পর্যটকদের পথ চেনান এই বম তরুণ
বান্দরবানের রুমা উপজেলায় পর্যটকদের গাইড হিসেবে কাজ করেন অনেকেই। তবে মুনথাং বমের কদর আলাদা। সদাহাস্যমুখ এই বম তরুণের গাইড হয়ে ওঠার গল্প শুনলেন সজীব মিয়া
এমনিতে ঢাকায় খুব একটা আসা হয় না মুনথাং বমের। পাহাড়ের মানুষ, পাহাড়েই প্রশান্তি পান। তারপরও কোনো কারণে রাজধানীতে এলে মধুর এক বিড়ম্বনায় পড়তে হয় তাঁকে। কার বাসা রেখে কার বাসায় উঠবেন, কার সঙ্গে একবেলা খাবেন সে সময় দেওয়া, কার সঙ্গে কখন কোথায় দেখা করবেন তা জানানো ইত্যাদি।
যাঁদের নিয়ে মুনথাংয়ের এমন বিড়ম্বনা, তাঁরা কেউ তাঁর আত্মীয় নন, তবে আপনজন। বান্দরবানের রুমায় পর্যটকদের গাইড হিসেবে কাজ করতে গিয়ে হাজারো মানুষকে তিনি এভাবেই ভালোবাসার বাঁধনে বেঁধেছেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে নিকটজনের চিকিৎসা করাতে ঢাকা এসেছিলেন মুনথাং বম। তখনই তাঁর সঙ্গে দেখা, আলাপ। জানতে চাইলাম, ‘এত এত মানুষের আপন হয়ে উঠলেন কী করে?’
মুনথাংয়ের কণ্ঠে বিনয় ঝরে পড়ে, ‘পর্যটকদের আমি আমার আত্মীয় হিসেবে নিই। গাইড হিসেবে সর্বোচ্চ সেবাটা দেওয়ার চেষ্টা করি। হয়তো আমার প্রতি অনেকে সন্তুষ্ট হন বলেই ভালোবাসেন।’
প্রতি সপ্তাহেই কোনো কোনো গন্তব্যে ছোটেন যান মুনথাং। কখনো তাঁর সঙ্গে সঙ্গী হন ১৫ জন, কখনো ৩০ জন। রুমা বাজার থেকে বগালেক, কেওক্রাডং, রিজুক ঝরনাসহ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অনুমোদিত এলাকায় ভ্রমণপিপাসুদের পথ দেখান তিনি। শুধু পথ দেখানো নয়, পর্যটকদের জন্য বাজারসদাই থেকে থাকা-খাওয়ার যাবতীয় বন্দোবস্ত করেন এই বম তরুণ।
যেভাবে গাইড হলেন
মুনথাং বম তখন নবম শ্রেণিতে পড়েন। বেথেল পাড়ায় তাঁদের বাড়ি। পাহাড়, ঝিরি আর নদী মাড়িয়ে বাড়ি থেকে বান্দরবানের রুমা উপজেলা সদর ঘণ্টাখানেকের পথ। সদরের উচ্চবিদ্যালয়ে রোজ আসতে-যেতে এই ‘সামান্য’ দূরত্ব রোজ তাঁকে পাড়ি দিতে হয়। সামান্য এ কারণে, মুনথাংয়ের সহপাঠীদের অনেকে আসেন তিন-চার ঘণ্টার পথ পেরিয়ে।
নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বইয়ে পড়া একটি তথ্য মুনথাংয়ের মস্তিষ্কে প্রশ্নের অনুরণন তুলেছিল। তথ্যটি ছিল, ‘বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের নাম কেওক্রাডং। এটি বান্দরবান জেলায় অবস্থিত।’
তারপর আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য মুনথাং জানলেন, কেওক্রাডং তাঁদের রুমা উপজেলার একটি পাহাড়। নিজের উপজেলায় দেশের সর্বোচ্চ পর্বত, অথচ তিনি দেখেননি, এ কী করে হয়। ২০০৬ সালে কেওক্রাডং ভ্রমণের বিস্তারিত জানলেন বড়দের কাছে।
পরের বছরই সুযোগ এল কেওক্রাডং ভ্রমণের। বমদের বড় এক ধর্মীয় সমাবেশ ছিল কেওক্রাডংয়ের নিকটবর্তী পাড়ায়। বন্ধুদের সঙ্গে দুদিনে তখন পর্যন্ত দুর্গম কেওক্রাডংয়ে গেলেন, ঘুরলেন, বিস্মিত হলেন। সে বিস্ময় আরও পরে এসে অনুপ্রাণিত করল পর্যটকদের গাইড হতে। মুনথাংয়ের ভাষায়, ‘এরপর অনেক এলাকায় আমি ঘুরেছি। আমাদের এলাকায় তখন পর্যটকেরা আসতে শুরু করেছে। তাদের পথ দেখাতে অনেকে সাহায্যও করছিল।’
তবে মুনথাং তখনো জুমচাষে বাবাকে সাহায্য করে যাচ্ছেন। পাহাড়ি সন্তানদের অনেকের মতো স্কুল থেকেই ঝরে পড়েছেন। মা-বাবা আর দুই ভাই-এক বোনের পরিবারে মুনথাংয়ের কাঁধে সংসারের দায়িত্ব চাপল দিনে দিনে। ২০১২ সালের দিকে পার্বত্য জেলায় ক্রমেই পর্যটকদের ভিড় বাড়তে থাকল। মুনথাং নাম লেখালেন গাইড হিসেবে। নিবন্ধিত গাইড হলেন ২০১৪ সালে।
মুনথাংকে জিজ্ঞেস করি, গাইড হিসেবে আর কত দিন?
মানুষ মুনথাংয়ের মতো উত্তরটাও সহজ, ‘যত দিন নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে মিশে কিছু শিখতে পাব, আনন্দ পাব।’