সাঙ্গুর রোমাঞ্চ, রোমাঞ্চের সাঙ্গু

ছবি: লেখক

সাঙ্গু নদীতে এর আগেও দুবার যাওয়া হয়েছে। সাঙ্গুর তীরে বসা, তার জলে অবগাহন করা, তার ধীর লয়ে বয়ে চলা দেখেছি। তার স্বচ্ছ শীতল জলে একটু-আধটু ভেজাও হয়েছে, তবে তার সবই শীতে, নীরব, নির্মল, নিরীহ সাঙ্গুতে। মেঘ কালো আকাশে, ভরা বরষায়, উত্তাল সাঙ্গুর জলে, ভীষণ খরস্রোতা সাঙ্গুতে, ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে এই প্রথম সাঙ্গুর সঙ্গে দেখা হলো। আর এবারই ভয়ানক খরস্রোতা, অসম্ভব সুন্দর, এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর সাঙ্গুর দেখা পেলাম।

বৃষ্টিস্নাত সাঙ্গু নদী
ছবি: লেখক

সাঙ্গুর বুকে ভেসে থাকা সরু কাঠের ট্রলারে যখন চেপে বসি, তখন টুপটাপ বৃষ্টিটা বেশ বেগ নিয়ে ঝরতে শুরু করেছে। থানচি বাজার থেকে কায়দা করে বানানো পলিথিন কেনা হয়েছিল, যে পলিথিনের ভেতরে ব্যাগ রেখে পলিথিন মুড়িয়ে বোটে রেখে দেওয়া হয়েছিল নদীর পানি ছিটকে উঠে ব্যাগ ভিজে যাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। তুমুল বৃষ্টিতে ততক্ষণে বর্ষাতিও ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছি। তাই অন্য আর একটা পলিথিন বেশ ভালো করে গায়ের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে রুপালি বৃষ্টি ঝরে সাঙ্গুর অপরূপ রূপসুধা উপভোগ করছিলাম।

যদিও বৃষ্টির জন্য প্রাণ ভরে উপভোগ করতে পারছিলাম না—ভিজে গিয়ে অসুস্থ হয়ে না যাই সেই ভয়ে। মনে মনে চাইছিলাম বৃষ্টিটা একটু কমে যাক, গায়ের পলিথিনটা পাশে রেখে প্রাণ ভরে, দুচোখের আশ মিটিয়ে উপভোগ করি পাহাড় সারির মাঝ দিয়ে বয়ে চলা খরস্রোতা সাঙ্গুর অপূর্ব রূপের সবটুকু।

সাঙ্গুতে পর্যটকদের জন্য অপেক্ষমান বোট
ছবি: লেখক

কিন্তু না, আমরা যত সামনে এগিয়ে যেতে থাকছি, তত যেন বৃষ্টি বেড়ে চলেছে। বৃষ্টিতে ভিজে শেষ পর্যন্ত কী অবস্থা হবে, এই ভেবে বৃষ্টি যত বাড়তে থাকে আমার দুশ্চিন্তাও তত বাড়তে থাকে। কিন্তু আরও কিছুটা এগিয়ে যেতে, নদী যখন পাহাড়ের বাঁক ঘুরতে শুরু করল, তখনই দেখা গেল সাঙ্গুর নতুন আর এক ভয়ানক এক রূপ! সেখানে নদী সমতল নয়, যে পথে চলছি সামনে নদী তার চেয়ে কয়েক ইঞ্চি উঁচু, যা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে! জীবনে এই প্রথম এমন কোনো নদী দেখলাম, যা রাস্তার মতো সমতল নয়, বরং বেশ উঁচু আর নিচু! সত্যি এত অবাক হয়েছি যে যত সামনে এগিয়ে যেতে থেকেছি ভেতরে-ভেতরে ভয়ে তত কুঁকড়ে গিয়েছি। সামনের নদী এত বেশি উত্তাল, এত বেশি খরস্রোতা, আর এত বেশি ভয়ানক ছিল কী আর বলব!

