মাল্টিফাংশনাল এ ধরনের আসবাব ছোট ঘরের জন্য বেশ কার্যকর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই প্রথম পশ্চিমে অনুভূত হয় এ ধরনের আসবাবের প্রয়োজনীয়তা। বাড়িগুলোর আকার ছোট হয়ে আসায় তখন এ ভাবনা ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে। একাধিক কাজ করে, জায়গা বাঁচায় ও সহজে ঘর গুছিয়ে রাখতে সহায়তা করে, ছোট ফ্ল্যাটের এ যুগে আমাদের দেশেও তাই বাড়ছে এসব আসবাবের জনপ্রিয়তা। এ ধরনের আসবাবের নকশাও মিনিমালিস্ট।

সমসাময়িক আসবাবের নকশায় আমরা বিশ শতকের শেষ দিকের শৈলী এবং আধুনিক ধারণার মিশ্রণ দেখতে পাই। অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী বা পুরোনো ঘরানার আসবাব বানানোর সময় ইতিহাস থেকে প্রেরণা নিয়ে থাকেন ডিজাইনাররা। এসব নকশায় কাঠকেই মূলত প্রাধান্য দেওয়া হয়। আর সমসাময়িক নকশার আসবাবে কাঠের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। পরিবর্তে বেছে নেওয়া হচ্ছে নানা ধরনের বোর্ড—মিডিয়াম ডেনসিটি ফাইবার বোর্ড (এমডিএফ), প্লাইউড, মেলামিন ফেসড চিপবোর্ড, হাই ডেনসিটি ফাইবার বোর্ড ইত্যাদি।

দামি আর ভারী আসবাব হলেই যে দেখতে ভালো লাগবে, বিষয়টি কিন্তু তা নয়। বরং এ ধরনের আসবাবের নকশার ভিড়ে অনেক সময় অন্দরের সৌন্দর্য হারিয়ে যায়। আমরা একটা সময় সেগুন কাঠের ভারী নকশার আসবাব পছন্দ করতাম। এখনকার প্রজন্ম সেই চিন্তা থেকে সরে এসেছে বলে জানান হাতিলের পরিচালক শফিকুর রহমান। ১০ থেকে ১২ বছর হয় আসবাবে হালকা নকশার চল শুরু হয়েছে। চিকন আর হালকা নকশা, কোথাও থাকবে না কোনো বাড়তি কারুকাজ—ছোট বাড়ির জন্য এখন এ ধরনের মিনিমালিস্টিক আসবাবের কথাই চিন্তা করা হয়। সহজেই এগুলো পরিষ্কার রাখা যায় আর ঘরের যেকোনো কোনায় অনায়াসে জায়গা করে নিতে পারে। শফিকুর রহমান বলেন, হাতিল এখন যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকু জায়গার উপযোগী আসবাব বানাচ্ছে। উপকরণ কম অপচয় করার চেষ্টা করছে।

পাশাপাশি ক্রেতারা এখন আসবাবে আরামের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। বিছানার হেড বোর্ডে ফোমের ব্যবহার বাড়ছে এ কারণেই। বিছানায় হেলান দিয়ে বসে টেলিভিশন দেখা কিংবা চা–পানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন অনেকে। অনেকের পছন্দ আবার ন্যাচারাল অ্যান্টিক রঙের আসবাব। এর বাইরে পার্টিকেল বোর্ডের ওপর বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে মেলামিন পেপার। ফলে বাড়তি বার্নিশের ঝামেলা আর থাকছে না। ব্রোঞ্জ, শ্যাম্পেন, আইভরি—বিভিন্ন রঙের লেকার পলিশও পাবেন। হালকা নকশার পাশাপাশি ভিক্টোরিয়ান নকশার আসবাবও কিনছেন অনেকে। এ ধরনের আসবাবে হাতের সূক্ষ্ম কাজ প্রাধান্য পায় বলে জানান অ্যাথেনার হেড অব অপারেশন মঞ্জুরুল হক। ফুল, পাতার নকশাই মূলত এখানে প্রাধান্য পাবে। টেক্সচারে বৈচিত্র্য আছে আর দামেও কম বলে পার্টিকেল বোর্ডের ব্যবহার বাড়ছে। হাই গ্লস বোর্ড চকচকে হয়। পরিষ্কার করতে সুবিধা, খুব সহজে দাগ কিংবা স্ক্র্যাচ পড়ে না।

বাজারে অনেক ব্র্যান্ডের হাই গ্লস বোর্ড পাওয়া যায়। আকিজ বোর্ডের মার্কেটিং ম্যানেজার শাহরিয়ার জামান জানান, হাই গ্লস বিশেষ ধরনের বোর্ড। যেকোনো ধরনের ইন্টেরিয়র ডিজাইনকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করবে এই বোর্ড। ইউরোপিয়ান প্রযুক্তিতে তৈরি বোর্ডটি টেকসইও।

আসবাবে একদম দেশি ধাঁচ আনতে চাইলে বেতের থেকে ভালো কিছু হতে পারে না। বাড়ির সব ধরনের আসবাবেই এর ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ভিক্টোরিয়ান, সমসাময়িক, শ্যাবি, চিক কিংবা ক্ল্যাসিক—প্রায় সব ধরনের আসবাবেই বেত যায়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আলমারি, চেয়ার, টেবিল তথা দরজার ফ্রেম পর্যন্ত বেতে করা হচ্ছে। যাঁরা একটু চকচকে আসবাব এড়িয়ে যেতে চান, তাঁদের জন্য আদর্শ এই পন্থা।

একদম গতানুগতিক ধারার বাইরে যেতে চাইলে পুরোনো শাড়ি, কাপড় পুনর্ব্যবহার করে যে আসবাব বানানো হচ্ছে, সেগুলো দেখতে পারেন। প্যাচওয়ার্ক, কাঁথা স্টিচের এই কাপড়গুলো খুব যত্ন করে কয়েকটি স্তরে আসবাবের কাঠের ফ্রেমে আটকে দেওয়া হচ্ছে। যাত্রার জেনারেল ম্যানেজার ইমতেনান মোহাম্মদ জাকি জানান, যাত্রার আসবাবে খুঁজে পাওয়া যাবে ওয়াবি সাবি থিমের ধাঁচ। এটি একটি জাপানি ধারণা, যা বস্তু, ল্যান্ডস্কেপ, নকশা ইত্যাদির মধ্যে সৌন্দর্য ও নির্মলতা খুঁজে পায়। এ ছাড়া পাটের দড়ি দিয়ে খাটিয়া বানানো হচ্ছে। বসার ঘরে কিংবা বারান্দার এক কোণে গ্রামের আবহ নিয়ে আসে এটির উপস্থিতি। কাঠের টেবিল, চেয়ারের ওপর হ্যান্ড পেইন্টের ছোঁয়াও নিয়ে আসছে ভিন্ন আমেজ।

শেষ কথা হচ্ছে, আসবাব যেমনই হোক, সেটি যেন আপনার দৈনন্দিন কাজে অসুবিধা তৈরি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। সৌন্দর্য রাখতে গিয়ে আরাম যেন হারিয়ে না যায়।