রাতারগুলে রাত্রিবাস

সকালে বেরিয়ে পড়েছিলাম রাতারগুল জলাবন ঘুরে দেখতে
ছবি: ম্যাক সুমন

রাতারগুল জলাবনে আগেও গিয়েছি। সিলেটে থাকি বলে দিনে গিয়ে দিনেই ফিরেছি। জলাবনের আশপাশে কখনো রাত কাটানো হয়নি। সেদিন ফেসবুকে তৌহিদ ও তানিয়া দম্পতির পোস্ট দেখে জানতে পারলাম, তাঁরা রাতারগুলে যাচ্ছেন, থাকার বন্দোবস্তও করেছেন। আমি সঙ্গী হলাম তাঁদের।

সিলেট নগরীতে আমার বাস। নগরীর আম্বরখানা থেকে সিএনজিতে উঠি রাতারগুলে যাব বলে। এরই মধ্যে আমার সঙ্গে যুক্ত হন আরও চারজন। দলেবলে সন্ধ্যায় পৌঁছালাম রাতারগুলে। নৌকাঘাটে পাশাপাশি কয়েকটি কুঁড়েঘর বানানো হয়েছে। তাঁবু টানিয়ে তারই সামনের জায়গায় থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

কান পাতলেই শেয়ালের হুক্কাহুয়া শোনা যায়। ঝিঁঝি পোকা আর ব্যাঙের ডাকে মধ্যরাতের রাতারগুল জলাবন বেশ রহস্যময় হয়ে উঠল
সকালের রাতারগুল গ্রাম

সন্ধ্যায় চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে এল। আবছা অন্ধকারে গেলাম চৌরঙ্গি ঘাটে। পাশেই সারি ও গোয়াইন নদ। পাখিরা যেভাবে নীড়ে ফেরে, মাঝিরাও তেমনি নৌকা নিয়ে ঘাটে ফিরছেন। সেখানে দাঁড়িয়ে দেখি, অন্ধকার নামতেই রাতারগুলের আশপাশের গ্রামগুলোতে টিমটিমে বাতি জ্বলে উঠল। দূরে দেখা দিল, ভারতের মেঘালয় ও আসামের কোনো শহর। জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে ভারতের শহরগুলো বেশ আলোকিত। বাংলাদেশ থেকে এ দৃশ্য দেখে বেশ অদ্ভুত লাগল।

চৌরঙ্গি ঘাটের পাশে গড়ে ওঠা এক রিসোর্টে ব্যবস্থা হয়েছে আমাদের রাত্রিযাপনের। কুঁড়েঘরের সামনে ছোট পুকুরের পাড়। নদীর পাড় থেকে ফিরে সেখানে সবাই গোল হয়ে বসি। আড্ডা জমতে সময় লাগে না। একফাঁকে কেউ কেউ গেয়ে উঠছেন গান। মহামারির দিনে যেন একটু সুখী হওয়ার চেষ্টা। সঙ্গী ম্যাক সুমন ছবিপাগল মানুষ। তিনি আড্ডা ছেড়ে অন্ধকারেই ক্যামেরা হাতে নেমে পড়লেন।

তাঁবুতে কেটেছে রাতের অনেকটা সময়

কদিন থেকে সিলেটের আকাশে ঝুম বৃষ্টি। কিন্তু অবাক করে দিয়ে সেই সন্ধ্যায় লাখো তারা বাজারগুলোর আকাশে জ্বলে উঠল। ভাদ্র মাসের আকাশের মেজাজ ধরা যায় না। ধুপ করে তারা জ্বলে ওঠার পর ধুপ করে আবার নিভেও গেল। তারপর মেঘকে ঠেলেঠুলে একটা কমলা রঙের চাঁদ উঠল। সেই চাঁদের আলো চৌরঙ্গি ঘাটের পানিতে লেগে টলমল করে উঠল। সে এক অপার্থিব দৃশ্য!

শহর ছেড়ে অনেক দূরে এক নৈসর্গিক পরিবেশে রাত কাটাচ্ছি। কান পাতলেই শেয়ালের হুক্কাহুয়া শোনা যায়। ঝিঁঝি পোকা আর ব্যাঙের ডাকে মধ্যরাতের রাতারগুল জলাবন বেশ রহস্যময় হয়ে উঠল। আমাদের কুঁড়েঘরের পাশেই সারি সারি নৌকা বাঁধা। দিনের বেলা এসব নৌকায় পর্যটকেরা রাতারগুল বন ঘুরে দেখেন।

ভোরের আলো

আড্ডা ইতি টানতে হলো। তখন মাঝরাত। সুনসান নীরবতায় হাঁটতে বের হলাম। পিছু নিল তিনটি কুকুর। মেঘলা আকাশে চাঁদ এই ভাসছে, এই ডুবছে। রাতারগুল গ্রামের তিনটি কুকুর আমাকে পেয়ে বেশ আনন্দিত। চেনা মানুষ ভেবে যেন আমার পাশে হেঁটে চলছে। খুব সামনেই যেন একটা সাপ গড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেল। বুনো হাওয়ার মাতাল ঘ্রাণে এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি হলো।

যাঁদের সঙ্গে এসেছি, তাঁরা খুব আমুদে প্রকৃতির মানুষ। গভীর রাতে সবাই আবার আড্ডায় মশগুল। বারবিকিউ পার্টি হলো। সিলেট অঞ্চলের লোকগানের সঙ্গে কেউ কেউ গলা মেলাচ্ছেন। জীবন উপভোগ করার দারুণ সব আয়োজন!

রাত জেগে আমরা অনেকেই ভোরের আলো ফুটলে ঘুমাতে গেলাম। একপশলা বৃষ্টি সে ঘুমকে আরও গাঢ় করে দিল। ঘুম ভাঙলে জানালা খুলে দেখি মেঘালয়ের পাহাড়ে সাদা সাদা তুলার মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে।

বেড়িয়ে পড়লাম। চৌরঙ্গি ঘাটে দুটি নৌকা বাঁধা। আমরা কয়েকজন হুড়মুড় করে গিয়ে নৌকায় বসলাম। শীতলপাটি তৈরি করে যে মুর্তাগাছ দিয়ে, সেই মুর্তার ঝোপের মধ্যে দিয়ে নৌকা চলতে শুরু করল। ডিঙি বলে কেউ একটু নড়লেই দোলে ওঠে। একসময় জলমগ্ন নিস্তব্ধতার মধ্যে শুধু বইঠার জল ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। শোনা যায় পাখির ডাক। মন উদাস করে দেয় মুহূর্তটুকু।