এই নারী ডুবুরিরা কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই সমুদ্রতলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন

দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের নারী ডুবুরিরা কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে সমুদ্রতল থেকে তুলে আনেন শামুক, ঝিনুকসহ নানা সামুদ্রিক সম্পদ। হেনিয়ো বা ‘সমুদ্র নারী’ নামে পরিচিত এই অনন্য নারীদের কাছ থেকে দেখতে গিয়েছিলেন তানজিনা হোসেন

সমুদ্রতল থেকে তাঁরা তুলে আনেন শামুক, ঝিনুকসহ নানা সামুদ্রিক সম্পদছবি: ভিজিট জেজু

দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার কথা শুনে মেয়ে উচ্ছ্বসিত, ‘মা, তুমি কিন্তু অবশ্যই জেজু দ্বীপে যাবে। দ্বীপের আশ্চর্য মেয়েদের দেখে আসবে।’

জেজুর আশ্চর্য মেয়েদের সম্পর্কে আমার কিছু জানা ছিল না। কিন্তু দুনিয়াজুড়ে কে-ড্রামা ভক্তকুল এদের সম্পর্কে দেখি সব জানে। সিউলে কনফারেন্স শেষ করে জেজু দ্বীপের বিমানে চড়ে বসলে পাশে বসা চিকিৎসক নুসরাতও অবাক, ‘আপনি সিরিজগুলো দেখেননি!’

লজ্জিত হয়ে বলি, ‘না তো। কোনটা বলো দেখি?’

‘উফ আপা, দেশে ফিরে অবশ্যই দেখবেন। হোয়েন লাইফ গিভস ইউ ট্যানজারিনস কিংবা ওয়েলকাম টু সামদাল–রি সিরিজগুলো। দাঁড়ান, আপনাকে কাহিনিটা বলি।’

তারপর সোয়া ঘণ্টার বিমানযাত্রায় নুসরাত আমাকে হেনিয়োদের সম্পর্কে বিস্তর সবক দিল। শুনে আমারও আগ্রহ বাড়ল। ঠিক হলো, হেনিয়ো নারীদের অবশ্যই দেখতে হবে। তাঁদের সম্পর্কে আমি আরও পড়তে ও জানতে চেষ্টা করলাম।

হেনিয়ো বা সমুদ্রনারীরা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো এক বিস্ময়। কীভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁরা সমুদ্রে থাকেন, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলেছে। বিজ্ঞানীরা একমত যে পেরুর কেচুয়া বা হিমালয়ের শেরপাদের মতো জেজুর হেনিয়োরাও বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ। বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ আর বংশপরম্পরায় আত্তীকরণের মাধ্যমে তাঁরা এই অনন্য দক্ষতা অর্জন করেছেন।

জেজু দ্বীপের নারী ডুবুরিরা কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে সমুদ্রতলে
ছবি: ইউনেস্কোর প্রামাণ্যচিত্র থেকে নেওয়া

বালিকাদের বয়স ১০-১১ বছর হলেই শুরু হয় প্রশিক্ষণ। দীর্ঘ সাত বছর প্রশিক্ষণ শেষে একটি মেয়ে হেনিয়ো হওয়ার দক্ষতা অর্জন করে। বর্তমানে এই দ্বীপে ৮০ বছর বয়স্কা হেনিয়োও আছেন। আর ৯০ শতাংশ হেনিয়োর বয়স এখন ৬০ বছরের ওপর। এককালে তাঁরা সাধারণ সুতি জামা পরেই সমুদ্রে নামতেন। শীতল পানিতে ঘণ্টাখানেক কাজ করার পর তাঁদের উঠে আসতে হতো, আগুনের পাশে বসে শরীর ও জামা শুকিয়ে আবার নামতেন। গ্রীষ্মকালে অবশ্য সময়টা তিন ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকত।

