পুণ্যার্থীদের সঙ্গে মানস সরোবর ও কৈলাস পর্বতে ঘুরতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে চার হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায় নীল জলরাশির এক হ্রদ মানস সরোবর। পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে কৈলাস পর্বত। এটি হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থস্থান। সম্প্রতিক হিমবাহ ধসে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অনেক তীর্থযাত্রী সেখানে হতাহত হয়েছেন। ২০১৯ সালে এই মানস সরোবর ও কৈলাস ঘুরতে গিয়েছিলেন কানাডা প্রবাসী সাইফুল ইসলাম
একটা সমকোণ বাঁক ঘুরতেই চালক গাড়ি থামিয়ে গভীর অনুভূতি নিয়ে ‘ওঁ নমঃ শিবায়’-এর মতো কিছু একটা বলে গাড়ি থেকে নেমে গেলেন। তারপর রাস্তায় শুয়ে পড়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন।
ট্যুর কোম্পানির একটি মাইক্রোবাস। চালক ছাড়া আছেন একজন তিব্বতি গাইড, ভারতীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় তরুণ-তরুণী, রাশিয়া থেকে আসা বছর চল্লিশের এক ভদ্রলোক, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আসা জন্মসূত্রে চীনা এক ভদ্রমহিলা আর আমি। ভক্তি ও শ্রদ্ধা থেকে তাঁরা এসেছেন—কেউ মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে, কেউ পুণ্য অর্জন করতে।
তাঁরাও দৌড়ে গাড়ি থেকে নেমে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন।
এই বাঁক ঘুরলেই প্রথম চোখে পড়ে কৈলাস পর্বত। তাই এই ভক্তিপ্রণাম। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর এই প্রথম কৈলাস দর্শন!
২০১৯ সালের মে মাসে কাঠমান্ডু থেকে শুধু তিব্বত পারমিট নিয়ে বিমানে তিব্বতের রাজধানী লাসায় যাই। যাঁরা এই ফ্লাইটে গেছেন, তাঁরা জানেন, কতটা মনোহর এই ভ্রমণ। হিমালয় পর্বতমালাকে দক্ষিণ থেকে উত্তরে পাড়ি দেওয়া, আর একেবারে মাউন্ট এভারেস্টকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার তুলনা আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়, শুধু দুই চোখ দিয়ে দেখা ছাড়া!
লাসা, তিব্বতের দিকের এভারেস্ট বেজক্যাম্পসহ আরও কিছু দর্শনীয় স্থান দেখে ষষ্ঠ রাতে আমরা সাগা নামের একটি শহরে রাত যাপন করি। তিব্বতের শহরগুলোর নাম ঠিক করে বলা মুশকিল। কখনো চীনা নাম, কখনো তিব্বতি শব্দ, আবার কখনো ইংরেজি নাম। সাগা শহরটি ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে। এখানে ব্রহ্মপুত্র খুব বেশি চওড়া নয়। মনে হয় সাধারণ একটি খরস্রোতা পাহাড়ি নদী।
সেখান থেকে কয়েক ঘণ্টার গাড়ি চালানো দূরত্বে মানস সরোবর। মানস সরোবরের কারণে এই রাস্তা ৯০ ডিগ্রি বাঁক নিয়ে সোজা উত্তরে চলে গেছে। এই বাঁক ঘুরলেই প্রথম দেখা যায় কৈলাসের চূড়া।
সবাই কৈলাস পর্বত প্রথম দেখার কৃত্যাদি শেষ করলেন। আমাদের গাইড ব্যাখ্যা করলেন, কৈলাস পর্বতের দক্ষিণ দিকে সিঁড়ির মতো যে ধাপগুলো দেখা যায়, সেখান দিয়েই পাশের একটি হ্রদে রাবণকে ফেলে দেন শিব। সেই হ্রদের নাম রাক্ষস তাল বা রাক্ষস লেক। দুটি হ্রদ পাশাপাশি। মানস সরোবরের জল স্বাদু আর রাক্ষস লেকের জল লবণাক্ত। কেন আমি জানি না। তবে এত উঁচুতে লবণাক্ত জলের হ্রদ খুব বেশি নেই।
এই বাঁক থেকে অবশ্য হ্রদ দুটি দেখা যায় না। শুধু দূরের কৈলাস পর্বতের চূড়াটাই দেখা যায়।
