তিব্বত ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন? আপনার জন্য ১১ তথ্য

তুষারাবৃত পাহাড়, উচ্চ মালভূমি, বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত এভারেস্ট, মাউন্ট কৈলাস, মানস সরোবর, পোতালা প্যালেসসহ প্রকৃতির অফুরন্ত ঐশ্বর্যে ভরপুর তিব্বত। অনেক ভ্রমণপিপাসুর কাছে তিব্বত শুধু একটি ভ্রমণ গন্তব্য নয়, বরং আত্মিক অনুসন্ধানের এক অনন্য ঠিকানা। এ অঞ্চল ভ্রমণের ক্ষেত্রে রয়েছে বিশেষ প্রশাসনিক বিধিনিষেধ, কঠিন প্রাকৃতিক বাস্তবতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলে জটিল হয়ে উঠতে পারে ভ্রমণ। তিব্বত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ দিলেন এলিজা বিনতে এলাহী

প্রকৃতির অফুরন্ত ঐশ্বর্যে ভরপুর তিব্বতছবি: এলিজা বিনতে এলাহীর সৌজন্যে

১. লাগবে বিশেষ ভ্রমণ পারমিট

চীনের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বত। তাই এখানে ভ্রমণে যেতে হলে পর্যটকদের সংগ্রহ করতে হয় চীনা সরকারের বিশেষ ট্রাভেল পারমিট। তিব্বতের অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করে পারমিট সংগ্রহ করা যায়। বাংলাদেশ থেকে কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সি তিব্বত প্যাকেজ নিয়ে কাজ করছে। তারাই অনুমোদিত ট্রাভেল কোম্পানির মাধ্যমে পারমিট সংগ্রহ করে দেবে।

২. তারও আগে চাই চীনের ভিসা

ট্রাভেল পারমিট পাওয়া খুব বেশি কঠিন নয়, তবে এ জন্য অবশ্যই চীনের ভিসা থাকা প্রয়োজন। চীনের ট্যুরিস্ট ভিসা পেতে ক্যাটাগরিভেদে খরচ হতে পারে সাড়ে ৯ থেকে সাড়ে ১৭ হাজার টাকা। ভিসা পেতে সাধারণত সপ্তাহখানেক সময় লাগে। ভিসা পাওয়ার পর পাসপোর্ট ও ভিসার কপি তিব্বতের ট্রাভেল এজেন্সিতে পাঠাতে হয়। ট্রাভেল পারমিট পেতে লাগে প্রায় ১৫ দিনের মতো। সব মিলিয়ে ভ্রমণের অন্তত দেড় মাস আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া নিরাপদ।

৩. সড়ক, রেল ও আকাশপথ

চীনের বিভিন্ন প্রদেশ দিয়ে তিব্বতে ঢোকা যায়। এ জন্য আকাশপথ ও রেলপথের পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথও রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিচুয়ান প্রদেশের সিচুয়ান-তিব্বত মহাসড়ক। চীনের চেংদু থেকে পাহাড়, উপত্যকা ও তুষারাবৃত গিরিপথ অতিক্রম করে তিব্বতের লাসায় পৌঁছেছে এই মহাসড়ক। পৃথিবীর সর্বোচ্চ উঁচু রেলপথ হিসেবে বিবেচিত চীনের ছিংহাই–তিব্বত রেলপথ দিয়েও যাওয়া যায়। বাংলাদেশ থেকে বেশির ভাগ পর্যটক চীনের কুনমিং হয়ে যান।

তিব্বতের আবহাওয়া অত্যন্ত অনিশ্চিত
ছবি: এলিজা বিনতে এলাহী

৪. আমার ১০ দিনের প্যাকেজ

১০ দিন ৯ রাতের একটি গ্রুপ প্যাকেজে সম্প্রতি আমি তিব্বত ভ্রমণ করেছি। আমার যাত্রাপথ ছিল ঢাকা থেকে কুনমিং, সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে শিনিং, আর শিনিং থেকে ছিংহাই-তিব্বত রেলপথ ধরে লাসা।

ঢাকা-কুনমিং-ঢাকা রিটার্ন বিমান টিকিট কেটেছিলাম ৬৮ হাজার টাকায়। আগেভাগে টিকিট কাটলে আরও কম দামে পাওয়া সম্ভব। কেউ চাইলে কুনমিং থেকে সরাসরি লাসায় বিমানে যেতে পারেন। তবে আমি বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলপথ হিসেবে পরিচিত ছিংহাই-তিব্বত রেলপথে রেলভ্রমণের অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য শিনিং হয়ে লাসায় যাই। শিনিং-লাসা ট্রেনের টিকিটের জন্য খরচ হয়েছিল ১৫০ মার্কিন ডলার (প্রায় ১৮ হাজার টাকা)। কেবিনের মানভেদে ভাড়া কমবেশি হয়।