উঁচু-নিচু নদীপথ পার হয়ে আবার নদী যখন সমতলে চলতে শুরু করল, তখন কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম ভেবে যখনই নিশ্চিন্ত হতে গেলাম, ঠিক তখনই সাঙ্গু তার আগের ভয়ানক রূপের চেয়েও বীভৎস রূপে দেখা দিল। হ্যাঁ, এবার আগের মতো শুধু উঁচু-নিচু নদী নয়—উঁচু তো বটেই, তার চেয়েও ভয়ানক যেটা সেটা হলো, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বড় বড় পাথর আর উত্তাল ঢেউ—এই দুইয়ের বিপজ্জনক বাধা, যেটা পার হতে গিয়ে প্রাকৃতিক এক রাফটিং হয়ে গেছে আমাদের আর সবাই উত্তাল সাঙ্গুর ঢেউয়ে ভিজে একাকার হয়ে গেছি। এই জায়গাটাও কোনো রকমে যখন পার হয়েছি তখনো জানি না, কোনো ভাবে বুঝতেই পারিনি যে সামনে এর চেয়েও ভয়ংকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ কিছু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সত্যি ভাবিনি যে এরপর আরও অন্য রকম কোনো রোমাঞ্চ বাকি থাকতে পারে।

সাঙ্গুর বড় চ্যালেঞ্জ পাহাড়ের বাঁক
ছবি: লেখক

আরও কিছুটা এগিয়ে যেতেই একই সঙ্গে সাঙ্গু আমাদের তিন তিন রকমের চ্যালেঞ্জের মুখে ভাসিয়ে নিয়ে এল। আগের উঁচু-নিচু নদী, সঙ্গে ভয়ানক স্রোত, উত্তাল ঢেউ—এগুলো তো ছিলই, এর সঙ্গে অতিরিক্ত যুক্ত হয়েছিল নদীর মাঝে, ঢেউয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিশাল বিশাল পাথর! যে কারণে কোনটি যে পাথর আর কোনটি যে ঢেউ, সেটা বুঝে ওঠা মুশকিল হয়ে যায়। আরও বড় চ্যালেঞ্জ যেটা সেটা হলো পাহাড়ের বাঁক, সঙ্গে সরু নদীপথে ঘন অরণ্য। পাহাড়ের এসব বাঁক একদিকের নদীর সঙ্গে অন্যদিকের নদীকে অদৃশ্য করে রাখে, যে কারণে অন্যদিক থেকে কোনো বোট চলে এল কি না, সেটার জন্যও মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হয়। এ বিপজ্জনক যাত্রায় কিছুটা নিরাপদ থাকার জন্য বোটের একেবারে সামনে একজন বইঠা হাতে প্রস্তুত থাকে উল্টো দিক থেকে আসা বোটকে সংকেত দিতে আর সেই সঙ্গে লুকিয়ে থাকা পাথর থেকে বোটকে বাঁচাতে।

এভাবে একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, একটার পর একটা রোমাঞ্চকর পথ পাড়ি দিয়ে, যেখানে এসে কিছুটা প্রশান্তি পেলাম, এত এত কষ্টের পর যার দেখা পেলাম, তা আমাদের জন্য ছিল সত্যি এক অবাক উপহার আর অপূর্ব অভিজ্ঞতা। এর জন্য আমরা মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। এমন কিছুর যে দেখা পাব, ভাবতেই পারিনি।

স্রোত আর পাথর এই দুটি জিনিস সাঙ্গুকে ভয়ঙ্কর করে রাখে
ছবি: লেখক

উত্তাল, উন্মাদ, উচ্ছ্বসিত আর রোমাঞ্চকর সাঙ্গুতে ভেসে ভেসে, অদ্ভুত রোমাঞ্চকর একটা বোট রাইড করে, থানচি থেকে পৌঁছে গিয়েছিলাম বান্দরবানের অন্যতম রূপবতী এক পাহাড়ি গ্রামের পায়ের কাছে, যেখানে বৃষ্টি শেষে, নদী, পাহাড় আর অরণ্যের কাছে মেঘেরা আসে ক্ষণিকের অতিথি হয়ে। পাহাড়ের কোলে অপরূপ এ গ্রামের নাম তিন্দু। সুন্দরী তিন্দু।