আরও প্রায় এক ঘণ্টা পর আমরা পৌঁছাই স্বপ্নের মানস সরোবরে। নীল পদ্মের খোঁজে আমি মানস সরোবরে যাইনি। আমার ধারণা, ভূগর্ভস্থ পানি আবিষ্কারের আগে এই শক্তিশালী নদীগুলোই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখত। সেই বাস্তবতা থেকেই হয়তো ভারতের বড় বড় নদীর উৎস খুঁজতে গিয়ে মানুষ মানস সরোবরের সন্ধান পেয়েছিল। তখন হেঁটেই এসবের সন্ধানে যাত্রা করতে হতো।
আমারও স্বপ্ন ছিল, হেঁটে মানস সরোবর যাব। সেই স্বপ্ন থেকেই এই যাত্রা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মিটার ওপরে বেশ কিছু হ্রদ দেখেছি। কিন্তু মানস সরোবর পৃথিবীর সেরা। সেখানে কোনো নীল পদ্ম নেই। এত উঁচুতে অতি স্বল্পজাত কিছু উদ্ভিদ ছাড়া আর কোনো কিছুর টিকে থাকা সম্ভব নয়। অথচ কী নির্মল, কী অকলঙ্কিত সেই হ্রদ! ৩৬০ ডিগ্রিজুড়ে শুধু শ্বেতশুভ্র মুকুটধারী পাহাড়। আর সবকিছুকে ছাপিয়ে কিছুটা দূরে কৈলাস পর্বত। তার চূড়ায় রাজমুকুটের মতো বিশাল আকৃতির জমাট তুষার।
তিব্বত চীনের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ওপর কিছুটা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় মানস সরোবরে সরাসরি স্নান করা নিষিদ্ধ। বালতিতে পানি তুলে আলাদা স্নানের জায়গায় স্নান করার ব্যবস্থা। আমাদের দলের মধ্যে শুধু সেই তরুণ জুটির তরুণী প্রায় হিমশীতল পানিতে স্নান করলেন।
এখান থেকেই শুরু হলো আমাদের কৈলাস পরিক্রমা।
কৈলাস পরিক্রমা ৫২ কিলোমিটার। দুই রাত, তিন দিন। আমরা কৈলাসের উপকণ্ঠে ডারচেন নামের একটি শহরে যাই। চীনের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর তিব্বতের সব এলাকা পাকা রাস্তা ও বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে সংযুক্ত হয়েছে। আধুনিক অনেক সুবিধাই এখানে আছে। যে হোটেলে আমরা রাতে থাকি, সেটিও মোটামুটি আধুনিক। আর সেখান থেকে কৈলাস পর্বত যেন একেবারে হাতের নাগালে। দক্ষিণ দিক থেকে কৈলাস পর্বত দেখে মন উপচে পড়ে।
পরের দিন শুরু করি পরিক্রমা। কিছুদূর পর্যন্ত গাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর হাঁটা শুরু। ট্রেইল হিসেবে খুব কঠিন নয়। প্রথমে যমদুয়ারী পার হতে হয়। বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি পার হওয়া মানে আপনি মৃত্যুকে অতিক্রম করে নতুন জীবন লাভ করলেন। কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা কোরা করেন। তাঁরা আমাদের মতো হেঁটে হেঁটে যান না। দাঁড়ানো থেকে মাটিতে শুয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন। হাত যে জায়গা পর্যন্ত মাটি ছুঁয়েছে, আবার দাঁড়িয়ে সেই জায়গা পর্যন্ত হেঁটে যান। এভাবেই ৫২ কিলোমিটার পথ পরিক্রমা করেন। তাঁদের কত দিন লাগে, আমার জানা নেই।
বিকেলে কৈলাসের উত্তর দিকে পৌঁছাই। কৈলাস পর্বতের এই দিকটাকে বলা হয় শিবের মুখ। কৈলাসের সব সৌন্দর্য যেন এই দিকেই লুকিয়ে। সবচেয়ে উঁচুতে চুলের ঝুঁটির মতো যে চূড়াটি, সেটিকে বলা হয় শিবের জটা। সেদিন আমার ভাগ্য ভালো ছিল না। শিবের মুখজুড়ে ছিল ঝোড়ো মেঘ। তাই ভালো করে দেখতে পারিনি।
রাতে আমরা ধিরাপুক নামের একটি মঠে থাকি।
দ্বিতীয় দিনটা বেশ কঠিন। এদিন ডোলোমা পাস পার হতে হয়। রাতে থাকি জুটুলপুক নামের আরেকটি মঠে। পরের দিন বেশ সহজ। ৮-১০ কিলোমিটার হাঁটার পর বাকি পথ গাড়িতে। আবার ফিরে আসি ডারচেনে। ফেরার পথে রাশিয়ান ভদ্রলোক একটি পরিত্যক্ত রুদ্রাক্ষের মালা খুঁজে পান। তিনি বিশ্বাস করেন, স্বয়ং মহাদেব এই মালা তাঁর জন্য পাঠিয়েছেন। আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।