পারমাণবিক জাহাজে করে উত্তর মেরু গিয়েছিল রাজশাহীর স্কুলপড়ুয়া প্রত্যয়

রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তিচালিত জাহাজে চেপে উত্তর মেরু ঘুরে এসেছে রাজশাহীর দশম শ্রেণির ছাত্র মালেকুল সালেহীন প্রত্যয়। তার অভিজ্ঞতা শুনেছেন সজীব মিয়া

উত্তর মেরুর পথে পারমাণবিক শক্তিচালিত জাহাজে মালেকুল সালেহীন প্রত্যয়
ছবি: মালেকুল সালেহীনের সৌজন্যে

ঘড়িতে গভীর রাত, অথচ চারদিকে দিনের আলো। মুরমানস্কে পা রেখেই এটাই ছিল আমার প্রথম বিস্ময়। রাশিয়ার উত্তরের এই অঞ্চলে এখন পোলার ডে—সূর্য অস্ত যায় না, ২৪ ঘণ্টাই চারপাশ জেগে থাকে দিনের আলোয়।

ঢাকা থেকে মস্কোয় পৌঁছাই ১ আগস্ট দুপুরে। পরদিন বিকেলে প্রায় আড়াই ঘণ্টার ফ্লাইটে আসি এই বন্দরনগরীতে। এখানকার আইসব্রেকারে (বরফে ঢাকা পানিপথে চলার জন্য বিশেষ ধরনের জাহাজ) বন্দর থেকেই আমাদের উত্তর মেরু যাত্রা শুরু হবে। তার আগে ৩ আগস্ট সারা দিন আমাদের মুরমানস্ক ঘুরিয়ে দেখানো হলো।

রাশিয়ার পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটম ‘আইসব্রেকার অব নলেজ’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আইসব্রেকারে করে উত্তর মেরু ভ্রমণের সুযোগ করে দেয়। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এবার বাংলাদেশ থেকে আমি এই সুযোগ পেয়েছি।

আমি রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র। আমার মতো আরও ২১ জন এসেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। মস্কোতেই তাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। প্রত্যেকের সঙ্গেই একজন করে অভিভাবক আছেন—কেউ বাবা, কেউ মা, কেউ ভাই বা বোন। আমার সঙ্গে আছেন বাবা।

বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে
ছবি: মালেকুল সালেহীনের সৌজন্যে

৪ আগস্ট সকালে আমাদের বন্দরে নিয়ে যাওয়া হলো। আইসব্রেকারের পাশাপাশি কয়েকটি যুদ্ধজাহাজও দেখলাম। জায়গাটি সামরিক নিয়ন্ত্রিত এলাকা। রাশিয়ার নৌবাহিনী সেখানকার নিরাপত্তা ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান চলল চার-পাঁচ ঘণ্টা। রাশিয়ার একটি ব্যান্ড গান শোনাল। অনুষ্ঠান শেষে একে একে আমাদের জাহাজে নেওয়া হলো। আর অভিভাবকেরা ফিরে গেলেন হোটেলে।

জাহাজে ওঠার পর প্রথম ঘণ্টাখানেক বেশ ভালোই কাটল। পুরো জাহাজ ঘুরিয়ে দেখানো হলো—কোথায় কী আছে, কী করা যাবে, কী করা যাবে না সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়া হলো। এরপর নোঙর তুলে জাহাজ চলতে শুরু করল।

জাহাজ চলতে শুরু করার কয়েক ঘণ্টা পরই শুরু হলো প্রচণ্ড দুলুনি। ঝড় উঠল, উত্তাল হলো সমুদ্র। উঁচু উঁচু ঢেউয়ে জাহাজ এমনভাবে দুলছিল যে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি জাহাজ ডুবে যাবে, আমি বুঝি মারা যাব। সি-সিকনেস দেখা দিল। আমিসহ অনেকের প্রচণ্ড বমি হলো। এরপর খাবারও খেতে পারছিলাম না। প্রথম দুই দিন মোশন সিকনেসের মধ্যেই কেটে গেল।

প্রথম বরফ, ঘুম এবং পোলার বিয়ার

রাশিয়ার এই পারমাণবিক শক্তিচালিত জাহাজে চেপেই উত্তর মেরু ঘুরে এসেছে প্রত্যয়ের মতো স্কুলপড়ুয়ারা
ছবি: মালেকুল সালেহীনের সৌজন্যে

ধীরে ধীরে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিলাম।

জাহাজের দিনগুলো ছকে বাঁধা। সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীরচর্চা। নাশতা সেরে যেতে হয় কনফারেন্স রুমে। সেখানে নানা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সেশন চলে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিশেষজ্ঞরা আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। কেউ মেরিন বায়োলজি নিয়ে আলোচনা করেন, কোনো নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানী তাঁর অভিজ্ঞতা বলেন, আবার নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন শোনান তাঁর কাজের গল্প। একদিন হলো এআই নিয়ে সেশন। রাশিয়ার ক্রীড়া ও অলিম্পিকের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও নিজেদের অভিজ্ঞতা শোনালেন।