বর্তমানে সমুদ্রে নামার জন্য মেয়েরা ডাইভিং মাস্ক, ওয়েট স্যুট, বুকের ওপর শক্ত বেল্ট, ফিন আর গোল ভাসমান বলের সঙ্গে যুক্ত একটা জাল ব্যবহার করেন। এতে তাঁরা পানিতে একটানা ৬ ঘণ্টা থাকতে পারেন! একেকবার ডুব দিয়ে হেনিয়োরা সমুদ্রের প্রায় ২০ মিটার বা ৬৬ ফুট নিচে চলে যান, সমুদ্রের তলদেশে শ্বাস আটকে বিচরণ করতে পারেন টানা ৩ মিনিট। এই বিশেষ শ্বাসপ্রশ্বাস কৌশলের নাম ‘সামবিসোরি’।

জেজুতে আমাদের গাইড অ্যানার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পরই বলেছিল, ‘উইন্ড, উইমেন অ্যান্ড রক—এই তিন হলো আমাদের ল্যান্ডমার্ক। আগ্নেয়গিরি থেকে উৎসারিত এই পাথুরে দ্বীপে সারা দিন উতল হাওয়া খেলা করে। আর আমাদের নারীরা পৃথিবীতে অনন্য।’

‘আমরা কি তাদের দেখতে পাব?’ আমার জিজ্ঞাসার জবাবে সে হেসে বলেছিল, ‘নিশ্চয়ই।’

‘এখানে নারীরাই শক্তি ও প্রকৃতির প্রতিনিধি,’ অ্যানার এ কথার পেছনে একটা ইতিহাস আছে। ডুবসাঁতার দিয়ে আগাছা কুড়োনোর এ পেশা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীনতম পেশা। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে এটি নারীকেন্দ্রিক পেশা হয়ে ওঠে। কোরিয়ার যে কটি অঞ্চলে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ প্রচলিত ছিল, জেজু তার অন্যতম। নারীরা এখানে উপার্জন করতেন আর পুরুষেরা ঘর সামলাতেন। জেজু ও এ–সংলগ্ন ‘মারা’ দ্বীপে পুরুষেরা বিবাহের সময় যৌতুক দিতেন, কন্যাশিশু জন্মকে এখানে বিশেষভাবে উদ্‌যাপন করা হতো। পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও ট্যানজারিন (বিশেষ ধরনের কমলা) চাষে বিপ্লব হওয়ার পর থেকে জেজুর প্রাচীন পেশা ও সমাজব্যবস্থায়ও পরিবর্তন এসেছে। সম্ভবত এখনকার হেনিয়ো নারীরাই শেষ প্রজন্মের ডুবুরি। তবে কোরীয় সরকার প্রাচীন এ সংস্কৃতির সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো জেজুর নারীদের এই অনন্য শক্তিমত্তা, দক্ষতা ও সাহসের কারণে হেনিয়ো পেশাকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’–এর মর্যাদা দান করেছে।

বেলা গড়িয়ে এলে আমাদের সিওনসাং ইলচুলবংয়ে নিয়ে গেল অ্যানা। পাহাড় ও সমুদ্রে ঘেরা নয়নাভিরাম একটা জায়গা। দেখলাম, সমুদ্রের গভীরে গিয়ে ডুব দিয়ে আগাছা আহরণ করছেন হেনিয়োরা। সমুদ্রের তীরে বসে দূরে গভীর জলে সাঁতরে বেড়ানো এই আশ্চর্য সমুদ্রদেবীদের দেখে মনে পড়ল ডেরেক ওয়ালকটের কবিতার পঙ্‌ক্তি, ‘হোয়্যার ইজ ইয়োর ট্রাইবাল মেমোরি?/স্যারস, ইন দ্যাট গ্রে ভল্ট/দ্য সি/দ্য সি হ্যাজ লকড দেম আপ/দ্য সি ইজ হিস্টোরি।’

হ্যাঁ, এই সমুদ্রই সেই ইতিহাস বহন করে চলেছে।

আরও পড়ুন