আমার নেওয়া প্যাকেজের মূল্য ছিল ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার (প্রায় দেড় লাখ টাকা)। এই টাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল—তিব্বত ট্রাভেল পারমিট, কুনমিং থেকে শিনিং অভ্যন্তরীণ বিমানের টিকিট, লাসা থেকে সড়কপথে ট্যুরিস্ট বাসে এভারেস্ট বেজক্যাম্প পর্যন্ত যাত্রা, হোটেলে রাত যাপন, সকাল ও রাতের খাবার এবং লাসা থেকে কুনমিং ফেরার বিমানের টিকিট।

গন্তব্যভেদে প্যাকেজের সময় ও খরচ পরিবর্তিত হবে। গ্রুপে সদস্যসংখ্যা বেশি হলে ভ্রমণ খরচ কমে আসবে। কেউ চাইলে শুধু লাসা শহর ঘুরে আসতে পারেন। আবার কেউ এভারেস্ট বেজক্যাম্পের পাশাপাশি মানস সরোবর ও কৈলাস পর্বত পর্যন্ত ভ্রমণ পরিকল্পনা করেন। সে ক্ষেত্রে সময় ও খরচ—দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

তিব্বতে ভ্রমণের সময় অনুমোদিত গাইড থাকা বাধ্যতামূলক
ছবি: এলিজা বিনতে এলাহী

৫. উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে

তিব্বত ভ্রমণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ‘উচ্চতা’। তিব্বতের রাজধানী লাসার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৬৫০ মিটার। উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব কমতে থাকে। আমাদের শরীর তখন এই কম অক্সিজেনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এই প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত সময় না পেলে বিভিন্ন ধরনের মাউন্টেন সিকনেসে আক্রান্ত হতে পারেন। চিকিৎসকদের মতে, প্রথম দুই দিন বিশ্রাম, ধীরে চলাফেরা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। তিব্বতের অনেক অঞ্চলে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা সীমিত। তাই ভ্রমণের আগে স্বাস্থ্যবিমা করা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

৬. পরিবর্তনশীল আবহাওয়া

তিব্বতের আবহাওয়া অত্যন্ত অনিশ্চিত। দিনে রোদ থাকলেও রাতে তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যেতে পারে। আবার একই দিনে কড়া রোদ, তীব্র ঠান্ডা বাতাস ও তুষারপাত হতে পারে। তাই শীতের বিশেষ পোশাক, থার্মাল কাপড়, উলের মোজা, শীতের জ্যাকেট, সানগ্লাস ও সানস্ক্রিন সঙ্গে রাখা অপরিহার্য।

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু হিসেবে পরিচিত ছিংহাই-তিব্বত রেলপথ
ছবি: এলিজা বিনতে এলাহী

৭. নগদ অর্থ সঙ্গে রাখুন

রাজধানী লাসার বাইরে এটিএম বা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা খুব সীমিত। ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ নগদ ইউয়ান সঙ্গে রাখা নিরাপদ।

৮. স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন

তিব্বতি সমাজ গভীরভাবে ধর্মাচার ও সংস্কৃতিনির্ভর। তিব্বতিদের বিশ্বাস ও জীবনধারাকে সম্মান দেখাতে হবে। ধর্মীয় স্থানে ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া জরুরি। স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন নিরাপদ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ ভ্রমণের চাবিকাঠি।

৯. যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত

তিব্বতে কিছু আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় তথ্য ডাউনলোড করে রাখা ভালো। তিব্বতের বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল।

১০. গাইড ছাড়া ভ্রমণ সম্ভব নয়

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তিব্বতে ভ্রমণের সময় অনুমোদিত গাইড থাকা বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত রুট ও সময়সূচি মেনে চলতে হয়। গাইডের নির্দেশনা ভ্রমণকে করে তুলে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য। নির্ধারিত রুট ও সময়সূচি মেনে চলতে হয়। নিরাপত্তার স্বার্থেই এ নিয়ম কঠোরভাবে মানা হয়। স্থানীয়দের সঙ্গে ভাষার জটিলতা এড়াতেও গাইড প্রয়োজন।

১১. খাদ্যাভ্যাস

তিব্বতের খাদ্যসংস্কৃতি ভিন্ন। নতুন স্বাদের জন্য মানসিক প্রস্তুতি রাখুন এবং প্রয়োজনে হালকা শুকনো খাবার (খেজুর, চকলেট বার, ড্রাই ফ্রুটস, বিস্কুট) সঙ্গে নিতে পারেন।

প্রকৃতি, নীরবতা ও মানুষের সরল জীবনযাপন—সব মিলিয়ে তিব্বত ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে এক গভীর আত্মিক অভিজ্ঞতা। সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে তিব্বতে পা রাখলে এই ভূখণ্ড তার অপার সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতা দিয়ে ভ্রমণকারীকে সমৃদ্ধ করবে নিশ্চিত!

আরও পড়ুন