ঢাকার কাছেই বসেছিল পৌষসংক্রান্তির এই শতাব্দীপ্রাচীন মেলা

পারিল গ্রামের মেলায় যাচ্ছেন আগতরাছবি: গোলাম শফিক

পৌষ নিয়ে কত কথা শুনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আহ্বান জানিয়েছিলেন, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে/ আয় রে চলে, আয় আয় আয়।’ আবার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাণী, মান্না দে’র গায়নে ‘পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেই দিন/ ফিরে আর আসবে কি কখনো’ গানটি দীর্ঘদিন আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তারও আগে ছিল ‘কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ’ অতি প্রাচীন এ বচন। বাংলাদেশকে বলা হয় বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ। কিন্তু বোধ করি ‘পার্বণ’ শব্দটি কোনো পার্বণের সঙ্গেই যুক্ত হয় না, ‘পৌষ পার্বণ’ ছাড়া। এর বাইরে সংক্রান্তিও আছে, পৌষসংক্রান্তি। সেটিই আমাদের আলোড়িত করে। তবে পৌষসংক্রান্তি বাংলাদেশে একেক অঞ্চলে একেকভাবে উদ্‌যাপিত হয়। এর মধ্যে অনন্য স্থানীয় বৈশিষ্ট্য ও ভিন্নতার সাক্ষাৎ মেলে। সেই রকমই এক ভিন্নতার ছোঁয়া পাওয়া গেল মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার পারিল গ্রামে।  

পারিল গ্রামটিই বাংলাদেশের এক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত গ্রাম। এই গ্রামটি দেখতে এবং উৎসবে যোগ দিতে ১৪ জানুয়ারি সকালে রওনা দিই ভাস্কর রুবায়াৎ রবিন ও তাঁর বন্ধু ইয়াসিন রহমানসহযোগে। পরে আমাদের সঙ্গে পুত্রসহ যোগ দেন ভ্রমণপিপাসু সাইফুর রহমান। গ্রামটি আক্ষরিক অর্থেই ছবির মতো। তাই এ গ্রামে ছবিয়াল ভ্রাতৃদ্বয়ের জন্ম হবে এটাই স্বাভাবিক। তাঁরা কিংবদন্তির আলোকচিত্রী নওয়াজেশ আহমদ, তাঁর গুরু ও বড় ভাই নাইব উদ্দিন। তাঁদের বাড়িটিই ঐতিহাসিক জহির মঞ্জিল। এ বাড়িটির অনতিদূরে দেখতে পেলাম হজরত শাহ্ মুহাম্মদ ইকরামুল হক বোগদাদীর মাজার, যিনি ১১ শতাব্দীতে এখানে এসেছিলেন। মাজার প্রাঙ্গণের বিশালাকৃতির পাথরগুলোতে পুণ্যার্থী ও মনস্কামীরা দুধ ঢেলে রেখেছেন। তা ছাড়া খইয়ামুড়িতে দেখা হলো দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি।

পারিলের মেলার মূল বৈশিষ্ট্য হলো মৃৎশিল্প হিসেবে এতে প্রধানত মাটির ঘোড়া বিক্রি হয় দেদার
ছবি: গোলাম শফিক