সূর্য না ডোবার কারণে সময়ের হিসাবও একটু অদ্ভুত লাগে। আমরা স্বাভাবিক সময়সূচি মেনে চলি। স্থানীয় সময়ের চেয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা এগিয়ে একটি সময়সূচি অনুসরণ করি। রাত ১০টার দিকে ঘুমাতে যাই। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে বাইরে তাকালে দেখি, দিনের মতো আলো। প্রথম দিকে বিষয়টি বেশ ভয়ংকরই লাগত।

জাহাজে নানা বিষয়ে ছিল সেশন
ছবি: মালেকুল সালেহীনের সৌজন্যে

জাহাজে ওঠার প্রায় তিন-চার দিন পর প্রথম বরফ দেখতে পেলাম। সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনি, পোলার বিয়ারও দেখা গেছে। কিন্তু তখন আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। পরে ছবি আর ভিডিও দেখলাম। দুটো পোলার বিয়ার জাহাজের আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে। এমন একটা বিরল মুহূর্তে ঘুমিয়ে থাকা কাউকে আলাদা করে ডাকেনি। যে দেখতে পেরেছে, সে নিজের মতো করে বাইরে গিয়ে দেখেছে। আমি ও আমার রুমমেট তখন বেশ ক্লান্তও ছিলাম। তবে নিজের চোখে দেখতে না পেরে একটু আফসোসই হলো।

জাহাজের ভেতরে সবকিছুই গরম ও স্বাভাবিক। তবে বাইরে তাপমাত্রা মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রুম থেকে বাইরে বের হলেই ঠান্ডায় জড়োসড়ো হয়ে যাই। হিম হয়ে আসা পরিবেশেই জাহাজের ওপরের অংশে, হেলিপ্যাডের মতো একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে আমরা সময় কাটাতাম এবং ছবি তুলতাম।

দিনে দিনে অন্যদের সঙ্গে বন্ধুত্বও। আমার রুমমেট ছিল ইন্দোনেশিয়ার। স্বাভাবিকভাবেই তার সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব হলো। এশিয়ার দেশগুলোর অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমারের অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে বেশি।

বাংলাদেশের পতাকা হাতে প্রত্যয়
ছবি: মালেকুল সালেহীনের সৌজন্যে

উত্তর মেরুতে লাল-সবুজ হাতে

৭ আগস্ট সকালে আমরা নর্থ পোলের কাছাকাছি পৌঁছাই। বরফের স্তর তখন বেশ পাতলা ছিল। কোথায় নামা সম্ভব হবে, সেটি খুঁজে দেখছিলেন আয়োজকেরা। সকালে একটি ছোটখাটো আয়োজন হলেও তখনই আমাদের নামানো হয়নি। পরে বিকেলের দিকে বরফের এমন একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে বরফ বেশ পুরু। সেখানে আমাদের নামানো হলো।

আমি বরফের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি একা নই—আমার দেশও আমার সঙ্গে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।

নর্থ পোল থেকে ফেরার যাত্রা শুরু হয় ৮ আগস্ট। জাহাজ কিছু সময় সেখানে অবস্থান করার পর আবার চলতে শুরু করে। জাহাজে জীবন চলছিল একই ছকে—সকালে ওঠা, সেমিনার, খাওয়াদাওয়া আর নিয়ম করে ঘুম। বাইরে পানি আর বরফের দুনিয়া।

বাংলাদেশের টি-শার্ট পরা সেই মানুষটি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া রুশ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে
ছবি: মালেকুল সালেহীনের সৌজন্যে

১২ আগস্ট ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা। একজনকে দেখি বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত টি-শার্ট পরা। এর আগে এই কয়েক দিনে তাঁকে বেশ কয়েকবার দেখেছি। আইসব্রেকারে এই রুশ একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ছিলেন। ছুটে গেলাম তাঁর কাছে।

কথা বলে জানতে পারি, তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে তাঁর অনেক বন্ধু হয়েছে। এমনকি একটি গ্রামের বিয়েতে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর আছে। নিজের মুঠোফোনে সেই বিয়ের ছবি দেখালেন। বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তা এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর মিশে যাওয়ার গল্প শুনে বেশ ভালো লাগল। আমরা দুজন ছবি তুললাম।

পৃথিবীর এত দূরে একজন বিদেশি বিশেষজ্ঞকে বাংলাদেশের জার্সি পরে থাকতে দেখে গর্বই হচ্ছিল।

ফেরার পথে যাত্রা শুরুর মতো তেমন মোশন সিকনেস হলো না। ১৩ আগস্ট আবার পা রাখলাম মুরমানস্ক বন্দরে।

আরও পড়ুন