয়োজকদের সঙ্গে হয়েছে ঘনিষ্ঠতা।

ঢাকা স্টেডিয়াম রান: ‘শ্বাসযোগ্য ঢাকার জন্য দৌড়’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ‘ঢাকা স্টেডিয়াম রান ২০২৫’–এর আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘কোস্টাল আলট্রা বাংলাদেশ’। এতে ৩৬, ২৪, ১২ ও ৬ ঘণ্টা ক্যাটাগরিতে অংশ নেন দেশি-বিদেশি ৩৫০ জনের বেশি দৌড়বিদ। তত্ত্বাবধানে ছিল বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন। দেশের এন্ডুরেন্স স্পোর্টসের ইতিহাসে এবারই প্রথম স্টেডিয়ামভিত্তিক আলট্রা দৌড় হলো। ২৬ ডিসেম্বর সকাল ছয়টা থেকে পরদিন সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ঢাকা স্টেডিয়ামে ৩৬ ঘণ্টার আলট্রা দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেন ২৩ জন। অতীত অভিজ্ঞতা ও সাফল্য দেখেই আয়োজকেরা এ বিভাগে অংশগ্রহণকারী নির্ধারণ করেন।
প্রথমবারের মতো ‘ঢাকা স্টেডিয়াম রান ২০২৫’ অনুষ্ঠিত হলো
ছবি: কোস্টাল আলট্রা বাংলাদেশ

বিশেষ কয়েকটি আয়োজনে ভালোও করেছি। এর মধ্যে কক্সবাজারে ‘মেরিন ড্রাইভ আলট্রা-২০২৩’–এ ১০০ কিলোমিটার দৌড়ে দ্বিতীয় ফিনিশার, ২০২৫ সালে কোস্টাল আলট্রার একই ইভেন্টে ১৬১ কিলোমিটারে ফিনিশার, অ্যাথলেট এক্স সুনামগঞ্জ আলট্রা ২০২৫–এর ১০০ কিলোমিটারে চ্যাম্পিয়ন। এ ছাড়া ঢাকায় বঙ্গবন্ধু ম্যারাথন, মৌলভীবাজারের শমসেরনগর আলট্রা ম্যারাথনে একাধিকবার সাফল্যের সঙ্গে ফিনিশার হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছি। গত ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তিতে সুনামগঞ্জ ফিটনেস কমিউনিটি আয়োজিত ৫৫ কিলোমিটার আলট্রা দৌড়ে অংশ নিয়েছি। আমরা সুনামগঞ্জ–সিলেটের ১৬ জন দৌড়বিদ মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সিলেট থেকে শুরু করে সুনামগঞ্জ শহীদ মিনার পর্যন্ত দৌড়াই।

পাঁচ ভাই, এক বোনের মধ্যে আমি চতুর্থ। বাবা আরজক আলী একসময় বাইরে ছিলেন। আমার কাজে পরিবারের সহযোগিতা, সমর্থন আছে। তারা উৎসাহ দেন। আমি ভ্রমণ পছন্দ করি। যখন যেখানে মন চায় ঘুরে বেড়াই। একটা ট্রাভেল গ্রুপের সঙ্গেও যুক্ত। এর মাধ্যমে অন্যদেরও ভ্রমণে নিয়ে যাই। বিশ্বটা ঘুরে দেখার ইচ্ছা আছে।

অনুলিখন: খলিল রহমান

আরও পড়ুন