এ গ্রামে আরও আছে ভাষাশহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদ স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার। এ ছাড়া জহির মঞ্জিলে সযত্নে রক্ষিত হচ্ছে ১৯০৫ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কর্তৃক ব্যবহৃত টেবিলটি, যা স্মারক হয়ে আছে ঋণসালিসি বোর্ডের প্রথম সভার।
পৌষসংক্রান্তির মেলা বসে প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো যে বটগাছটির নিচে, সেটিকে নওয়াজেশ আহমদ নাম দিয়েছিলেন ‘মহাঅশ্বত্থ’। ইত্যাকার ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন (৩০০ বছরের প্রাচীন একটি জমিদারবাড়ি), গ্রামের অবারিত ফসলের মাঠ, বিটপিকুঞ্জ, ওরস ও মেলার সম্মিলিত সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় উত্তরাধিকার গ্রামটিকে দর্শনার্থীদের এক অদম্য আগ্রহের তীর্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। পারিলের পৌষসংক্রান্তির এ মেলা শতাব্দীপ্রাচীন। এটির বয়স জানতে গিয়ে গোলকধাঁধায় পড়তে হয়। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ জানালেন, সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর যুগ পেরিয়ে কলির যুগে এ মেলার প্রবর্তন হয়েছিল, যে যুগের শেষ নেই। পৌষ মাসের শেষ দিনে সূর্য ধনুরাশি অতিক্রম করে মকররাশিতে প্রবেশের কারণে এটিকে মকরসংক্রান্তিও বলা হয়। পারিলের মেলার মূল বৈশিষ্ট্য হলো মৃৎশিল্প হিসেবে এতে প্রধানত মাটির ঘোড়া বিক্রি হয় দেদার। দর্শনার্থীরা এসব ক্রয়ের পর একে একে কাতার করে মহাঅশ্বত্থের নিচে রেখে দেয়। ধর্মনির্বিশেষে এলাকাবাসী মানত পূরণের জন্য এ কাজটি করে। সারা বছর এসব পড়ে থেকে থেকে বিবর্ণ হয়ে যায়। পৌষসংক্রান্তির দিন পুরোনোগুলো ফেলে দিয়ে নতুনগুলো স্থাপন করা হয়। এলাকাবাসী ঘোড়াকে বিবেচনা করে শৌর্যবীর্যের প্রতীক হিসেবে। বিজ্ঞান বলে, এসব হচ্ছে টোটেম-টাবু। এমন আরও নানা ধর্মীয় সম্প্রীতির বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় এ গ্রামে। পৌষমেলার মূল কেন্দ্রস্থলের পাশ দিয়ে একদল ঢাকি-যন্ত্রী ও পূজারি চলে যায় পাশের সেই বাড়িটিতে, যেখানে একটি মণ্ডপ স্থাপিত হয়েছিল এবং যা বংশপরম্পরায় টিকে আছে। এখানকার আদি লোকজন দেশীয় পদ্ধতির চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যে চিকিৎসাপ্রক্রিয়ায় প্রার্থনা ও কৃত্যানুষ্ঠানের ভূমিকা ছিল। তখনই প্রবর্তিত হয়েছিল পাগলা ঠাকুরের মেলা, যা আজও আছে। এই বাড়িতে পূজারিরা মাথায় ঝাঁপিতে করে নিয়ে যায় গজার মাছ। পরে নানা যজ্ঞ ও কৃত্যানুষ্ঠান চলে। একাধিক ঝাঁপির এ গজারগুলোকে রাঙানো হয় আবিরের রঙে। এখানকার কৃত্যানুষ্ঠান শেষে মাছগুলো নিয়ে যাওয়া হয় প্রাচীন বটবৃক্ষের নিচে, যেখানে এগুলোকে পোড়নো হয় কাঠে অগ্নিসংযোগ করে। পরদিন এসব মৎস্যের চামড়া ও কাঁটা ফেলে দিয়ে ভক্তদের ভক্ষণ করানো হবে বলে জানানো হয়। বটবৃক্ষের আরেক পার্শ্বে কাদামাটি দিয়ে যে শোয়ানো শিব অবয়বটি নির্মাণ করা হয়, তাকে ঘিরেও কৃত্য চলে দীর্ঘক্ষণ।

সন্ধ্যায় এ বাড়িতে দেখা হলো প্রসাদের স্তূপীকৃত খাদ্যদ্রব্য, যেখানে ছিল ঢ্যাপের মোয়াও। নিচু এলাকা বলে বর্ষাকালে এখনো এ অঞ্চলে প্রচুর শাপলাফুল ফোটে, যেসবের বীজের খই ফুটিয়ে এ মোয়া তৈরি করা হয়। আমাদের পরিচিত তারা রানী কাকি ইতিপূর্বে এ মোয়া খাইয়েছিলেন। পৌষসংক্রান্তির দিন সারা গ্রাম ঘুরতে গিয়ে এ রকম আরও নারীর সাক্ষাৎ মেলে, যাঁরা আমাদের নানা বিষয়ে ধারণা দিতে সচেষ্ট ছিলেন।
অগ্রহায়ণের পর মানুষের গোলা ভরে যায় ধানে। এ সময় প্রাচুর্যের কারণে মানুষের মন-প্রাণ উৎফুল্ল থাকে। চলে পিঠা-পুলির আয়োজন। এ আনন্দ উদ্‌যাপনই অতীতে পৌষসংক্রান্তির মেলা জমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। পারিল গ্রামের মেলা সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। কী নেই এ মেলায়? আছে কাঠ, বেত, বাঁশের আসবাব ও সামগ্রী, শিশুদের নানা খেলনা, মোয়া-মুড়কি, বাতাসা, মিষ্টি, আলতা, ফিতে। গৃহস্থালির নানা জিনিস তো আছেই। এখানে খাবার হিসেবে তেলে ভাজা যে দ্রব্য তৈরি করা হয়, তাতে খাঁটি তেল ব্যবহারকে তারা পবিত্র দায়িত্ব জ্ঞান করে।
এখন সারা গ্রামেই শর্ষেফুলের ম ম গন্ধ আর পাখির কূজন। সন্ধ্যার পর যখন আবার সিঙ্গাইর, হেমায়েতপুর হয়ে প্রত্যাবর্তন উদ্দেশ্যে খেতের আল ধরে আমরা ফিরছিলাম তখন ব্যাঙ, ঝিঁঝি ও অন্যান্য পতঙ্গের ডাকে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। মনে মনে আওড়ে নিই—আবার জমবে মেলা বটতলা হাটখোলা, অঘ্রাণে নবান্নে উৎসবে...।

আরও পড়ুন