আমাদের এখানে ফুলের প্রধান দুই মৌসুম বসন্ত ও গ্রীষ্ম। ফাল্গুনের শেষ থেকে চৈত্রের মাঝামাঝির মধ্যে বসন্ত-গ্রীষ্মের অধিকাংশ ফুলগুলো ফোটে। মূলত বন-পাহাড়গুলোতে গেলেই প্রকৃতির এই আয়োজনটা ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়। অতএব এই দুই মৌসুমে আমার বনযাত্রা অবধারিত। এবার দেখা হলো বান্দরবানের লামায় পাহাড়ের পথে পথে রঙের পসরা সাজানো কিছু ফুল। বাড়তি হিসেবে জুটল কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সংরক্ষিত বাগানে ফোটা নতুন কিছু ফুল। এই প্রতিষ্ঠানের অনতিদূরে বান্দরবানের নীলগিরি শৈলসারির নিচে বমু সংরক্ষিত বন আর লুলাইনপাড়ায় পাওয়া গেল কিছু ঝলমলে ফুল। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে ডলুছড়িতে দুর্গম এই পাহাড়ি নিসর্গের অবস্থান।
অনেক দূর থেকে ছোপ ছোপ লাল রং দৃষ্টি কাড়ল। কিন্তু এখন তো শিমুল বা কৃষ্ণচূড়া ফোটার মৌসুম নয়। তাহলে কী ফুল! কাছে গিয়ে বোঝা গেল এগুলো আসলে লাল উদাল বা নাইচিচি উদাল। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ফুল ভরা অনেক লাল উদালের গাছ দেখা গেল। লালের সঙ্গে সাদা রঙের মিল রেখেই ফুটেছে বুনো ফুল বিউমন্টিয়া। এই ফুল প্রথম দেখি রমনা পার্কে। বাদ্যযন্ত্র ভেরির মতো দেখতে এই ফুলটিকে ভেবেছিলাম বিদেশি। পরে লাউয়াছড়া ও রাঙামাটির বনে দেখে ভুল ভাঙে। মানে এরা আমাদের বন-পাহাড়েরই ফুল। লুলাইনপাড়া পর্যন্ত যেতে পথে পথে পাওয়া গেল কইনার, অশোক, কুরচি, হাড়গজা, গাওছালতা আর পিরালু বা পিডালু। গাছগুলো ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠেছে। কুরচিগাছের নতুন কুঁড়ির সঙ্গে শ্বেত-শুভ্র ফুলগুলো ফুটে আছে। ফুলটির সৌরভ ছড়িয়ে আছে চারপাশে।
কইনারের পাতা যেমন সুশ্রী, ফুলের রংও বেশ লোভনীয়। গন্ধটা ভারি মিষ্টি। এ কারণে আমার পছন্দের ফুলের তালিকায় আছে গাছটি। গন্ধরাজ পরিবারের এই গাছ ঢাকায় আছে হাতে গোনা কয়েকটি। এখন পত্রহীন হাড়গজার গাছগুলো হলুদ রঙের অসংখ্য ফুলে ভর্তি। ঢাকায় এই গাছ একটিও আছে কি না, জানা নেই। গাওছালতা প্রথম দেখি রাঙামাটি থেকে সুবলং যাওয়ার পথে পেদা টিং টিং রেস্তোরাঁয়। পিরালু বা পিডালুকে চিনেছি এ গাছের ফলের তৈরি সুস্বাদু ভর্তা খেয়ে। আবার ফুলটিও বেশ স্নিগ্ধ।
কেয়াজুপাড়ায় অবস্থিত কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সমৃদ্ধ বাগানটিতে দেশি-বিদেশি বেশ কিছু দুর্লভ ফুলের দেখা পাওয়া গেল। এ বাগানে ফুটেছে গুল্মশ্রেণির লাল রঙের একটি নতুন কাঞ্চন ও নতুন জাতের মান্দার। আরও ফুটেছে নীলমণিলতা, সোনাঝুরিলতা, হলুদ কর্ডিয়া, ভাদ্রা, ভুঁইকুমড়া, রুদ্রপলাশ, অ্যাজালিয়া, স্বর্ণকাঞ্চন, র্যাভেনিয়া, ডম্বিয়া, কপসিয়া আর তীব্র সুগন্ধি ফুল সুরভি। সব মিলিয়ে একেবারে রঙের ঝরনাধারা যেন। বেশি আনন্দ পেয়েছি গোল্ডেন স্পুন বা হগবেরির ফুল দেখে। আগে কখনো এ ফুল দেখিনি। খুবই ঝলমলে রং। হলুদ কর্ডিয়া বা কর্ডিয়া লুটিয়ার ফুলও একেবারে চোখজুড়ানো। এরা মূলত গ্যালাপাগোস ও মারকুইস দ্বীপ এবং ইকুয়েডরের নিজস্ব উদ্ভিদ। আমাদের দেশে এই দুই ফুল সম্ভবত নতুন। শুধু এ কয়েকটিই নয়, চারপাশে ছড়িয়ে আছে আরও অনেক ফুল। এবার দাবদাহের কারণে কিছু ফুল আগেই ফুটেছে মনে হলো। প্রকৃতির এই ভয়ংকর রুদ্র মূর্তির বিপরীতে এমন একটি রঙিন পুষ্পোদ্যান কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক।