লঙ্কাকাণ্ডের সময় শ্রীলঙ্কায়
যাত্রাপথে একটা জায়গায় শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনী আমাদের আটকাল। চালকের কাছে জিজ্ঞেস করল, কারফিউয়ের সময় সে কেন বাইরে বের হয়েছে। যখন জানল, গাড়িটা পর্যটকবাহী, সুন্দর হাসিতে চালককে সামনে আগানোর অনুমতি দিল
কলম্বোর বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ল্যান্ড করল আমাদের বিমান। প্রায় ২৬০ আসনের বিশাল প্লেনে যাত্রী মাত্র ৪০-৫০ জন। যাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই আবার শ্রীলঙ্কান। নেমে দেখি সুনসান এক বিমানবন্দর। যাত্রীদের চেয়ে বন্দরকর্মীর সংখ্যাই বেশি। ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতেও সময় লাগল মিনিট পাঁচেক। পুরো বিমানবন্দরে চালু একমাত্র কনভেয়ার বেল্টে লাগেজ চলে এল।
বিমানবন্দরের বাইরে বেরিয়ে দেখি গাইড নীল। আমার নাম একটা কাগজে মোটা হরফে লিখে অপেক্ষা করছেন। তিনি ছাড়া কাউকেই অপেক্ষমাণ দেখলাম না। ঢাকা থেকেই নীলের সঙ্গে যোগাযোগ। পরিচয় দেওয়া মাত্রই শ্রীলঙ্কানদের স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসি তাঁর মুখে।
নীলের গাড়িতে উঠতে উঠতেই সূর্য ডুবে গেল। শহরে কারফিউ। শ্রীলঙ্কা আসার ঠিক আগেই জানি কলম্বো উত্তাল। রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত। নিত্যপণ্যের দোকান ছাড়া শহরের সব দোকানপাট বন্ধ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশ চেকপোস্ট। যেতে যেতে দেখলাম জ্বালানির জন্য পেট্রলপাম্পে লম্বা লাইন। অনেক সময় পেট্রল পেতে নাকি দুই দিনও লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তবু কেউ এখানে বেলাইনে যায় না!
শ্রীলঙ্কা সফরে প্রথম অবাক হলাম জ্বালানি নিতে গিয়ে। চালক ও গাইড নীল প্রায় দুই কিলোমিটার লাইনের তোয়াক্কা না করে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল পেট্রলপাম্পে। গাড়িতে বিদেশি পর্যটক আছে শুনে পাম্পের কর্মীরা সবার আগে আমাদের পেট্রল দিল। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির বড় ভিত পর্যটন খাত। করোনা আর দেশের ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এ খাত একেবারে ধসে গেছে। শ্রীলঙ্কায় বিদেশি পর্যটকদের ‘পয়া’ বা সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করা হয়। তাই এখানকার মানুষেরা পর্যটকদের জন্য যেকোনো সেবা সবার আগে দেওয়ার মানসিকতা পোষণ করে।
যাত্রাপথে একটা জায়গায় শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনী আমাদের আটকাল। চালকের কাছে জিজ্ঞেস করল, কারফিউয়ের সময় সে কেন বাইরে বের হয়েছে। যখন জানল, গাড়িটা পর্যটকবাহী, সুন্দর হাসিতে চালককে সামনে আগানোর অনুমতি দিল।
অন্ধকার কেটে আমাদের গাড়ি চলেছে কলম্বো ছাড়িয়ে সিগিরিয়ার পথে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের প্রথম গন্তব্য কলম্বো থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার পথ এই সিগিরিয়া। সেখানে পৌঁছাই রাত সাড়ে নয়টায়। বিশাল এক রিসোর্ট। সাধারণ সময়ে যেখানটা পর্যটকদের আনাগোনায় পূর্ণ থাকে, সেখানে অতিথি বলতে আমরা দুজন। রিসোর্টের বাতি জ্বলছে, অসংখ্য স্টাফ অন ডিউটিতে আছে শুধু দুজন অতিথিকে সেবা দেওয়ার জন্য। আর কী অসাধারণ তাদের আতিথেয়তা!
ভোরের আলো ফোটা মাত্রই বুঝলাম, রাতভর ‘স্বর্গে’ ছিলাম। চমৎকার স্বচ্ছ পানির লেক কায়ানওয়ালার বুকে ফুটে আছে হাজার হাজার পদ্ম। আকাশে নির্ভয়ে উড়ছে শত প্রজাতির পাখি। শব্দ বলতে পাখির কূজন আর বাতাসে নড়া পাতার আওয়াজ শুধু।
সকাল উপভোগ করে আমরা বের হলাম ইউনেসকোর বিশ্বঐতিহ্য লায়ন রক দেখতে। এখানে প্রবেশ করতে বিদেশিদের ৩০ ডলার গুনতে হয়। তবে সার্কভুক্ত দেশের মানুষের জন্য সেটা অর্ধেক। লায়ন রক এলাকায় নামতেই আমাদের দুজনের ওপর এসে পড়ল প্রায় অর্ধশত ইউনিফর্ম পরা লোকাল গাইডের চোখ। একটু অস্বস্তি লাগছিল এই ভেবে যে এরা হয়তো এখন বিরক্ত করবে। কিন্তু আমরা যখন জানালাম আমাদের গাইডের দরকার নেই, তখন আমাদের অবাক করে দিয়ে আর একবারও তারা আমাদের পেছন থেকে ডাকাডাকি করল না। এত অভাবে থেকেও পর্যটকহীন একটা সময়ে তাদের কোনো কিছুতে কোনো জোরাজুরি নেই। নিজেদের মতো করে আমরা ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। পুরাকীর্তিতে ভরা নির্জন একটা পার্ক, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে মানবজট লেগে থাকে। এই পার্কের মাঝখানেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত সেই লায়ন রক। ১৬২৪ ফুট উঁচু। ওপরে উঠে অনুভব করলাম প্রচণ্ড বাতাস। পাখির চোখে চমৎকার সবুজে ঘেরা সিগিরিয়ার শহর সময় নিয়ে দেখলাম।
আমাদের পরের গন্তব্য শ্রীলঙ্কার পুরোনো রাজধানী ক্যান্ডি।